‘জীবন-জীবিকায়
প্রাধান্য দিয়ে
সুদৃঢ় আগামীর
পথে বাংলাদেশ’—এ
প্রতিপাদ্যকে সামনে
রেখে ৩
জুন অর্থমন্ত্রী
জাতীয় সংসদে
২০২১-২২
অর্থবছরের এবং
বাংলাদেশের ৫০তম
জাতীয় বাজেট
পেশ করেছেন।
বিগত এক
বছরের অধিক
সময় ধরে
করোনা মহামারী
পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে
এবারের বাজেট
বিগত যেকোনো
বাজেটের থেকে
কিছুটা ভিন্নতর
এবং স্বাভাবিকভাবেই
জনহিতকর বিষয়গুলো
প্রাধান্য পেয়েছে।
জাতীয় বাজেটের
একটি বড়
অংশ প্রত্যক্ষ
ও পরোক্ষভাবে
স্থাপত্য ও
নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্ট।
দেশের অবকাঠামোগত
উন্নয়নকে করোনা
মহামারী দুর্যোগ
পরিস্থিতিতেও এবারের
বাজেটে গুরুত্ব
দেয়া হয়েছে।
২০২১-২২
অর্থবছরের ৬
লাখ ৩
হাজার ৬৮১
কোটি টাকার
প্রাক্কলিত বাজেট
ঘোষণা করা
হয়েছে, যার
মধ্যে বার্ষিক
উন্নয়ন কর্মসূচি
বাবদ ২
লাখ ২৫
হাজার ৩২৪
কোটি টাকা
বরাদ্দ রাখা
হয়েছে। বার্ষিক
উন্নয়ন কর্মসূচি
বাবদ বরাদ্দের
মধ্যে দ্বিতীয়
সর্বোচ্চ বরাদ্দ
(২৬.৪%)
হিসেবে নির্মাণসংশ্লিষ্ট
যোগাযোগ অবকাঠামোকে
গুরুত্ব দেয়া
হয়েছে, যা
চলমান ও
নতুন প্রকল্প
সহায়ক হবে
এবং এ
খাতে কর্মসংস্থান
সৃষ্টি হবে।
করোনা মহামারীর পরিপ্রেক্ষিতে এ বাজেটে গৃহায়ন খাতে ৬ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ শিল্পের প্রধান উপকরণের ওপর যেমন স্টিল, সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানির করহার ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যা এসব নির্মাণ উপকরণের বাজারদরের ওপর সুপ্রভাব ফেলবে এবং বেসরকারি নির্মাণ খাতে করোনার সময়েও গতির সঞ্চার করবে। সরকার ২০২৫ সালের মধ্য পোড়ানো ইটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব স্যান্ড-সিমেন্ট ব্লকের ১০০ শতাংশ প্রচলন করার জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সিমেন্ট উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আগামীতে সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানিতে কর শূন্যের কোঠায় আনা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন হবে। জ্বালানিসাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব লো-কার্বন প্রযুক্তি জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) ও এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে, লৌহ ও লৌহজাত পণ্য প্রস্তুতের কাঁচামাল, স্ক্র্যাপ ভেসেল, প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর আগাম কর অব্যাহতি প্রদান, স্টেইনলেস স্টিলের প্রতি টনের স্পেসিফিক ডিউটি ১০০০ টাকা কমিয়ে ৫০০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে, যা নির্মাণ শিল্পে পরোক্ষভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
দেশের অর্থনৈতিক
উন্নয়নের সঙ্গে
তাল মিলিয়ে
সু-উচ্চ
ও বৃহদাকার
ভবন নির্মাণ
হচ্ছে, যার
একটি উল্লেখযোগ্য
অংশ বাণিজ্যিক
ও পোশাক
শিল্পের কারখানা
হিসেবে ব্যবহূত
হচ্ছে। যেখানে
বসবাসের পরিবেশের
পাশাপশি কাঠামোগত
ও অগ্নিনিরাপত্তা
খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
২০২১-২২
অর্থবছরের বাজেটে
ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা
নিশ্চিত করতে
অগ্নি প্রতিরোধক
দরজার ওপর
গুরুত্ব প্রদান
করে ফায়ার
ডোরের স্থানীয়
উৎপাদনের ক্ষেত্রে
কাঁচামাল আমদানিতে
শুল্ক রেয়াতের
প্রস্তাব করা
হয়েছে। তবে
এ ধরনের
ফায়ার ডোর
ব্যবহারের ক্ষেত্রে
আন্তর্জাতিক মানের
পরীক্ষাগার থেকে
সনদ গ্রহণ
করতে হয়,
যা ব্যয়
ও সময়সাপেক্ষ।
নির্মাণ শিল্পের
উন্নয়নের জন্য
এ ধরনের
পরীক্ষাগার দেশে
প্রতিষ্ঠা করা
এবং গৃহায়ন
ও নির্মাণ
খাতে গবেষণা
বৃদ্ধিতে বিশেষ
বরাদ্দ দেয়া
প্রয়োজন। গ্রামীণ
গৃহায়নের ওপর
গুরুত্ব আরোপ
সেই সঙ্গে
মানসম্মত স্যানিটেশন
ব্যবস্থা নিশ্চিত
করতে বহুল
প্রচলিত লং-প্যানের
ওপর থেকে
১০ শতাংশ
সম্পূরক কর
প্রত্যাহার এ
বাজেটের আরো
একটি উল্লেখযোগ্য
দিক। তবে
পানিসাশ্রয়ী বিভিন্ন
ফিকচার বা
কল আমদানি
এবং দেশীয়
উৎপাদনের ক্ষেত্রে
কাঁচামালের আমদানি
শুল্ক হ্রাস
করা সময়ের
দাবি।
মানবসম্পদ উন্নয়নের
মাধ্যমে খাতভিত্তিক
দক্ষ জনশক্তি
গড়ে তোলার
জন্য কৃষি,
মত্স্য, তথ্যপ্রযুক্তি
বিষয়ে ডিপ্লোমা
কোর্স এবং
বিভিন্ন কারিগরি/ভোকেশনাল
কোর্স বা
প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটকে
শর্তসাপেক্ষে ১০
বছরের জন্য
কর অব্যাহতি
দেয়া হয়েছে,
যা স্থানীয়
পর্যায়ে বিভিন্ন
খাতে দক্ষ
কর্মী গড়ে
তুলতে সহায়ক
ভূমিকা পালন
করবে। একই
সঙ্গে ভবন
নির্মাণসংক্রান্ত ডিপ্লোমা
কোর্স ও
নির্মাণ সুপারভাইজার
এবং শ্রমিক
প্রশিক্ষণের ওপর
গুরুত্ব দিয়ে
এ খাতে
দক্ষ জনবল
গড়ে তোলা
প্রয়োজন। করোনা
মহামারীর সময়ে
মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন
দেশে অবস্থানরত
এবং নির্মাণকাজে
নিয়োজিত প্রবাসীদের
অর্জিত রেমিট্যান্স
প্রবাহ আমাদের
অর্থনীতির চাকার
গতি ধরে
রেখেছে। এ
বিবেচনায় প্রশিক্ষিত
নির্মাণ শ্রমিক
বিদেশে প্রেরণের
জন্য সরকারিভাবে
প্রশিক্ষণ প্রদান
ও দক্ষতা
বৃদ্ধির লক্ষ্যে
বাজেটে বিশেষ
বরাদ্দ রাখা
প্রয়োজন।
বর্তমানে দেশের
প্রায় ১৭
কোটি জনগণের
মধ্যে মাত্র
২৫.৪৩
লাখ নাগরিক
আয়কর প্রদান
করেন, যা
মোট জনগোষ্ঠীর
খুবই সামান্য
অংশ এবং
এর মধ্যে
উল্লেখযোগ্য অংশ
সরকারি কর্মচারী।
আয়করযোগ্য সব
জনগোষ্ঠীকে আয়করের
আওতায় আনতে
হবে। এ
বাজেটে গৃহায়ন
ও নির্মাণ
খাতে করের
আওতা বৃদ্ধিতে
কিছু পদক্ষেপ
নেয়া হয়েছে,
যার মধ্যে
বাড়ি ও
ভবনের নকশা
অনুমোদনের জন্য
টিআইএন সনদ
দাখিল করার
প্রস্তাব করা
হয়েছে। এরই
সঙ্গে ভবনের
স্থাপত্য নকশা,
কাঠামোগত নকশা,
বিল্ডিং সার্ভিস
নকশা প্রণয়নকারী
কারিগরি ব্যক্তিকে
অনুমোদনের জন্য
নকশা দাখিলের
সময় পেশাগত
পরিচিতি দাখিলের
পাশাপাশি টিআইএনের
বাধ্যবাধকতা যুক্ত
করলে করের
আওতা বাড়বে।
একটি ভবন
নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে
ঠিকাদারকে মাত্র
৭.৫
শতাংশ হারে
ভ্যাট, ২-৭
শতাংশ পর্যন্ত
উৎসে কর
দিতে হয়
অর্থাৎ সেই
ভবনের স্থাপত্য
পরামর্শ সেবার
ক্ষেত্রে ন্যূনতম
১০ শতাংশ
হারে উৎসে
কর এবং
১৫ শতাংশ
হারে ভ্যাট
দিতে হয়।
অগ্রিম আয়কর
ও ভ্যাটের
এ উচ্চহারের
কারণে অধিকাংশ
ক্ষেত্রে কর
ও ভ্যাট
ফাঁকি দেয়ার
প্রবণতা লক্ষ
করা যায়।
এছাড়া সব
ধরনের ভবন
নকশার ক্ষেত্রে
একই হারে
ভ্যাট ও
করের হার
যুক্তিযুক্ত নয়।
ঢাকা মহানগরের
একটি ভবন
এবং অন্যান্য
জেলা-উপজেলা
অঞ্চলের ভবনে
কর একই
হারে নির্ধারিত।
আবাসিক ও
বাণিজ্যিক ভবনের
বাজারমূল্য ভিন্ন
হলেও নকশা
প্রণয়নের পরামর্শ
সেবার ক্ষেত্রে
একই হারে
ভ্যাট ও
কর দিতে
হয়। বিদ্যমান
এ করের
কাঠামো সংস্কারের
মাধ্যমে বা
করের হার
কমিয়ে ভবনের
ধরন ও
এলাকাভিত্তিক ভিন্ন
হারে কর
নির্ধারণ করলে
তা রাজস্ব
আদায়ে অবদান
রাখবে বলে
আশা করা
যায়। করোনাকালে
স্থপতি ও
প্রকৌশলীদের কভিড-১৯
থেকে সুরক্ষা
প্রদানে টিকাদান
কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার
দেয়া প্রয়োজন।
২০২০ সালের
মার্চ থেকে
করোনা মহামারীর
প্রকোপ সারা
বিশ্বের সঙ্গে
আমাদের অর্থনীতিও
নানাবিধ চ্যালেঞ্জের
সম্মুখীন হয়েছে।
করোনা মহামারী
মোকাবেলায় সরকারের
সময়োপযোগী নীতি,
বিভিন্ন সংগঠন,
সংস্থা ও
জরুরি সেবার
সঙ্গে সংশ্লিষ্ট
সবার পেশাদারি
ভূমিকা এবং
দক্ষতার কারণে
আমরা এ
বৈশ্বিক মন্দার
মধ্যেও সফলতার
সঙ্গে পরিস্থিতি
মোকাবেলা করতে
সক্ষম হয়েছি।
করোনা মোকাবেলায়
সরকার গৃহায়ন
খাতসহ ২৩টি
বিভিন্ন খাতে
প্রণোদনার প্যাকেজ
ঘোষণা করছে
এবং গৃহহীন
ও ভূমিহীনদের
পাকা বাড়ি
দেয়া হয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে
৭০ হাজার
গৃহহীন পরিবার,
দ্বিতীয় পর্যায়ে
৫৩ হাজার
৪৩০ পরিবার
এবং স্বাধীনতার
সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে
অর্থাৎ ২০২১
সালের মধ্যে
১ লাখ
পরিবারকে স্থায়ী
পাকা বাড়ি
দেয়া হবে।
সরকারের এ
মহৎ কাজে
দেশের স্থপতি
ও প্রকৌশলীদের
সক্রিয় অংশগ্রহণ
এ কার্যক্রমকে
আরো সফলভাবে
বাস্তবায়নে সহায়তা
করতে পারে।
সরকারের নির্বাচনী
ইশতেহারের ‘আমার
গ্রাম আমার
শহর’ কর্মসূচির
আলোকে ১৫টি
মডেল গ্রামে
পাইলট প্রকল্প
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন
রয়েছে। জাতীয়
বাজেটে প্রশিক্ষণের
জন্য পৃথক
বরাদ্দ সংস্থান
করে স্থপতি,
প্রকৌশলী ও
পরিকল্পনাবিদদের দক্ষতা
বৃদ্ধির মাধ্যমে
পর্যায়ক্রমে দেশের
সব গ্রামকেই
পরিকল্পিত গ্রামে
উন্নীত করা
সম্ভব হবে।
মো. নাফিজুর রহমান: স্থপতি ও গবেষক