পর্যালোচনা

এডিস মশা দমনে কার্যকর কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায়

অতিক্ষুদ্র পতঙ্গ মশা তার বাসস্থান বা প্রজননস্থলে যত স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে ঠিক তত দ্রুতগতিতে বংশ বিস্তার করতে সাবলীল হয়ে ওঠে। এজন্যই তো বলা হয় মশা এনটিডি বা নেগলেকটেড ট্রপিক্যাল ডিজিজের একটি সুপরিচিত ও কৌশলী ভেক্টর (বাহক)। সুপরিচিত বলছি এ কারণে যে মশাবাহিত রোগগুলো মানুষের যত সমস্যা ও মৃত্যু ঘটায় অন্য কোনো বাহক তা পারে না। আর কৌশলী বলার অর্থ হলো, মশা এমন

অতিক্ষুদ্র পতঙ্গ মশা তার বাসস্থান বা প্রজননস্থলে যত স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে ঠিক তত দ্রুতগতিতে বংশ বিস্তার করতে সাবলীল হয়ে ওঠে। এজন্যই তো বলা হয় মশা এনটিডি বা নেগলেকটেড ট্রপিক্যাল ডিজিজের একটি সুপরিচিত ও কৌশলী ভেক্টর (বাহক)। সুপরিচিত বলছি এ কারণে যে মশাবাহিত রোগগুলো মানুষের যত সমস্যা ও মৃত্যু ঘটায় অন্য কোনো বাহক তা পারে না। আর কৌশলী বলার অর্থ হলো, মশা এমন কোনো পদ্ধতি ব্যবহার বাদ রাখেনি যা তাকে সব ধরনের আঘাত-প্রতিঘাত হতে রক্ষা করে নিজেকে কর্মক্ষম রেখেছে। এ অতিক্ষুদ্র পতঙ্গ যার জীবন চক্রের চারটি ধাপ হলো ডিম, লার্ভা, পিউপা ও পূর্ণাঙ্গ মশা। এর মধ্যে তিনটি ধাপই পানিতে অতিবাহিত করে, তাই তো সাহিত্যিকের মতো বলতে ইচ্ছা করে পানিতে কাটানো তিনটি ধাপ সম্পন্ন করা পতঙ্গটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষের চোখের পানি ঝরিয়ে চলছে। এ পতঙ্গ ডিপটেরা অর্ডারের। প্রজনন চক্র সম্পন্ন করার জন্য স্ত্রী মশকী মানুষের রক্ত শোষণের সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু অণুজীব যেমন ভাইরাস, প্রোটকটিস্ট প্রভৃতি মানুষের রক্তে মিশিয়ে দেয়, যা শুধু ওই আক্রান্ত মানুষের রক্তই দূষিত করে না, প্রাণহানী ও ভোগান্তিতে মানুষের হৃদয়ে দাগ রেখে যায়। 

আমরা জানি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষ অতি নিম্নমানের আবাসস্থলে বসবাস করে এবং জীবনের মৌলিক অধিকারগুলো তারা করুণা বা দান হিসেবে মনে করে। এ বিপুল জনগোষ্ঠীকে ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজের মধ্যে আনার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান প্রাণান্তর চেষ্টা করছে। এই এনটিডির মধ্যে মশাবাহিত রোগগুলো উল্লেখযোগ্য। এখন মশাবাহিত রোগগুলো এনটিডির গণ্ডি পেরিয়ে সচ্ছল ও অভিজাত শ্রেণীকেও তার ভয়াল থাবার আওতায় নিয়ে আসছে। তাহলে কি পুরো পৃথিবীতে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তা শুধু সুবিধাবঞ্চিত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মানুষের পাশাপাশি যারা এ বৈশ্বিক পরিবেশ পরিবর্তনের জন্য দায়ী তাদের আঘাত করতে শিখেছে।

আমরা অত্যাধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এসি, রেফ্রিজারেটর ব্যবহার করছি। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে অতিমূল্যবান গাড়ি ব্যবহারকারী হিসেবে নিজেকে ভাগ্যবান ভাবছি। অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য অধিক পরিমাণ অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়ণ গড়ে তুলছি। বুঝে না বুঝে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বনায়ন ধ্বংস করে চলেছি। কথায় কথায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপযুক্ত ডায়াগনোসিস না করে যথেচ্ছা ওষুধ সেবন করছি। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের ইচ্ছামতো ব্যবহার। জীবন সহজ করতে প্লাস্টিক ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ও যথাযথ ডিজপোজেবলের অভাবে তৈরি সমস্যাগুলো পরিবেশের ওপর যে বিস্তর বিরূপ প্রভাব ফেলছে তা এখন এনটিডির পরিসর শুধু যে বৃদ্ধি করছে তা নয়, বাড়চ্ছে ভয়াবহতার তীব্রতাও। তাই মশার প্রজনন ক্ষেত্র যেমন করাইল বস্তিতে আছে, তেমনি আছে গুলশান, বনানী, বসুন্ধরার মতো অভিজাত এলাকায়ও। ডেঙ্গু রোগী যেমন ঢাকা শহরে আছে তেমন ছড়িয়ে গেছে প্রত্যন্ত গ্রামেও। ব্যাপারটি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে অভিশাপের ঝড় এলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। 

২০০০-২২ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশার দমন প্রক্রিয়া নিয়ে যত ধরনের ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়েছে তা কি যথেষ্ট ও সন্তোষজনক ফলাফল দিতে পেরেছে। মনে হয় উত্তরটা ‘না’ সূচকই হবে। এর বিপরীতে যদি বিশ্লেষণ করা হয় তবে ফলাফল দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে এডিস মশার দুটি প্রজাতি। এডিস এজিপ্টি ও এডিস এলবোপিকটাস এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃত। তাই এখন অত্যন্ত সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে আমরা সত্যিই তটস্থ রাজধানী শহরে। যেখানে সর্বাত্মক চেষ্টা এবং বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও নির্দেশনা মোতাবেক মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে প্রত্যন্ত গ্রামে এমন সুগঠিত ব্যবস্থাপনা টিম কীভাবে সম্ভব হবে বুঝতে পারছি না। বুঝতে পারছি না প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি হেলথ প্রোভাইডারদের কাছে এত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কীভাবে সম্ভব হবে। এমন যদি হয় পরিস্থিতি তাহলে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা চিন্তা করতেই গা শিউরে উঠছে। 

এ পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার এমনভাবে ঘটছে আর আমরা কি আজও এ ক্ষুদ্র পতঙ্গ এবং এর মধ্যে বেড়ে ওঠা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের চোখ রাঙানিতে চরম অসহায়ত্ব নিয়ে নিজের অতিমূল্যবান জীবনকে সমর্পণ করব। অতিপ্রিয়জনকে অকালে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে করব আলিঙ্গন। না না কখনই নয়। এমনটি যাতে না হয় সেজন্যই অত্যন্ত শক্তিশালী স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান নিয়ে পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সত্যিকারের দেশপ্রেম নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের কার্যকরী অংশগ্রহণ পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত করতে হবে। জনসম্পৃক্ততা ছাড়া এ অমানিশার অন্ধকার কাটানো সম্ভব নয়। তবে এখানেও গবেষণার প্রয়োজন। বর্তমান সামাজিক যোগাযোগের বহুল প্রচলিত মাধ্যমগুলোর সরব কার্যকরী ব্যবহারের যুগেও সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সম্পৃক্ততা কেন সম্ভব হচ্ছে না তা অবশ্যই গবেষণার দাবি রাখে। যেমন দাবি রাখে লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইডের প্রতিরোধী হয়ে ওঠার সীমানা নির্ধারণ এবং সেই অনুযায়ী অ্যাকটিভ ইনগ্রিডেন্ট (কার্যকরি উপাদান) ও মুড অফ অ্যাকশনসমৃদ্ধ যুক্তিযুক্ত রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার। তবে এর সঙ্গে অবশ্যই মনে রাখতে হবে কীটনাশকের (লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশা ধ্বংসকারী) ব্যবহার পর্যায়ক্রমে করতে হবে। অর্থাৎ গবেষণালব্ধ ফলাফল অনুযায়ী বিজ্ঞ টাস্কফোর্স ও জাতীয় পরামর্শক কমিটির সুচিন্তিত পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের মুড অফ অ্যাকশনের কীটনাশক (লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড) নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। তার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচিত কীটনাশকগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় বিরতি দিয়ে পর্যায়ক্রমে সাজাতে হবে এবং একই মুড অফ অ্যাকশনের কীটনাশক কোনোভাবেই ছয় মাসের বেশি ব্যবহার করা যাবে না। কারণ ওই নির্দিষ্ট কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশা প্রতিরোধী হয়ে ওঠার আগেই কীটনাশকের পরিবর্তন করতে হবে।

