ফিনটেক

বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করতে চাই উৎসাহমূলক উদ্যোগ

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন সরকার ঘোষিত বাজেটের একটি বিশেষত্ব রয়েছে। নতুন অর্থবছরের প্রথম দিনটিই আর্থিক খাতের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, ১ জুলাই থেকে সারা দেশে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে। কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত সব ব্যাংক, মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (এমএফএস) ও লেনদেন ব্যবস্থা পরিচালনাকারী অপারেটর বা পিএসওদের অবশ্যই এটি ব্যবহার করতে হবে। এমনকি বাজেট নিয়ে সংবাদ সম্মেলনেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। তিনি সেদিন বলেন, ফুটপাতেও ব্যবহার করতে হবে বাংলা কিউআর।

এ কথা সত্যি যে আমাদের দেশে প্লাস্টিক মানির ব্যবহার এখনো শপিং মল, সুপারশপকেন্দ্রিক। এক্ষেত্রে গভর্নরের ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলা কিউআর যদি ফুটপাতের দোকানে চলে যায়, তাহলে সেটা ক্যাশলেস সোসাইটিকে ঘিরে যে আকাঙ্ক্ষা সেদিকে এগোনোর জন্য বড় পদক্ষেপ হবে। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন কিউআর কোডের সঙ্গে কার্ডে লেনদেনের সম্পর্ক কী? বাংলা কিউআর কতটা জরুরি?

কিউআর মূলত সংক্ষিপ্ত রূপ। এর মূল শব্দটি আসলে ‘কুইক রেসপন্স’। কিউআর কোড একধরনের দ্বিমাত্রিক বারকোড। এতে সাধারণ বারকোডের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সঞ্চিত থাকে। কিউআর কোডের ব্যবহার শুরু ১৯৯৪ সালে, জাপানে। গাড়ি ট্র্যাক করার জন্য প্রথমে এটি তৈরি করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় এর ব্যবহার শুরু হয়। স্মার্টফোন আসার পর জনসাধারণের নিত্যদিনের কাজে কিউআর কোড জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ আর্থিক লেনদেন ও কেনাকাটায় এটা বিকল্পহীন পদ্ধতিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে।

আমরা যে ক্যাশলেস সোসাইটি বলে একটি সমাজ বা দেশের কথা ভাবি, সেখানে কিন্তু কিউআর কোড বড় রকমের ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একেবারেই নগদ অর্থ ব্যবহৃত হয় না, এখনো এমন দেশ পৃথিবীতে নেই। নগদ লেনদেন নিষিদ্ধও করা হয়নি কোনো দেশে। তবু প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন সহজ ও নিরাপদ বলে জনগণের ব্যবহারিক জীবনের হিসেবে প্রায় ক্যাশলেস হয়ে পড়েছে বেশকিছু দেশ।

বিশ্বের অন্যতম পেমেন্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডপের গ্লোবাল পেমেন্টস রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, বিশ্বে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডসহ নরডিক দেশগুলো রয়েছে। একই সময়ে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ায় ক্যাশলেস অর্থনীতির বিস্তারে অন্যদের তুলনায় অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অন্যান্য নরডিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, নরওয়ে ও আইসল্যান্ডে দোকানপাটে মাত্র ২ শতাংশ কেনাকাটা নগদ অর্থে সম্পন্ন হয়। এসব দেশে যেকোনো কেনাকাটায় ক্রেতারা ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেন করেন। সেটা হোক ছোট্ট একটি কফি শপ কিংবা গ্রোসারি শপ। এমনকি অনেক দোকানেই লেখা থাকে ‘ক্যাশ ফ্রি’। মানে তারা নগদ অর্থ নেন না, বিলটা দিতে হবে কার্ড বা এমএফএসের মাধ্যমে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, সুইডেনের অনেক ব্যাংকই এখন আর নগদ টাকা গ্রহণ করে না। সেই দেশে সুইস নামে মোবাইল পেমেন্ট অ্যাপ বহুল ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ডিজিটাল পেমেন্টে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও এক ধরনের বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটেছে। এর কেন্দ্রবিন্দু হলো কিউআর-কোডভিত্তিক ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই) ব্যবস্থা। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) পেমেন্ট সিস্টেমস রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ইউপিআই একাই দেশটির মোট পেমেন্ট লেনদেনের প্রায় ৮৫ শতাংশ ভলিউম পরিচালনা করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য বলছে যে বিশ্বের রিয়েল টাইম ডিজিটাল পেমেন্টের প্রায় ৪৯ শতাংশ এখন ইউপিআইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ভারতে এ সাফল্যের পেছনে সরকারের সরাসরি প্রদত্ত কিছু প্রণোদনারও ভূমিকা রয়েছে। সেটা চলতি অর্থবছরেই নাকি বাংলাদেশী টাকার প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার সমতুল্য। আমাদের দেশেও বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করতে উৎসাহমূলক কিছু উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন, বলতে শুরু করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে আমাদের সরকার কিছু ভাবছে কিনা, আমরা এখনো জানি না।

