আলোকপাত

সংসদীয় গণতন্ত্রে সিভিল সার্ভিসের ভূমিকা প্রসঙ্গে

তদানীন্তন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের (আইসিএস) একজন খ্যাতনামা কর্মকর্তা ছিলেন সুলেখক ফিলিপ ম্যাসন। তিনি ব্রিটিশ ভারতে মাঠ প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী দায়িত্বশীল পদে দীর্ঘকাল কাজ করেছেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীনও। প্রশাসন সম্পর্কিত তার পুস্তকাদির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। তিনি তার দ্য মেন হু রুল্ড ইন্ডিয়া (১৯৮৫) বইতে লিখেছেন, সবকিছু বলার পরও একটি নির্ভেজাল সত্য থেকে যায় এবং তা লর্ড ওয়াভেলের (ভারতবর্ষের শেষ ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল

তদানীন্তন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের (আইসিএস) একজন খ্যাতনামা কর্মকর্তা ছিলেন সুলেখক ফিলিপ ম্যাসন। তিনি ব্রিটিশ ভারতে মাঠ প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী দায়িত্বশীল পদে দীর্ঘকাল কাজ করেছেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীনও।

প্রশাসন সম্পর্কিত তার পুস্তকাদির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। তিনি তার দ্য মেন হু রুল্ড ইন্ডিয়া (১৯৮৫) বইতে লিখেছেন, সবকিছু বলার পরও একটি নির্ভেজাল সত্য থেকে যায় এবং তা লর্ড ওয়াভেলের (ভারতবর্ষের শেষ ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের পূর্বকার গভর্নর জেনারেল) ভারত ত্যাগের পরবর্তী একটি ভাষণে সুস্পষ্ট প্রকাশ পায়। তিনি বলেছিলেন, ভারতে ব্রিটিশরা স্মরণে বেঁচে থাকবে কোনো প্রতিষ্ঠান, প্রবর্তনা বা স্থাপনার জন্য নয়; আদর্শ জেলা প্রশাসকের বাঞ্ছনীয় রূপ কী হতে পারে ব্রিটিশের সৃষ্ট সেই ইমেজই হবে তাদের কালজয়ী ঐতিহ্য। ভারতে প্রথম ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের এ বিষয়ে বক্তব্য ছিল অনুরূপ। ম্যাসন-এর মন্তব্য—ভারতের পল্লীবাসী যদি আজ তার নিজের জাতিভুক্ত (অর্থাৎ ভারতীয়) জেলা প্রশাসকের কাছে সুবিচার ও সহানুভূতিমূলক সুবিবেচনা প্রত্যাশা করে, এ উপমহাদেশে সেটাই হবে ব্রিটিশের সর্বশ্রেষ্ঠ স্মারক।

আমাদের নিজস্ব পর্যালোচনায় সম্যক উপলব্ধির জন্য আমরা এখানে ‘ভারতের’ স্থানে ‘বাংলাদেশ’ ধরতে পারি। মনে রাখা সংগত, এখানে জেলা প্রশাসক বলতে সামগ্রিকভাবে প্রশাসনই নির্দেশিত হচ্ছে এবং ম্যাসন এ বক্তব্য দিয়েছিলেন ১৯৮৫ সালে, অর্থাৎ ভারতের স্বাধীন রিপাবলিক হিসেবেও প্রায় ৩৬ বছর গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা এক্সপেরিমেন্টের অভিজ্ঞতার পটভূমিতে।

মোগলদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি শাসন ব্যবস্থাই ব্রিটিশ প্রথম গ্রহণ করে, তাতে প্রয়োজনবোধে আপন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য পরিবর্তন ও পরিমার্জন সময় সময় করতে থাকে।

স্মরণ্য যে, ১৭৬৫ সালে দুর্বল মোগল বাদশাহ শাহ আলম দ্বিতীয় একটি দেওয়ানি ঘোষণা জারি করেন, যাতে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যায় মোগল রাজস্ব কর্মকর্তার পরিবর্তে ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া শুরু হয়। ব্রিটিশদের এ উপলব্ধি হয়েছিল যে ভারতবর্ষের বিরাট সাম্রাজ্যে মোগল রাজস্ব পদ্ধতি, এমনকি সাধারণ প্রশাসনিক ব্যবস্থাও ছিল কার্যকর। শশী থারুর, একজন প্রখ্যাত ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং বিশ্লেষক ও লেখক, তার ইনগ্লোরিয়াস এম্পায়ার (২০১৬) বইয়ে  লিখেছেন, ‘মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে বিশ্ব অর্থনীতির ২৭ শতাংশ অংশই ছিল মোগল-ভারতের। অনুকূল ও সহায়ক প্রশাসনিক ব্যবস্থার অবর্তমানে তা সম্ভব ছিল না। ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক পর্বে নিজাম, দেওয়ান, কোতোয়াল, সদর আমিন, কাজী, হাকিম, হেকিম এবংবিধ বহু পদ চালু ছিল। এখনো মুন্সেফ, উকিল, মোক্তার, কানুনগো, সেরেস্তাদার, কিস্ত, নাজারত, পেশকার, নাজির, নায়েব, তহশিল, খাজাঞ্চি, মহাফেজখানা, হেফাজত, জামিন, শুমারি, জমিন, জমিদার, তরফদার ইত্যাদি সরকারি ব্যবহারেও প্রচলিত রয়েছে।

মোগল শাসনে অসাম্প্রদায়িকতা সম্পূর্ণভাবে বজায় ছিল। সমাজ-দেহে তো বটেই, প্রশাসনিক কাঠামোর প্রত্যেক স্তরেই ছিল তার অবিসংবাদিত প্রতিফলন। বাদশাহ আকবর রাজস্ব গণনা ও স্থানীয় জনগণের সুবিধার জন্য ইসলামী চান্দ্র হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করেই পূর্ব ভারতে মাসের স্থানীয় নামানুসারে সৌরবছর চালু করেন, যা বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের কোনো কোনো স্থানে বঙ্গাব্দ বলে প্রচলিত এবং ব্যবহূত হচ্ছে। আকবর দ্য গ্রেটের প্রধান সেনাপতি ছিলেন রাজপুত হিন্দু মান সিংহ এবং রাজস্ব উজির হিন্দু টোডর মল্ল। রাজস্ব আদায়ের জন্য নিয়োজিত সম্মানিত ব্যক্তিদের পদবি ছিল চৌধুরী (যারা ভূমির মালিক হলেও প্রজা-চাষীদের কাছ থেকে আহরিত রাজস্বের মাত্র এক-চতুর্থাংশ বা ‘চৌথ’ রাখতে পারতেন), মজুমদার, তালুকদার, মিরাশদার, হাওলাদার/হালদার, ভুঁইঞা; যারা যেকোনো ধর্মাবলম্বী বা সম্প্রদায়ের হতে পারতেন। কিন্তু ব্রিটিশরা এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন পন্থা গ্রহণ করল, যা ছিল সাম্প্রদায়িক। সরকারি পদে বা ভদ্র পেশায় নিয়োজিত হিন্দুদের নামের অন্তে বা শুরুতে জুড়ে দেয়া হতো ‘বাবু’ আর মুসলামদের শুরুতে ‘মৌলভী’। অন্তে ‘সাহেব’ থাকত, যা অবশ্য ইউরোপীয়দের ক্ষেত্রেও স্থানীয় ভাষায় প্রচলিত ছিল। আইসিএস ও প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসের ‘লিস্টেড পোস্ট’ধারীদের এই বিভাজনের বিড়ম্বনা ছিল না, কেননা তাদের বিলিতিয়ানায় অভ্যস্ত বলে ধরা হতো। সম্মাননা প্রদানেও ছিল এই সাম্প্রদায়িক বিভাজন—ব্রিটিশদের চোখে কৃতী মুসলমানদের উপাধি দেয়া হতো (‘নাইটহুড না হলে) খান বাহাদুর, খান সাহেব আর হিন্দুদের দেয়া হতো রায় বাহাদুর, রায় সাহেব। শশী থারুর তার উল্লিখিত বইটিতে লিখেছেন, ১৮৫৭ সালে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বা তথাকথিত সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে হিন্দু-মুসলিম সৈনিক ও লড়াকুদের যুগপৎ ঐক্যবদ্ধভাবে শেষতম মোগল সম্রাট, প্রায় ক্ষমতাবিহীন বাহাদুর শাহ জাফরের একক নেতৃত্বে আস্থা স্থাপন করে ব্রিটিশবিরোধী যুদ্ধ পরিচালনা প্রতিপক্ষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। তখনই ব্রিটিশদের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ভারতীয়দের সমাজ জীবনে অনুপ্রবিষ্ট করাতে পারলেই উপমহাদেশে সাম্রাজ্যবাদী শাসন বলবৎ রাখা সম্ভব হবে এবং তাই হয়ে দাঁড়াল সাম্রাজ্যবাদীদের প্রশাসনিক ‘মন্ত্র’—বিভেদ জাগাও—শাসন করো।

