‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি আজ বাঙালির ভাষা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মুক্তি সংগ্রামের উদ্দীপনার একটি মৃত্যুহীন উৎস। তবে কী করে এই গানটি আমাদের জাতীয় জীবনে এমন সম্পৃক্ততা পেল তা হয়তো অনেকে জানেন না।
১৯৫২ সালে ঢাকা কলেজের তদানীন্তন ছাত্র আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী কবিতাটি রচনা করেছিলেন। পরে অবশ্য কবি হাসান হাফিজুর রহমান সংকলিত ‘একুশের কবিতা’ গ্রন্থে কবিতাটি স্থান পায় এবং প্রসিদ্ধি লাভ করে। এতৎসঙ্গে হাসান হাফিজুর রহমান, আবু জাফর ওবায়েদুল্লাহ, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখ তরুণ কবিদের একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে রচনা জনপ্রিয় ও গণউদ্দীপক হয়ে ওঠে। কতিপয় কবিতায় সুরারোপ করে গান করে তোলার চেষ্টা হয়। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর উপর্লিখিত কবিতাটিতে সুরারোপ করেন তখনকার একজন বিখ্যাত গায়ক আবদুল লতিফ। তিনি কয়েকজনকে গেয়ে শুনিয়েছিলেন। আমার ছোট বোন নাসিমকে গান শেখাতেন তিনি। আমি তখন (১৯৫২-৫৩ সাল) ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি (জিএস)। আমাদের কয়েকজন সহপাঠী সহকর্মী মিলে সুরারোপিত গানটি শুনলাম। এর মধ্যে ছিলেন কবি নিজে, প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের ছোট ভাই (আমাদের সহপাঠী) গায়ক আতিকুল ইসলাম, ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ খান, ছাত্রনেতা ইকবাল আনসারী খান, (পরবর্তী সময়ে সাংবাদিক) মশির হোসেন আরো কেউ কেউ। তখন আমরা ঢাকা কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করছিলাম, ঢাকার তদানীন্তন ইংলিশ সিনেমা হল—রমনায় অবস্থিত ‘ব্রিটানিয়া হল’-এ। স্থির হলো কবিতাটি একটি গান হিসেবে অনুষ্ঠানের মুখ্য গীতি বিচিত্রায় স্থান পাবে।
গানটি-কবিতাটি বেশ দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছিল। একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৩ সালে সিদ্দিক বাজারে অবস্থিত ঢাকা কলেজ প্রাঙ্গণে (একটি ভাড়াটে বাড়ি) আমরা ভোরবেলা সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি শহীদ মিনার নিজেরাই স্থাপনের উদ্যোগ নিলাম। আশপাশের নির্মীয়মাণ বাড়ির মাল-মসলা চেয়ে জোগাড় করে আমরা ১০-১২ জন মিলে ইট-সুরকি দিয়ে সিমেন্ট সহযোগে একটি স্থাপনা খাড়া করে ফেললাম। এলাকার সমাজপতি (ঢাকাই উর্দুভাষী) মতি সরদার আমাদের তার মজুদ থেকে ইট ও সিমেন্ট সরবরাহ করলেন। ওই সময়ে ইডেন কলেজের ছাত্রীরা ঢাকা কলেজে ঘোড়ার গাড়ি করে আসতেন বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরি ব্যবহার করতে। তাদের কলেজে কোন ল্যাবরেটরি ছিল না। সকাল বেলা যখন ছাত্রীরা এলেন আমরা কয়েকজনকে অনুরোধ জানালাম—নির্মাণকাজে আমাদের সহায়তা করতে। কেননা, কলেজের দারোয়ানরা আমাদের কাজ করতে বাধা দিচ্ছিল—শারীরিক প্রতিরোধ করে। মেয়েদের বেলায় তারা অবশ্য তা করতে পারেনি। স্বল্পকালের মধ্যেই ইট-সুরকির একটি মিনার গড়ে উঠল। তখন ছাত্রছাত্রীদের তরফ থেকে আমি (সাধারণ সম্পাদক হিসেবে) কয়েকটি ফুল দিয়ে মিনারের বেদিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করলাম। আর বন্ধু গাফ্ফারের এই গানটি কবিতা হিসেবেই পঠিত হলো। পরে অবশ্য লতিফ ভাই এসে গানটি তার নিজের সুরে দরাজ গলায় গাইলেন এবং কয়েকজনকে সুর শেখালেন—যার কয়েকটি চরণ আমরা পরবর্তী সময়ে প্রভাত ফেরিতে গাইতাম। শহীদ মিনার নির্মাণ এবং আনুষঙ্গিক কর্মকাণ্ডে কলেজ কর্তৃপক্ষ খুবই রুষ্ঠ হল। ইডেন কলেজের তদানীন্তন প্রিন্সিপাল মিসেস ফজিলাতুন্নেছা জোহা গাড়ি করে এলেন এবং আমাদের তিরস্কার করে তার কলেজের মেয়েদের ফিরে যেতে বললেন। ইংরেজিতেই বেশ চড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কারা এই ঘটনার আয়োজন করেছো? জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে আমি বললাম, আমরা সবাই-ই। তিনি বললেন—না, আমাদের মেয়েদের জন্য তোমরা এমন অবস্থার সৃষ্টি করেছিলে যে তাদের কয়েকজনের সহায়তা করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। মনে পড়ে তিনি খুবই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রিন্সিপাল ছিলেন। মেয়েরা সবাই ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ফেরত গেল।
কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সূচনা করলেন। তবু আমাদের কেউ কেউ রোজ সকালে কলেজে এসে এই গান গাওয়া শুরু করল। অবশ্য তখন ভালোভাবে গান গাইতে পারত শুধু আতিকুল ইসলাম ও আনোয়ার উদ্দিন খান। পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই এ গানটি সর্বপ্রথম গণমঞ্চে গীত হলো।
কলেজ থেকে আমাদের চারজনকে বহিষ্কার করা হলো। এর মধ্যে ছিলাম বন্ধুবর কবি গাফ্ফার এবং আমি। পরে অবশ্য ছাত্র আন্দোলনের জেরে বহিষ্কারদেশ প্রত্যাহৃত হয়। কযেক মাসের মধ্যেই সংগীতঙ্গ আলতাফ মাহমুদ গানটির সুর পরিবর্তন করে নতুন (যা বর্তমানে প্রচলিত) সুরারোপ করেন। নতুন সুরটি হলো সহজ অথচ আবেদনমুখর—সুরেলা। প্রভাত ফেরিতে গাইবার জন্য খুবই উপযুক্ত। পরবর্তী সময়ে ছাত্রছাত্রীদের প্রভাত ফেরিতে গানটি প্রায় আবশ্যিক হিসেবেই গীত হতে থাকল। গানটি খুব দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে দাঁড়াল। আর এর আবেদন ছড়িয়ে গেল সব সীমানা। গানটি আজ একুশে ফেব্রুয়ারির প্রাণপাখি।
ইনাম আহমদ চৌধুরী: সাবেক চেয়ারম্যান, প্রাইভেটাইজেশন কমিশন