সভ্যতার দুঃসময়

কী করে হল?- এভাবে এত ব্যাপক আকারে। বিশ্ব সভ্যতা, রাজনীতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা; এই সব কিছুকে অনেকটাই ভেঙেচুরে দিয়েছে এই দুঃসময়ে যা বর্তমান। এরপরে যেটাকে আমরা বলি আফটার ম্যাথ, তা কি এবং কেমন হতে পারে, এখন সেটা বলা কঠিন। বিশ্বের অধিকাংশ জায়গা বা জনপদের মানুষরা আতঙ্কিত, শংকিত, চিন্তিত এবং বিস্মিত। অনেকেই মৃত্যুর মুখোমুখি। এটা মানব সভ্যতার একবিংশ যুগের দুঃসময় আর এক মহা ক্রান্তিকাল। নিউইয়র্ক থেকে শুরু করি। বিশ্বের রাজধানী শহর বলেন একে অনেকেই। কথায় আছে নিউইয়র্ক নেভার স্লিপ, কিন্তু এখন আর সেটা বলা যাচ্ছে না। বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে কেবল রাতের বেলাতেই না প্রকাশ্য সূর্যের আলোতে ঝলমলে উজ্জল দিনের আলোতে এই শহর ঘুমিয়ে আছে।

কী করে হল?- এভাবে এত ব্যাপক আকারে। বিশ্ব সভ্যতা, রাজনীতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা; এই সব কিছুকে অনেকটাই ভেঙেচুরে দিয়েছে এই দুঃসময়ে যা বর্তমান। এরপরে যেটাকে আমরা বলি আফটার ম্যাথ, তা কি এবং কেমন হতে পারে, এখন সেটা বলা কঠিন। বিশ্বের অধিকাংশ জায়গা বা জনপদের মানুষরা আতঙ্কিত, শংকিত, চিন্তিত এবং বিস্মিত। অনেকেই মৃত্যুর মুখোমুখি। এটা মানব সভ্যতার একবিংশ যুগের দুঃসময় আর এক মহা ক্রান্তিকাল। নিউইয়র্ক থেকে শুরু করি। বিশ্বের রাজধানী শহর বলেন একে অনেকেই। কথায় আছে নিউইয়র্ক নেভার স্লিপ, কিন্তু এখন আর সেটা বলা যাচ্ছে না। বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে কেবল রাতের বেলাতেই না প্রকাশ্য সূর্যের আলোতে ঝলমলে উজ্জল দিনের আলোতে এই শহর ঘুমিয়ে আছে।

১। অফিস-আদালত দোকান, ছোট-বড় কফি শপ, বিশাল আকারের শপিংমল। সবকিছুর দরজা বন্ধ। এর কোন কোন দরজায় ঝুলছে উই আর ক্লোজড, যেসব দরজায় আগে কখনো কখনো থাকতো উই আর হায়ারিং। নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী অন্য কিছু কেনার জন্য বিশাল আকারের সুপার মার্কেটে আগের মতো কোনো ভিড় নেই। এর অর্থ না এই যে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী কোন প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন তো অবশ্যই আছে, কিন্তু সেটা মেটাতে সুপার মার্কেট গুলোতে আগের মত দলবেঁধে কেউ যাচ্ছে না, কর্তৃপক্ষ তা দিচ্ছেন না। সুপার মার্কেটের বাইরে অনেক লম্বা লাইন ধরে ক্রেতা অপেক্ষা করেন, তারপর সেই লাইন থেকে দু’তিনজন করে দোকানের ভেতর প্রবেশ করেন এবং প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সারেন। এতে আগে যে কাজ এক ঘণ্টায় করা যেতো, এখন সেটা সারতে সময় নেয় আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ঘণ্টা। বাইরের সেই লাইনে একে অন্য থেকে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ফিট দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন ভেতরে ঢোকার। সবার হাত মুখ প্রয়োজনীয় বেষ্টনি পড়া বা বাধা। জরুরি ওষুধের দোকানগুলোতেও একই রকম দৃশ্য। পাবলিক ও প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভিড়। ডাক্তার নার্স সবাই অনেক বেশি ব্যস্ত। এর পাশে এই স্বাস্থ্য সেবক রা এরকম মহামারী সংক্রামক ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের সেবা দিচ্ছেন নিজেদের জীবনের ঝুঁকি এবং চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। এর বড় একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কে এই রোগে আক্রান্ত সেটা শনাক্ত করবার প্রয়োজনীয় টুলস এবং সামগ্রীর স্বল্পতা। স্থানীয় রাষ্ট্র সরকার এবং জাতীয় সরকার এই স্বল্প তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। যেসব প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন ভেন্টিলেশনের স্বল্পতা আই সি ইউ ব্যবস্থার স্বল্পতাগুলো এই ধরনের রোগীদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার সাপ্লাই চেইন যথাযথভাবে এসবের সরবরাহকে নিশ্চিত করতে পারছে না। এর অনেক কারণ এর একটি, অনেকের মতে এই বিশ্ব ব্যাধির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারেরও তেমনি প্রস্তুতি কিম্বা সতর্কতার ব্যাপারে পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না।

