অভিমত

বাংলাদেশে সর্বজনীন ‘রেশন কার্ড’ চালু করতে হবে

বাংলাদেশে তিন দশক আগেও রেশন ব্যবস্থা চালু ছিল। সরকার ধীরে ধীরে এ ব্যবস্থা সংকুচিত করে এবং রেশনের মূল্য বাড়িয়ে এটিকে অকার্যকর ও বিলুপ্ত করে। দেশে ফের রেশন ব্যবস্থা ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে এখন ‘‌ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। নিম্নবিত্তদের পাশাপাশি এ কার্ড এখন মধ্যবিত্তের জন্যও কাঙ্ক্ষিত ও লোভনীয় হয়ে উঠেছে। অনেকে এ কার্ডকে ‘‌রেশন কার্ড’ বলছেন।

বাংলাদেশে তিন দশক আগেও রেশন ব্যবস্থা চালু ছিল। সরকার ধীরে ধীরে এ ব্যবস্থা সংকুচিত করে এবং রেশনের মূল্য বাড়িয়ে এটিকে অকার্যকর ও বিলুপ্ত করে। দেশে ফের রেশন ব্যবস্থা ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে এখন ‘‌ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। নিম্নবিত্তদের পাশাপাশি এ কার্ড এখন মধ্যবিত্তের জন্যও কাঙ্ক্ষিত ও লোভনীয় হয়ে উঠেছে। অনেকে এ কার্ডকে ‘‌রেশন কার্ড’ বলছেন। 

সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বর্তমানে বেশকিছু কর্মসূচি চালু রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, মাসে এক কোটি পরিবারের মাঝে এ কার্ডের মাধ্যমে বাজারমূল্যের চেয়ে কিছুটা কম মূল্যে কয়েকটি পণ্য সরবরাহ করা। এ কাজে নিয়োজিত রয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। সংস্থাটি আগে কার্ড ছাড়াই নিম্নবিত্তদের মাঝে পণ্য সরবরাহ করত। এখন কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে ২০০ টাকায় দুই লিটার সয়াবিন বা রাইসব্রান তেল, ১২০ টাকায় দুই কেজি মোটা দানার মসুর ডাল, ৭০ টাকায় এক কেজি চিনি ও ১৫০ টাকায় পাঁচ কেজি মোটা চাল দিচ্ছে টিসিবি। এসব পণ্য প্যাকেজ হিসেবে বিক্রি করা হয়। তবে চারটি পণ্যের মধ্যে গত আগস্টে চিনি সরবরাহ করা হয়নি। সেপ্টেম্বরেও সব জায়গায় চিনি দেয়া হয়নি। 

বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। ২০১৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চাল ১৫ শতাংশ, ডাল ১২০ শতাংশ, খোলা সয়াবিন তেল ৯৫ শতাংশ ও চিনি ১৮০ শতাংশ দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া আটা ৮৮ শতাংশ, আলু ৮০ শতাংশ ডিম ৬৭ শতাংশ, দুধ ১০০ শতাংশ, মুরগি ৪৮ শতাংশ ও মাছ ১০০ শতাংশ বেড়েছে। তবে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্য কমছে। বাংলাদেশে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেয়া কোনো পদক্ষেপই কাজ করছে না। 

টিসিবি পণ্য বিতরণে কার্ড চালু করলেও এসব পণ্য সংগ্রহে ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠে যায়। টিসিবির ট্রাক কিংবা পণ্য সংগ্রহের নির্ধারিত স্থানে লাইনে দাঁড়ানো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, হুড়োহুড়ি, হট্টগোল ছাড়া পণ্য মেলে না। পণ্য বিতরণের এ বিশৃঙ্খল অবস্থা জনগণের জন্য অমর্যাদাকর। এজন্য মধ্যবিত্তরা টিসিবির লাইনে মুখ লুকিয়ে দাঁড়ান। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, জুনে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। তার আগে মে মাসে দাঁড়িয়েছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে, যা এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমে হয় ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। কিন্তু আগস্টে এ হার বেড়ে হয় ৯ দশমিক ৯২ শতাংশে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, তার আগে জুলাইয়ে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। কিছুদিন আগে দেউলিয়া শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি গগনচুম্বী ছিল। অল্প দিনের ব্যবধানে তারা সে ধকল কাটিয়ে উঠেছে। দেশটিতে এখন অনেক খাদ্যপণ্যের মূল্য বাংলাদেশের চেয়ে কম। দেশটিতে এক কেজি চিনি খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকায়, বাংলাদেশে বিক্রি হচ্ছে ১৩৫-১৪০ টাকায়। সেখানে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, বাংলাদেশে বিক্রি হচ্ছে ১৭০-১৭৫ টাকায়। দেশটিতে এক কেজি পেঁয়াজ ৭২ ও মসুর ডাল ১২০ টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশে পেঁয়াজ কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ৮০ ও মসুর ডাল ১৩৫ টাকা (মানবজমিন, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩)। 

অবিরাম মূল্যস্ফীতি ও অসহনীয় দ্রব্যমূল্যের ফলে কৃষক, শ্রমিক, মজুর, চাকরিজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবার জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে ঠেকেছে। আবার যারা ভাড়া বাসায় থাকেন তাদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ-গ্যাস-ডিশ-নেট ও ময়লার বিল, বাসভাড়া, চিকিৎসা, শিশুর লেখাপড়া, পোশাক-আশাকের খরচ তো আছেই। সে হিসাবে একজন মানুষ যা আয় করছেন, তাতে ব্যয় মিটছে না। টিকে থাকার জন্য উপার্জিত অর্থ যথেষ্ট হচ্ছে না। আগে যেটিকে ‘মোটামুটি ও সচ্ছল’ আয় হিসেবে ধরা হতো, সেটি এখন নিম্নআয়ে পরিণত হয়েছে। দেশের পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থার পট পরিবর্তন হয়েছে। টিসিবির লাইনে মধ্যবিত্তরা অনেক আগে থেকেই দাঁড়ানো শুরু করেছে। এজন্য সর্বসাধারণের অধিকারের অংশ হিসেবে সর্বজনীন রেশন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

বর্তমান টিসিবির তালিকায় মধ্যবিত্তদের অন্তর্ভুক্ত করার সময় এসেছে। টিসিবির উদ্দেশ্য হলো, কম মূল্যে পণ্য ভোক্তাদের মাঝে সরবরাহ করে বাজার স্থিতিশীল রাখা। কিন্তু সীমিত কার্যক্রমে বাজারে কোনো প্রভাবই পড়ছে না। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানিয়েছেন, গত বছর টিসিবির পণ্য বিতরণে সরকার ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। কিন্তু দুর্মূল্যের বাজারে টিসিবির পণ্য কারা পাচ্ছেন ও এর বণ্টন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যাক। সংস্থাটির দাবি, ২০২২ সালের মার্চ থেকে তিন-চারটি পণ্য প্রতি মাসে যে এক কোটি কার্ডধারীকে দেয়া হচ্ছে, এতে পাঁচ কোটি জনগণ আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। ফলে দেশের সব শ্রেণীর ভোক্তা স্থিতিশীল বাজারের সুবিধা ভোগ করছে। নিয়মিত টিসিবির পণ্য সুলভ মূল্যে পাওয়ায় দেশের জনগণ স্বস্তিতে রয়েছে। বাস্তবচিত্র হলো, টিসিবি বেপরোয়া বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। বাজারে সব পণ্যের দাম বাড়লেও খুব সামান্য পণ্যই সরবরাহ করতে পারছে। আর মাসে যে পরিমাণ পণ্য দেয়া হয় তা দিয়ে অনেক পরিবারের পাঁচদিনও চলে না। 

অথচ প্রতিবেশী ভারত রেশন ব্যবস্থা বাস্তবায়নে দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটিতে শুধু রেশনে চাল, ডাল, তেল মেলে না, বরং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণের জোগান দেয়া হয়। গত জুলাইয়ে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় আরো ৩৫টি পণ্য রেশনে যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল। সেসব পণ্যের মধ্যে দুধ, শুকনো ফল, গুড়, ঘি, ডিটারজেন্ট এমনকি শিশুদের পোশাকও রয়েছে (মানবজমিন, ২৬ জুলাই, ২০২৩)। বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুসারে, দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। নির্দেশনা অনুযায়ী, টিসিবির উপকারভোগী নির্বাচনে দরিদ্র, অসহায়, দিনমজুর নির্বিশেষে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি। প্রকৃত অনেক সুবিধাভোগী টিসিবির তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। স্থান পেয়েছেন মোটামুটি অবস্থাসম্পন্নরাও। কার্ড বিতরণে অস্বচ্ছতা, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও তথ্য প্রচারে ঘাটতি ছিল। অনেকেই এ কার্ডের বিষয়ে অবগত ছিলেন না। এখনো জানেন না, এ কার্ড কীভাবে মেলে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির তথ্য অনুসারে, করোনা মহামারীর সময় সরকার যেসব দরিদ্র পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে দেয়ার তালিকা করেছিল, তাদের ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ ফ্যামিলি কার্ড পাননি (ঢাকা পোস্ট, ১১ আগস্ট, ২০২২)। এদিকে সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে সামনে টিসিবির স্মার্টকার্ড ও কার্ড সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। এর সঙ্গে টিসিবির সক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে হবে সরকারকে। নতুন করে কার্ড বিতরণে স্থানীয় প্রশাসনের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা যেমন জরুরি তেমনি রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করাও অবশ্যক।

দেশের যেকোনো পরিস্থিতিতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের তৎপরতা জরুরি। আগামীতে টিসিবির পণ্য বাড়ানোর ব্যাপারে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। অনেক কৃষক ফসল উৎপাদন করে লাভবান হতে পারছেন না, অনেক ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করে লাভের মুখ দেখছেন না, আবার বর্তমানে বেসরকারি চাকরিজীবীদের কাজের কোনো নিরাপত্তা নেই। বেতনের ঠিক নেই, যার যখন খুশি চাকরি যাচ্ছে। এমন ব্যবস্থায় সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির প্রসার খুবই প্রয়োজন। অনিয়ম রোধে এ কর্মসূচিকে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে। ভালো হয় যদি ভারতের মতো বিপুলসংখ্যক লোককে খাদ্যনিরাপত্তার আওতায় আনা যায়। 

ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা আইন-২০১৩ অনুসারে, দেশটিতে বসবাসরত ৮০ কোটি মানুষকে খাদ্যনিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ৭৫ শতাংশ ও শহরাঞ্চলে ৫০ শতাংশ লোক রেশনের আওতায় রয়েছে। আইনটি পাস করার সময় প্রতি কেজি চাল ৩ টাকা দরে, ২ টাকা কেজি দরে গম সরবরাহের কথা বলা হয়েছিল। কাজেই ভারতের মতো বাংলাদেশে রেশন ব্যবস্থা চালু হলে মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে স্বস্তি পাবে। দেশে বর্তমানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, কারারক্ষী ও ফায়ার সার্ভিসের জন্য রেশন ব্যবস্থা রয়েছে। বিজিবি ব্যতীত অন্যরা মাত্র ২ টাকা ১০ পয়সা দরে ১ কেজি চাল এবং ১ টাকা ৭৭ পয়সা দরে ১ কেজি গম রেশন হিসেবে পেয়ে থাকেন। বিজিবিকে এসব পণ্য কিনতে আরো কিছু পয়সা গুনতে হয়। (দেশ রূপান্তর, ৩১ জানুয়ারি, ২০২০)। সরকার যদি রেশন ব্যবস্থায় নাও ফেরে, তাহলে ফ্যামিলি কার্ডে আরো জোর দিতে হবে। ভারতের রেশন ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলেও সরকারকে আরো দুই কোটি ফ্যামিলি কার্ড চালু করতে হবে। এটি সর্বজনের সময়ের দাবি ও মৌলিক অধিকার। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও ভবিষ্যতে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় এটিই বাস্তবসম্মত সমাধান। 

পাপলু রহমান: সংবাদকর্মী

আরও