দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সুবর্ণজয়ন্তী

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

আজকের বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের, বলতে গেলে প্রায় ৪০০ বছরের। ব্রিটিশ আমলে এ সম্পর্কে কিছুটা ভাটা পড়ে, তবে উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাংলার মানুষকে সহযোগিতা এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনে জাপানের ভূমিকা এ সম্পর্কে নতুন মাত্রা আনে। ১৯৪৭-এ স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি হলে অন্য অনেক দেশের

আজকের বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের, বলতে গেলে প্রায় ৪০০ বছরের। ব্রিটিশ আমলে সম্পর্কে কিছুটা ভাটা পড়ে, তবে উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাংলার মানুষকে সহযোগিতা এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনে জাপানের ভূমিকা সম্পর্কে নতুন মাত্রা আনে। ১৯৪৭- স্বাধীন ভারত পাকিস্তান সৃষ্টি হলে অন্য অনেক দেশের আগে জাপান তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে আর্থিক সহায়তা বিনিয়োগে এগিয়ে আসে। ১৯৫০-এর দশকে ঢাকায় জাপানের কনস্যুলার মিশন স্থাপনের পর এশিয়ার দুই প্রান্তের জাপান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে জাপান উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। জাপানের গণমাধ্যম, শিক্ষার্থী শিক্ষকসমাজ, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীগোষ্ঠী জনগণ ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং জাপানে বিশ্বের অন্যত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গঠনে সোচ্চার ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে ব্যক্তি হিসেবে তাকাশি হায়াকাওয়া এবং সংগঠন হিসেবে জাপানের নিহন বেনগার তোমো নো কাই বাংলাদেশ সলিডারিটি ফ্রন্টের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ সবার আগে যেসব দেশের স্বীকৃতি পায়, জাপান সেগুলোর অন্যতম। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জানায়; শুরু হয় অর্থনৈতিক কারিগরি সহায়তা, সাংস্কৃতিক বিনিময়   পারস্পরিক সফর কার্যক্রম, বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়তা ইত্যাদির মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মৈত্রীর নবযাত্রা। বছর ফেব্রুয়ারিতে আমরা সে ঘটনার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাপান সফর দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি সুদৃঢ় করে। আর বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত ২০২১-এর ডিসেম্বরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর উদযাপন উপলক্ষে অনুষ্ঠানমালায় যোগ দিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২০২২ সালে জাপান সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক বছর বাংলাদেশে জাপানের সহায়তার ধরন ছিল মূলত খাদ্য পণ্য সাহায্য। ১৯৮০ সালেও বাংলাদেশে জাপানি সাহায্যের মোট পরিমাণে প্রকল্প সাহায্যের চেয়ে খাদ্য পণ্য সাহায্য বেশি ছিল। পরবর্তীকালে বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এবং শিল্প উৎপাদন অবকাঠামো সম্প্রসারণ সম্পর্কিত কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাংলাদেশে জাপানের প্রকল্প সাহায্যের পরিমাণ দ্রুত হারে বাড়তে থাকে।

১৯৭১/৭২ থেকে ২০০৮/০৯ পর্যন্ত সময়ে জাপান বাংলাদেশকে মোট সাহায্য দিয়েছে হাজার ৯৫৯ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার, যার ৪৭ শতাংশের কিছু বেশি ছিল অনুদান এবং অবশিষ্ট অংশ সহজ শর্তে ঋণ। মোট সাহায্যের ৪২ শতাংশই ছিল প্রকল্প সাহায্য। উল্লিখিত সময়ে জাপানই ছিল বাংলাদেশের জন্য এককভাবে বৃহত্তম দাতা দেশ।

আগের ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের পরবর্তী সময়ে প্রতি বছর বাংলাদেশকে দেয়া জাপানের সাহায্য বৃদ্ধি পেয়েছে। জাপানি অর্থবছর ২০২০ (এপ্রিল ২০২০ - মার্চ ২০২১)- জাপান বাংলাদেশকে হাজার ৩৯৩ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। অর্থ বাংলাদেশের যেসব বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয় হবে, সেগুলোর মধ্যে আছে ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট (ট্রানজিট লাইন ), মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প, যমুনা রেল সেতু, দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্প, স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নে নীতি সহায়তা ঋণ এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প।

জাপানের কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পল্লী উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, পরিবহন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। জাপান আমদানি-রফতানি ব্যবসা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতেও সহায়তা দেয়। জাপান বাংলাদেশকে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো অর্জন, বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীলকরণ, সামাজিক উন্নয়ন সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে।

শিল্পোৎপাদনে শক্তিশালী দেশ হিসেবে জাপান বাংলাদেশের জন্য আমদানির বড় উৎসের পাশাপাশি রফতানিরও একটি বৃহৎ গন্তব্য। জাপান সারা বিশ্ব থেকে যত আমদানি করে, তার সামান্যই (২০১৫ সালে .১৭%) যায় বাংলাদেশ থেকে, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য পরিমাণটি মোটেই সামান্য নয়। সে বছর জাপান ছিল বাংলাদেশের পণ্য আমদানিকারক হিসেবে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম দেশ। বাংলাদেশ জাপানে যেসব পণ্য রফতানি করে, সেসবের মধ্যে প্রধান হচ্ছে পাদুকা চামড়াজাত অন্যান্য দ্রব্য, তৈরি পোশাক এবং চিংড়ি।

জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য বর্তমানে বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে জাপানে রফতানির পরিমাণ বছরে প্রায় দশমিক বিলিয়ন ডলার এবং জাপান থেকে বাংলাদেশে আমদানি বছরে প্রায় দশমিক বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগেও জাপান অনেক দেশের তুলনায় বেশ এগিয়ে আছে। ২০০৪ সালেই জাপান বাংলাদেশে চতুর্থ বৃহৎ প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। সূচকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, চীন, ভারত ইত্যাদি দেশের পাশাপাশি জাপানের অবস্থান এখনো বেশ ওপরের দিকে। লক্ষণীয়, জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের স্থানীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা পরিচালনায় এখন অনেক বেশি আগ্রহ প্রকাশ করছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ৩০০-এর কিছু বেশি জাপানি কোম্পানি চালু আছে। জাপানের আরো অনেক কোম্পানি বাংলাদেশে, নির্দিষ্টভাবে বললে বাংলাদেশের আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ), মিরসরাই (চট্টগ্রাম) মাতারবাড়ীতে (কক্সবাজার) তৈরি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।

বিদেশে জাপানের বাণিজ্য বিনিয়োগ দেখভাল করার প্রতিষ্ঠান জেট্রো ১৯৭৩ সালে ঢাকায় কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠানটির ঘোষণা অনুযায়ী জাপান বাংলাদেশে নতুন নতুন অনেক ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোগকে উৎসাহ সহায়তা দিতে চায়; যারা জাপানে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, হস্তশিল্প সামগ্রী ইত্যাদি রফতানি করবে। এছাড়া জেট্রো বাংলাদেশে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির বিকাশ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চায়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাপানসহ দাতা দেশগুলোর সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিস্ময়কর উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। এলডিসি পর্যায় থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের সারিতে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। অভিযাত্রায় বাংলাদেশ জাপানকে সবসময় পাশে পাবে। পাঁচ দশকের ইতিহাস সেকথাই বলে।

বিবিসি সম্প্রতি একটি বিশ্বজনমত সমীক্ষা থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে যে বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষ জাপানকে পছন্দ করে। সে কারণে বাংলাদেশ জাপানবান্ধব একটি দেশ। অন্য সব উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে জাপানকে নিয়ে বাংলাদেশ নিশ্চয়ই সব সমস্যা মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যাবে।

 

. এসএম মাহফুজুর রহমান: উপাচার্য

বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা

আরও