তবে সন্দেহাতীতভাবে এটা বলা যেতে পারে প্রশাসনিক সিভিল সার্ভিসে বা সরকারের অন্য সব শাখা-প্রশাখা বা বিচার ব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িকতা কখনো মাথাচাড়া দিয়ে (কয়েকটি নগণ্য ক্ষেত্রে ছাড়া) উঠতে পারেনি। এক্ষেত্রে সুবেদার-নাজিম, হাকিম, কোতোয়াল, কাজী—এদের মোগল ঐতিহ্য বজায় রাখার প্রচেষ্টা বলবৎ ছিল। কেননা ব্রিটিশরা জানত সিভিল সার্ভিস যদি পারদর্শিতা অর্জন, নিরপেক্ষতা, দুর্নীতিমুক্ত ইমেজ সৃষ্টি করতে না পারে তাহলে প্রশাসনের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা, সম্মান ও আনুগত্যবোধ থাকবে না। আর তাতেই সাম্রাজ্যবাদী শাসন দীর্ঘস্থায়ী করা ক্রমাগত দুষ্কর হয়ে দাঁড়াবে!

১৮৩৫ সালে ফার্সির স্থলে ভারতের সরকারি ও আদালতের ভাষা হিসেবে ইংরেজি প্রতিষ্ঠিত হলো। ব্রিটিশ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের অবশ্য সাধারণের বোধগম্য ভাষা হিসেবে (লিঙ্গুয়া-ফ্রাংকা) উর্দু/হিন্দুস্তানি শিক্ষা দেয়া হতো। তবে রোমান হরফে ১৮৫৮ সালে যখন মহারানী ভিক্টোরিয়া রাজকীয় ঘোষণা দিয়ে ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করলেন, তখনই উচ্চতর সিভিল সার্ভিসের দ্বার ভারতীয়দের জন্য উন্মুক্ত হলো। রানী ভিক্টোরিয়া অবশ্য উর্দু হরফেই তার নাম স্বাক্ষর শিখলেন তার ব্যক্তিগত সখা ও মুন্সি আব্দুল করিমের কাছ থেকে। মোগল ঐতিহ্য অনুসারে একজন প্রত্যক্ষ নিয়োজিত সুবেদার/গভর্নরের অধীনে রাজস্ব, বিচারক ও দাপ্তরিক কাজে পারদর্শী কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রশাসন পরিচালনাই সর্বোত্তম পন্থা হিসেবে ব্রিটিশরা গ্রহণ করল। তারা ১৭৬৭ সালেই কলকাতায় তাদের রাজধানী স্থাপন করল এবং প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে ‘রাইটার্স বিল্ডিং’-এ করল সচিবালয়ের প্রতিষ্ঠা। মুখ্য জেলা অধিকর্তা হিসেবে নিয়োজিত হলেন কালেক্টর, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ডেপুটি কমিশনার পদবিধারী কর্মকর্তারা। রাজস্ব সংগ্রহই প্রাথমিক দিকে তাদের প্রধান কর্তব্য বলে তাদের কার্যালয় সাধারণত ‘কালেক্টরেট’ বলেই খ্যাত হলো। পরবর্তী সময়ে রাজস্ব, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা ছাড়াও অন্যান্য সরকারি কর্মকাণ্ড যথা উন্নয়ন, রিলিফ, প্রচার, সমন্বয় সাধন ইত্যাদিও তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দায়িত্বাধীন হলো। ক্ষুদ্রতর পরিসীমায় মহকুমা হাকিম বা (সাবডিভিশনাল অফিসার—এসডিও) জেলা হাকিমের অধীনে এবংবিধ কার্যাবলি সম্পন্ন করেন। নীতিনির্ধারণী স্তরেও সেক্রেটারিয়েটে/সচিবালয়ে নিয়োজিত হলেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাঠ প্রশাসনে পারদর্শী কাঠামো অনুসারে নিয়োজিত সচিব ও তার সহকারীরা। প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সহকারে এ ব্যবস্থাই কম-বেশি স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তানে (এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তান—বাংলাদেশে) চালু থাকল। অবশ্য মূল উদ্দেশ্যের ঘটল আমূল পরিবর্তন। রাজপ্রতিনিধি নয়, তারা হয়ে দাঁড়ালেন গণনির্বাচিত সরকারের কাছে দায়ী জনসেবক। বাস্তবিক অর্থে সেটাই হওয়া আবশ্যিক ও বাঞ্ছনীয়। স্বীয় রাষ্ট্রভাষা অনুযায়ী তাদের নামাকরণ হলো বাংলাদেশে জেলা প্রশাসক, পাকিস্তানে কখনো ডিসি কখনো নাজিম, ভারতে রাজ্যভেদে জেলা শাসক, উপায়ূক্ত (সমন্বয়ক), জেলা দণ্ডাধিকারী বা ডিসি। বাংলাদেশে সব মহকুমাই রূপান্তরিত হলো জেলা হিসেবে। প্রায় সব থানাই হলো উপজেলা আর সেখানে মুখ্য অধিকর্তা হলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা—ইউএনও। তবে আমি মনে করি, তাদের পদবি সাব-ডিস্ট্রিক্ট অফিসার বা এসডিও রাখাই যুক্তিসংগত হবে। তাতে তাদের কার্যাবলির যথার্থ প্রতিফলন এবং তা সম্পাদন সহজতর হবে। তিন দেশেই সচিবালয় রয়ে গেছে প্রায় আগের মতোই।

যদিও একটি মহান গণবিপ্লবের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে হলো বাংলাদেশের স্থাপনা, ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিবনগরে স্বাধীন সরকারের প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরে আইন জারি হলো, সব সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, যারা বাংলাদেশের আনুগত্য স্বীকার করবেন তারা তাদের পূর্বতন চাকরির শর্তাবলি অনুসারেই পরিচালিত হবেন এবং বিপরীতধর্মী কোনো আইন জারি না হলে পূর্বপ্রচলিত সব আইনই বজায় থাকবে।

যশোর ছিল ব্রিটিশদের কলকাতা-সন্নিকটবর্তী সর্বপ্রথম নিয়ন্ত্রিত জেলা। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষার্ধে পাকিস্তান আমলে ওখানে ডিসি হিসেবে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। ঘটনাক্রমে আমার বাবা মরহুম গিয়াসুদ্দিন আহমদ চৌধুরীরও সে জেলায় ম্যাজিস্ট্রেট-কালেক্টর নিযুক্ত ছিলেন পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধে। ওই সময়ে তাই আমার সুযোগ হয়েছিল এবং আমি সোৎসাহে সব সরকারি কাগজাদি, পত্রাবলি, নির্দেশগুলো গোপনীয় অফিসে এবং রেকর্ড রুমে সুরক্ষিত অবস্থায়ই রেখেছিলাম। একটি বিষয় বিশেষ লক্ষণীয় ছিল। এ পদাধিকারীদের প্রতি কেন্দ্রীয় শাসকদের প্রচুর আস্থা ছিল এবং তারাও নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে, কখনোবা বলিষ্ঠভাবে তাদের বক্তব্য জানিয়ে সরকারকে ‘জ্ঞাত’ রাখতেন। কর্মকর্তাদের আইনকানুনের কাঠামোয় নির্ভয় থাকতে উৎসাহিত করা হতো এবং কোনো প্রকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হতো না, যাতে সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ন না হয়। সহকর্মীদের মধ্যে একটি অলিখিত সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিল। যথাযথ দায়িত্ব পালনে অথবা কোনো শক্তিশালী মহলের ‘চাপ’ প্রতিরোধে যদি কোনো কর্মকর্তাকে অসুবিধা বা বিপদে পড়তে হতো, তাকে সুরক্ষা করা হতো। দুর্ভাগ্যবশত এ রীতি এখন প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এটা আমাদের স্খলন।

অধ্যাপক খালেদ-বিন-সাঈদ তার পাকিস্তান, দ্য ফর্মেটিভ ফেইজ গ্রন্থে  ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনভার হস্তান্তরকরণের সময়ে সামরিক ও বেসামরিক সরকারি কাজে নিয়োজিত মুসলিম কর্মকর্তাদের বিবরণ দিয়েছেন। এমনিতেই মুসলমানদের সংখ্যা খুব কম ছিল আর ‘মুসলিম’ বাঙালিদের সংখ্যা ছিল তীব্র নগণ্য। পেশাজীবীদের মধ্যেও ছিল তা-ই। সামরিক বাহিনী ছিল সব বাঙালির জন্যই রুদ্ধদ্বার। মুসলমানের প্রশ্নই প্রায় ছিল না। যা ছিটেফোঁটা, তাও ছিল আসাম, উড়িষ্যা, বিহার বা অন্য কোথার অভিবাসী হিসেবে। অন্য রাজ্যের/প্রদেশের মুসলমান আইসিএস বা সামরিক কর্মকর্তা অবশ্য বেশকিছু ছিলেন। ওই সময় চাকরিতে সম্ভবত মাত্র দুজন বাঙালি মুসলমান আইসিএস এবং কতিপয় ‘লিস্টেড পোস্ট’ পদাধিকারী ছিলেন। ডক্টর আকবর আলি খান তার গ্রেসামস ল সিনড্রোম অ্যান্ড বিয়ন্ড বইটিতে বিবৃত করেছেন—১৯৪৯ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সিএসপিতে ৪৫৮ জনের নিযুক্তি হয়েছিল। যার মধ্যে ছিলেন ১৮৫ জন বাঙালি। তাও সবাই মেধানুক্রমিক নন—বেশকিছু ‘কোটা’ সিস্টেমের কল্যাণে। অবশ্য প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসে নিয়োজিত প্রায় ৬০০ জনের সবাই ছিলেন বাঙালি। ড. খান তার বইটিতে এবং কাবেদুল ইসলাম তার বাংলায় রচিত স্বাধীনতা যুদ্ধে সিএসপি এবং ইপিসিএস অফিসারদের ভূমিকায় বিবৃত করেছেন। শুধু প্রশাসনিক সিভিল সার্ভিস নয়, অন্য সব সার্ভিসের বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সম্ভাব্য সর্বপ্রকার মুক্তিসংগ্রামে সহায়তা বা অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৭১, মার্চে সম্ভবত ১০-১১ তারিখে সিএসপি অ্যাসোসিয়েশনের (পূর্ব পাকিস্তান শাখা) প্রেসিডেন্ট এমএম হাসান (আইসিএস-সিএসপি-পাঞ্জাবি) সভাপতিত্বে কার্যকরী পরিষদের একটি জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়—জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা এ মত প্রকাশ করছেন যে সাংবিধানিক নিয়মানুযায়ী পার্লামেন্টের নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থাভাজন ব্যক্তি কর্তৃক সরকার গঠনের নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তা বাস্তবায়ন প্রক্রিযায় যে যার স্থান থেকে প্রদেয় সর্বপ্রকার সহায়তা প্রদান ও দায়িত্বপালনে উদগ্রীব রয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানালে তিনি তার সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। বস্তুত এ কথাগুলো তিনি পরবর্তী সময়ে স্মরণ রেখেছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে একটি সমন্বিত সিভিল সার্ভিস গঠন করা হয়, যেখানে সব ক্যাডারকেই আইনগতভাবে সমকক্ষ ধরা হয়। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস অর্ডার ১৯৮০ অনুসারে, বিসিএস (প্রশাসনিক) ক্যাডারের অংশ হলো ভূতপূর্ব সিএসপি, ইপিসিএস, সামরিক ল্যান্ডস, সেক্রেটারিয়েট সার্ভিস, আইএমএস ইত্যাদি।

পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিভিল সার্ভিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেহেতু নির্বাচিত সরকার এবং নির্বাচিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও এদের ওপরই অনেকটাই নির্ভর করতে হয়, বিশেষ করে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে। আইনকানুনের প্রয়োগ ও মাঠ পর্যায়ে সরকারি কর্মকাণ্ড পরিচালনা অনেকাংশে এদের দায়িত্বাধীন। ড. আকবর আলি খান লিখেছেন, ‘সাধারণ প্রশাসক কিন্তু আসলে একজন স্পেশালিস্ট। তার অর্জন করতে হয় প্রশাসনে বিশেষ দক্ষতা।’ অবশ্য এখনকার প্রশাসকরা আগের মতো রাজপ্রতিনিধি নন। নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়ী, তারা হচ্ছেন জনসেবক। পরিপূর্ণ অনেক বাস্তব ক্ষেত্রে সেটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রশাসনের কলাকৌশল পরিবর্তনীয় এবং এর প্রয়োগ বিভিন্ন অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তবে এর দিগন্ত বিস্তারমান। সর্বক্ষেত্রে যথাসম্ভব ‘প্রাইভেটাইজেশন’-এর একজন প্রবক্তা হয়েও আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বিবেচনা করি ‘প্রশাসনিক সিভিল সার্ভিস’ সরকারি কর্মকাণ্ডের কিং পিন হয়েই থাকবে, বিশেষ করে সংসদীয় গণতন্ত্রে। তাই এটা অত্যাবশ্যক যে এ কর্মকর্তারা যথোপযুক্তভাবে প্রশিক্ষিত, দুর্নীতিমুক্ত, প্রণোদিত, দক্ষ, নিরপেক্ষ এবং সব রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত থাকেন।

এটা অবশ্যই একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ।

 

ইমাম আহমদ চৌধুরী: সাবেক চেয়ারম্যান প্রাইভেটাইজেশন কমিশন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য

আরও