উন্নয়ন ভাবনা-৪

অর্থনৈতিক উন্নয়ন : ব্যক্তিত্ব-বৈশিষ্ট্যভিত্তিক বিশ্ব মানচিত্র এবং বাংলাদেশ

উন্নত বিশ্ব বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানান ধরনের গবেষণা চলে সারাবছর। গবেষণার বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যতা অনেক সময় বেশ আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। বছর খানেক আগে ইউরোপীয় একদল গবেষক জানালেন মানুষের দাড়িতে অসংখ্য জীবাণুর বসবাস। বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় তা বেশ তোলপাড় সৃষ্টি করে। তোলপাড়ের যৌক্তিকতা কতটুকু সে আলোচনায় যাবো না। তবে অনেকেই ধরে নিলেন গবেষণার উদ্দেশ্য মুসলিমদের হেয় করা নিশ্চয়ই। অথচ বাস্তবতা হলো পৃথিবীতে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষও অনেকেই দাড়ি রেখে থাকেন। আবার (মুসলিমদের ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটি চিহ্ন হলেও) সকল মুসলমান পুরুষ যে দাড়ি রাখেন তা-ও নয়। ফলে অনেকের বিবেচনায় বিষয়টির সাথে ধর্মকে যুক্ত করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়তোবা সঠিক হচ্ছে না।

উন্নত বিশ্ব বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানান ধরনের গবেষণা চলে সারাবছর। গবেষণার বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যতা অনেক সময় বেশ আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। বছর খানেক আগে ইউরোপীয় একদল গবেষক জানালেন মানুষের দাড়িতে অসংখ্য জীবাণুর বসবাস। বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় তা বেশ তোলপাড় সৃষ্টি করে। তোলপাড়ের যৌক্তিকতা কতটুকু সে আলোচনায় যাবো না। তবে অনেকেই ধরে নিলেন গবেষণার উদ্দেশ্য মুসলিমদের হেয় করা নিশ্চয়ই। অথচ বাস্তবতা হলো পৃথিবীতে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষও অনেকেই দাড়ি রেখে থাকেন। আবার (মুসলিমদের ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটি চিহ্ন হলেও) সকল মুসলমান পুরুষ যে দাড়ি রাখেন তা-ও নয়। ফলে অনেকের বিবেচনায় বিষয়টির সাথে ধর্মকে যুক্ত করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়তোবা সঠিক হচ্ছে না।

আমার এক ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও ব্যাচমেটকে এ বিষয়ে শান্ত করতে আরো কয়েক বছর আগের আরেকটি গবেষণার কথা বললাম। সেই গবেষণাটিও ইউরোপীয় কোন এক প্রতিষ্ঠানের করা। গবেষকেরা জানান (জার্নালে প্রকাশিত), কুকুরের মুখের চেয়ে মানুষের মুখের ভিতর ক্ষতিকর জীবাণু অনেক বেশি পরিমাণে থাকে। এই গবেষণালব্ধ ফলাফল উল্লেখ করে তাকে বললাম ওইসব দেশের বিশেষজ্ঞরা দাড়ি নিয়ে যে গবেষণা করেছেন তা-ও এরকম শুধুই একটি গবেষণা মাত্র। তারপরও যদি মনে হয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটা করেছে- সেক্ষেত্রে পাল্টা গবেষণার মাধ্যমে বিপরীত ফলাফল দিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া অধিকতর সম্মানজনক হতে পারে। পরে অবশ্য ধীরে ধীরে সবাই বিষয়টি ভুলে গেছে।

এখন চলুন ভিন্ন স্বাদের আর একটা গবেষণার বিষয়ে জেনে আসি। JWT কর্তৃক পৃথিবীব্যাপী পরিচালিত এই গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি Stereotype মানচিত্রে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মত (স্বল্পসংখ্যক দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে) সঙ্গতকারণেই বাংলাদেশকেও দেখানো হয়নি। তারপরও আমরা নিজেরা কোন দলের (group) অন্তর্ভুক্ত সে সম্পর্কে একটা ধারণা করা যেতে পারে। আর সেজন্যই আমাদের আগ্রহ।

পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশের রয়েছে আলাদা আলাদা সভ্যতা ও সংস্কৃতি। রয়েছে বিশেষ ধরনের অভ্যাস, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ (norms) যা দিয়ে তাদের একটা নির্দিষ্ট ছকে আবদ্ধ করে ভিন্ন ভিন্ন দলে দলবদ্ধ করা যায়।

JWT এর এই গবেষণা জরিপে পৃথিবীর সকল দেশের জনগণকে (citizens) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা দেশের জনগণ, সংস্কৃতি এবং সরকারসহ অন্যদের কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং তারা নিজেদেরইবা কীভাবে দেখে- এগুলোর নির্দেশক বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া হয়। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে জনগণের সামগ্রিক ব্যক্তিত্ব সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোকে আট ভাগে বিভক্ত করা হয়। এবং  সমধর্মী দেশগুলোকে একত্র করে নতুনভাবে ভাবে আটটি মহাদেশ বিবেচনায় বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি মহাদেশে এক বা একাধিক দেশ রয়েছে। রয়েছে মহাদেশগুলোর আলাদা আলাদা নাম। আগেই বলেছি জরিপে সবগুলো দেশ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও মানচিত্রে সবাইকে দেখানো হয়নি। লেখাটির শুরুতেই সংযুক্ত নতুন বিশ্ব মানচিত্রটি (stereotype map) একনজর দেখে নেয়া যেতে পারে।

-মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে জনগণের ব্যক্তিত্বের প্রধান প্রধানবৈশিষ্ট্যসহ উহার ভিত্তিতে মহাদেশগুলোর নামকরণ করা হয়েছে।

* মহাদেশ-১: নাম- Balancia। এই মহাদেশের জনগণ ধীরস্থির, দৃঢ়, সংস্কারমুক্ত, উদার ও গনতান্ত্রিকমনোভাবাপন্ন। যাদের মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফিনল্যান্ড ও ফ্রান্স এর মতো দেশগুলো।
* মহাদেশ-২: Spiritania। এই মহাদেশের জনগণের ধর্মীয় বিষয়ে ঝোঁকটা বেশিবেশি। এখানে রয়েছে মিশর, সৌদি আরব ও পাকিস্তান।
* মহাদেশ-৩: Smugville। এই মহাদেশের জনগনকে মনে করা হয়রক্ষনশীল ও দাম্ভিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়া উল্লেখযোগ্য।
* মহাদেশ-৪: Uniformany। জার্মানি, হংকং, জাপান এই মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত। প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- জনগণ কঠোর পরিশ্রমী, দক্ষ, নিয়মনিষ্ঠ এবং সুশৃঙ্খল।
* মহাদেশ-৫: Funlandia।  এর মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, ইটালি ও স্পেন। এদের বৈশিষ্ট্য Uniformany মহাদেশের (৪ নং) বিপরীত।
* মহাদেশ-৬: Chillville। দেশ মেক্সিকো আর থাইল্যান্ড। দেশ দুটোর জনগণ রসবোধসম্পন্ন ও হাসিখুশি (fun and frolic) বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন।
* মহাদেশ-৭: Geniustan। চায়না একাই এই মহাদেশ গঠন করেছে। সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তা (creativity and intelligence) তাদের আলাদা করেছে।
* মহাদেশ-৮: Vanillia। পার্থক্য সৃষ্টিকারী বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য নেই এমন দেশগুলো এই মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত। দেশগুলো হচ্ছে আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, চেক রিপাবলিক, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, সিংগাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ কোরিয়া।  

গবেষণা ও মানচিত্র তৈরি কতটা সিরিয়াসলি করা হয়েছে তা বলতে পারবো না। তবে দলভিত্তিক বৈশিষ্ট্যের কোন বিশ্বাসযোগ্যতা যে একেবারেই নেই তা এক কথায় বলা যাবে না। আবার কোন কোন মহাদেশের জনগণের বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক (বেশি বা কম) হিসেবেও চিহ্নিত করা যেতে পারে।

বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত আটটি মহাদেশের কোনটিতেই দেখানো হয়নি। তবে মহাদেশভিত্তিক জনগণের যেসব বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে সেই আলোকে এবং আমাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় বাংলাদেশ কোন মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে বা কোন মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত হতে গর্ববোধ করবে কিংবা সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় বিশ্বসভায় আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অবস্থান কী হতে পারে তা কি আমরা এই নতুন ধরনের বিশ্ব মানচিত্র থেকে ধারণা করতে পারি?

লেখক: সাবেক যুগ্মসচিব
e-mail: [email protected]


>> উন্নয়ন ভাবনা-১
>> উন্নয়ন ভাবনা-২
>> উন্নয়ন ভাবনা-৩

আরও