বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে নির্বাচন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক শাসন ও পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণতন্ত্রবিরোধী অপশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের পর আসে ১৯৭০ সালের নির্বাচন। সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ (সূত্র: অসমাপ্ত আত্মজীবনী)। সে সময় বঙ্গবন্ধুসহ কেউ নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি।
রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নির্বাচন। আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দলগুলোর কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হবে। সে অনুযায়ী, ভোটের বাকি মাত্র কয়েক মাস। নির্বাচন প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে। নির্বাচন কেমন হবে, কীভাবে হবে, বিএনপি অংশ নেবে কিনা—এ নিয়ে আগ্রহ রয়েছে সাধারণ মানুষের। কারণ সর্বশেষ ২০১৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচন এখনো বিতর্কের বৃত্তে রয়েছে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিদেশীরাও এবারের নির্বাচন নিয়ে বেশ কৌতূহলী ও তৎপর। এর কারণ দেশে তাদের বিপুল বিনিয়োগ ও প্রকল্পের কাজ রয়েছে।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে বিদেশীদের তৎপরতা বেড়েছে। গত ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন তিনি। জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে বন্ধু ও উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে লু জানিয়েছেন, সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র (সময় টিভি অনলাইন, ১৭ জানুয়ারি)। তার আগে ১০ জানুয়ারি চারদিনের সফর শেষ করেন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক ইলিন লাউবাচার। তিনি বাংলাদেশের মানবাধিকার, সরকার পরিচালনা ও নিরাপত্তা বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব, নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও সুশীলসমাজের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন (ডেইলি স্টার, ১১ জানুয়ারি)। মার্কিন কর্মকর্তাদের সিরিজ সফরে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আসেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাউন্সিলর ডেরেক শোলে। তিনি স্পষ্ট দুটি বার্তা দিয়ে গেছেন। এক. বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জোরদার করা। দুই. মার্কিন বলয়ের পরিধি বৃদ্ধি করতে বাংলাদেশকে কাছে টানা। অংশগ্রহণের চেয়েও নির্বাচনের প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছেন এ কূটনীতিক। বাংলাদেশের তরফে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে (যুগান্তর, ১৭ ফেব্রুয়ারি)। শোলের সফরের পর তাৎপর্যপূর্ণভাবে আবির্ভূত হন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় খাতরা। তিনি এসে জানালেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তার দেশের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে (প্রথম আলো, ১৬ মার্চ)। কূটনৈতিক এ চক্রে শামিল হয় চীনও। গত ১৪ মার্চ চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থানকে চীন সমর্থন করে। বিশ্লেষকদের ধারণা, নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে চীন এ মন্তব্য করেছেন। কিছুদিন আগে মার্কিন দূত পিটার হাস তার দায়িত্ব পালনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এক নিবন্ধে লিখেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের কেউ নেই। তবে আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চাই। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের নিজেদের সরকার নির্বাচন করতে পারবে—এটাই যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া (নয়া দিগন্ত, ১৬ মার্চ)। পিটারের এ প্রত্যাশার মধ্যে ১২ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলির নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রতিনিধি দল বিএনপির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে সামনের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে ‘ইইউ’ নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠাবে না (ডেইলি স্টার, ১৪ মার্চ)। ইইউর এ কঠিন বার্তার পরই ২০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। তাতে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অনিয়মের কথা বলা হয়। পর্যবেক্ষকদের বরাতে প্রতিবেদনে সে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে মত দেয়া হয় (বণিক বার্তা, ২১ মার্চ)।
দেশের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্য এসব মন্তব্য সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলছে। এমন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সরকার কূটনীতিতে জোর দিচ্ছে। লক্ষ্য, যেন নির্বাচন নিয়ে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি না ঘটে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই নির্বাচনী কূটনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন। গত ৩১ মার্চ দৈনিক কালবেলার প্রতিবেদনে জানা যায়, ঈদুল ফিতরের পর তিনি জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করবেন। এবার স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছাবার্তায় প্রধান শক্তিধর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও উন্নয়ন নিয়ে যেভাবে মনোভাব স্পষ্ট করেছেন, তাও গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন বিদেশী পক্ষগুলো। মার্কিন সাময়িকী ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার কৃতিত্বস্বরূপ বর্তমান সরকারকেই জনগণ বেছে নেবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনি ব্লিংকেন বলেছেন, দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, একটি সুশিক্ষিত কর্মশক্তি এবং গতিশীল তারুণ্যের হাত ধরে বাংলাদেশ দ্রুতই একটি বিশ্বশক্তি হয়ে উঠছে। তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়ন গর্ব করার মতো।
উন্নয়ন, ভূরাজনীতি ও কৌশলগত কারণে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, রাশিয়া ও ভারতসহ অনেকের নজর বাংলাদেশের দিকে। এসব কারণে দেশের নির্বাচনেও তারা নজর রাখছেন। নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকলে তাদের মাথাব্যথা সংগত কারণেই থাকবে। তাদের থামানোর একমাত্র উপায় হলো সুষ্ঠু নির্বাচন। কেবল সাধারণ মানুষ কিংবা বিএনপিই নয়, বিদেশীদের কাছেও একটি স্বচ্ছ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদিকে নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘকে চিঠি দিতে যাচ্ছে বিএনপি। শেষ দুই জাতীয় নির্বাচনে জনগণের ‘ভোটাধিকার হরণ’ করার পাশাপাশি আগামী সংসদের ভোটও ‘একতরফা’ করতে সরকার নানামুখী ‘ষড়যন্ত্র’ করছে বলে জাতিসংঘকে অভিযোগ জানাবে তারা। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করার যৌক্তিকতাও চিঠিতে উল্লেখ করবে। এছাড়া বিরোধী দলের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন, সভা-সমাবেশে বাধা, গ্রেফতার, হামলা-মামলার তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরবে দলটি। দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের সুরক্ষায় জাতিসংঘকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাবে। জাতিসংঘের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), কমনওয়েলথকেও একই বিষয়ে চিঠি দেবে তারা (সমকাল, ৩১ মার্চ)।
দেশের উন্নয়ন গতিশীল রাখতে এখন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা শুধু তাদের ব্যবসাই দেখছেন না, চলমান রাজনীতিতেও ঢুকে পড়ছেন। জাতিসংঘসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ বাংলাদেশে স্বচ্ছ নির্বাচন দেখতে চায়। এক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারকে শুধু উন্নয়ন-অর্থনীতি নয়, নির্বাচন ব্যবস্থার ওপরও জোর দিতে হবে। বিরোধী দলগুলোর কাছে তাদের আস্থা বাড়াতে হবে। কারণ দেশে বিএনপিকে বাদ দিয়ে কখনই প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বিএনপির প্রধান চাওয়া, কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ চায়, সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হোক। দুই দলের এ দ্বন্দ্ব নিরসন না হলে দেশে বিদেশী শক্তিগুলোর তৎপরতা বাড়তে থাকবে। বাধাগ্রস্ত হবে দেশের বিনিয়োগ ও অর্থনীতির ধারা। কাজেই জাতীয় স্বার্থে নির্বাচনী সংকট উত্তরণে দলগুলোকে সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ঐকমত্যে’ পৌঁছতে হবে। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, নির্বাচন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আগামী নির্বাচনে জনগণের সে অধিকার প্রতিষ্ঠা পাক—সেটিই প্রত্যাশা।
পাপলু রহমান: সাংবাদিক