জলবায়ু ভাবনা

বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে বিশ্ব নেতাদের দৃঢ় অঙ্গীকার দেখা যাচ্ছে কি?

শুধু জ্বালানি খাতের পরিবর্তন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়। শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সংকট। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। এর প্রভাবে পরিবর্তন হচ্ছে আবহাওয়ার ধরন, বাড়ছে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাবও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হ্রাস জরুরি হয়ে পড়েছে।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হলো ওজোন স্তর। এটি বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের মাঝামাঝি থেকে উচ্চতর অক্ষাংশে বেশি পরিমাণে ওজোন গ্যাস বিদ্যমান থাকে। এ ওজোন স্তর পৃথিবীকে চাদরের মতো ঢেকে রেখেছে বলেই ক্ষতিকর উপাদানগুলো এতে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যায়। কিন্তু পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান মানুষের উচ্চাভিলাষী জীবনযাপন ও অতিরিক্ত কার্বন ব্যবহারের কারণে ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে। সত্তর দশকের শুরুর দিকে ওজোন গ্যাসের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি বিজ্ঞানীদের প্রথম নজরে আসে। গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলেন, স্ট্রাটোস্ফিয়ারে প্রতি এক দশকে প্রায় ৪ শতাংশ হারে ওজোন স্তরের পুরুত্ব কমে যাচ্ছে। এটি ক্ষয়ের অন্যতম কারণ ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (সিএফসি), যা একসময় রেফ্রিজারেটর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও বিভিন্ন অ্যারোসল পণ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে সিএফসি থেকে নির্গত ক্লোরিন ওজোন অণু ধ্বংস করে। এছাড়া হ্যালন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড ও অন্যান্য কিছু পদার্থও ওজোন স্তরের ক্ষতি করে।

ওজোন স্তর রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ১৯৮৭ সালে গৃহীত মন্ট্রিয়ল প্রটোকল। এর মাধ্যমে ওজোন স্তর ধ্বংসকারী পদার্থের উৎপাদন ও ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ বা সীমিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ চুক্তির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক ঐকমত্য ও সমন্বিত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও ওজোন স্তর ক্ষয় এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এক বিষয় নয়। তবে এ দুটির কারণ ও প্রতিকার আলাদা হলেও কিছু রাসায়নিক পদার্থ উভয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি। জীবাশ্ম জ্বালানি—যেমন কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস—পোড়ানোর ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। শিল্পায়ন, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বন উজাড় ও ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনের কারণেও বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডও বৈশ্বিক উষ্ণায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

প্রাকৃতিকভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের উপস্থিতি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। কিন্তু মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে এসব গ্যাসের পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে পৃথিবী থেকে নির্গত তাপের একটি বড় অংশ বায়ুমণ্ডলে আটকে পড়ে। ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এ প্রক্রিয়াই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মূল ভিত্তি। এর প্রভাবে জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ঘটে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবেশগত ও আর্থসামাজিক ঝুঁকি বাড়ে।

জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। এ লক্ষ্যেই ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) গ্রহণ করে। এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের জন্য ১৭টি লক্ষ্য ও ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট অভীষ্ট নির্ধারণ করা হয়। এসডিজি-১৩-তে জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে এসডিজি-১৭-তে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব জোরদারের কথা বলা হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করাই এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মধ্যে প্যারিস চুক্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০১৫ সালে গৃহীত এ চুক্তির লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে সীমিত রাখা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আটকে রাখার প্রচেষ্টা চালানো। এ লক্ষ্য অর্জনে দেশগুলোকে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হয়। তবে চুক্তির লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক নিঃসরণ, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়নের প্রয়োজন এবং জলবায়ু অভিযোজনের ব্যয় নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনাও অব্যাহত রয়েছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি, নদীনির্ভর ভূপ্রকৃতি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তৃতির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেশের কৃষি, পানি, জনস্বাস্থ্য, জীবিকা ও অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোও বাংলাদেশের জন্য জরুরি।

এ পরিস্থিতিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। সৌর ও বায়ুশক্তির মতো উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ও জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-৩০) প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ কৌশলপত্র অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরশক্তি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও এ ধরনের পরিকল্পনার অংশ। তবে এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, জমির প্রাপ্যতা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

শুধু জ্বালানি খাতের পরিবর্তন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়। শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি বনভূমি ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ করতে হবে। গাছ কার্বন শোষণে ভূমিকা রাখে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বনায়ন ও বন সংরক্ষণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার অন্যতম উপায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সুন্দরবনসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক বনভূমি সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ; তবে এর সুফল নির্ভর করবে উপযুক্ত প্রজাতি নির্বাচন, গাছের পরিচর্যা ও দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার ওপর।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে বিশ্বনেতাদের অঙ্গীকারকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নীতিমালা গ্রহণের পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়ন, অর্থায়ন এবং অগ্রগতি পরিমাপের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির সহযোগিতা জরুরি। একই সঙ্গে দেশগুলোর নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনায় নিঃসরণ হ্রাস ও জলবায়ু অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ব্যক্তিপর্যায়েও পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন, সাইকেল কিংবা স্বল্প দূরত্বে হাঁটার অভ্যাস জ্বালানি ব্যবহার ও নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করতে পারে। বিদ্যুতের অপচয় রোধ, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং বর্জ্য কমানোর মতো পদক্ষেপও প্রয়োজন। তবে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

পরিশেষে বলা যায়, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলায় বিশ্বনেতাদের অঙ্গীকারের গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু অঙ্গীকারের পাশাপাশি তার বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, জলবায়ু অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে হলে বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা ও ধারাবাহিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে।

ড. মো. ইকবাল সরোয়ার: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও