নতুন শিল্পাঞ্চল নয়, দরকার স্থাপিত শিল্পাঞ্চলগুলোর সদ্ব্যবহার

বিসিকের শিল্পনগরীগুলোর মধ্যকার আরো অনেক ক’টিই পরবর্তী সময়ে একই ধারা ও মানদণ্ডে স্থাপিত হয়েছে এবং মূলত সে কারণেই সেগুলোতে অদ্যাবধি কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় ও মানে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি

বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতায় দেশে বর্তমানে প্রায় ২০০টি আনুষ্ঠানিক শিল্পাঞ্চল রয়েছে, যেগুলো শিল্পনগরী, শিল্পপার্ক, ইপিজেড, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাই-টেক পার্ক, সফটওয়্যার পার্ক ইত্যাদি নামে পরিচিত। তদুপরি এ-জাতীয় আরো প্রায় ১০০টি শিল্পাঞ্চল স্থাপনের জন্য সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে অনুমোদন দেয়া হয়েছে এবং সে অনুযায়ী সেগুলোর স্থাপন কাজও প্রক্রিয়াধীন আছে। তবে স্থাপিত ওই শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশেই এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত হারে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। হয় প্লট বরাদ্দ নিয়ে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা সেখানে শিল্প স্থাপন না করে ফেলে রেখেছেন অথবা শিল্প স্থাপনের কথিত লক্ষ্যে নির্মাণকাজ শুরু করে দীর্ঘদিনেও উৎপাদনে যাননি। আসলে এ উভয় শ্রেণীর প্লটের বরাদ্দ গ্রহীতারাই প্রকৃত উদ্যোক্তা নন। এরা ভবিষ্যতে বেশি মূল্যে প্লট বিক্রি করে কিংবা হস্তান্তরের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্যই বস্তুত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অন্যবিধ প্রভাব খাটিয়ে এসব প্লটের বরাদ্দ করায়ত্ত করেছেন। অন্যদিকে এমন কিছু দুর্বল উদ্যোক্তা আছেন, যারা প্লট বরাদ্দ নিয়ে শিল্প স্থাপন করেছেন বটে, কিন্তু সেগুলো চলছে খুবই ঢিমেতালে। বস্তুত এগুলো চলছে খুবই নিম্ন উৎপাদন স্তরে এবং কোনো কোনোটি অনেকটাই আধা-নিষ্ক্রীয় অবস্থায় পড়ে আছে। তন্মধ্যে অনেকগুলো আবার বন্ধও হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কি, ইপিজেডগুলো ছাড়া দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে পূর্ণ বা কাম্য উৎপাদনক্ষমতায় চলা শিল্প-কারখানার সংখ্যা খুবই কম।

এর বাইরে উল্লিখিত শিল্পাঞ্চলগুলোতে স্থাপিত অনেক কারখানা একসময়ে উৎপাদনে গেলেও পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের কাছে ঋণখেলাপি হয়ে পড়া, বাজার প্রতিযোগতায় টিকতে না পারা, পরিচালন দক্ষতার ঘাটতি প্রভৃতি নানা কারণে এখন আর ঠিকমতো চলছে না অথবা চললেও লাভজনকতার বিবেচনায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। এদেরই কেউ কেউ আবার ঋণ বা ঋণের সুদ মওকুফসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা লাভের আশায় নিজেদের কারখানাগুলোকে রুগ্‌নশিল্প নাম দিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের কাছে তদবির করে বেড়াচ্ছেন এবং প্রায় সফলও হচ্ছেন। কিন্তু এসব সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা নেয়া সত্ত্বেও কারখানারগুলোর উৎপাদন কর্মকাণ্ড কিছুতেই গতিশীল হয়ে ওঠছে না। আর ওই শিল্পাঞ্চলগুলোর যেসব কারখানা আপাতদৃষ্টে ভালোভাবে চলছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেগুলোও আসলে অতটা ভালো নয় যতটা মনে করা হচ্ছে। আদর্শ বৈশ্বিক মান অনুযায়ী এগুলোরও একটি বড় অংশের উৎপাদনশীলতার স্তর অত্যন্ত নিম্নবর্তী। এগুলোতে উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদন ব্যয়ের হার, কর্মপরিবেশের স্তর ইত্যাদি কোনো কিছুই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উচ্চতর পর্যায়ে নেই।

