বিশ্লেষণ

টিকার বাজার, নৈতিকতা ও বিদ্যমান বৈষম্য

কভিড-১৯ মহামারীর দ্বিতীয় তরঙ্গের তীব্রতা প্রথমবারের ভয়াবহতাকে ছাপিয়ে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই গোটা বিশ্ব দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়েছে। ধনী রাষ্ট্রগুলোয় মহামারীটি ধীরে ধীরে ও অসমভাবে হ্রাস পাচ্ছে বটে কিন্তু উন্নয়নশীল আর উদীয়মান দেশগুলোয় এর প্রকোপ ক্রমে তীব্র হয়ে উঠছে, বিশেষ করে ভারতে। তাছাড়া বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরস্ক, ফিলিপাইন, ইথিওপিয়া এবং কেনিয়ায়ও মহামারীটির বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাব বিদ্যমান।

কভিড-১৯ মহামারীর দ্বিতীয় তরঙ্গের তীব্রতা প্রথমবারের ভয়াবহতাকে ছাপিয়ে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই গোটা বিশ্ব দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়েছে। ধনী রাষ্ট্রগুলোয় মহামারীটি ধীরে ধীরে ও অসমভাবে হ্রাস পাচ্ছে বটে কিন্তু উন্নয়নশীল আর উদীয়মান দেশগুলোয় এর প্রকোপ ক্রমে তীব্র হয়ে উঠছে, বিশেষ করে ভারতে। তাছাড়া বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরস্ক, ফিলিপাইন, ইথিওপিয়া এবং কেনিয়ায়ও মহামারীটির বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাব বিদ্যমান। 

স্বাভাবিকভাবেই এ বিভাজনের বিবিধ কারণ রয়েছে কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় অসম সুযোগ—বিশেষ করে কভিড ১৯ ভ্যাকসিন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমরা যে সুস্পষ্ট বৈষম্যের ঘটনা দেখছি, তা মোটেও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ১৮ জানুয়ারি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস অ্যাডহ্যানম গেব্রেসুস উল্লেখ করেছেন, কমপক্ষে ৪৯টি উচ্চ আয়ের দেশে কভিড-১৯-এর ৩৯ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন প্রদান করা হয়েছে। বিপরীতে সবচেয়ে কম আয়ের একটি দেশে মাত্র ২৫ ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। হ্যাঁ, আপনারা ঠিকই পড়ছেন, মাত্র ২৫ ডোজ! ২৫ মিলিয়ন কিংবা ২৫ হাজার নয়, তাদের মাত্র ২৫টি ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে এক বিলিয়নেরও বেশি ভ্যাকসিন ডোজ প্রদান করা হলেও সেখানেও বড় ধরনের বৈষম্য দৃশ্যমান। ভ্যাকসিন প্রদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে সেশেলস দ্বীপপুঞ্জ। দেশটি তাদের ৫৯ শতাংশ জনসংখ্যাকেই ভ্যাকসিনের আওতায় নিতে সমর্থ হয়েছে। ভ্যাকসিন প্রদানের তালিকায় এগিয়ে রয়েছে ইসরায়েল, চিলি ও যুক্তরাষ্ট্রও। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ, চিলির ৩৪ শতাংশ ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের ৩০ শতাংশ জনগণকে এরই মধ্যে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে এসেছে। এদিকে ব্রজিল মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশ জনগণকে কভিড-১৯ টিকার আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে, ভ্যাকসিন প্রদানকারী দেশের মধ্যে তাদের অবস্থান ৪৩তম। তবে ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থা আরো শোচনীয়, দেশ দুটি যথাক্রমে তাদের ১ দশমিক ৮ ও ১ দশমিক ৭ শতাংশ জনগণকে টিকা দিতে সমর্থ হয়েছে। আরো ভয়াবহ তথ্যটি হচ্ছে, আফ্রিকার সাহারা অঞ্চলের  বেশকিছু দেশে এখন পর্যন্ত একজন লোককেও ভ্যাকসিনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন খাদ্য ও বাসস্থানের মতোই প্রয়োজনীয়, তাই এ ধরনের বৈষম্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্য আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। এদিকে ধনী দেশগুলো ভবিষ্যতের আপত্কালীনের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভ্যাকসিন মজুদের মাধ্যমে পরিস্থিতিতে আরো  খারাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অথচ কয়েক মাস আগে পর্যন্তও মেডিসিন ও মুক্ত বিজ্ঞানে প্রবেশের বিষয়গুলো ঘিরে আমরা আশাবাদী ছিলাম যে কভিড-১৯ মহামারীর ব্যাপকতা মেধাস্বত্ব বিজ্ঞান ও পেটেন্টভিত্তিক বাজারের একচেটিয়াত্বকে প্রত্যাখ্যানের দিকে পরিচালিত করবে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মহামারী সম্পর্কিত বৌদ্ধিক সম্পত্তির ব্যাপক স্বেচ্ছাসেবী অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে গ্লোবাল কভিড-১৯ টেকনোলজি অ্যাক্সেস পুল (সি-ট্যাপ) উদ্যোগ চালু করে। অনুরূপ, কভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যাকসেস (কোভ্যাক্স) ফ্যাসিলিটি শুরুর উদ্দেশ্য ছিল ধনী দেশের আর্থিক সহায়তায় দরিদ্র দেশগুলোয় ভর্তুকিযুক্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ। তবে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক অ্যালেকজান্ডার জাইচিক দ্য নিউ রিপাবলিকে তার এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘শুরুর দিকের আশাবাদ আর সম্ভাবনাগুলো থেকে আমরা আজ অনেকটাই দূরে সরে এসেছি।’

আজ আমরা যদি ভ্যাকসিনের ন্যায়সংগত প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ব্যর্থতাগুলোর দিকে দৃষ্টি দেই, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্রান্তিকালে দরিদ্র দেশগুলোর বাদ পড়ার সম্ভাবনা খানিকটা হলেও কমাতে পারব। কভিড-১৯ ভ্যাকসিন ঘিরে বিদ্যমান ব্যর্থতা একই সঙ্গে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক। সর্বোত্তম উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত বেশির ভাগ ভ্যাকসিন পরিকল্পনা ও প্রস্তাব ব্যক্তি ভর্তুকির দিকে খুব কম মনোযোগ দেয়। যদিও সংস্থাগুলোর ভ্যাকসিনবিষয়ক নৈতিকতার পক্ষে জোর প্রচারণা চালালেও তারা সবাই যে নৈতিকতার পক্ষে, এমনটা ভেবে নেয়া বড্ড বেশি বোকামি।  

আমরা এমন একটি ভবিষ্যতের কল্পনা করতে পারি, লোকেরা যেখানে জ্ঞান সৃষ্টির জন্য বিনিয়োগ করে এবং পরবর্তী সময়ে তাদের লব্ধ জ্ঞানগুলোর বিনিময়ে অর্থ উপার্জনের বিপরীতে সবার জন্য তা উন্মুক্ত করে দেয়। পরিষ্কার বোঝা যায় যে আমরা এখনো এ পর্যায়ে পৌঁছতে পারিনি। তাই বর্তমানে ব্যয়বহুল গবেষণায় বিনিয়োগ নিশ্চিতের জন্য আমাদের উচিত হবে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে তাদের আবিষ্কৃত বৌদ্ধিক সম্পত্তির ওপর অধিকার অর্জন করতে দেয়া।

একই সঙ্গে গবেষণার জন্য ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাগুলোকে ভর্তুকি প্রদান বন্ধ না করেও তাদের মুনাফার পরিমাণ কমানোর সুযোগ রয়েছে, বিশেষত কম দামে পণ্য বিক্রয় ও নির্দিষ্ট অঞ্চলে গোষ্ঠীভিত্তিক উত্পদান ব্যবস্থা সক্ষম করার মাধ্যমে। আর তা যথাযথভাবে করতে গেলে আমাদের অবশ্যই ভ্যাকসিনের মতো গবেষণালব্ধ পণ্যের বাজার কাঠামোগুলো বুঝতে হবে। বর্তমানে আমরা বিষয়টি উপলব্ধি করছি না; বাজার মূলত প্রতিযোগিতা ও পারস্পরিক চুক্তির জগাখিচুড়ির এক আখড়া। নিউ ইকোনমিক থিংকিং সম্প্রতি তাদের একটি গবেষণায় দেখিয়েছে, সরকার ও ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাগুলো গত বছর ৪৪টি দ্বিপক্ষীয় কভিড-১৯ ভ্যাকসিন চুক্তি সম্পাদন করেছে, যার মধ্যে অনেকগুলো চুক্তির বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি, গোপন রাখা হয়েছে এবং দুর্বলভাবে বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে ব্যাপক হারে বাদ পড়েছে দরিদ্র দেশগুলো।

এ বাজার বুঝতে আমাদের একটি তাত্ত্বিক কাঠামোর প্রয়োজন। ১৮৩৮ সালে আগস্টিন কর্নট তার তত্ত্বে বাজার প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেছিলেন, তবে বতর্মান পরিস্থিতি খুব স্পষ্ট করেই তুলে ধরছে যে অলিগোপলি ব্যবস্থার সত্যিকার চেহারাটা আসলে কেমন হতে পারে। কর্নটের যুগান্তকারী তত্ত্ব পরবর্তী সময়ে মার্কিন শেরম্যান অ্যান্টিট্রাস্ট অ্যাক্ট ১৮৯০-এর মতো প্রথম অ্যান্টিট্রাস্ট আইনের বিকাশকে সক্ষম করে। এটি সংস্থাগুলোকে দাম নির্ধারণের অনুমতি দেয়, তবে দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গোপন বহুপক্ষীয় চুক্তি নিষিদ্ধ করে। এরপর এ আইনগুলো ক্রমে আরো তীব্র হয়ে ওঠে।

অথচ আজ আমরা অনিশ্চিত কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থায় আটকে থাকা অবস্থার ভেতরও ভ্যাকসিন বাজারের নিয়ম তৈরি করতে বসছি। স্বল্প পরিসরে আমরা যতটুকু জানি, তা থেকে অন্তত এতটুকু আমাদের কাছে পরিষ্কার যে বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকারগুলোকে অবশ্যই এখানে একটি ভূমিকা পালন করতে হবে, বিশেষ করে বর্তমান এ পরিস্থিতিতে। অন্যদিকে উদ্ভাবন ও গবেষণা কার্যক্রম বজায় রাখার জন্য ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাগুলোর যতটা অর্থ প্রয়োজন, তারা তার চেয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে অনেক বেশি মুনাফা অর্জন করছে। করোনার মতো এ ধরনের একটি অতিমারীকালীন ওষুধ সংস্থাগুলোর ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য এককালীন ক্ষতিপূরণ দেয়া, পেটেন্ট প্রত্যাহার করা এবং বিভিন্ন সংস্থাকে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন উৎপাদনের অনুমতি দেয়া উচিত।

যেকোনো সমাজের সার্বিক সাফল্য শুধু একক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মুনাফার ওপর নির্ভর করে না—ঠিক এ বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে আমরা নিজেদের দীর্ঘমেয়াদে অনেকটা এগিয়ে নিতে পারি। জনপ্রিয় ওই স্লোগানের কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে—‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা প্রত্যেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি না ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কেউই নিরাপদ নই।’ এ স্লোগানের মাধ্যমে ধনীদের প্রতি আহ্বান জানানোর কারণ নিজ স্বার্থেই অন্যের উদ্দেশে তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া জরুরি। তবে মহামারীটি কিন্তু অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার সংকীর্ণ সীমার বাইরে চিন্তাভাবনা শুরু করা এবং অন্যের স্বার্থকে আমাদের নিজস্ব অংশ হিসেবে ভাবার জন্য একটি প্রবর্তক।

[স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 কৌশিক বসু: কর্নেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক, বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ভারত সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

আরও