আলোকপাত

পরিকল্পনায় সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি প্রয়োজন

সুন্দরবন কিন্তু অনেক ছোট হয়ে গেছে, সুন্দরবনের ওপর একটি বই আমি সম্পাদনা করেছি। সেখানে দেখেছি এক-তৃতীয়াংশ ভারতের ভাগে পড়া সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বরং বেড়েছে আর বাংলাদেশের ভাগে যে দুই-তৃতীয়াংশ পড়েছে সেখানে গত কয়েক দশকে বাঘের সংখ্যা কমে গেছে। ফারাক্কার প্রভাবে প্রাকৃতিক রক্ষা ঢাল সুন্দরবনের বিপর্যয়, পশ্চিমবঙ্গের নৌপথ ও বন্দর বিনষ্ট এমনকি আসাম ও বিহারে অকাল

[গতকালের পর]

সুন্দরবন কিন্তু অনেক ছোট হয়ে গেছে, সুন্দরবনের ওপর একটি বই আমি সম্পাদনা করেছি। সেখানে দেখেছি এক-তৃতীয়াংশ ভারতের ভাগে পড়া সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বরং বেড়েছে আর বাংলাদেশের ভাগে যে দুই-তৃতীয়াংশ পড়েছে সেখানে গত কয়েক দশকে বাঘের সংখ্যা কমে গেছে। ফারাক্কার প্রভাবে প্রাকৃতিক রক্ষা ঢাল সুন্দরবনের বিপর্যয়, পশ্চিমবঙ্গের নৌপথ ও বন্দর বিনষ্ট এমনকি আসাম ও বিহারে অকাল এবং অস্বাভাবিক বন্যার কারণ সৃষ্টি হয়েছে। ফারাক্কা যখন প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারক ভূরাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখা দেয়, তখন আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গার পানিবণ্টনের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ ও নেগোসিয়েশনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দ্বারা বাংলাদেশের পুরো পরিবেশ-পরিস্থিতিতে গঙ্গা-তিস্তার খারাপ প্রভাব নিয়ে প্রতিবাদ স্তিমিত হলেও এখন খোদ ভারতের আসাম, বিহার এবং অন্যান্য রাজ্য ও অঞ্চল থেকেও ফারাক্কা ভেঙে দেয়ার দাবি উঠেছে। কারণ ফারাক্কার ওখানে পলি জমে। এ প্রসঙ্গে যেটা বলার চেষ্টা যে দূরদর্শী পরিকল্পনার অবর্তমানে প্রকৃতি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের তরফে কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমস্যার প্রতি করণীয় ভূমিকা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে সুষ্ঠু ও দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবে। এসব কারণে প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে যদি বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা না নিতে পারে বা বিলম্ব করে তার খেসারত দিতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। আপাতদৃষ্টিতে ক্ষতিকর মনে না হলেও কিংবা এখন এটা স্বাভাবিক মনে হবে যে যেহেতু সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হচ্ছে, খুব তাড়াতাড়ি কোথাও যাওয়ার অবকাঠামো গড়ে উঠছে, আপাতত সবকিছু ঠিক মনে হচ্ছে কিন্তু আখেরে গিয়ে বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতি ও অর্থনীতির স্বয়ম্ভরতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও তার কার্যকারিতা হারিয়ে যাচ্ছে। যেমন খুব স্পেসিফিকভাবে বলা যায় এই যে প্রচুর সেতু বানানো হচ্ছে, সেতু কোথায় বানানো হয়? নদীর ওপর। নদীর ওপর সেতু বানানো হয়, কীভাবে বানানো হয়, যেভাবেই হোক দেখা যাচ্ছে যে ওখানে নদীর পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এই যে ছোট-বড় নদী এসবের পানি প্রবাহের পথ কিন্তু থেমে যাচ্ছে এবং সেতুর ওপর দিয়ে সহজে পার হওয়ার জন্য মানুষ কিন্তু নিচের নদী বা খালটার প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়ছে। অমনোযোগী হয়ে যাওয়ায় সেগুলো ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। যদি এখানে এ রকম হতো, সেতু না থেকে যদি পর্যাপ্ত ফেরি থাকত, দ্রুত ও নির্বিঘ্নে পারাপারের ব্যবস্থা থাকত তাহলে কীভাবে নৌপথে নাব্য থাকতে পারে, সেভাবে নদীর ওপর নজর বাড়ত, কিন্তু সেতু বানানোতে একদিকে যেমন পানিপ্রবাহে প্রভাব পড়ছে, আরেকদিকে খালবিল, মেস্যর আধার, সেচের আধার এসব কিছুর প্রতি রাষ্ট্রের মনোযোগ কমে যাচ্ছে। 

আমরা প্রচুর সেতু বানাচ্ছি, এসব সেতু বানাতে বিদেশীরা টাকা দিচ্ছে যাতে তাড়াতাড়ি সেতু হয়, সে টাকা বেহাত হয়ে পাচার হয়ে বিদেশে যাচ্ছে, আগে চট্টগ্রামে যেতে মেঘনা-গোমতীতে দুটি ফেরি ছিল, জাপানিরা রীতিমতো অনুদানের টাকায় মেঘনা-গোমতী সেতু বানিয়ে দিল। খুব ভালো কথা কুমিল্লা-চট্টগ্রামে যাতায়াতে সুবিধা বাড়ল, কিন্তু সেতু বানানোর পর পরিবেশবান্ধব নৌপথ নদী ও রেল য়োগাযোগের প্রতি অমনোযোগিতা বেড়ে গেল। মেঘনার উজানে সুরমা, কুশিয়ারা নাব্যতা হারিয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এসব নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে সিলেটে এবার যে বড় বড় বন্যাগুলো হলো এগুলো হতে থাকবে এবং আরো সমস্যা হবে। 

আরো একটা উদাহরণ দিই, খুব বাস্তব উদাহরণ, আমি প্ল্যানিং কমিশনে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য হিসেবে যোগ দেয়ার এক মাসের মাথায় একটা প্রকল্প এল, হাতিরঝিল প্রকল্প। সেখানে বলা হলো রামপুরা থেকে সোনারগাঁও হোটেলের লিংক রোড পর্যন্ত একটা বড় ফ্লাইওভার হবে। সোনারগাঁও হোটেলের ওখান থেকে ফ্লাইওভারে উঠে সবাই সহজে সরাসরি রামপুরা যাতায়াত করতে পারবে, এতে মগবাজারসহ তত্সংলগ্ন এলাকায় ট্রাফিক জ্যাম কমবে, কিন্তু আমরা তাত্ক্ষণিক প্রশ্ন রাখলাম ঝিলের ওপর দিয়ে ফ্লাইওভার হলে তার নিচে ঝিলের পচাগলা পানির কী হবে, তারা বলল সেটা ওভাবে থাকবে। অর্থাৎ ওপর দিয়ে যখনই ফ্লাইওভার বানাব তখন নিচের পানি নষ্ট হয়ে গেল না কী হলো ওর প্রতি কারো কোনো নজর থাকবে না। ফলে মরে যাবে ঝিল। ধানমন্ডি লেকের সঙ্গে হাতিরঝিলের একসময়কার সংযোগ, হাতিরপুলের খাল, ধোলাইখাল এমনি আরো কত পানির আধার হারিয়ে গিয়েছে। তত্কালীন যিনি উপদেষ্টা ছিলেন যিনি পূর্ত মন্ত্রণালয় বা ভৌত অবকাঠামো এসব বিষয় দেখতেন মরহুম আনোয়ারুল ইকবাল তিনিসহ আমরা তাত্ক্ষণিক বললাম, না তা হবে না, পরিবেশবাদীদের কথা আমাদের ঢাকা শহরে একটা পানির আধার থাকতে হবে, আমাদের এ খাল রীতিমতো ধানমন্ডির ওই লেকের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এটা গুলশান, বনানী, বেগুনবাড়ী হয়ে ওই পাড়ে বালু নদে পড়েছে, এভাবে মুঘল আমল, ব্রিটিশ আমলে খাল ছিল। আশির দশকে সরকার স্টর্ম ওয়াটার প্রজেক্ট নিয়ে ধানমন্ডির সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পান্থপথের ওপর দিয়ে যে রাস্তা বানিয়েছে, হাতিরঝিলের পাশের হাতিরপুলের খালও বন্ধ হয়ে গেল। ধোলাইখালের ওপর দিয়ে রাস্তা হয়ে গেল। ওই নদী এবং খালগুলোর ওপর দিয়ে প্রচুর রাস্তা বানানো হলো, অর্থাৎ খালগুলোকে শেষ করে দেয়া হলো। একটা শহরে যতটা পরিমাণ পানির আধার থাকতে হয় ঢাকা শহরে সে ব্যালান্স নষ্ট হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। আমরা হাতিরঝিলের ব্যাপারে বললাম, এ পানির আধার রাখতে সেখানে প্রয়োজন হলে আরো খনন করো। এখানে মগবাজারসহ অন্য এলাকা থেকে যত ড্রেন আছে, সেগুলো বন্ধ করে দিন। এগুলো বন্ধ করে পুরো একটা পানির আধার বানান। সে মাটি দিয়ে চারদিক দিয়ে সার্কুলার রোড বানিয়ে দিন, ওয়াকওয়ে ও গাছের বেষ্টনী বানিয়ে দিন, তাহলে মানুষ এখানে স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারবে, পানিটাও ভালো থাকবে, টলটলে পানির লেকে হালকা নৌযানে মানুষ যাতায়াত করতে পারবে। লেক থাকবে এবং ধীরে ধীরে এটি গুলশান-২ পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত হবে। মাত্র ২০-২৫ দিনে বুয়েটের ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের ভাবনামতো সুন্দর ডিজাইন নিয়ে এলেন। তাদের সৃজনশীলতা ও নিষ্ঠাকে এখনো সানন্দে অভিবাদন জানাই। লেক ও এর সব পাড়ে জমির মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করে মাত্র তিন মাসের মাথায় হাতিরঝিল প্রকল্প একনেকে পাস হয়। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ সরকারের সময়েই প্রকল্পের ৮০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল। পরিকল্পনা মতো কিছু কাজ এখনো বাকি থাকলেও এটি উদ্বোধন করে সবাই এখন এটির সুফল উপভোগ করছে। ওখানে কিন্তু পরিকল্পনা নেয়া আছে, এটি গুলশান-২ পর্যন্ত যাবে, গুলশান থেকে মানুষ নৌপথে মগবাজারে এসে নামবে। এতে উপরের রাস্তার ট্রাফিক অনেকটা কমে যাবে। আরেকটা হচ্ছে রামপুরা, মগবাজার যাওয়ার বহুমুখী পথ সৃষ্টি হবে, সে সুযোগ আমরা এখনই লক্ষ করছি, দেখতে পাচ্ছি কী সুন্দর হয়েছে। তার ভেতরে আরেকটা পরিকল্পনা ছিল, ওখানে নিবিড় অথচ আলাদা একটা অভয়ারণ্য তৈরি হবে। ঢাকা শহরের পাখিরা নীরবে আর নিরিবিলিতে থাকতে পারবে। সে বনটাও শুরু করা হয়েছে। সেখানে গাছ লাগানো হয়েছে। শুধু দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতার কারণে যদি সে সময় ঝিলের ওপর দিয়ে একটা ফ্লাইওভার করে দেয়া হতো, একটা ফ্লাইওভার হয়তো হতো, কিন্তু এখন চারদিকে যে নান্দনিক পরিবেশ এগুলো হতো না। ঢাকা শহরের চারপাশে নৌপথ নির্মাণের জন্য যে প্রকল্প নেয়া হয়েছিল, ভূমিদস্যুতার কারণে তা কেন বাস্তবায়ন করা যায়নি, কারণ অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন। উন্নয়নশীল উন্নয়নের প্রতি সবার সচেতন দৃষ্টিক্ষেপ দরকার। 

 এ নিরিখে পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমাদেরকে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও এখনো স্থির প্রাজ্ঞ হতে হবে। এমন প্রকল্প নেব তা যেন পরিবেশকে বিপন্ন না করে বরং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হয়। মানুষের সাধারণ যে অবস্থান সে অবস্থান যেন বজায় থাকে এবং তাতে যেন মাছ, ভাত খেয়ে বা কৃষির যেন ব্যবস্থা হয়। যেমন বলা হচ্ছে কোনো জমি আবাদের বাইরে রাখা হবে না। একই সঙ্গে শুধু জমি বাদ রাখা না, এক জমিতে তিন ফসলও করতে হচ্ছে। তাই যদি না করা যেত, তাহলে ১৯৭২-এর তুলনায় ২০২২-এ জনসংখ্যা প্রায় আড়াই গুণ বেড়ে যাওয়ার পরও আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারতাম না। এখানেও মানুষের এ খাদ্য চাহিদার জন্য কৃষিকে শক্তিশালী করার জন্য আমরা আবার অনেক কীটনাশক ব্যবহার করছি। আমাদের এগুলো ব্যবহার করা লাগত না যদি আমাদের আবাদি জমিগুলো আগের মতো ঠিক অবস্থায় থাকত। যদি সেখানে প্রাকৃতিক সেচ ব্যবস্থা থেকে পানি পাওয়া যেত। সেখানে যদি যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় থাকত, তাহলে হয়তো আমাদের এতটা কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীল হতে হতো না। কীটনাশক ব্যবহারে জনস্বাস্থ্য হুমকির মধ্যে ফেলার আশঙ্কা বাড়বে। প্রচুর সড়ক তৈরি করাতে আমাদের সড়কে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হতে হয় এবং মূল্যবান সে জ্বালানির সরবরাহে বিশ্ববাজার যখন বিমুখ হয়ে যাচ্ছে তখন আমাদের এক ধরনের মহাসংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে। এগুলো এত লাগত না, যদি আমরা নৌপথটা ভালো রাখতে পারতাম। তাহলে বিকল্প হিসেবে সড়কের ওপর নির্ভরতা কমানো যেত। কারণ যত সড়ক হবে তত গাড়ির ব্যবহার বাড়বে, মোটরসাইকেল বাড়বে, কতকিছু বাড়বে। প্রতিদিন যদি হিসাব করি, সড়কে গড়ে ৩০/৫০ জন মানুষ হতাহত হচ্ছে। এ ক্ষতির সঙ্গে জ্বালানির যে জীবাশ্ম সেটার ফলে বাতাসে যে সিসা তৈরি হচ্ছে এবং আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার চেয়ে বড় কথা আমাদের চাহিদা মেটানোর জন্য জলবিদ্যুতের ওপর যে নির্ভরশীলতা থাকা উচিত ছিল, প্রাকৃতিকভাবে নবায়নযোগ্য যে জ্বালানিতে যাওয়া উচিত ছিল, সেখানে শিল্পায়নে এখন বিদ্যুৎ বেশি দরকার হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে আবার কয়লা বিদ্যুতের দিকে যেতে হচ্ছে। কয়লা বিদ্যুৎ আবার আলাদাভাবে পরিবেশ নষ্ট করে দিচ্ছে। আর তার চেয়ে বড় কথা সে বিদ্যুতের কেন্দ্র বানাতে হচ্ছে প্রাকৃতিক সুরক্ষা সুন্দরবনের কাছে। সুন্দরবনের কাছে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার প্রতিফল হচ্ছে সুন্দরবন ধ্বংস হওয়া। অথচ এ সুন্দরবন আমাদের এমন প্রাকৃতিক সুরক্ষা, যা পুরো উপকূল অঞ্চলকে ঝড়, ঝাপ্টা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। সে সুন্দরবন একদিকে ফারাক্কা বাঁধের কারণে লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ঠিক একই সঙ্গে এ জাতীয় শিল্পায়ন হলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব পড়বে। এগুলো সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যাবে না, এখন যারা এটার পক্ষে কথা বলেছেন তারা তো বেঁচে থাকবেন না যখন পরিবেশের ক্ষতি শুরু হয়ে যাবে। ফারাক্কার প্রভাবক ভূমিকা যারা নিজেদের স্বার্থে একদিন উপেক্ষা করেছিলেন তারা তো এখন নেই। সুতরাং সব পরিকল্পনায় থাকতে হবে সুদূরপ্রসারী সুদৃষ্টি। সে পরিকল্পনায় মূর্ত হতে হবে নিজের ইন্ডিজেনাস সক্ষমতা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য যেন সংরক্ষিত হয়, এগুলো যেন বজায় থাকে। জাপানের উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। জাপান অত্যন্ত আধুনিক রাষ্ট্র, প্রযুক্তিতে খুবই উন্নত তার পরও তারা সে পুরনো ট্রেন, পুরনো বাসস্ট্যান্ড, পুরনো পদ্ধতি গত ৫০/৬০ বছরে পরিবর্তন করেনি। এখন আমরা উড়াল সেতু বানাচ্ছি, এর পরিবর্তে উচিত ছিল সনাতন যে রাস্তা আছে সে রাস্তাকে কীভাবে ঠিকঠাক করে ব্যবহার করা যায়। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় এবং এসব কাজ দিতে গিয়ে ভূরাজনৈতিক নানা গ্যাঁড়াকলে পড়ার বিষয়টির সুদূরপ্রসারী ফল পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে। জনগণকে ট্রাফিক আইন-কানুন মেনে চলা শিখিয়ে, কীভাবে রাস্তা বড় করা যায় সেদিকে না যেয়ে ওপরে একটা বড় ফ্লাইওভার বানাতে গিয়ে নিচের রাস্তাটাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর ওপরে ওই রাস্তার ফলে যে নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে তাতে পরিবহন খরচ তো বাড়বেই। সাধারণ মানুষ তো তাতে উঠতে পারবে না, অথবা সমাজে এমন একটা আয়বৈষম্য তৈরি হয়েছে তাতে কিছু লোক হয়তো উঠতে সক্ষম হবে, সেই কিছু লোকের জন্য সমগ্র লোকের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে যাতায়াতের সুযোগ কেন বেহাত হবে? [শেষ]   


ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এবং প্ল্যানিং কমিশনের সাবেক সদস্য

আরও