প্রস্তাব

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এখন সর্বজনের দাবি

কোটা সংস্কারের দাবিতে জোরদার আন্দোলন প্রথম আমরা দেখি ২০১৮ সালে। সেই আন্দোলনে বিরক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী সেই সময় পুরো কোটা বাতিল করে দিয়েছিলেন। আন্দোলনের দাবি পুরো কোটা বাতিল ছিল না, ছিল কোটা সংস্কার। পুরো কোটা বাতিল সংবিধান অনুযায়ী আইনে টেকারও কথা নয়, টেকেনি। ফলে আবারো ৫৬ শতাংশ কোটা বলবৎ হয় এ বছরের জুনে, আদালতের এক নির্দেশে। ফলে সেই

কোটা সংস্কারের দাবিতে জোরদার আন্দোলন প্রথম আমরা দেখি ২০১৮ সালে। সেই আন্দোলনে বিরক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী সেই সময় পুরো কোটা বাতিল করে দিয়েছিলেন। আন্দোলনের দাবি পুরো কোটা বাতিল ছিল না, ছিল কোটা সংস্কার। পুরো কোটা বাতিল সংবিধান অনুযায়ী আইনে টেকারও কথা নয়, টেকেনি। ফলে আবারো ৫৬ শতাংশ কোটা বলবৎ হয় এ বছরের জুনে, আদালতের এক নির্দেশে। ফলে সেই আন্দোলনের পুনরুত্থান ঘটে এর পরেই। প্রথম থেকেই শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলন অসংখ্য শিক্ষার্থীকে একত্র করতে সক্ষম হয়। গত কয়েক বছরে কোনো প্রতিবাদে এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীকে জড়ো করা যায়নি। 

সরকার একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ ও বলপ্রয়োগের পথ ধরলে প্রতিবাদ আরো বিস্তৃত হতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন শুরু হওয়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষও প্রতিরোধ গড়তে শুরু করে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অংশও একত্র হতে শুরু করে। প্রথমে আমরা পাবলিক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একত্র হয়ে আন্দোলন করতে দেখি। পরবর্তী সময়ে স্কুল-কলেজ এমনকি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হয়ে পড়েন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর পরই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে রাস্তায় আসেন। এরপর রাষ্ট্রীয় আক্রমণ আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। মাত্র কয়দিনে যেভাবে শিশু কিশোর তরুণদের সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তার কোনো পূর্ব নজির নেই। কিন্তু তাতে প্রতিবাদ দমে যায়নি। বরং প্রতিবাদকারীর সংখ্যাও অভূতপূর্ব মাত্রায় বেড়েছে।

আন্দোলন দমনের জন্য প্রথমে স্কুল-কলেজ, পরে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ছাত্রলীগ, যুবলীগের সঙ্গে পুলিশ, র‍্যাব দিয়ে শিক্ষার্থীদের হলছাড়া করা হয়। দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক হল নেই, তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি কোথাও বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকেন। সরকারি এ পেশিবাহিনী তাদের বাড়িতেও হানা দিয়ে ত্রাস ছড়াতে শুরু করে। চট্টগ্রামের অনেক শিক্ষার্থী আমাকে জানিয়েছে কীভাবে তাদের জোর করে ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। কারফিউর মধ্যে বাড়ি ছাড়ার পর তাদের যাওয়ার জায়গা ছিল না। তারা রাস্তায় চরম অনিরাপত্তায় ভুগেছে। এ রকম অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ চল্লিশ বছর শিক্ষকতা করেছি। সবুজ-শ্যামলে ছাওয়া একটি ক্যাম্পাস এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে মুখর থাকত। অথচ ১৫ জুলাই থেকে কয়দিন টেলিভিশনে দেখেছি রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর আক্রমণ। এরপর পুলিশের গাড়ি আর সাঁজোয়া যান ক্যাম্পাসের রাস্তায় রাস্তায়। পুলিশ ও র‍্যাবকে টিয়ার শেল ছুড়তে দেখেছি। ক্যাম্পাসের ভেতর তারা গোলাগুলি করেছে। আর শিক্ষার্থীরা ঝোপঝাড়ে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেছে। অনেক শিক্ষকও এ সময়ে নিজেদের ও শিক্ষার্থীদের রক্ষা করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। পাখিদের কলকাকলি আর শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস যুদ্ধের দামামার শব্দে রূপ নেয়। শিক্ষক হিসেবে এমন দৃশ্য সহ্য করার মতো নয়। 

আজ থেকে ৪১ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৮৩ সালে এরশাদের সামরিক শাসনামলে এমন ঘটনা দেখেছিলাম। সেই বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি সামরিক বাহিনী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়। অনেক শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে ময়দানে নিয়ে নির্যাতন করে। ওই সময়ের নির্যাতনকেও ছাড়িয়ে গেছে বিগত কয়েক দিনের নির্যাতন। এবারে ছাত্রলীগ যুবলীগের সন্ত্রাসীদের অস্ত্র হাতে নামানো হয়েছে, তাদের এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে নির্বিচারে শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের নাগরিকদের লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল যে পথচারী, ঘরের শিশু, নারীও নিস্তার পাননি। হয়তো কেউ ওষুধ কিনতে বের হয়েছেন তাকে গুলি করা হয়েছে। নির্বিচারে গুলি করার ফলে আরো মানুষ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।

নির্বিচারে নিপীড়নের এমন ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। স্বাধীনতার আগে কিংবা পরবর্তী সময়েও আর কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। কোনো ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য এত সংখ্যক মানুষকে অতীতে প্রাণ দিতে হয়নি। এমনকি পাকিস্তান শাসনামলেও কোনো আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা এত ছিল না। বেশ কয়েকটি রক্ষণশীল হিসাব জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে। কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকে মুমূর্ষু অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। হাত বা পা বা চোখ হারিয়ে বিপর্যস্ত কয়েক হাজার মানুষ। 

