কিন্তু হাসপাতাল অবকাঠামোর সংখ্যা বাড়লেও সংবেদনশীল এ খাতে তদারকি, জবাবদিহিতা ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলিত রয়ে গেছে। রাজধানীতে যত্রতত্র অনুমোদনহীন নকশা ও কাঠামোগত ঝুঁকি নিয়ে আইনের ফাঁকে অনেক হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সম্প্রতি আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর হাসপাতাল অবকাঠামোর বিষয়টি ব্যাপক গুরুত্ব পাচ্ছে। বিষয়টি অনুধাবন করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (রাজউক) ঢাকার সব হাসপাতালের তালিকা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ তালিকার ওপর ভিত্তি করে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হবে বলে জানা গেছে। সময়োপযোগী উদ্যোগ হলেও এটি বাস্তবায়নে জটিলতা কম নয়।
বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘হেলথ কেয়ার ফ্যাসিলিটি গাইডলাইন’ অনুসরণ করা হয়। এ নির্দেশনার আওতায় হাসপাতাল ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও অক্সিজেন সরবরাহ, দুর্যোগ প্রতিরোগী ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের উপযোগী কক্ষ, ওয়ার্ড ও আইসিইউর মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগ পথ, রোগীর চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান এবং পৃথক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রাখা বাধ্যতামূলক। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালকে ‘লাইফলাইন স্ট্রাকচার’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ দুর্যোগ-পরবর্তী সময়েও কাঠামোটি যেন সেবা দিতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ হাসপাতালেই এসব ব্যবস্থা নেই। অনেক হাসপাতাল আবাসিক ভবনেই কার্যক্রম চালাচ্ছে। ফলে দুর্যোগকালীন এসব অবকাঠামো রোগীর জীবনের জন্য বাড়তি ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা থাকলেও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি আছে। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবাসিক ভবন, মার্কেটের ফ্লোরে কিংবা পুরনো আবাসিক ভবনে। অধিকাংশ হাসপাতাল বা ক্লিনিকই চিকিৎসা উপযোগী নকশা অনুসরণ করে তৈরি করা হয়নি।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ২০২০ সালে হালনাগাদের পর হাসপাতালের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা মান নির্ধারণ করে। কিন্তু আইনের প্রতিফলন মাঠ পর্যায়ে দেখা যায় না। এমনকি রাজউক নিজেই স্বীকার করেছে, রাজধানীতে কতগুলো হাসপাতাল অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য তাদের কাছে নেই। হাসপাতালের অবকাঠামোগত ত্রুটি চিকিৎসার মান ও রোগীর জীবনের নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ অগ্নিদুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ায় যেকোনো সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থাকে। লাইফলাইন স্ট্রাকচার হিসেবে হাসপাতালে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সিঁড়ি না থাকলে রোগীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে থাকে। সংকীর্ণ আবাসিক ভবনে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে না। এ ধরনের হাসপাতালে অ্যাকোয়ার্ড ইনফেকশন বাড়ে। তখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অনেকেই অজান্তে নানা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
চলতি বছর দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। হামের প্রাদুর্ভাবের পর আসছে ডেঙ্গু মৌসুম। এছাড়া শহরমুখী জনস্রোত, বার্ধক্যজনিত ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংক্রমণ রোগ বাড়া—এসব মিলিয়ে স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু অবকাঠামো দুর্বলতার কারণে স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হলে গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে। এ চাপ মোকাবেলা করার মতো সক্ষমতা সরকারি খাতের নেই।
অনিয়মতান্ত্রিক ভবনে পরিচালিত হাসপাতালে সেবার মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরিসর কক্ষে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন সম্ভব হয় না, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জায়গা থাকে না এবং রোগীর সংখ্যা বাড়লে জরুরি সেবা দেয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসে। এসব কারণে কাঠামোগত অনিয়ম একটি হাসপাতালকে ধীরে ধীরে রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে, সেটা দৃশ্যমান কোনো দুর্ঘটনার আগেই। রাজউকের এ তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নীতিগতভাবে সঠিক। প্রথমবারের মতো একটি সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি হলে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় একটি সত্যিকারের চিত্রের ওপর ভিত্তি করে নীতি প্রণয়ন করতে পারবে। তবে উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের কৌশলের ওপর। এজন্য হাসপাতালের শ্রেণী বিভাজন জরুরি। সব হাসপাতালকে একই মানদণ্ডে বিচার করলে হবে না। যে হাসপাতালে ভবন কাঠামোগতভাবেই বিপজ্জনক, সেটি বন্ধ করে দেয়াই যুক্তিসংগত। কিন্তু যে হাসপাতালে কাগজপত্রে ঘাটতি কিন্তু কাঠামো নিরাপদ সেটির ক্ষেত্রেও একই সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি অযৌক্তিক। হাসপাতাল অবকাঠামোর ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী ‘লাল’, ‘হলুদ’ ও ‘সবুজ’ বিভাজনে স্তরভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। কোনো হাসপাতালের কাগজপত্রে ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সামান্য ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ এবং সময় দিতে হবে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানকে রাতারাতি বন্ধ করে দিলে রোগীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। মধ্যম মাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মান অর্জনের বাধ্যবাধকতায় আনা সমীচীন।
যে হাসপাতালগুলো অনুমোদনহীনভাবে চলছে, সেগুলো একদিনে গড়ে ওঠেনি। বছরের পর বছর ধরে অনুমোদন না নিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে, কারণ নিয়মকানুন প্রয়োগের ব্যবস্থা কার্যত ছিল না। রাজউকের তদারকি ব্যর্থতার দায়ও তাই এ সমস্যার সমান অংশীদার। শুধু হাসপাতাল বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নজরদারি ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। এজন্য আন্তঃসংস্থা সমন্বয় অপরিহার্য। রাজউক একা এ কাজ করতে পারবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং সিটি করপোরেশন এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত না করলে তালিকা তৈরি হবে, কিন্তু প্রয়োগ হবে না। এ পুরো প্রক্রিয়ায় রাজউককেই নেতৃত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে বহু ভালো উদ্যোগ আন্তঃদপ্তর সমন্বয়হীনতার কারণে ব্যর্থ হয়েছে। রাজউকের উদ্যোগকে তাই তাৎক্ষণিক প্রশংসা দিয়ে সেখানেই থামলে চলবে না। এটিকে একটি টেকসই নিয়ন্ত্রণ ও কাঠামোর সূচনাবিন্দু হিসেবে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে তালিকা তৈরি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, সংস্কারের রোডম্যাপ এবং নিয়মিত পরিদর্শন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হবে, কোনো বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়।