মোটকথা, এ পর্যন্ত সময়ে দেশে গড়ে তোলা শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি বড় অংশেরই কাম্য সদ্ব্যবহার অদ্যাবধি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তদুপরি সেখানে অবস্থিত শিল্প-কারখানাগুলো থেকে যে পরিমাণে ও যে মানে যে ধরনের উৎপাদন আশা করা হয়েছিল, সেটিও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় দেশে নতুন কোনো শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে উল্লিখিত এ দ্বিবিধ সমস্যা (শিল্পাঞ্চলগুলোতে কাঙ্ক্ষিত হারে শিল্প-কারখানা গড়ে না ওঠা এবং গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানা কাম্য স্তর ও মান অনুযায়ী না চলা) কীভাবে তৈরি হলো, সেটি যাচাই করে দেখা জরুরি বলে মনে করি। সেই সঙ্গে ওই সমস্যা থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যাবে, সেটিও পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে শুরুতেই সমস্যার প্রথম অংশ অর্থাৎ শিল্পাঞ্চলগুলোতে সৃষ্ট শিল্পপ্লটগুলোর সদ্ব্যবহার কেন নিশ্চিত করা সম্ভব হলো না, সেটি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

উল্লিখিত শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অঞ্চল রয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) আওতায় এবং এগুলোর স্থাপনও শুরু হয়েছে বেশ আগে ১৯৬০-এর দশক থেকে। তাই আলোচনাটি শিল্পনগরী ও শিল্পপার্ক নামে পরিচিত বিসিকের এ শিল্পাঞ্চল দিয়েই শুরু করা যেতে পারে। আর এসবের সঙ্গে কিঞ্চিৎ যুক্ততার অভিজ্ঞতা থেকে বলি, এ শিল্পনগরীগুলোর একটি বড় অংশই স্থাপিত হয়েছে রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক আগ্রহে ও তদবিরে। সত্যি কথা বলতে কি, একেবারে গোড়া থেকেই রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক নির্বিশেষে সব সরকারের আমলেই এ কর্মসূচি নানা অযৌক্তিক ও অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে, যে ধারা এখনো অব্যাহত আছে। এ সূত্রে এর যাত্রা পর্যায় থেকে একটি উদাহরণ দিই। বিসিকের আওতাধীন ৮২টি শিল্পনগরীর মধ্যে আয়তনের দিক থেকে বৃহত্তম বরিশাল শিল্পনগরীটি স্থাপিত হয়েছিল এখন থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে একজন বিশেষ আমলার ব্যক্তিগত আগ্রহে, যিনি এ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। শিল্পনগরীটি যে সময় স্থাপিত হয়েছিল, সে সময় সেখানে শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকা তো দূরের কথা, উচ্চতর কৃষির প্রয়োগও ছিল প্রায় অসম্ভব। অথচ নিছক ক্ষমতা হাতে থাকার সুবাদে ‘নিজ এলাকার জন্য কিছু করার’ ভ্রান্তিপূর্ণ ধারণার ভিত্তিতে সেখানে এটি স্থাপন করা হয়েছিল।

বিসিকের শিল্পনগরীগুলোর মধ্যকার আরো অনেক ক’টিই পরবর্তী সময়ে একই ধারা ও মানদণ্ডে স্থাপিত হয়েছে এবং মূলত সে কারণেই সেগুলোতে অদ্যাবধি কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় ও মানে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। আসলে ‘নিজ এলাকার উন্নয়ন’ বলতে প্রকৃতপক্ষে কী বোঝায়, সে বিষয়ে দেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, ক্ষমতাসীন আমলা, নীতিনির্ধারক ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে একটি খুবই ভ্রান্তিপূর্ণ ধারণা বিরাজমান আছে। তাদের অনেকেই মনে করেন, তার এলাকায় একটি শিল্পনগরী স্থাপিত হলেই ওই এলাকার উন্নয়ন ঘটে যাবে, যা একটি খুবই অপরিপক্ব ও অগভীরতাপূর্ণ চিন্তা। তারা বুঝতে চান না যে বিশুদ্ধ পানীয় জল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুবিধা, বিদ্যুৎ ইত্যাদি যেমন প্রত্যেক মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছানো দরকার, শিল্পনগরী স্থাপনের বিষয়টি তেমন নয়। এটি ঘরে ঘরে বা প্রত্যেক এলাকায় পৌঁছানোর মতো বিষয় নয় এবং পৃথিবীর কোনো বুঝধার দেশ তা করেওনি।

আসলে শিল্পনগরী স্থাপন করতে হবে সাধারণ জনপদ থেকে কিছুটা দূরবর্তী স্থানে ও তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন এলাকায়, যাতে করে শিল্পের দূষণ ও এর অন্যান্য ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষ, সমাজ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মুক্ত থাকতে পারে (তবে সে এলাকাকে অবশ্যই সমুদ্র ও নৌবন্দরের সঙ্গে সহজ সংযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হতে হবে)। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এটি স্থাপন করা হয়েছে কখনো জেলায় জেলায় (১৯৮০-এর দশকে নেয়া এ প্রকল্পের নামই ছিল ‘জেলাভিত্তিক শিল্পনগরী কর্মসূচি’), কখনো উপজেলা পর্যায়ে (১৯৯০-এর দশকের গোড়াতে নেয়া এ প্রকল্পের নাম ছিল ‘পরীক্ষামূলক উপজেলা শিল্পনগরী কর্মসূচি’), আবার কখনো তা স্থাপিত হয়েছে প্রভাবশালীদের বাড়ির পাশে, যেমনটি এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শিল্পোন্নত দেশগুলোর এ-সংক্রান্ত তথ্য নিলে থেকে দেখা যাবে যে কোনো দেশেই তা এরূপ প্রতি জেলায়, প্রতি উপজেলায় কিংবা বহুজনের বাড়ির পাশে গড়ে তোলা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশই কেবল এটিকে বিশুদ্ধ পানীয় জলের মতো সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছে দেয়ার বিষয় বলে গণ্য করার মাধ্যমে এ ছোট্ট দেশের সীমিত ভূমির অপরিমিত ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে, যা রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি ক্ষমার অযোগ্য জঘন্য ভ্রান্তি।

সরকার ২০১০ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) গঠন করে এর আওতায় সরকারি ও বেসরকারি খাতে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যা ছিল একটি বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত। এটি প্রকারান্তরে স্বল্প ভূমির মালিক ক্ষুদ্র কৃষককে জমি থেকে উচ্ছেদ ও তাকে বিত্তহীন করে নতুন বিত্তবান শ্রেণী গড়ে তোলার রাষ্ট্রীয় আয়োজন ছাড়া আর কিছুই নয়। নইলে ১০০টি এসইজেড? প্রয়োজনে সীমিত জমি নিয়ে ৫, ১০, ১৫ কিংবা ২০টি অঞ্চল হতে পারত। তাই বলে ১০০টি? সরকার এরই মধ্যে ওই অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা সাময়িকভাবে কমিয়ে এনেছে। কিন্তু প্রকল্পটি বাতিল করেনি বা প্রকল্প সংশোধন করে এর সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনেনি, যা করাটা অত্যন্ত জরুরি। তদুপরি লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনার পর যে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে যাবে, সেগুলোতে যাতে দ্রুত শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতে পারে, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

বিসিকের শিল্পনগরী ও বেজার আওতাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর বাইরে অন্য যেসব শিল্পাঞ্চল রয়েছে, সেগুলোতে মোটামুটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠলেও সেগুলোর অধিকাংশই পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনক্ষমতা অনুযায়ী চলছে না। অধিকন্তু এসব শিল্প-কারখানার বেশির ভাগের উৎপাদনশীলতার স্তরই অত্যন্ত নিম্নবর্তী যা আগেও উল্লেখ করা হয়েছে এবং এরূপ নিম্ন উৎপাদনশীলতা নিয়ে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় তাদের পক্ষে কিছুতেই এবং কখনই টিকে থাকা সহজ হবে না। নানা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা নিয়ে এসব কারখানা সাময়িকভাবে লাভজনক অবস্থায় থাকলেও ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে স্তর উন্নয়ন ঘটার পর ওইসব সুবিধা ও প্রণোদনার একটি বড় অংশই যখন ওঠে যাবে, তখন ওইসব কারখানা কতদিন লাভজনকভাবে টিকে থাকতে পারবে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতীয়মান হচ্ছে যে দেশে এ পর্যন্ত স্থাপিত শিল্পাঞ্চলগুলোর অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। সেক্ষেত্রে পরিদৃষ্ট সমস্যাগুলোকে মূলত নিম্নোক্ত সাতটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: এক. পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও যত্রতত্র প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা; দুই. উদ্যোক্তার যোগ্যতা ও সামর্থ্য যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করে এবং সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তব ক্ষেত্রে যথেষ্ট লাভজনক হবে কিনা সে বিষয়ক সম্ভাব্যতা নিরূপণ না করেই রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক, সামাজিক ও অন্য নানা তদবিরের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে অনুপযুক্ত ব্যক্তি ও অনুপযুক্ত প্রকল্পের বিপরীতে প্লট বরাদ্দদান; তিন. বরাদ্দকৃত প্লটে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার জন্য কারিগরি ও আনুষঙ্গিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক নিজেদের দায়িত্ব শুধু প্লট বরাদ্দদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা; চার. কোনো কোনো উদ্যোক্তা কর্তৃক ব্যাংকের ঋণ ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপ করে ঋণ মওকুফ সুবিধা, আর্থিক প্রণোদনা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার দিকে তাকিয়ে থাকা; পাঁচ. অব্যবহৃত বা অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকা প্লটের বরাদ্দ বাতিল রুখতে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা কর্তৃক হীন উদ্দেশ্যে আদালতের আশ্রয় নেয়ার কারণে নিয়ম অনুযায়ী বহুসংখ্যক প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা সম্ভব না হওয়া; ছয়. উচ্চ উৎপাদনশীলতা অর্জনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মধ্যে পর্যাপ্ত ধারণা ও সচেতনতা না থাকা এবং তাদের মধ্যে এ-বিষয়ক সামর্থ্যের ঘাটতি বিরাজমান থাকা এবং সাত. উপযুক্ত বিনিয়োগ পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় সেবাসহায়তা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি থাকা।

সুপারিশ: দেশে স্থাপিত শিল্পাঞ্চলগুলোকে ঘিরে সৃষ্ট উপরোক্ত সমস্যাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে নিম্নে অতিসংক্ষেপে কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হলো। এক. এ পর্যন্ত স্থাপিত শিল্পাঞ্চলগুলোর পূর্ণ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দেশে আর কোনো নতুন শিল্পাঞ্চল স্থাপন না করা; দুই. যেসব প্লট অব্যবহৃত, অর্ধ-ব্যবহৃত কিংবা রুগ্‌ণশিল্প সংবলিত অবস্থায় পড়ে আছে, অবিলম্বে সেগুলোর বরাদ্দ বাতিল করা; তিন. মামলা থাকার কারণে যেসব প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা যাচ্ছে না কিংবা যেসব প্লট-সংশ্লিষ্ট কারখানার বিরুদ্ধে ব্যাংকের মামলা রয়েছে, সম্ভব দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেসব মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি আইন সালিশি কমিশন গঠন করা; চার. বিসিক, বেপজা, বেজা ও বিএইচটিপিএর আওতাধীন শিল্পাঞ্চলগুলোতে এ পর্যন্ত স্থাপিত শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদন পরিস্থিতির ওপর একটি জরিপ চালিয়ে সেগুলোর বর্তমান অবস্থা নিরূপণ ও সেগুলোর উৎপানশীলতা উন্নয়নে করণীয় নির্ধারণ; পাঁচ. স্থাপিত শিল্পাঞ্চলগুলোর অবকাঠামোগত পরিস্থিতির ক্ষেত্রে বর্তমানে যেসব ঘাটতি রয়েছে, অবিলম্বে সেগুলো পূরণের ব্যবস্থা নেয়া এবং সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাজেটে নিয়মিত ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান রাখা; ছয়. শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে কারখানা ভবনগুলোর আনুভূমিক (horizontal) বিস্তার না ঘটিয়ে এসবের ঊর্ধ্বমুখী (vertical) বিস্তার ঘটানোর লক্ষ্যে বরাদ্দ নীতিমালা সংশোধন করা; সাত. শিল্পাঞ্চলগুলোতে বর্ধিত হারে স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ব্যাপকভিত্তিক প্রচারণা ও আনুষঙ্গিক উদ্যোগ গ্রহণ করা ইত্যাদি।

পরিশেষে বলব, অতিসীমিত ভূমির এ ছোট্ট দেশে রাষ্ট্রের সব উন্নয়ন পরিকল্পনাই হতে হবে ভূমিসাশ্রয়ী। খেয়াল রাখতে হবে, উন্নয়নের নামে কোনো অবস্থাতেই যেন কৃষিজমি হ্রাস না পায়, দরিদ্র মানুষ যেন ভূমি থেকে উচ্ছেদ না হয়, কোনো শিল্প-কারখানার দখলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি না থাকে এবং প্রতি ইঞ্চি জমির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়

আরও