উন্নয়ন ভাবনা-২

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানসম্মত আধুনিক শিক্ষা

বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায় অনেক উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়ন উপযোগী অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও সেসব দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষা আছে কিন্তু দক্ষ কর্মী নেই। এই skills mismatch পরিস্থিতি বিরাজ করায় সেখানে যুবকরা কারিগরি জ্ঞানের অভাবে কার্যকর জনশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে না। উদ্যোক্তারা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনবল সরবরাহ পায় না। অথচ উচ্চ গুনগত মানসম্পন্ন শিক্ষা ছাড়া যেমন ভাল কাজ (good employment) পাওয়া সম্ভব হয় না তেমনি কাজ পেলেও কম মজুরি গ্রহন করতে বাধ্য করা হয়। আবার এসব দেশে বিরাট সংখ্যক নিরক্ষর যুব জনগোষ্ঠী থাকায় দেশগুলোকে


(পূর্ব প্রকাশের পর)

বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায় অনেক উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়ন উপযোগী অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও সেসব দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষা আছে কিন্তু দক্ষ কর্মী নেই। এই skills mismatch পরিস্থিতি বিরাজ করায় সেখানে যুবকরা কারিগরি জ্ঞানের অভাবে কার্যকর জনশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে না। উদ্যোক্তারা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনবল সরবরাহ পায় না।  অথচ উচ্চ গুনগত মানসম্পন্ন শিক্ষা ছাড়া যেমন ভাল কাজ (good employment) পাওয়া সম্ভব হয় না তেমনি কাজ পেলেও কম মজুরি গ্রহন করতে বাধ্য করা হয়। আবার এসব দেশে বিরাট সংখ্যক নিরক্ষর যুব জনগোষ্ঠী থাকায় দেশগুলোকে অপুষ্টি, কাজহীনতাসহ(worklessness) নানান সমস্যা মোকাবেলায় ব্যস্ত (struggle) থাকতে হয়। ফলে সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন চরম বাধাগ্রস্ত হয়।

- আমরা জানি (উন্নয়ন ভাবনা-১ এর আলোচনায় দেখেছি) উন্নয়ন কার্যক্রম পুরাদমে শুরু করার শুরুতেই এশিয়ার বিস্ময় দক্ষিণ কোরিয়া, সিংগাপুর ও মালয়েশিয়া কাম্য জনসংখ্যা (optimum population) নির্ধারণ ও অর্জন নিশ্চিত করেছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিল্পায়নের উপযোগী মানবসম্পদ অর্থাৎ শিক্ষিত কর্মশক্তি(workforce) গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা সংস্কারে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে। এতে করে শিক্ষার হার (১৫+ বয়সীদের প্রায় শতভাগ শিক্ষার হার  অর্জন করেছে) যেমন  দ্রুত বৃদ্ধি পায় পাশাপাশি দ্রুততার সাথে দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে সেসব দেশ কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও সক্ষম হয়। তাহলে চলুন বিষয়টি একটু পর্যালোচনা করে দেখা যাক- 

দক্ষিণ কোরিয়া

দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৯৪৫ সালে শিক্ষার হার ছিল ২২%। ১৯৬০ ও ১৯৭০ এর দশকে শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বৈজ্ঞানিক, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক (scientific, technical and vocational) শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের উপর জোর দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, শিক্ষা সংস্কারের ঐ সময় আগে থেকে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ধারার (traditional confusiusm)  শিক্ষার সাথে প্রচণ্ড বিরোধ  (clash) সৃষ্টি হয়।  ব্যাপক বাধা সত্ত্বেও সরকার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে দক্ষ জনবল সরবরাহ নিশ্চিত করতে দৃঢ়ভাবে তা বাস্তবায়ন করে। ফলে উন্নয়নের অনেক লক্ষ দ্রুত অর্জিত হতে থাকে।

- দর্শনীয় শিল্পায়ন আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চমকে কোরিয়ার জনগণ দ্রুতই আধুনিক শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে এবং সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসে। ফলাফল- অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সাধারণ ঐতিহ্যবাহী শিক্ষার জায়গায় বৈজ্ঞানিক, কারিগরি ও কর্মক্ষেত্রের উপযোগী বিশেষায়িত জ্ঞানসমৃদ্ধ শিক্ষা স্থান করে নেয়। অবাক করা বিষয় হলো দুই দশক আগের পশ্চাৎপদ দরিদ্র ও চরমভাবে কুসংস্কারাচ্ছন্ন কোরিয়ান সমাজে ১৯৮০ এর দশকে এসে বৈজ্ঞানিক শিক্ষা, পেশা ও বিজ্ঞানীরা সমাজ ও রাষ্ট্রে সবচেয়ে সম্মানিত বিবেচিত হয়ে ওঠে। একই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে শিক্ষার হার। ১৯৪৫ এর ২২% থেকে১৯৮০র দশকে ৯৩% এবং ১৯৯০র দশক থেকে ৯৫% এবং বর্তমানে ৯৭.৯%। শুধুই কি শিক্ষার হার বৃদ্ধি? শিক্ষার মানটা দেখুন- 

ARWU (Academic Ranking of World Universities) কর্তৃক World Ranking-2019 এ প্রথম ১০০০ টির মধ্যে ৩৩ টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার। বিপরীতে ওই ১০০০ এর মধ্যে দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিতে সক্ষম হয়নি।

- তাহলে সহজেই বলা যায় শিক্ষার উচ্চ হার ও উচ্চ মানের জাদুকাঠিতে অর্জিত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন। দেশটির বর্তমান মাথাপিছু আয় ৩১,০০০ ইউএস ডলার এবং উন্নয়নের ধারায় অনেক আগেই উন্নত দেশের কাতারে স্থান করে নিয়েছে।

সিংগাপুর

এশিয়ার আরেক বিস্ময় সিঙ্গাপুর ১৯৬০ এর দশকে  যখন স্বাধীনতা লাভ করে তখন দেশটা ছিল মূলত দারিদ্র আর অদক্ষ শ্রমিকে ভরপুর (market)। পরবর্তী ৫০ বছরের ব্যবধানে সরকার বিস্ময়করভাবে মানসম্মত উচ্চতর আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। যার আওতায় সেখানকার গ্রাজুয়েটরা উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন technical-highly skilled jobs উপযোগী কর্মীতে রূপান্তরিত হয়েছে ও হচ্ছে।

- ২০১৫ সালে OECD(Organization for Economic Cooperation and Development) সিংগাপুরের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পৃথিবীর অন্যতম সেরা (Best) শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে ranking করেছে। OECD- র  মতে সিংগাপুরের শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে অংক ও বিজ্ঞানে(math and science) দক্ষতা পাশ্চাত্যের শিক্ষার্থীদের থেকেও এগিয়ে আছে।

- জানা যায় (সিংগাপুরে MATT-2 প্রশিক্ষণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দর্শন (visit) অন্তর্ভূক্ত ছিল) সিংগাপুরের শিক্ষা কারিকুলামে বাস্তব দক্ষতা উন্নয়ন শিক্ষার উপর ব্যাশপক জোর দেয়া হয়। ক্লাসে শিক্ষার্থীদেরকে সুনির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানে দক্ষ করে তোলা হয়। যা শিক্ষার্থীদেরকে বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে সহায়ক হয়ে থাকে। শিক্ষা প্রদানের কৌশল হিসেবে 'Teach Less, Learn More' শ্লোগান এবং সিঙ্গাপুরের  'Talent Myth' সংস্কৃতি  শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

- এভাবে সিঙ্গাপুরের সংস্কৃতি এবং উচ্চ মানের শিক্ষা বিষয়ক নেতৃত্ব ( first-rate educational leadership) দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পৃথিবীর সেরা করে তুলেছে। এমনও বলা হয় অন্যান্য দেশ সিংগাপুরের কিছু কৌশল গ্রহণ করলে সারা দুনিয়াতে শিক্ষা ক্ষেত্রে নিশ্চিত উন্নয়ন ঘটতো। 

- সিংগাপুরে শিক্ষার হার ১৯৮০ সালে ৮২.৯% এবং তা থেকে বেড়ে ‌২০১৯ সালে ৯৭.৫% দাঁড়ায়। আর শিক্ষার মান? মাত্র ৭২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তন আর অর্ধকোটি জনসংখ্যা-র (৪০% বিদেশী- স্থায়ী অস্থায়ী মিলে) দেশে ARWU (Academic Ranking of World Universities) কর্তৃক World Ranking-2019 এ প্রথম ৯০০ এর মধ্যে ০৩ টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সিংগাপুরের।

- শিক্ষার এই উচ্চ হার ও উচ্চ মান নিশ্চিত করেছে উচ্চ দক্ষতার মানবসম্পদ যা প্রাকৃতিক সম্পদহীন সিংগাপুরকে নিয়ে গেছে উন্নতির শিখরে। যেখানে বর্তমানে মাথাপিছু আয় ৬৪,০০০ ইউএস ডলার!

মালয়েশিয়া

১৯৫৭ সালে ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। দরিদ্র এই দেশে আগে থেকেই সেক্যুলার ও ধর্মীয় উভয় ধরনের শিক্ষা চালু ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বৃটিশদের উদ্ভাবিত (originated) ও চলে আসা বিজ্ঞান শিক্ষা কারিকুলাম অব্যাহত রাখা হয়। তবে বহু জাতি ও ভাষাভাষীর দেশ মালয়েশিয়াকে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে অন্যদের থেকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। 

- পরবর্তীতে মালয়েশিয়া ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি ৩০ বছর মেয়াদি ভিশন ১৯৯১-২০২০ ঘোষণা করে। লক্ষ্য ২০২০ সালে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জন। উন্নত দেশ মানেই শিল্পায়িত (industrialised) অর্থনীতির দেশ। এজন্য মালয়েশিয়ায় গবেষণা, প্রকৌশল ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের উপর ব্যাপক জোর দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, একটি মুসলিম-প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও মালয়েশিয়া ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

- যার ধারাবাহিকতায় দেখা যায় ২০১৫ সালে এসে মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয় QS (Quacquarelli Symonds) কর্তৃক করা বিশ্বব্যাপী ranking এ সেরা ১৫০ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছে। আরো বিস্ময়কর হচ্ছে উচ্চ শিক্ষায় বিদেশী শিক্ষার্থী আকর্ষনে সারা বিশ্বে এখন মালয়েশিয়ার অবস্থান ১১তম। ARWU (Academic Ranking of World Universities) কর্তৃক World Ranking-2019 এ প্রথম ৮০০ এর মধ্যে ০৫ টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে মালয়েশিয়ার। পাশাপাশি শিক্ষার হার ১৯৮৪ সালের ৬৯.৫% % থেকে বেড়ে ২০১৮ সালে ৯৪.৮৫% দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ১২,০০০ ইউএস ডলার মাথাপিছু আয় নিয়ে ভিশন ১৯৯১-২০২০  অনুযায়ী মালয়েশিয়া উন্নত দেশের কাতারে প্রবেশের একেবারে দ্বারপ্রান্তে!

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি উপরে উল্লিখিত দেশসমূহ বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই আধুনিক শিক্ষায় ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। আর এটা বলা মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে কাম্য জনসংখ্যা (optimum population) নির্ধারণ ও অর্জনের পাশাপাশি মানসম্মত আধুনিক শিক্ষা এবং শিক্ষার উচ্চহার দেশগুলোর বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

- বাংলাদেশ উচ্চ জনঘনত্ব, শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধারার শিক্ষা ও সমন্বয়হীনতা, শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন, ৭৩% স্বাক্ষরতার হার ও ২০০০ ইউএস ডলার মাথাপিছু আয় নিয়ে ২০২৪ সালে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনের পথে এবং ২০৩১ সালে উচ্চ মধ্যম ও ২০৪১ সালে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন (vission) নিয়ে এগুচ্ছে। সেখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে সেই স্বপ্ন (vission)-কে বাস্তবে রূপ দেয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কোন ধরনের শিক্ষাকে জোরালোভাবে অগ্রাধিকার দিবে?

মোহা. কাওসার আলী

সাবেক যুগ্মসচিব 

ইমেইল: [email protected]

আরও