জাটকা নিধনে চলছে নিষেধাজ্ঞা

কর্মসূচি সফল করতে জেলেদের পর্যাপ্ত সহায়তা দেয়া হোক

দেশে বর্তমানে জাটকা নিধনে চলছে নিষেধাজ্ঞা। গত ১ মার্চ শুরু হওয়া এ নিষেধাজ্ঞা চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। এ সময়ে অভয়াশ্রমগুলোয় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু জায়গায় জাটকা নিধনের খবর মিলছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে জনসচেতনতা বাড়াতে ‘মুজিব বর্ষে শপথ নেব, জাটকা নয় ইলিশ খাব’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে পালন হচ্ছে

দেশে বর্তমানে জাটকা নিধনে চলছে নিষেধাজ্ঞা। গত ১ মার্চ শুরু হওয়া এ নিষেধাজ্ঞা চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। এ সময়ে অভয়াশ্রমগুলোয় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু জায়গায় জাটকা নিধনের খবর মিলছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে জনসচেতনতা বাড়াতে ‘মুজিব বর্ষে শপথ নেব, জাটকা নয় ইলিশ খাব’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে পালন হচ্ছে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০২১। ১০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের অন্তত ২০ জেলায় আলোচ্য সপ্তাহ পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয়ভাবে তাত্পর্যপূর্ণ এ কর্মসূচি ঘিরে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় নানা প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জাটকা সুরক্ষায় এসব কার্যক্রম ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বৈকি।

কেবল জাতীয় মাছ নয়, ইলিশ এখন আমাদের অন্যতম ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবেও স্বীকৃত। ঐতিহ্য, কর্মসংস্থান, মানুষের আমিষের চাহিদা মেটানোসহ বিভিন্ন দিক থেকে এর গুরুত্ব বিপুল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নদ-নদীর নাব্য হ্রাস, পরিবেশ বিপর্যয়, নির্বিচারে জাটকা নিধন, মা-মাছ আহরণসহ বিভিন্ন কারণে একটা সময় নদীতে আকাল দেখা দিয়েছিল ইলিশের। উৎপাদন কমে অনেকটাই সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল এটি। তবে রাষ্ট্রীয় নানামুখী প্রচেষ্টায় আবারো নদীতে ফিরতে শুরু করেছে ইলিশের প্রাচুর্য। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী দেশে গত ১২ বছরে ইলিশ উৎপাদন প্রায় ৭৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর সময় পর্বে উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার টন। একই সঙ্গে এ সময়ে ইলিশ উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। চলতি অর্থবছর (২০২০-২১) উৎপাদন ছয় লাখ টনে পৌঁছবে বলে প্রাক্কলন মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। এ পরিসংখ্যানগুলো নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য সাফল্যেরই ইঙ্গিত দেয়। ধারাবাহিকভাবে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির এ সাফল্যে একটি প্রভাবক ভূমিকা রেখেছে, তা হলো অক্টোবর-নভেম্বরে মা-মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা এবং মার্চ-এপ্রিলে জাটকা নিধনে নিষেধাজ্ঞা। বেশ আগে থেকেই দ্য প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ রুলস আইনটি থাকলেও এর প্রয়োগ কড়াকড়িভাবে শুরু হয় ২০০৮ সালে। এ আইনের আওতায় প্রতি বছরই উল্লিখিত দুই সময়ে মাছ ধরায় কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। ফলে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে ইলিশ উৎপাদন।

দেশের মোট মত্স্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ (১২ দশমিক ১৫ ভাগ) এবং বর্তমানে জিডিপিতে অবদান ১ শতাংশের বেশি। প্রায় ছয় লাখ মানুষ ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ৩০ লাখ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। চলমান জাটকা নিধনের নিষেধাজ্ঞা মৌসুমে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মত্স্যজীবীরা জীবিকা সংকটে পড়েছেন। প্রতি বছরই নিষেধাজ্ঞার সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় জেলে পরিবারগুলোকে চাল ও আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়। এবারও তা-ই করা হচ্ছে। কিন্তু এ ধরনের সহায়তা কার্যক্রমে কিছু পদ্ধতিগত ত্রুটি থেকে যাওয়ার অভিযোগ মেলে। শনাক্তকরণে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অনিয়মের ফলে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের তালিকা থেকে প্রকৃত জেলেদের অনেকেই বাদ পড়েন। তার বদলে স্থান পায় পেশাবহির্ভূত কিছু সচ্ছল পরিবার। আবার সহায়তা যা দেয়া হয়, তা-ও অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত বলে জেলেদের ভাষ্যে উঠে এসেছে। কাজেই নিষেধাজ্ঞার সময়ে জাটকা নিধনে জেলেদের নিবৃত্ত করতে তাদের যথাযথভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। এক্ষেত্রে সুবিধাভোগীর তালিকায় যেমন প্রকৃত জেলেদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি সহায়তার পরিমাণও বাড়াতে হবে। চলমান জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের সময়েও চাঁদপুরসহ কয়েকটি জেলায় বিপুলসংখ্যক জাটকা নিধনের খবর মিলছে। এ ধরনের তত্পরতা বন্ধে কোস্টগার্ডের সক্রিয়তা বাড়াতে হবে। হাটবাজার ও আড়তে অভিযান পরিচালনা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দায়ীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে জুতসই উপায় হলো প্রকৃত জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তার জন্য প্রয়োজনে উপকরণ সহায়তা দেয়া যেতে পারে। সাধারণত প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকায় জেলেদের অন্য কাজে যুক্ত হওয়া কঠিন। বিকল্প কর্মসংস্থানে সহায়তার জন্য মাঝে বিষয়ভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এখন এটি আরো জোরদার করতে হবে। সুরক্ষামূলক সহায়তা দিয়ে অনেকের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। বিকল্প জীবিকার উপায় থাকলে খুব দ্রুত ও টেকসইভাবে জেলেদের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। সুতরাং বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি বিবেচনার দাবি রাখে বৈকি।

ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে গবেষণা ও অভয়াশ্রমের সংখ্যা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। এ পর্যন্ত ইলিশের ছয়টি অভয়াশ্রম ঘোষিত হয়েছে। সেগুলো মূলত উপকূলীয় জেলা ঘিরে। নতুন নতুন অভয়াশ্রম ঘোষণার জন্য মত্স্য অধিদপ্তরের জরিপ পরিচালনা বাড়াতে হবে। পানির গুণগত মান নির্ণয়সহ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান অভয়াশ্রমগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। আগে যেখানে ২৪টি উপজেলায় ইলিশের বিচরণ ছিল, এখন এর বিচরণক্ষেত্র ১২৫টি উপজেলায় বিস্তৃত হয়েছে। ফলে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইলিশ রফতানির সুযোগও বাড়ছে। গৃহীত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে ইলিশ উৎপাদনে বিদ্যমান সাফল্য অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা।

আরও