এতেও প্রতিবাদ প্রতিরোধ কমার বদলে আরো বাড়তে থাকলে ১৮ জুলাই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়, ১৯ জুলাই দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি কতটা জটিল হয়ে উঠেছে তা এ থেকেই স্পষ্ট প্রতিভাত হয়। 

আমার ছোট পড়ার ঘরে জানালাটা বড়। এ জানালা দিয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি চারদিকের অশান্তি, দূষণের মধ্যে একটু আশ্রয় খুঁজি। অথচ ১৮-১৯ জুলাই এ জানালাই আমাকে ভয়ংকর দৃশ্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে। আকাশে হেলিকপ্টার উড়ছে, বারবার ঘুরে ঘুরে আসছে। হেলিকপ্টার থেকে ফেলা হচ্ছে মরণবিষ, ভয়ংকর শব্দ হচ্ছে। পরে জানতে পারি হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। ছোড়া হয়েছে টিয়ার গ্যাস ও বুলেট। প্রশাসন বরাবরই জানিয়েছে, তারা এমন কিছু করেনি। অথচ হেলিকপ্টার থেকে যে গুলি ছোড়া হয়েছে তা আমি স্বচক্ষে দেখেছি। গুলির আঘাতে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, নারী পুরুষ, শিক্ষার্থী-পেশাজীবী-শ্রমজীবী সবাই আক্রান্ত হয়েছেন। বেশ কয়েকজন শিশু ঘরে, বাসার ছাদে প্রাণ হারিয়েছে। 

এত রক্তের পর সরকার বাধ্য হয়ে কোটা সংস্কার করেছে। এর এক সপ্তাহ আগেও যদি এমন সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারত তাহলে এ রক্তপাত বন্ধ করা যেত। দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত বিশাল। চলমান সংঘাত-সহিংসতায় আর্থিকভাবে তো অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেনই, শারীরিকভাবেও অনেকের ক্ষতি হয়েছে। যারা শারীরিকভাবে আহত হয়েছেন তাদের চিকিৎসার পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সুস্থ হওয়ার পথ জটিল হয়ে গেছে। বিশেষত এ ভয়াবহ ঘটনা আজীবন তাদের তাড়িয়ে বেড়াবে। সরকার দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিলে, আন্দোলনকারীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সহমর্মিতা দেখালে এত মানুষের এত সর্বনাশ হতো না।

সরকার কোটা সংস্কারের বিষয়ে এবারে যে ঘোষণা দিয়েছে সেখানেও অসংগতি রয়েছে। তারা আন্দোলনকারী কিংবা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারো মতামত নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। বরং তারাই একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যাদের কোটা অধিকার প্রয়োজন তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। এ আন্দোলনের বড় উদ্দেশ্য ছিল পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু মানুষদের অধিকার নিশ্চিত করা। তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উদ্দেশ্য ছিল না।  

সরকার বরাবরই বলছে, তারা সব দাবি মেনে নিয়েছে। কিন্তু ১৫ জুলাই থেকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এ নিষ্ঠুরতা, এত হত্যাকাণ্ড, এত জখম, এত ধরপাকড় আর রক্তপাতের বিষয়ে তারা এখনো দায় গ্রহণ করেনি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সরকারের আগ্রাসী অবস্থান বোঝা যায় যখন তারা এখনো নির্বিচারে মানুষের ওপর হামলা মামলা হয়রানি করছে। এত মানুষের প্রাণহানি এবং সম্পদ ধ্বংসের দায় মূলত সরকারের ওপর বর্তায়। এ মুহূর্তে তাদের নিহতদের সঠিক সংখ্যা ও পরিচয় বের করতে হবে। এত মানুষ হত্যা করেছে যারা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করেছে যারা তাদের শনাক্ত করতে হবে। কারা গুলির নির্দেশ দিয়েছে, কারা অস্ত্রধারীদের নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে, জড়িতদের শনাক্ত করতে হবে। তার আইনি প্রতিবিধান নিশ্চিত করতে হবে। 

সরকারের ভূমিকার কারণেই কোটা সংস্কারের আন্দোলন জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের অভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি থেকে আজ গুলি, হত্যাযজ্ঞ, হামলা, গণগ্রেফতার বন্ধ, আটক শিক্ষার্থী-জনতার মুক্তি, কারফিউ প্রত্যাহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া ও অসংখ্য শিক্ষার্থী-জনতাকে হত্যার দায়ে সরকারের পদত্যাগের এক দফায় এসে ঠেকেছে। তার পরও আমরা জানি যেমন আমাদের শিক্ষার্থীরাও একমত হবেন যে কেবল এই সরকারের পতন বাংলাদেশের মুক্তি আনবে না। পুনঃপুনঃ স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বেড়ে ওঠা বন্ধ করবে না। এ কারণে মুক্ত বাংলাদেশের লড়াই এগিয়ে নিতে মুক্তিযুদ্ধকে দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে। দেশের সম্পদ লুটপাট, অন্যায়, দুর্নীতি, প্রাণ-প্রকৃতি বিধ্বংসী ‘উন্নয়নের’ আক্রমণ আর চলবে না। দেশের সম্পদ লুট হবে, দেশের মানুষের জুলাই হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটবে—সেটা মেনে নেয়া হবে না। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় কীভাবে বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রূপান্তর করা যায় সেই পথে আমাদের অগ্রসর হতে হবে, সর্বজনের বাংলাদেশ নির্মাণ করতে হবে। এ চিন্তা ও উদ্যোগই এ সময়ের সর্বজনের দাবি। 

আনু মুহাম্মদ: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও