অভিমত

ডেঙ্গু মোকাবেলায় ২০২৪ সালে আমাদের প্রস্তুতি কেমন?

বাংলাদেশে ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ২৪৬, মোট মৃত্যু ছিল ৮৫৩ জন। কেস ফেটালিটি রেট বা মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ। গত ২২ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে ২০২৩ সালে সারা দেশে মোট আক্রান্ত হয় ৩ লাখ ২১ হাজার এবং মৃত্যুবরণ করে ১ হাজার ৭০৫ জন। যেখানে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২ সালে স্বাস্থ্য

বাংলাদেশে ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ২৪৬, মোট মৃত্যু ছিল ৮৫৩ জন। কেস ফেটালিটি রেট বা মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ। গত ২২ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে ২০২৩ সালে সারা দেশে মোট আক্রান্ত হয় ৩ লাখ ২১ হাজার এবং মৃত্যুবরণ করে ১ হাজার ৭০৫ জন। যেখানে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসি কর্তৃক পরিচালিত এডিসের লার্ভার যে পরিসংখ্যান প্রকাশ হয়েছিল তখনই অনুমান করা হয়েছিল ২০২৩ সালে ভয়াবহতার কথা। ২০২৩ সালে এডিস মশার সেই ঘনত্বই তাণ্ডবলীলা চালিয়ে কেন্দ্র ঢাকা হতে প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছে গেছে। ২০২৩ সালে প্রাপ্ত এডিস মশার মৌসুমি ঋতু আগে ও মৌসুমি ঋতুতে প্রাপ্ত লার্ভার ঘনত্ব বিগত বছরের প্রায় কয়েক গুণ। বুঝতেই পারছেন ২০২৪ সালে কত বড় ভয়াবহতা অপেক্ষা করছে। তার সুস্পষ্ট নমুনা আমরা এরই মধ্যে অবলোকন করেছি। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৯৩ জন আর মৃত্যুবরণ করেছে ১৫ জন। এর মধ্যে ঢাকায় আক্রান্ত ৩৭৩ জন এবং মৃত্যু হয়েছে নয়জনের, যেখানে মৃত্যুর হার ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ঢাকার বাইরে মোট আক্রান্ত ৭২০ জন, মোট মৃত্যু ছয়জন, যেখানে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। এ পর্যন্ত ঢাকা ও ঢকার বাইরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার ১ দশমিক ৪। এ পরিসংখ্যানকে যদি সবচেয়ে ভয়াবহ বছর ২০২৩ সালের সঙ্গে তুলনা করি তাহলে গা শিউরে উঠবে। ২০২৩ সালে ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল বর্তমান আক্রান্তের অর্ধেক অর্থাৎ ৫৫৩ জন এবং মোট মৃত্যু ছিল বর্তমান মৃত্যু সংখ্যার অর্ধেক আটজন। 

এ পরিসংখ্যানের সঙ্গে যদি বিগত বছরের আবহাওয়া ও পরিবেশের উপাদানগুলোর তুলনা করি তাহলে সেখানেও একটা হোঁচট খেতে হবে। বিগত বছরের তুলনায় এ বছর তাপমাত্রা এখন পর্যন্ত নিম্নগামী, যা এডিস মশার প্রজননের জন্য প্রতিকূল। তার পরও যদি এ ভয়াবহ পরিণতি হয়। তাহলে বুঝতেই পারছেন ২০২৪ সালে পরের দিনগুলোয় ডেঙ্গুর ভয়াবহতা কতটা অগ্নিমূর্তি ধারণ করতে পারে। এখনই যদি এডিসের বংশ বৃদ্ধি হওয়ার স্থানগুলো যথাযথ ব্যবস্থাপনায় না নেয়া হয়। তাহলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে চিন্তা করলেই শিউরে উঠতে হয়। সব পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণ হতে এটা তো খুব সহজেই বলা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গুর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে এ শ্রেণীর ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার যথাযথ কারণ আছে। এ লাজুক পরিস্থিতিতে সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনার যথাযথ ব্যবহার ছাড়া আর কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হচ্ছে না। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার ভয়ংকর গাণিতিক বৃদ্ধির বিপরীতে যতগুলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আছে তার সবগুলোরই উপযুক্ত প্রয়োগ আবশ্যক। নিশ্চিত করতে হবে ক্রমবর্ধমান মশার প্রজনন ক্ষেত্রের নিয়মিত ধ্বংস ও ম্যানেজমেন্ট। এটা সত্যিই একটা কঠিন কাজ। তবে সবার সমন্বিত কার্যক্রমে অবশ্যই অসম্ভব নয়। মনে রাখা প্রয়োজন, এ মশক প্রজননক্ষেত্র এখন শুধু ঢাকা বা সিটি করপোরেশনেই সীমাবদ্ধ নয়। এটা এখন ৬৪ জেলার সমস্যা। ঢাকার অবকাঠামো, লোকবল এবং প্রশাসনিক তৎপরতার চেয়ে গ্রামীণ বা জেলা, উপজেলাগুলোয় ব্যবস্থাপনা দুর্বল। তাই অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে আমাদের জাতীয় স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান যথাযর্থভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি স্থানে ভেক্টর সার্ভিল্যান্সের নিয়মিত তৎপরতার মাধ্যমেই নিতে হবে ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। যেখানে লার্ভিসাইড স্প্রে করা প্রয়োজন সেখানে নিয়ম করে লার্ভা ধ্বংস প্রক্রিয়া সক্রিয়ভাবে চালু রাখতে হবে। যেখানে এডান্টি সাইড প্রয়োগ করতে হবে সেখানে নিয়মিতভাবে সঠিক সময়ে সঠিক নিয়মে, সঠিক ডোজে যথাযথ তদারকির মাধ্যমে প্রয়োগ করতে হবে। সেখানে মশারিসহ অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন হবে, সেখানে তা অবশ্যই করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ। এটা সরকারের কখনই একার দায়িত্ব নয়। আবার সরকারের কোনো নির্দিষ্ট একটি মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের একার কাজ নয়। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। যেখানে বায়োলজিক্যাল এজেন্ট বা বায়োকন্ট্রোল এজেন্ট ব্যবহার প্রয়োজন সেখানে অবশ্যই তা নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে মশার প্রাকৃতিক শত্রু সংরক্ষণ করে প্রাকৃতিকভাবেই এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা সম্ভব সেখানে কনজারভেটিভ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। নতুন প্রণীত জাতীয় স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানের মিশন ভিশন সামনে রেখে যতগুলো দায়িত্বপূর্ণ গ্রুপ আছে সবাইকে সর্বোচ্চটুকু দিতে হবে। একেকটি মৃত্যু শুধুই সংখ্যা নয়, একেকটি জেনারেশন। এ মহামূল্যবান জীবন রক্ষার্থে প্রত্যেক মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয় এলাকার জনপ্রতিনিধি, মসজিদের ঈমাম, স্কুলের প্রধান শিক্ষক, গণ্যমান্যদের নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক ব্যক্তির একটি স্থানীয় শক্তিশালী বডি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে ওই এলাকার পুরো ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছতার সঙ্গে অতি সহজ হয়ে উঠবে। এ স্থানীয় শক্তিশালী বডিকে সাহায্য করবে জেলায় গঠিত তদারকি কমিটি। একইভাবে বিভাগীয় পর্যায়ে তদারকি কমিটি জেলা কমিটিকে তদারক করবে এবং বিভাগীয় কমিটিকে তদারক করবে আন্তঃমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত জাতীয় কমিটি। আর সব সমন্বয়কে গতিশীল ও কর্মক্ষম রাখার জন্য এর একক নিয়ন্ত্রণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে থাকা অত্যাবশ্যক। তাহলেই কভিড-১৯-এর ভয়াবহতা থেকে জাতি যেমন অবমুক্ত হয়েছে, আসন্ন ডেঙ্গুর ভয়াবহতা হতে রক্ষা পেতে তেমনিভাবে সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন। একইভাবে টেকসই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বলবৎ রাখতে দেশে ভেক্টর ও ভেক্টরবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ ইনস্টিটিউট এবং বিশ্বমানের গবেষণাগার স্থাপন অত্যাবশ্যক, একই সঙ্গে ওয়ার্ল্ড মসকুইটো প্রোগ্রামে ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তির মাধ্যমে কাজ করা প্রয়োজন। একইভাবে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এ ভয়ংকর ঘাতক বাহককে প্রতিহত করতে হবে। মশা দমনে অন্য যেসব দেশ সফল হয়েছে তাদের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারলে অবশ্যই আমরা সফল হব। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য যেসব কার্যক্রম চলছে, বিশেষ করে নতুন নতুন ইমারত তৈরির কার্যক্রম তা অবশ্যই নিয়মের মধ্যে আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ এবং তদারক করা প্রয়োজন। সর্বোপরি এডিস মশার লার্ভা তৈরির স্থান ধ্বংসকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কার্যক্রমের পরিসর আইনি কাঠামোর মাধ্যমে আরো সুদৃঢ় করতে হবে। বায়োলজিক্যাল ও মলিকুলার যেসব আপডেটেড পদ্ধতি, যেমন এসআইটি, বিটিআই, উলবাকিয়া ইন্ট্রোগেশন প্রভৃতির ব্যবহারকল্পে আমাদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এজেন্ট ব্যবহারের জন্য দেশীয় পরিবেশেই গবেষণা করা যেতে পারে। 

ড. মো. গোলাম ছারোয়ার: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

কীটতত্ত্ব বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম), মহাখালী, ঢাকা

আরও