অনেকে আবার বিপরীতভাবেও ভাবতে পারেন, ডিজিটাল লেনদেনে ভর্তুকি বা প্রণোদনা দিয়ে সরকারের লাভটা কী? এখানেই দীর্ঘমেয়াদে অবশ্যই সরকার অনেক সুবিধা পাবে। প্রযুক্তিভিত্তিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায় সহজেই। এক্ষেত্রে আরো প্রশ্ন থাকতে পারে, বাংলা কিউআর কোড নিয়ে সরকারের দিক থেকে আগ্রহের কারণ কী? সহজভাবে বললে জনসাধারণের জীবন কীভাবে আরামদায়ক হবে, সেটা নিশ্চিত করা তো যেকোনো সরকারের প্রধান দায়িত্ব। আরেকটু গভীর থেকেও বলা যায়, আর্থিক দুর্নীতি প্রতিরোধে ডিজিটাল লেনদেন বেশি কার্যকর। কারণ নগদ লেনদেন আড়ালে-আবডালেও করা যেতে পারে। কিন্তু অ্যাপভিত্তিক লেনদেনের প্রমাণ লুকানোর কোনো উপায় নেই। লেনদেন সহজে শনাক্ত করার বিষয়টি সরকারকে অন্যভাবে উপকৃত করবে। সেটা হলো কর আদায়ের বিষয়টিতে গতি আনা। কারণ ডিজিটাল লেনদেনে কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ অনেক কমে আসে। এখানে একটু বলতে হয়, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা আসার কথা মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে। এক্ষেত্রে বাংলা কিউআর এ লক্ষ্য পূরণে সহায়ক এক শক্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সেটা নিশ্চিত করতে হলে এটি প্রথম কয়েক বছর ব্যবহারকারীদের জন্য চার্জমুক্ত রাখা যায় কিনা, তা ভেবে দেখার অনুরোধ করব আমাদের নীতিনির্ধারক মহলকে।

সরকারি-বেসরকারি নানা উৎসাহধর্মী উদ্যোগের কারণে এমএফএস বা যেটা আমাদের দেশে মোবাইল ব্যাংকিং হিসেবে পরিচিত, সেটা কিন্তু তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। গণমানুষের জীবন এখন এটা ছাড়া অচল বলা যায়। কিন্তু এর ব্যবহার বেশি হয় কোথাও টাকা পাঠাতে। সেই তুলনায় কেনাকাটার ক্ষেত্রে ব্যবহার এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এর অন্যতম কারণ ব্যবসায়ীরা অনেক বেশি কিউআর কোড দোকানে রাখাটা ঝামেলা মনে করেন। প্রচলিত যে পদ্ধতি সেখানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের জন্য দেখা যায় পাঁচটি কিউআর কোড টাঙিয়ে রাখতে হয়। এখানেই আসলে বাংলা কিউআরের অভিনবত্ব। এটা থাকলে সব লেনদেন একই কোড দিয়ে করা সম্ভব হবে।

ডিজিটাল পেমেন্ট একদিক দিয়ে কিন্তু সরকারের বড় অংকের টাকা বাঁচিয়ে দিতে পারে। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, লেনদেনের জন্য কাগজের নোট ছাপাতেই বাংলাদেশ ব্যাংককে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও হস্তান্তরের কাজেও আলাদা ব্যয় রয়েছে। তাই ‘ক্যাশলেস ট্র্যানজেকশন’ যত বাড়বে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নগদ মুদ্রা-সংক্রান্ত খরচ তত কমে আসবে।

ডিজিটাল লেনদেনে জনসাধারণের জন্য ইতিবাচক দিকটি হচ্ছে এতে সময় নষ্ট হয় কম। কারণ গোনাগুনতির কোনো ঝামেলা থাকে না। টাকা আসল, নাকি জাল এ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে না। এছাড়া নগদ টাকা সঙ্গে থাকলে চুরি বা হারিয়ে যাওয়ার ভয়ও থাকে না। যদি বাংলা কিউআর সত্যিই ফুটপাত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে ক্যাশলেস ব্যবস্থার দিকে আমরা দ্রুত হাঁটতে পারব।

খন্দকার এমদাদুল হক: ব্যাংকার

আরও