সেজন্য অবশ্যই চারটি মুড অফ অ্যাকশনের কার্যকর কীটনাশক (লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড) নির্বাচন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত ডোজে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অর্গানো ফসফরাস কীটনাশকের পাশাপাশি উদ্ভিজ্জ এক্সট্রাকশনের ব্যবহার এবং বায়ো ইনসেকটিসাইডের অন্তর্ভুক্তিও অত্যন্ত জরুরি। 

কীটনাশক (লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড) প্রয়োগ যেমন একটি একক অ্যাপ্রোচ যার অনেক বিরূপ প্রতিক্রিয়া আছে। তাই এই সিঙ্গেল অ্যাপ্রোচের পাশাপাশি অবশ্যই সমন্বিত বা হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ অর্থাৎ সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনা বা আইভিএম কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আইভিএমের মধ্যে কীটনাশকের যুক্তিযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিতের পাশাপাশি বায়োলজিক্যাল এজেন্ট অর্থাৎ প্রিডেটর, প্যারাসাইট এবং প্যাথোজেনের কৌশলী প্রয়োগের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রথমে খেয়াল রাখতে হবে প্রকৃতিতে মশা ও মশার লার্ভার যে প্রাকৃতিক শত্রু আছে যেমন ড্রাগন ফ্লাইয়ের নিম্ফ, কোপপেড, গাপ্পি মাছ প্রভৃতি যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। 

আমাদের দেশে বিটিআই বা ব্যাসিলাস থ্রুয়েনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস ব্যবহার না হলেও সবাই নামটির সঙ্গে পরিচিত। এটি একটি বায়োইনসেকটিসাইড এবং এটি একটি এন্টোমোপ্যাথজেনিক ব্যাকটেরিয়া। এ ধরণের ব্যাকটেরিয়া কীটপতঙ্গের শরীরে প্যাথোজেনোসিস বা রোগ সৃষ্টি করে তাদের লার্ভার মৃত্যু ঘটায়। এটি সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশে সফলতার সঙ্গে পরিবেশবান্ধব বায়োকন্ট্রোল এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তাই আমাদের দেশেও এর সফল ব্যবহার সম্ভব। সঙ্গে সঙ্গে মনে রাখতে হবে, এই ব্যাকটেরিয়া বাইরে থেকে আমদানির পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড মসকুইটো প্রোগ্রামের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের দেশে বাণিজ্যিকভাবে বিটিআই উপাদান ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। 

একইভাবে আরেক গ্রাম নেগেটিভ এন্ডোসিমবায়োন্ট ব্যাকটেরিয়া যা মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসের রেপ্লিকেশন বাধাগ্রস্ত করে ডেঙ্গু বিস্তার রোধে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই ব্যাকটেরিয়ার নাম উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার টেকসই, অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব।

জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে ধ্বংস করতে হবে মশার প্রজনন স্থল। সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে বোঝাতে হবে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ও এডিস মশার বিরক্তিকর এবং আরো ক্ষতিকারক জীবাণু বহনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যা আমাদের সাবলীল ও স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে জনসাধারণের পারস্পরিক আন্তঃ মতবিনিময়ের মাধ্যমেই এডিসসহ অন্যান্য ক্ষতিকারক মশক ও জনস্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ কীটপতঙ্গের উৎপত্তি ও বাসস্থান ধ্বংস অবশ্যই সম্ভব।

ড. মো. গোলাম ছারোয়ার: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)

আরও