নীতি আলোচনা

বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কারের উদ্দেশ্য ছোট এলিট গোষ্ঠী তৈরি করা নয়

উচ্চশিক্ষার পরিসর কখনো থমকে থাকে না। শিল্প বিপ্লব, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চশিক্ষা কাঠামোর পরিবর্তন ঘটে।

বর্তমানে এ পরিবর্তন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক সুদূরপ্রসারী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও উন্নত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রসারের ফলে এখন আর কল্পবিজ্ঞানের কথাও অবাক করার মতো নয়। এজন্যই শিল্প উৎপাদন, সেবার পরিসর এবং যোগাযোগের বহুমুখী ধরন আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে পাল্টে দিচ্ছে। এখন যন্ত্রই অনেক কিছু বিশ্লেষণ করে পূর্বাভাস দিতে পারে, যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে এমনকি বড় শিল্পের ব্যবস্থাপনাও যন্ত্রের হাতে দেয়া যায়। এজন্যই মানুষ আরো কিছু বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠছে। এমন এক বিশ্বে শুধু ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা ও সচেতনতা, সামগ্রিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ, জটিল সমস্যাকে চিহ্নিত ও সমাধান করার দক্ষতা, উদ্ভাবনী মনোভাব, সহমর্মিতা এবং সর্বোপরি পরিবর্তনশীল জ্ঞানের বিষয়ে নিজেকে আপডেট রাখা। এসব দক্ষতা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে হঠাৎ যোগ করা যায় না; বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে ধাপে ধাপে এগুলো গড়ে তুলতে হয়।

কিন্তু দেশের প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা এখনো অনেকাংশে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর ধাঁচে পরিচালিত হচ্ছে। মুখস্থবিদ্যা শ্রেণীকক্ষে প্রাধান্য পায়। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষাই মেধার প্রধান মানদণ্ড। কোচিং সেন্টার অনেক সময় প্রকৃত শিক্ষার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করলেও মূলগত শিক্ষায় দুর্বল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। তারা বিশ্লেষণধর্মী পড়া ও লেখার চর্চায় কষ্ট পায়, উন্মুক্ত প্রশ্নে ভয় পায়, নিজেরা অনুসন্ধান করার বদলে শিক্ষকদের আগে থেকেই তৈরি ‘নোট’ চায়। এছাড়া শ্রেণীকক্ষের বাইরে থাকা বিতর্ক, দলগত কাজ বা অনিশ্চয়তায় অস্বস্তি বোধ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং দ্রুত সামাজিক পরিবর্তনের যুগে প্রথাগত মুখস্থনির্ভর বিদ্যা এখন শুধু অকার্যকর নয়; জাতীয় প্রতিযোগিতা ও টেকসই সামাজিক সংহতির জন্য ক্ষতিকরও। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রায়ই সেই ঘাটতির মূল্য দিতে হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগেই তৈরি হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীরা যুক্ত হওয়ার আগে কীভাবে শিক্ষা অর্জন করছে আর সেখানে পৌঁছে তারা কী শিখছে—এসব ভালোভাবে নির্ধারণ ও মূল্যায়ন করা না গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকৃত মেধার ব্যবস্থাপনা জটিলতায় ভুগবে। এখানে স্পষ্ট যে প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় পরিবর্তন না আনলে উচ্চশিক্ষায় অর্থবহ সংস্কার সম্ভব নয়। তবে বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। সব সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে আমরা আরেকটি প্রজন্ম হারাব। আবার শিক্ষার্থীদের বাস্তব অবস্থা উপেক্ষা করে সংস্কার করলে বৈষম্য ও হতাশা বাড়বে। তাই একসঙ্গে কাজ করতে হবে: এখনই বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কার শুরু করতে হবে, শিক্ষার্থীদের সহায়তা দিতে হবে, স্কুল শিক্ষাকে ধীরে ধীরে সমন্বয় করতে হবে এবং শিল্প খাতকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় পাঁচটি বড় কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, এইচএসসি ফলাফল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যাশার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য আছে। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা—স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় উভয় পর্যায়েই—মুখস্থবিদ্যাকে উৎসাহিত করে, অনুসন্ধানী মনোভাবকে নিরুৎসাহিত করে। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের সংযোগ দুর্বল; ফলে অনেক স্নাতকের দক্ষতা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মেলে না। চতুর্থত, শিক্ষাদানের মান ও স্নাতক পর্যায়ের শেখার ওপর পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়া হয় না।

পঞ্চমত, সংস্কার উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কাঠামো ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী সীমিত বিশ্লেষণী দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা ও মৌলিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি জ্ঞান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় এ বাস্তবতা অস্বীকার করতে পারে না; বরং সুসংগঠিত একাডেমিক ও শিক্ষণ কৌশলের মাধ্যমে তাদের সহায়তা করতে হবে। এখন প্রয়োজন একটি স্পষ্ট জাতীয় রূপরেখা, যা ধাপে ধাপে সমন্বিত ও মানবিক সংস্কারের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এখনো অনেকাংশে তাত্ত্বিক। এমন পাঠক্রম শ্রমবাজার ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা ও কাঠামোবদ্ধ সমস্যা সমাধানের সুযোগ সীমিত। সব বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও প্রযুক্তি সচেতনতা বাধ্যতামূলক ভিত্তিমূলক উপাদান হওয়া উচিত। এটিকে এখন শুধু বিশেষায়িত উপাদান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা তহবিল সীমিত, শিল্প খাতের সঙ্গে সহযোগিতা অনিয়মিত। শ্রেণীকক্ষে এখনো লেকচারভিত্তিক শিক্ষাই প্রধান। কিছু ক্ষেত্রে এ শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রয়োজন হলেও আধুনিক দক্ষতা গড়ে তুলতে তা যথেষ্ট নয়। গবেষণা বলছে, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, সমস্যাভিত্তিক শিক্ষা, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা ইত্যাদি পদ্ধতি উচ্চতর দক্ষতা গড়ে তুলতে বেশি কার্যকর। শিক্ষকরা পদ্ধতি বেছে নেয়ার স্বাধীনতা পাবেন, তবে প্রতিষ্ঠানকে নতুন শিক্ষণ পদ্ধতিতে উৎসাহ দিতে হবে।

বিশেষত মূল্যায়ন সংস্কার বিশেষভাবে জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি তাত্ত্বিক কোর্সে চূড়ান্ত পরীক্ষাই প্রায় ৭০ শতাংশ নম্বর নির্ধারণ করে। এতে মুখস্থবিদ্যা উৎসাহিত হয়, দীর্ঘমেয়াদি বোঝাপড়া নয়, বরং ৪০-৫০ শতাংশ চূড়ান্ত পরীক্ষা এবং ৫০-৬০ শতাংশ কোর্সওয়ার্ক, প্রকল্প, উপস্থাপনা ও ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সহযোগিতা ও সৃজনশীলতা ভালোভাবে যাচাই করা সম্ভব। আশ্চর্যের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা ইউজিসি এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি। গণিত বা গণনাভিত্তিক কোর্সেও প্রয়োগভিত্তিক অ্যাসাইনমেন্ট বা প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর শেখা মূল্যায়ন করা সম্ভব। মূল্যায়নই আচরণ নির্ধারণ করে। মুখস্থবিদ্যাকে পুরস্কৃত করলে মুখস্থকারীরা তৈরি হবে; অনুসন্ধানকে পুরস্কৃত করলে চিন্তাশীল মানুষ তৈরি হবে। বর্তমানে স্কুলশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়, স্বীকৃত সংস্থা ও শিল্প খাত প্রায় আলাদা পথে চলছে। এক জায়গায় সংস্কার করলে অন্য জায়গায় অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। সমন্বয় ছাড়া ভালো উদ্যোগও সীমিত ফল দেয়। তাই একটি ১০ বছর মেয়াদি জাতীয় রূপরেখা প্রয়োজন। এতে বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার, ধীরে ধীরে এইচএসসি ও এসএসসি পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পরিবর্তন, শিল্প খাতের সম্পৃক্ততা এবং স্বীকৃত মানদণ্ডকে একসঙ্গে যুক্ত করতে হবে। নীতি প্রণয়নে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, শ্রমবাজারের চাহিদা, দক্ষতার ঘাটতি এবং বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।

সংস্কারের উদ্দেশ্য একটি ছোট এলিট গোষ্ঠী তৈরি করা নয়। বরং বৃহত্তর শিক্ষার্থী সমাজকে সক্ষম, অভিযোজনক্ষম ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল ঘাটতি পূরণকারী নয়, বরং জাতীয় উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার চালিকাশক্তি হতে হবে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় উচ্চশিক্ষা সংস্কার পরিষদ গঠন করা যেতে পারে। এ সংস্থা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, তদারকি, ফলাফল মূল্যায়ন ও নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা সংস্কার জরুরি। এটি হতে হবে ধাপে ধাপে, সমন্বিত, তথ্যভিত্তিক ও মানবিক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখনই সংস্কার শুরু করতে হবে এবং বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য কাঠামোবদ্ধ সহায়তা দিতে হবে। স্কুলশিক্ষার পরিবর্তন ধীরে হলেও সচেতনভাবে এগোতে হবে। যদি আমরা আন্তরিকভাবে এগোই, এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ এমন একটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা বিষয়ভিত্তিক গভীরতা, প্রয়োগযোগ্য দক্ষতা, নৈতিক সচেতনতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাসম্পন্ন স্নাতক তৈরি করবে, যা জাতীয় উন্নয়ন ও বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও