ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি

পরিত্রাণের উপায় হতে পারে মেডিকেল এন্টোমোলজি

জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ও পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্য স্থির রেখে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো তখনই সম্ভব যখন জনস্বাস্থ্যের সব গুরুত্বপূর্ণ শাখায় যথার্থ জ্ঞান অর্জন নিশ্চিত করা যায়। মানবদেহের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন হার্ট, কিডনি, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, চোখ ইত্যাদি ব্যতিরেকে সুস্থ-সবল নীরোগ মানবদেহ পাওয়া অসম্ভব, ঠিক তেমনি মেডিকেল এন্টোমোলজির মতো এত বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ রেখে

জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ও পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্য স্থির রেখে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো তখনই সম্ভব যখন জনস্বাস্থ্যের সব গুরুত্বপূর্ণ শাখায় যথার্থ জ্ঞান অর্জন নিশ্চিত করা যায়। মানবদেহের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন হার্ট, কিডনি, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, চোখ ইত্যাদি ব্যতিরেকে সুস্থ-সবল নীরোগ মানবদেহ পাওয়া অসম্ভব, ঠিক তেমনি মেডিকেল এন্টোমোলজির মতো এত বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ রেখে কীভাবে পাবলিক হেলথ শিক্ষা পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে। এর প্রতিফলন আমরা প্রতিপদে তীব্রভাবে অনুভব করছি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এডিস মশা ও এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইয়ালো ফিভার, জিকা ভাইরাসসহ অনেক রোগ আমাদের সুস্থ জীবনযাপনে অস্বস্তি এবং অনেক জীবন কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, এ মশা বা অন্য পোকামাকড়বাহিত রোগ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য অতীব জরুরি যে বিষয়টি আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও তাৎপর্যের সঙ্গে পড়ানো ও গবেষণা করার কথা ছিল তা এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালু তো দূরের কথা, অনেকে নামই জানেন না। অথচ শূন্য দশমিক শূন্য ৪ হেক্টর মাথাপিছু আবাদি জমির দেশে গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যশস্যে ১৩৩টি পোকামাকড়, ডাল ফসলে ৮৩টি, তৈলবীজ ফসলে ১২৫টি, আঁশ ফসলে ৭৬টি, চিনি ফসলে ৬৯টি, কন্দাল ফসলে ৩৯টি, সবজি ফসলে ১৯০টি, ফল ফসলে ৩১৩টি, মসলা ফসলে ৭৫টি, ফুলের ফসলে ৮৭টি, বনের গাছে ৫৪৬টি, মাদকদ্রব্য ও পানীয় ফসলে ৭১টিসহ অগুনতি কীটনাশকের হাত হতে সুরক্ষা করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন প্লান্ট এন্টোমোলজির গবেষকরা। গরু-ছাগলের এন্ডো বা এক্টোপ্যারাসাইট দমন করে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিশ্চিত করেছেন ভেটেরিনারি গবেষকরা। তাহলে মানুষের জন্য মশাবাহিত বা ভেকটর বাহিত রোগ ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইয়ালো ফিভার প্রভৃতির উৎপত্তি, ট্রান্সমিশন, ইনকিউবিশন প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধি প্রভৃতির জন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে মেডিকেল এন্টোমোলজি বিষয়টি অন্তর্ভুক্তীকরণ কতটা গুরুত্বের দাবি রাখে ভেবে দেখুন। 

কভিড-১৯ পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে ভেক্টর বাহিত রোগের গুরুত্ব ও তাৎপর্য কত বেশি, ঠিক তেমনই মশাবাহিত ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি বুঝিয়ে দিচ্ছে মেডিকেল এন্টোমোলজির মহত্ত্ব, গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য। দুই দশক ধরে মশকনিধনের জন্য যেসব সম্মানিত পরামর্শকের পরামর্শে কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হচ্ছে, তারা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবেন যে প্রাণিবিদ্যা বা প্লান্ট এন্টোমোলজির চেয়ে পাবলিক হেলথে, বিশেষ করে ভেক্টর বাহিত রোগের জন্য মেডিকেল এন্টোমোলজির গুরুত্ব কতটুকু! দেশে আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে যেমন নগরায়ণ বেড়েছে, বেড়েছে শহুরে পোকামাকড় বাহিত রোগের প্রকোপ ও ভয়াবহতা। নগরায়ণের সব সুযোগ-সুবিধার মাঝে এনথ্রোপোজেনিক হেমাটোফেগাস প্রাণী মশকের বংশবৃদ্ধি ও রোগ ছড়ানোর ক্ষমতাও যুগপৎভাবে বেড়েছে। মশকসহ অন্যান্য ভেক্টর দমনে শুধুই ক্ষতিকারক কীটনাশকের সর্বনাশা ব্যবহার পরিহার করে সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির উন্নতর ব্যবহার নিশ্চিতে অবশ্যই দেশে গড়ে তুলতে হবে অত্যাধুনিক গবেষণাগার এবং এ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিকল্প নেই। 

আজ ডেঙ্গুর ভয়াবহতার জন্য মূলত আমরাই দায়ী। কারণ দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় অত্যন্ত উন্নতমানের ইনস্কেটেরিয়াম যেমন তৈরির অত্যাবশ্যকতা ছিল, তেমনি মশা ও মশার মধ্যে বেড়ে ওঠা ভয়ংকর ভাইরাসের সেরোটাইপ অনুযায়ী আক্রমণের তীব্রতার জন্য প্রয়োজনীয় জিনোম সিকুয়েন্সিং করে মশার প্রতিরোধী হওয়ার লেভেলের ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থাপনার ধরন ও প্রয়োগ নির্ণয় করতে অবশ্যই মেডিকেল এন্টোমোলজস্টিদের বিকল্প কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। 

আমাদের দেশে এডিস মশার দুই প্রজাতির মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ায় বলে আমরা জানি। এরা এডিস এজিপ্টি ও এডিস এলবোপিকটস। এরা ছাড়াও অন্য কোনো প্রজাতি এ ভাইরাস বহন করছে কিনা তাও গবেষণার দাবি রাখে। স্ত্রী এডিস মশা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তপান করে ভাইরাস তার নিজের শরীরে গ্রহণ করে। তারপর এই ভাইরাস একটি নির্দিষ্ট সময় মশকের শরীরে অতিবাহিত করে যাকে আমরা ইনকিউবেশন পিরিয়ড বলে থাকি। ঠিক এ সময় ভাইরাসটি মশকের শরীরের সব শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যবহার করে নিজেকে শক্তিশালী করে। এখন প্রশ্ন হলো, পরিবেশের দূষণ বা পরিবর্তনের ফলে অথবা উপর্যুপরি কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশকী যখন তার শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের পরিবর্তন ঘটিয়ে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। ঠিক তখন তার মধ্যে বেড়ে ওঠা ভাইরাসটির কী মাত্রায় পরিবর্তন হচ্ছে তা পরিমাপ করতে পারলেই আমরা ব্যবস্থাপনার ধরন ও প্রয়োগ নীতি যথাযথ করতে পারব। মেডিকেল এন্টোমোলজিস্ট গড়ে তোলা ছাড়া এ কাজগুলো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

ডেঙ্গুসহ অন্যান্য ভেক্টর বাহিত রোগ আজ জাতীয় চরম বিপর্যয়ের মুখে আমাদের দাঁড় করিয়েছে। জানি না প্রয়োজনীয় ঢাল-তলোয়ার ছাড়া কীভাবে সম্ভব এ আক্রমণ মোকাবেলা করা। এ অপরিণামদর্শী প্রবল শত্রুর বিরুদ্ধে ঝটিকা অভিযানের জন্য যেমন প্রয়োজন অস্ত্রাগার ও প্রশিক্ষিত সৈন্য বাহিনী, তেমনি প্রয়োজন সময়মতো আক্রমণ। অর্থাৎ উন্নতমানের ল্যাব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গবেষক ও বিজ্ঞানী এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা সর্বোপরি সাধারণ জনগণের নিবিড় সম্পৃক্ততা।

ড. মো. গোলাম ছারোয়ার: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ 

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)

আরও