অভিমত

ধূমপানে স্বাস্থ্যঝুঁকি: প্রয়োজন সচেতনতা ও আইনের প্রয়োগ

বর্তমানে দেশের ৩৫ শতাংশের বেশি মানুষ তামাক ব্যবহার করছে। তবে এ সংখ্যার চেয়েও আরো বেশি আশঙ্কাজনক পরোক্ষ ধূমপানের হার। বর্তমানে দেশে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে ৩ কোটি ৮৪ লাখ মানুষ। পরোক্ষ ধূমপানের হার এভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ অসচেতনতা এবং আইনের বাস্তবায়নহীনতা।

বর্তমানে দেশের ৩৫ শতাংশের বেশি মানুষ তামাক ব্যবহার করছে। তবে সংখ্যার চেয়েও আরো বেশি আশঙ্কাজনক পরোক্ষ ধূমপানের হার। বর্তমানে দেশে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে কোটি ৮৪ লাখ মানুষ। পরোক্ষ ধূমপানের হার এভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ অসচেতনতা এবং আইনের বাস্তবায়নহীনতা।

টেলিভিশন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যন্ত বিস্তরভাবে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানোর পরও পরোক্ষ ধূমপান নিয়ে মাথা ঘামাতে দেখা যাচ্ছে না কাউকেই। ঘরের ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে গণপরিবহনের নারী আসনে বসে থাকা নারী শিশুকারো কথাই ভাবছে না ধূমপায়ীরা। এতে যে পরিমাণ মানুষ ধূমপায়ী ক্ষতির শিকার হচ্ছে তারও কয়েক গুণ মানুষ।

চিত্রটি থেকে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার যে পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতির বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে না ধূমপায়ীরা। অথচ দেশে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে পরোক্ষ ধূমপানের কারণে।

তাহলে উপায়? এক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে লক্ষাধিক মানুষকে বাঁচাতে এবং ধূমপানমুক্ত দেশ গড়তে দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা হতে পারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে প্রাথমিক পদক্ষেপটি হওয়া উচিত আইনের কঠোর প্রয়োগ। আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে প্রকাশ্যে ধূমপানের মতো আইনবিরুদ্ধ কাজকে রুখতে।

২০১৩ সালে সংশোধিত ধূমপান তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে জনসমক্ষে চলাফেরার স্থান বা গণপরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ। কেউ এমন স্থানে ধূমপান করলে অনধিক ৩০০ টাকা জরিমানা করার বিধান আছে। একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে তিনি দ্বিগুণ হারে দণ্ডিত হবেন।

আইনটি অনুসারে পাবলিক প্লেস বলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বেসরকারি অফিস; গ্রন্থাগার, লিফট, হাসপাতাল ক্লিনিক, আদালত, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, নৌবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল, প্রেক্ষাগৃহ, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিপণিবিতান, রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, শিশুপার্ক, মেলা বা পাবলিক পরিবহনে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সারি, জনসাধারণের সম্মিলিত ব্যবহারের স্থান বোঝায়। আইন প্রয়োগের জন্য আরো সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ঘর থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, রাস্তাঘাট, এমনকি বদ্ধ গণপরিবহনেও চলছে প্রকাশ্যে ধূমপান। আইনে থাকলেও কোথাও নেই কোনো স্মোক জোনের ব্যবস্থা। এভাবে সিগারেটের ধোঁয়ায় অনেকে অস্বস্তি বা বিরক্ত হলেও কিছুই বলতে পারে না। বা বললেও তা সাধারণ বাগিবতণ্ডার মাধ্যমে শেষ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে হেনস্থার শিকার হন অভিযোগকারীরাই। এর কারণ এত বছর ধরে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি শুধু কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। বাস্তবায়ন হলে ধূমপায়ীরা জানত তারা আইনবিরুদ্ধ কাজ করছে, অন্যদিকে অভিযোগ জানানোর সুযোগ পেত অধূমপায়ীরাও।

২০১৭ সালে ম্যালিন্ডা অ্যান্ড গেটস ফাউন্ডেশনে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর গণপরিবহনে আড়াই কোটি মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে হাসপাতালের মতো জায়গায়ও প্রায় ১৩ ভাগ মানুষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে।

মূলত, ধূমপানের প্রভাব কেবল যে সিগারেট গ্রহণ করে সেই ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সামাজিক, আর্থিক স্বাস্থ্যগত নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। একজনের ধূমপানের ফলে অন্য ব্যক্তি পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। বিশেষ করে নারী শিশুদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে শঙ্কার।

প্রকাশ্যে ধূমপানে নিষেধাজ্ঞা, নির্দিষ্ট ধূমপান এলাকা রাখার বিধান, অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি না করাসহ বেশকিছু জনবান্ধব বিধান রয়েছে আমাদের আইনে। কিন্তু আইন যতক্ষণ শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ, ততক্ষণ এর সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, ধূমপানের পাশাপাশি বহুগুণ বেড়েছে জর্দাসহ আরো নানা রকম তামাকের ব্যবহার। ধূমপান নিয়ে যেটুকু প্রচার-প্রচারণা রয়েছে, সেটুকু প্রচারণাও নেই ধোঁয়াহীন তামাকের ব্যাপারে। অথচ বাংলাদেশে ধূমপায়ীদের চেয়ে ধোঁয়াহীন তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ এবং চিকিৎসকদের মতে, এর প্রভাবও অনেক বেশি ভয়ংকর। তাই ধোঁয়াহীন তামাকের বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো প্রয়োজন।

দেশকে তামাকমুক্ত করার যে লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার এগিয়ে যাচ্ছে, তার বাস্তবায়নে মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদ্যমান আইনটির কঠোর প্রয়োগ। এজন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতকে আরো বেশি কার্যকর করে তুলতে হবে। প্রয়োজনে ডিজিটালাইজড মনিটরিং ব্যবস্থা করতে হবে। কেউ প্রকাশ্যে ধূমপান করলে যাতে দ্রুত অভিযোগ করা যায়, সেজন্যে একটি নাম্বার খুলে দিতে হবে। নিয়মিত জরিমানা করা হলে এবং শাস্তির আওতায় আনা গেলে খুব দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আমরা আশাবাদী।

 

অ্যারোমা দত্ত: সংসদ সদস্য মানবাধিকার নেত্রী

আরও