২। লক্ষণীয় যে, আক্রান্তের তুলনায় মৃতের সংখ্যা আনুপাতিক কম হলেও আতঙ্ক কমছে না। সমজিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে আগে যে টুকু মানুষের আগ্রহ ছিল সেই আগ্রহটা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং মৃত্যুর অনিশ্চয়তার ভয় স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করছে। সাথে যোগ হচ্ছে এই দুশ্চিন্তা যে কখন শেষ হবে এবং কীভাবে হবে। এটাও অনেককেই চিন্তিত রাখছে। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলতে গেলে বন্ধ আছে। এমনকি এই সময়ে হাসপাতলে আক্রান্ত কোন রোগীকে বা আপনজনকে দেখতে যাওয়া যাচ্ছে না, এবং তাদের মৃত্যু হলেও অনেক ক্ষেত্রেই মৃত বডি পরিবারের কাছে দেয়া হচ্ছে না। অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার বাড়ছে। যে হিসাব আগে ছিল ৬ শতাংশের নিচে, এখন তা দাঁড়িয়েছে ২০ শতাংশের বেশি। যদিও মার্কিন সরকার এই দুর্যোগ মোকাবেলায় গেল সপ্তাহে মার্কিন ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ান ডলারের একটা সাহায্য প্যাকেজ সরকার অনুমোদন দিয়েছেন। এই অনুমোদন প্রাপ্ত অর্থ যারা এই দুর্যোগে কাজ হারিয়েছেন, স্বল্প আয়ের পরিবার, ব্যক্তি, এবং ছোট বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, এদের সংকট থেকে বেলআউট বা উদ্ধারের জন্য ব্যয় করা হবে। পৃথিবীর এখন ধনী-দরিদ্র উন্নত অনুন্নত। পূর্ব এবং পশ্চিম। উত্তর বা দক্ষিণ। চারিদিকের এই মানব জনপদ বিশ্ব ব্যাধিতে আক্রান্ত। এর কারণটা সবটাই কি প্রাকৃতিক? প্রশ্নটা ইতিমধ্যে নানারকম অভিসন্ধি মুলক তত্ত্ব এবং ভাবনাকে নাড়া দিচ্ছে। তবে এই সংকট অনেক কিছুর সাথে এটাও প্রমাণ করছে আধুনিক সভ্যতায় মানুষের মানবিকতা, সহানুভূতি, এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের টনক সেভাবে ক্রিয়াশীল ছিল না। যে পরিমাণে ক্রিয়াশীল ছিল মানুষের জন্য বাণিজ্য না, বরং বাণিজ্যের স্বার্থে মানুষ চিন্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া। ফলাফল কি দেখছি আমরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় প্রতিষ্ঠান এক ধরনের লোকসানের মুখোমুখি এখন, মুখ থুবরে পড়ে গেছে ওয়ালস্ট্রিট বাজারের বড় বড় শেয়ারহোল্ডারদের পুঁজি বিনিয়োগ এবং তার ক্ষতির পরিমাণ। প্রশ্ন আসবে বিশ্ব সাহায্য সংস্থা, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। মানব সম্পদকে রক্ষা কাজে এরা কে কতটা কি ভূমিকা রাখছে। এসব বড় বড় প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সরকার