আশ্রয় ও খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে বন্যপ্রাণী

প্রকৃতি সংবেদনশীল উন্নয়নই বন্যপ্রাণী ও মানুষের সংঘর্ষ কমাতে পারে

বন্যপ্রাণী প্রাকৃতিকভাবে মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক নয়। তাই লোকালয়ে যখন বন্যপ্রাণী প্রবেশ করে তখন বুঝতে হবে তারা খাদ্য কিংবা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে।

বণিক বার্তার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, সিলেটের পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে গত কয়েক মাসে বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর অনুপ্রবেশ ঘটছে। এর মধ্যে শুধু মৌলভীবাজারেই ১০টিরও বেশি অজগর লোকালয়ে ধরা পড়েছে। এছাড়া চাবাগান ও আবাসিক এলাকায় নিয়মিত হাতি, গন্ধগোকুল, বিরল প্রজাতির বানর এমনকি বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ নিয়মিত ধরা পড়ছে। এমন ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। কারণ বন্যপ্রাণী যে স্বাভাবিক সময়ে মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে ফিরিয়ে দেয়াই সবচেয়ে ভালো উপায় এ বিষয়ে সামাজিক পর্যায়ের সচেতনতা এখনো দেশে গড়ে ওঠেনি।

স্থানীয় মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতনতা কম থাকায় লোকালয়ে বন্যপ্রাণী এলেই মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। অনেক সময় প্রাণীদের নির্মমভাবে আটকে রাখা হয়, না হয় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এ সংঘর্ষ মূলত মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরিণতি। এজন্যই প্রাণপ্রকৃতি রক্ষায় পরিবেশ পুনর্নির্মাণের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। এটি এমন এক সংকট যা শুধু সরকারের প্রচেষ্টায় সফল হওয়ার নয়। তবে সরকারকে অবশ্যই এ বিষয়ে যে আইনকাঠামো রয়েছে তার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সমস্যাটি শুধু সিলেটে সীমাবদ্ধ নয়। সারা দেশেই বনাঞ্চল সংকুচিত হয়ে পড়ায় প্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্যের সংস্থান হারাচ্ছে। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০১-২৫ সালের মধ্যে দেশ মোট বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকার প্রায় ২৭০ হাজার হেক্টর গাছ হারিয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বণিক বার্তার পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনে মানবসৃষ্ট বিপর্যয় আর সংঘর্ষের কারণে মহাবিপন্ন প্রাণী হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত হতে শুরু করেছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার চট্টগ্রামের চুনতি-সাতগড় করিডোরসহ দেশের অন্তত ১২টি ঐতিহ্যবাহী হাতির চলাচলের করিডোর চিহ্নিত করেছে। বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে এসব করিডোর দিয়ে হাতি চলাচল করতে পারে না বলে প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসে। তখন ফাঁদে পড়ে না হয় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অনেক হাতি মারা যায়।

প্রাকৃতিক বন উজাড় করে শাল, সেগুন কিংবা আকাশমণির মতো বাণিজ্যিক গাছের বাগান করায় বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক খাদ্যের (যেমন বাঁশ, লতাপাতা ও বুনো ফলমূল) চরম সংকট তৈরি হচ্ছে। টেকনাফ ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঙ্কচুয়ারিসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে অবকাঠামো উন্নয়ন ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের ফলে বনাঞ্চলের বিশাল অংশ বিলুপ্ত হয়েছে, যা স্থানীয় বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র নষ্ট করেছে। একসময় দেশের বনাঞ্চলের আবরণে থাকা অঞ্চলগুলো বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল। কিন্তু বর্তমানে মানুষেরই বাসস্থানের সংকট এত তীব্র আকার ধারণ করেছে যে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাস ও খাদ্যের উৎসকে সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে। অবৈধ দখলদাররা সংগঠিত আক্রমণের মাধ্যমে বন খণ্ডিত করছে। বাণিজ্যিক চা বাগানের সম্প্রসারণ, অনুমোদনহীন জনবসতি এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ বনকে খণ্ডায়িত করেছে। ফলে প্রাণীদের জন্য সংযুক্ত, নিরাপদ বন এলাকা আর নেই। ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথ ও সড়কপথ বনের ভেতর দিয়ে চলে যায়। প্রতিদিন গাড়ি ও ট্রেনের নিচে অসংখ্য প্রাণী পিষ্ট হয়। এ বিভাজন প্রাণীদের প্রাকৃতিক গতিবিধি, প্রজনন ও খাদ্য অনুসন্ধানে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করেছে।

বনের খাদ্যশৃঙ্খল জটিল ও পারস্পরিক নির্ভরশীল। গাছ কাটার ফলে বন্যপ্রাণীর প্রধান খাবার ফলবৃক্ষ (বট, অশ্বত্থ, জাম, বিভিন্ন বন্য ফল) অদৃশ্য হয়েছে। পাখি ও ছোট প্রাণী এজন্যই কমছে। ছোট প্রাণী কমায় বড় প্রাণীও (অজগর, গন্ধগোকুল, বানর) খাবার খুঁজে পায় না। তৃণভূমি উচ্ছেদে খরগোশ ও হরিণ জাতীয় প্রাণী বিনষ্ট হয়েছে। পাহাড়ি ছড়া ও জলাভূমি অপরিকল্পিত নির্মাণে ধ্বংস হয়েছে বলে মাছ ও জলজ প্রাণী কমেছে। এ সামগ্রিক খাদ্য সংকটে প্রাণীরা তাদের স্থায়ী আবাস ছেড়ে চা বাগান, মানুষের খামার ও বসতিতে খাবারের খোঁজে নেমে আসছে। সেখানেও তাদের নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২’"রয়েছে। কাগজে-কলমে এ আইন যথেষ্ট শক্তিশালী আর সংশ্লিষ্ট বিভাগও নিয়মিত অভিযান ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু অবকাঠামো ও জনবল সংকটের কারণে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ন্যূনতম সফলতা দৃশ্যমান নয়।

আধুনিক সময়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রাণপ্রকৃতির সুরক্ষা একটি পূর্বশর্ত। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি অদৃশ্য ক্ষতি এড়ানোর স্বার্থেই বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে জোর দিতে হবে। ব্যাপক বৃক্ষরোপণ বিশেষত ফলবৃক্ষ ও স্থানীয় প্রজাতির গাছপালা পুনঃস্থাপন করতে হবে। এটি প্রাণীদের জন্য খাদ্য ও আশ্রয় পুনরায় সৃষ্টি করবে। লোকালয়ে যেন বন্যপ্রাণী চলে না আসে সেজন্য খণ্ডিত বন এলাকাগুলোকে প্রাকৃতিক সেতুর মাধ্যমে সংযুক্ত করতে হবে। এভাবে প্রাণীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারে। এটি জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

মানবসৃষ্ট অপরাধ দমনেও কঠোর হতে হবে। সংরক্ষিত বন এলাকায় নতুন জনবসতি ও স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। বর্তমান অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে। অবকাঠামোগত পরিকল্পনা প্রকৃতি সংবেদনশীল করার দিকটিও বাড়তি মনোযোগের দাবি রাখে। রেল ও সড়ক নির্মাণে বন ভেদ সর্বনিম্ন করতে বিকল্প রুট অন্বেষণ করতে হবে। বিদ্যমান সড়ক ছেদে বন্যপ্রাণী পাস ও ওভারপাস স্থাপন করতে হবে। জলাশয় ও পাহাড়ি ছড়া সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক প্রাণী সুপেয় পানির অভাবের কারণেও লোকালয়ে চলে আসে। স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণে অংশীদার করে তাদের বিকল্প জীবিকা (ইকো-ট্যুরিজম, টেকসই বন পণ্য সংগ্রহ, বীজ প্রসারণ) দিতে হবে। তাদের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও তাদের নিরাপদে পুনর্বাসনের বিষয়ে সচেতন করে তোলাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের সংঘর্ষ কমাতে না পারলে লোকালয়ে বুনো প্রাণীর প্রতি সহিংস মানসিকতাও কমবে না। এজন্য প্রশিক্ষিত উদ্ধার দল প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় সচেতনতা বাড়ানোর প্রোগ্রাম চালু করতে হবে।

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে সিলেটের নজিরটি আসলে প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম ধসের খণ্ডিত দৃষ্টান্ত। আমরা বন ধ্বংস করেছি, খাদ্যশৃঙ্খল বিনষ্ট করেছি এবং প্রাণীদের নিরাপদ পথ বন্ধ করেছি। এখন সেই বনের বাসিন্দারা আমাদের দোরগোড়ায় চলে আসছে। এটি প্রকৃতির সর্বশেষ আহ্বান। তাই জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষা করতে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সুসংগঠিত পদক্ষেপ এখনই নেয়া অপরিহার্য। বিলম্বে প্রাকৃতিক ঐতিহ্যই হারাবে।

আরও