জ্বালানি ভাবনা

সবুজ হাইড্রোজেনে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ক্ষেত্রে ভারতের নেতৃত্ব

পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধনের ব্যাপারে ভারত একটি বৈশ্বিক নেতৃস্থানীয় দেশে পরিণত হয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ, ভারতের স্থাপনকৃত মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৫১ দশমিক ৯৩ শতাংশ ছিল অ-জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদনকৃত, যা ভারতের দ্বিতীয় ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনে (এনডিসি) নির্ধারিত ৫০ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রাকে অতিক্রম করে যায়। আইআরইএনএর রিনিউয়েবল এনার্জি স্ট্যাটিসটিকস ২০২৫ অনুযায়ী, স্থাপনকৃত মোট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতার দিক থেকে ভারত বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।

ভারতের জ্বালানি খাতের রূপান্তরকে দেশটির উন্নয়ন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বুঝতে হবে। দেশটি এখনো জ্বালানি চাহিদার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেনি এবং জ্বালানির প্রাপ্যতা ক্রয়ক্ষমতা ও নিরাপত্তা ও এখনো ভারতের উন্নয়নের গতিপথের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিদ্যমান রয়ে গেছে। তাই ভারতের উন্নয়ন কৌশলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, পারমাণবিক শক্তি, সবুজ হাইড্রোজেন, কার্বন সিংক ও কার্বন বাজারের পাশাপাশি শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এর মধ্যে সবুজ হাইড্রোজেন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, কারণ এটা এমন সব খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করতে সক্ষম, যেগুলোতে সরাসরি বিদ্যুতায়ন পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। সবুজ হাইড্রোজেন হলো একাধারে একটি জ্বালানি এবং শিল্পের একটি কাঁচামাল। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে এর উৎপাদন পেট্রোলিয়াম পরিশোধন, সার উৎপাদন, ইস্পাত উৎপাদন এবং অন্য যেসব খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানো কঠিন, সেসব ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপন্ন উপকরণের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে এটি দূরপাল্লার যানবাহন, রেলওয়ে ও সামুদ্রিক জাহাজের কার্বন নিঃসরণ কমাতেও সহায়তা করতে পারে। ভারতীয় রেলওয়ে সম্প্রতি হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন পরিচালনা করার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।

ন্যাশনাল গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন এ সম্ভাবনাকে সম্প্রসারণ করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় নীতিগত কাঠামো প্রদান করে, যা জ্বালানি রূপান্তরের সঙ্গে শিল্পনীতি ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সংযুক্ত করে। এর লক্ষ্যমাত্রা হলো ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ৫০ লাখ টন সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন করা। এরই মধ্যে ১৮টি প্রতিষ্ঠানকে বছরে ৮ লাখ ৬২ হাজার টন উৎপাদন সক্ষমতা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে এবং ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে বছরে তিন হাজার মেগাওয়াট ইলেক্ট্রোলাইজার উৎপাদন সক্ষমতা স্থাপনের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গুজরাটের দীনদয়াল বন্দর কর্তৃপক্ষ, তামিলনাড়ুর ভি ও চিদাম্বরম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ওড়িশার পারাদ্বীপ বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে তিনটি সবুজ হাইড্রোজেন হাবও চিহ্নিত করা হয়েছে।

খাতভিত্তিক একটি প্রধান লক্ষ্য হলো সবুজ হাইড্রোজেনকে সুনির্দিষ্ট শিল্প ক্ষেত্রে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করা। সার খাতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি ৫৫ দশমিক ৭৫ রুপি দরে বছরে মোট ৭ দশমিক ২৪ লাখ টন সবুজ অ্যামোনিয়া ক্রয়ের সক্ষমতা রয়েছে। পেট্রোলিয়াম পরিশোধন খাতে, শিল্পের কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাস করার জন্য সবুজ হাইড্রোজেন ব্যবহার করা হচ্ছে, অন্যদিকে ইস্পাত শিল্পে সরকারি ও বেসরকারি উৎপাদনকারীদের সঙ্গে নিয়ে পাঁচটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের স্থানীয় পরিচালন পরিস্থিতির অধীনে আয়রন রিডাকশন ও অন্যান্য প্রক্রিয়াকরণে সবুজ হাইড্রোজেনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

ভারতের সবুজ হাইড্রোজেন কৌশলের একটি সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক মাত্রাও রয়েছে, যেখানে ভারত জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যারিস চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে স্বেচ্ছামূলক সহযোগিতাকে কাজে লাগানোর দিকে নজর দিচ্ছে। এ আন্তর্জাতিক অভিমুখটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সবুজ হাইড্রোজেন ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বাণিজ্যের একটি অংশ হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এভাবেই ভারতের সবুজ হাইড্রোজেন উদ্যোগ কেবল মাত্র অভ্যন্তরীণ কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার চাহিদাই পূরণ করে না, বরং এটি দেশটিকে ভবিষ্যতের নিম্ন-কার্বন বৈশ্বিক অর্থনীতির নীতিমালা, বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খল গঠনে অবদান রাখার অবস্থানেও নিয়ে যায়।

ভারত উদীয়মান আন্তর্জাতিক হাইড্রোজেন প্লাটফর্মগুলো ও অংশীদারত্বের ক্ষেত্রেও নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করে তুলছে। ২০২৪ সালে রটারডামে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড হাইড্রোজেন সামিটে প্রথমবারের মতো ইন্ডিয়া প্যাভিলিয়ন স্থাপনের মাধ্যমে ভারত আন্তর্জাতিক হাইড্রোজেন সম্প্রদায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করে। ইইউ-ইন্ডিয়া ট্রেড অ্যান্ড টেকনোলজি কাউন্সিলের আওতায় সহযোগিতা সম্প্রসারণ হচ্ছে, যেখানে বর্জ্য থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন বিষয়ে ৩০টিরও বেশি যৌথ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। ভারত ও যুক্তরাজ্য হাইড্রোজেনের মান নির্ধারণ (স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন) নিয়ে কাজ করছে এবং এর পাশাপাশি রফতানি করার জন্য বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা ও যৌথ টেন্ডার কাঠামো প্রণয়নে জার্মানির সঙ্গেও কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সবুজ অ্যামোনিয়া ও সবুজ মিথানলের জন্য জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি (অফটেক অ্যাগ্রিমেন্ট) সম্পাদন করেছে।

ভারত শুধু সৌরশক্তির প্রসার ঘটানোর মাধ্যমেই নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরে নিজস্ব কার্যক্রমের দৃষ্টান্তমূলক প্রভাবের মাধ্যমেও গ্লোবাল সাউথে সৌরশক্তি ব্যবহারের প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। সবুজ হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রে ভারতের সক্রিয় উদ্যোগগুলোরও গ্লোবাল সাউথে অনুরূপ ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব রাখবে।

মনজীব সিং পুরি: বিশিষ্ট ফেলো, দ্য এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট (টিইআরআই) এবং সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত

[তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নেপাল, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গের পাশাপাশি জাতিসংঘে ভারতের রাষ্ট্রদূত ও উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন]

আরও