এবং নিজেদের স্বার্থ শ্রেণীকে যেরকম অর্থ অনুদান দিয়ে সাহায্য করেন সেই পরিমাণ বা তার অনেক কম হলেও কতটা আর্থিক সাহায্য করেন তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শ্রেণীস্বার্থ কে, স্বাস্থ্য রক্ষার্থে এবং সার্বিক পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে। প্রশ্ন আসবে সাম্প্রতিক কয়েকটি মানবিক যুদ্ধ এবং সংঘর্ষে যেসব নিরপরাধ নাগরিক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা জীবন দিয়েছেন, বিশেষ করে যারা আহত হয়েছেন। তাদের শুশ্রূষা এবং সেবায় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কি ভূমিকা পালন করেছে। এই প্রশ্নগুলি প্রকট হবে যদি এই বিশ্ব ব্যাধিতে বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ নীতি, মানবিকতা, উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তা ভীষণভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। মানুষের একের প্রতি অন্যের নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের, বিশ্ব মোড়লদের পৃথিবীর দুর্বল এবং অপেক্ষাকৃত অনুন্নত রাষ্ট্র কাঠামোতে নিজেদের একাধিপত্য পায়তারা চলছিল সেখানেও এই ক্রান্তিকালে একটি শিক্ষা ভীষণভাবে মানব সমাজ এবং সংস্কৃতিতে ধাক্কা দিতে পারে, অনেক এসবের চেহারাকে পাল্টা দিবে কিনা, সে ব্যাপারেও সংখ্যা আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল রিপাবলিকানরা যদি আবারো তাদের নেতাকে পুনর্নির্বাচন করেন, এবং তখন যদি এই মহা রোগের আক্রমণে সামগ্রিক অর্থনীতি ব্যবস্থা দুর্বল থাকে, সেটা মোকাবেলা তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক মোড়লিপনা বড় বিপদ ডেকে আনবে সম্ভাবনা আছে। কারণ মিস্টার ট্রাম্পের কাছে মানুষের চেয়ে বড় হচ্ছে বাণিজ্য, বর্ণ বিভেদ এবং মূর্খের অহংকার, যেমন সে কথায় কথায় বলে আমেরিকাই সবার আগে। বর্তমান সংকট এটাও প্রমাণ করেছে আমরা পৃথিবীতে কেউই কারও আগে নয় বরং সবাই সবার সাথে। এর সাথে আরেকটি যোগ করতে হয়, বহুদিন থেকে বিশ্ব সমাজে এনভারমেন্ট বা প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তন নিয়ে, এর দূষণ বিষয় নিয়ে যে সুচিন্তিত মতামত এবং জনমত যুক্ত ছিল, ট্রাম্পের দাম্ভিকতা সেই পরিবেশ দূষণ চিন্তাকে অগ্রাহ্য করবার কারণে আজকের মহাবোধি বিস্তৃত হচ্ছে। এটাকে সম্পূর্ণরূপে অপেক্ষা করা যাবে না। কিন্তু ক্ষমতায় ট্রাম্প ফিরে এলে এর প্রতি অপেক্ষা লাখ হবে বলে আশা করা কঠিন। এতে বিশ্ব বেঁধে ফিরে আসার সম্ভাবনা একেবারেই অমূলক হবে না। 

৩। বর্তমান বিশ্ব ব্যর্থতা কোন রাষ্ট্র বা কোন সংস্থার জ্ঞাতার্থে সৃষ্টি কিনা, তবে এসময় সভ্যতা আজ না হলেও কাল সেটা বলে দেবে। এই ক্রান্তিকাল সামনে ইউরোপ এবং আমেরিকার সার্বিক সংস্কৃতিকে ইতিহাসের কোন মোরে বা অভিজ্ঞতায় ফেলবে বলা না গেলেও ভাবা হচ্ছে যে সভ্যতার সংকটে মানুষের প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান চেতনা এবং সৃষ্টি আবিষ্কার সবকিছুকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না। উনবিংশ শতাব্দি থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের সব রকম উন্নতি এবং উদ্ভাবন দুটি প্রশ্ন আমাদের সামনে এনে দিয়েছে, এক, সবই কি মানুষের হাতে, দ্বিতীয় প্রশ্ন, মানুষের সব সামর্থ্য কি প্রকৃতির সব শক্তির সাথে লড়াই করতে সক্ষম কিনা। এর উত্তর ও তাই তার নানান উৎকর্ষতা, উদ্ভাবনা এবং সংকটের নানান পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দেবে বলে বিশ্বাস।

৪। বর্তমান দুঃসময় এবং সংকটে আমরা রাষ্ট্র, ছোট বড় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান, এবং ব্যক্তি উদ্যোগের আন্তরিকতা, মানবিকতা কেউ লক্ষ্য করেছি নানাভাবে নানা দেশে। যুক্তরাষ্ট্রে আমরা লক্ষ্য করেছি কেবল ধনী ব্যক্তিরাই না, কোথাও কোথাও অপ্রাপ্তবয়স্ক স্কুলের ছেলেমেয়েরাও দুঃস্থ মানুষদের সেবাতে এগিয়ে আসছেন। তাদেরকে সবার আগে ধন্যবাদ জানাতে হয়, যারা এই যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনে আছেন, যেমন ডাক্তার নার্স পুলিশ দমকল বাহিনী। এদের সদস্য সদস্যরা সবার আগে এই ঝুঁকির মুখে অন্য মানুষকে সেবা দিচ্ছেন এবং তাদের উদ্ধার কাজে অগ্রসর হয়ে আসছেন। এটা মানুষের দ্বারাই সম্ভব। এটা মানুষের দ্বারাই সম্ভব এ ধরনের মানবিকতা চর্চা করবার। সুস্থ বলেই সবাই দূরে সরে থাকছে না, কিংবা হাত গুটিয়ে ঘরের ভেতর বসে থাকছে না। যে যার ক্ষমতা এবং সাধ্যমত দুঃস্থ মানুষদের পাশে থাকছে। এদেরই আমরা বলব সমাজ ও রাষ্ট্রের হিরো বীর এবং অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। বর্তমান এই লড়াইয়ে যুদ্ধের কমান্ডিং অফিসার কে, এখানে কোন এক ব্যক্তি এই লড়াইয়ের commander-in-chief না। বরং আমরা একে অন্যের জন্য নিদর্শন এবং পরিচালক হতে পারি। এই সময়ে পেন্টাগনের কোন ব্রিফিং নেই, গর্ব নেই আমরা প্রতিদিন কত শত্রু মেরে ফেললাম এরকম ঘোষণার। বরং হতে পারে আমরা কোন কোন অর্থে এখন একে অপরের শত্রু, যদি না আমরা এই যুদ্ধের মোকাবেলায় করণীয় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কে পালন না করি। এই যুদ্ধের মোকাবেলার সাপ্লাই চেইনে কোন মিল কিংবা আনবিক বোমা অথবা কোন নিউক্লিয়ার অস্ত্র সরবরাহের অবকাশ নেই। অবকাশ আছে কেবলই মানুষকে বাঁচবার প্রয়োজনীয় এবং আবশ্যিক সামগ্রীর সাপ্লাই চেইন চালু রাখা।

৫। বর্তমান এই পরিস্থিতির মাঝে আমাদের শিখবার অনেক উপকরণ আছে যদি শিখতে চাই। অনেকে বলেন এটা এক ধরনের অভিশাপ। মানুষের সব কাজকর্ম অভিশাপ আশীর্বাদে পূর্ণ থাকে, নির্ভর করছে আমাদের কাজের প্রকৃতি উদ্দেশ্য নিয়ত এবং লক্ষ্যের ধারাবাহিকতা কেমন তার উপর। আমরা যে যার ধর্মে বিশ্বাস করি তাদের উচিত আমাদের প্রতিটা কাজকর্মের অন্তর্নিহিত অর্থ এবং কার্যকারণ সম্পর্ককে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করা। মানুষ নিজেই তার সুখ ও সমৃদ্ধি এর প্রধান কারণ এবং সেই কারণে ভালো ফল হলে মানুষ তার প্রশংসা করে, প্রশংসা অর্জন করে। তাই যদি হবে তাহলে এই জগতের যেকোন দুঃসময় সংকট এবং দুর্যোগের সাথে ও আমাদের সংশ্লিষ্টতা এবং কাজে জড়িত না তাও ভাবলি কি করে।

৬। বর্তমানে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সার্বিক চিত্রটা একটু বলা দরকার। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পুরো বাস্তবতা এরকম বা আমেরিকার মতো এতটা ভয়াবহ না। এর কারণ প্রথমত, আমাদের দেশে অনেক ঘটনারই তাৎক্ষণিক বাস্তবতা আমরা জানতে পারি না, যখন জানি সেটা অনেক পরে জানি। দ্বিতীয়ত আমাদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবার তীব্রতা ঝুঁকিপূর্ণ, অতি আবেগপূর্ণ, এবং অধিক অস্থিরতায় ঢাকা থাকে। যা অনেক সময় নিরপরাধ অনেক ব্যক্তি গোষ্ঠীকে বিপদে ফেলে দেয়। তৃতীয়ত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের রোগ প্রতিরোধ শক্তি একটু বেশি আমেরিকা বা ইউরোপ এই জনপদের মানুষের থেকে। চতুর্থ, জাতিগতভাবে আমাদের মধ্যে শংকর উদ্যোগে এক ধরনের অসংগঠিত ভাবে হলেও সাহস এবং ধৈর্য একেবারেই কম না। এরকম নানান সামাজিক সংস্কৃতিক নৃতাত্ত্বিক ইতিবাচক মনোবৃত্তি এবং মাইন্ড সেট কে আমরা খাটো করেও দেখতে পারিনা। তবে এটা ঠিক এবং ক্রান্তিকালের এই দুর্যোগ যদি আমাদের জনপদকে সেভাবে সংক্রমিত করে তাহলে আমাদের বিপদ বিস্তৃতির প্রকটতা বাড়বে এবং জীবনের অনিশ্চয়তা বেড়ে যাবে। 

৭. এটা বলাও জরুরি যে এ ধরনের বিপদে সব মানুষের ইহজাগতিক একটি চিন্তা বলতে ধর্মীয় একটি শিক্ষা নেওয়ার এবং বোঝার গুরুত্ব কম না। ইসলাম ধর্মকে যারা বিশ্বাস করি, ভালোবাসি ভেতর থেকে, ভয় করে ভালোবাসি না ভালোবেসে ভয় করি। পবিত্র কোরআন যারা পুরি অর্থ বুঝি। যারা বিশ্বাস করি এই গ্রন্থ সর্ব শ্রেষ্ঠ এবং এক সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রেরিত। আমাদের এই সবার বর্তমান দুঃসময়ের কারণ এবং প্রতিকার কি কি করনীয় তা বর্ণিত আছে পবিত্র কোরআনে, বর্ণিত হয়েছে আজ থেকে প্রায় ১৪০০ বছর আগে। এই পৃথিবীতে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তার সৃষ্টির পর থেকে যেসব গোত্র এবং জাতির জন্য মেসেঞ্জার পাঠিয়েছেন, তাদের আল্লাহ কি বলেছেন, কী কী তখন ঘটেছে এইসবই বর্ণিত আছে পবিত্র কোরআনে। মানুষই আমরা আমাদের সুখ ও বিপদের প্রথম কারণ আমাদের কৃতকর্মের দ্বারা তাও সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে এই পবিত্র বইতে। সমাজ এবং রাষ্ট্রে আমরা যে যত বড় ক্ষমতাবান বা শক্তিমান হই না কেন নাগরিক বা শাসক কেউই যেন আমরা আমাদের সীমালংঘন না করি। আমাদের মনে রাখা উচিত আমাদের শক্তি এবং জীবন দুটোই সংক্ষিপ্ত। একটা কথা আছে এরকম, যখন তোমার কেউ ছিলনা তখন ছিলাম আমি, এখন তোমার সবি হয়েছে আমি হলাম পর। বিশেষ করে আমাদের অনেক মুসলিমের চরিত্র এবং আচরনে এরকম একটা প্রভাব আছে, অশুভ ছায়া আছে। 

