জেন-জি অভ্যুত্থানের এক বছর

পুরনো বন্দোবস্তেই নেপালের নতুন রাজনৈতিক অভিজাতরা?

বালেন্দ্র শাহর সরকারের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠেছে বারবার। আরএসপি নিজেদের দলীয় কাঠামোয় স্বজনপ্রীতি ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার পরিবারের সদস্যদের সরকারি দায়িত্বে নিয়োগ সে প্রতিশ্রুতিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘনিষ্ঠদের নিয়োগের অভিযোগ এসেছে। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় কিন্তু সমস্যা হলো, পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তও এভাবেই তৈরি হয়েছিল। একটি বড় অনিয়ম দিয়ে নয়; ছোট ছোট ব্যতিক্রমকে স্বাভাবিক করতে করতে

গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর জেনারেশন জেড তথা জেন-জি আন্দোলনে পতন ঘটেছিল কেমি শর্মা অলির সরকারের। ৭৬ প্রাণের বিনিময়ে নেপালের ক্ষমতার মুখ বদলেছিল। কয়েক দশক ধরে রাজনীতির মঞ্চ দখলে রাখা পুরনো দল ও নেতাদের সরিয়ে সামনে এসেছে নতুন প্রজন্ম। ৩৬ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, কয়েক বছরের পুরনো রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গড়েছে, সংসদে তরুণদের প্রতিনিধিত্বও বেড়েছে। পুরনো প্রধান দলগুলো কার্যত ভেঙে পড়েছে। এত দ্রুত ও এত বড় রাজনৈতিক পালাবদল দক্ষিণ এশিয়ায় বিরল।

বাইরে থেকে দেখলে গত এক বছরে নেপালের রাজনীতিতে পরিবর্তন কম নয়। কিন্তু কাঠমান্ডুর ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে একটু দূরে গেলেই ছবিটা ঠিক ততটা নতুন মনে হয় না। এক বছর পরও তাই নেপালের সামনে আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক অভিজাতদের মুখ বদলালেই কি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বদলায়?

এ প্রশ্ন শুধু ক্ষমতাচ্যুত পুরনো রাজনৈতিক শক্তির নয়। গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তি, নিহতদের পরিবার এবং জেন-জি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেও একই প্রশ্ন তুলছেন। যে পরিবর্তনের জন্য পথে নেমেছিলেন, তার প্রতিফলন এখনো খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না বলেই মত তাদের। জেন-জি আন্দোলনের দাবি শুধু সরকার বদলানো ছিল না। দাবি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন বদলানো। পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ ছিল ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা এবং যোগ্যতার বদলে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে সুযোগ দেয়া। আন্দোলনের বহুল ব্যবহৃত ‘নেপো কিড’ স্লোগানও মূলত এ রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই ছিল।

নেপালের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব পুরনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনরোষের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতায় এসেছে। ফলে অন্য সরকারের তুলনায় তাদের কাছে প্রত্যাশাও অনেক বেশি। তাদের জন্য ‘পুরনো ব্যবস্থা থেকে পাওয়া সমস্যা’ যুক্তিটিও দীর্ঘদিন কার্যকর থাকবে না। কারণ তারা ক্ষমতায় এসেছেন সে ব্যবস্থা পাল্টানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই। সেই নেতৃত্ব যদি শেষ পর্যন্ত পুরনো নিয়মেই রাষ্ট্র চালায়, তাহলে ইতিহাস হয়তো এ সময়কে ক্ষমতার পরিবর্তন হিসেবে মনে রাখবে, রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পরিবর্তন হিসেবে নয়

বালেন্দ্র শাহর সরকারের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠেছে বারবার। আরএসপি নিজেদের দলীয় কাঠামোয় স্বজনপ্রীতি ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার পরিবারের সদস্যদের সরকারি দায়িত্বে নিয়োগ সে প্রতিশ্রুতিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘনিষ্ঠদের নিয়োগের অভিযোগ এসেছে। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় কিন্তু সমস্যা হলো, পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তও এভাবেই তৈরি হয়েছিল। একটি বড় অনিয়ম দিয়ে নয়; ছোট ছোট ব্যতিক্রমকে স্বাভাবিক করতে করতে।

প্রবল সমালোচনায় হয়েছে বালেন শাহ সরকারের জবাবদিহি নিয়ে। সরকারি দল সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। শক্তিশালী সরকার কোনো সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার দেশে স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংস্কারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সে সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি সংসদীয় জবাবদিহির প্রয়োজন কমিয়ে দেয়, তখন সেটি ঝুঁকি হয়ে ওঠে।

প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের সংসদে উপস্থিতি এবং বিরোধীদের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার প্রবণতা নিয়ে সমালোচনা চলছে। গত আগস্ট পর্যন্ত সংসদের ৪১টি বৈঠকের মধ্যে তিনি মাত্র ছয়টিতে উপস্থিত ছিলেন। সাংবিধানিক পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সদস্য সংখ্যাও অধ্যাদেশের মাধ্যমে কমানো হয়েছে। সরকারের যুক্তি ছিল, দীর্ঘদিন অচল থাকা নিয়োগপ্রক্রিয়া সচল করা। কিন্তু এতে প্রধানমন্ত্রী ও তার পক্ষে থাকা কয়েকজন সদস্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নিয়োগ দেয়ার পথও সহজ হয়েছে।

নেপালের অন্যতম সমস্যা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দল ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের প্রভাব থেকে স্বাধীন থাকতে পারেনি। নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি একই জায়গায় ফিরে যায়, তবে শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রজন্ম বদলানোর রাজনৈতিক মূল্য সীমিত হয়ে আসবে। অন্যদিকে পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের দীর্ঘ লাইন, রান্নার গ্যাস নিয়ে সংকট, কৃষকের সার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কিংবা কাজের সন্ধানে তরুণদের বিদেশে চলে যাওয়ার পুরনো দৃশ্য পুরোপুরি বদলায়নি। এগুলো হয়তো এক বছরে সমাধান করার মতো সহজ সমস্যা নয়। কিন্তু জেন-জি আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল ঠিক এ দৈনন্দিন ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ।

নেপালের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব পুরনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনরোষের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতায় এসেছে। ফলে অন্য সরকারের তুলনায় তাদের কাছে প্রত্যাশাও অনেক বেশি। তাদের জন্য ‘পুরনো ব্যবস্থা থেকে পাওয়া সমস্যা’ যুক্তিটিও দীর্ঘদিন কার্যকর থাকবে না। কারণ তারা ক্ষমতায় এসেছেন সে ব্যবস্থা পাল্টানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই। সেই নেতৃত্ব যদি শেষ পর্যন্ত পুরনো নিয়মেই রাষ্ট্র চালায়, তাহলে ইতিহাস হয়তো এ সময়কে ক্ষমতার পরিবর্তন হিসেবে মনে রাখবে, রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পরিবর্তন হিসেবে নয়।

নেপালের জেন-জি অভ্যুত্থানের সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি তাই বালেন্দ্র শাহ কতটা তরুণ প্রধানমন্ত্রী কিংবা আরএসপি কত বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, সেটি নয়। মাপকাঠি হবে সাধারণ নাগরিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে আগের চেয়ে ভালো সেবা পাচ্ছেন কিনা, তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কিনা, সংসদ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাহী ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কিনা? এক বছর পর এসব প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক নয়।

মাহফুজ রাহমান: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, বণিক বার্তা

আরও