যে কারণে বিপদ বা সংকট আসলে আমরা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে স্মরণ করি তার নাম উচ্চারণ করি,বিপদ কেটে গেলে দ্রুত সৃষ্টিকর্তা এবং তার আশীর্বাদকে ভুলে যাই, যা কোন মুসলমানের ভোলার কথা না। এই ব্যাপক এবং বিস্তৃত দুঃসময়ে এবং এই বৃষ্টিতে সমাজের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ গুনি ব্যক্তিত্ব প্রত্যেকেরই সামাজিক দায়িত্ব আছে একে অপরের সাথে পারস্পরিক সহযোগিতায় সহমর্মিতায় একতা নিয়ে কাজ করার। কারোরই বা কোন সরকারের একার পক্ষে এই বিশাল দায়িত্ব পালন করবার সম্ভাবনা নাই, ক্ষমতা নাই শক্তি নাই। প্রত্যেকে প্রত্যেকের ধর্ম বিশ্বাসে অটল থেকে এবং ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সবাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং ইহজগতে মানবধর্ম কে সব ধর্মের উপরে স্থান দেয়া সবচেয়ে বড় ধর্ম। এটা বিশ্বাস করে যেন কাজ করতে পারি কে বলে বিপদে না যতদিন বাঁচি ততদিন। এই শিক্ষা থেকে নিজেদের যেন বঞ্চিত না করি। 

যারা মনে করি এই ইহ জগত শুরু এবং শেষ, তারাও যেন ইহ জগতের মানুষের প্রতি আমাদের মানবতা এবং মানবিক ধর্মকে কাজে লাগাই। পরিশেষে রাসূল (সা) এর একটি কথা স্মরণ করে লিখছি- যে লোক কোন মুমিনের দুনিয়াবী বিপদ দূর করে দিবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনে তার থেকে বিপদ সরিয়ে দেবেন। যে লোক কোন দুষ্ট লোকের অভাব দূর করবেন, আল্লাহতালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দুরাবস্থা দূর করবেন। আর যে লোক কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন। বান্দা যখন তার ভাইয়ের সহযোগিতায় আত্মনিয়োগ করে, আল্লাহতালা ততক্ষণ তাকে সহযোগিতা করে থাকেন। - সহি মুসলিম

মানুষের এই দুঃসময়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ পেশা সবার উপরে প্রতিটা মানুষই জানো আমরা অপর মানুষের জন্য অধিক নিরাপদ এবং তাদের সাহায্য সেবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করি। অবশ্যই যাদের এটা করবার সুযোগ ও সামর্থ্য আছে। সমাজ রাষ্ট্র জাতীয় বিশ্বে প্রতিটা সময়ই আমাদের কোন না কোন গান বদ এবং চিন্তা এবং দর্শন কে খুঁজে পেতে সাহায্য করে। বর্তমান মহাসংকটে এটা আমাদের জন্য একটি ইতিবাচক শিক্ষা নিশ্চয়ই হবার কথা। এই শিক্ষা থেকে আমরা যেন বিস্তৃত না হই কিংবা একে উপেক্ষা না করি সঙ্কটের শেষে।

আজকের দুঃসময়ে ক্রান্তিকালে আমাদের শিক্ষা হলো প্রথম, আমাদের জন্য সামনে কিংবা পরবর্তী মুহূর্তে কি আছে আমরা তা জানি না। দ্বিতীয়, মানুষের হাতেই সব নিরাময়ের ক্ষমতা বা শক্তি নাই। তৃতীয়, আমাদের সময় এবং মৃত্যু দুটোই ভীষণরকম অনিশ্চিত আবার নিশ্চিত বলতে পূর্ব নির্ধারিত। পরীক্ষা শুধু আমরা কে কিভাবে সেটাতে উত্তীর্ণ হতে পারি। চতুর্থ, মানুষ আমরা যত শক্তি বাড়ান যত ক্ষমতাশীল এবং যত সংরক্ষিত হই না কেন প্রকৃতির হাতে আমরা অসহায়। পঞ্চম, মানুষ আমরা ধনী-দরিদ্র শক্তিমান ক্ষমতাশীল যাই হই না কেন রোগে শোকে দুঃখে আমরা যে একটিমাত্র অভিন্ন জাত তা বারবার প্রকৃতি আমাদের বুঝিয়ে দেয়। এখানে কোন বর্ডার নেই কোন বর্ণ নেই কোন বৈষম্য নেই। ষষ্ঠ, মানুষের সম্মিলিত একতা ও সহমর্মিতা বদ একে অন্যের সংকটের বড় প্রতিকার ও প্রতিশোধক। বর্তমান সভ্যতার এই দুঃসময়ে আমাদের এই শিক্ষা দিল, এটা যেন মনে রাখি। 

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও