বিশ্লেষণ

জলবায়ু পরিবর্তনের রাশ টানতে পারবে কি বাইডেন প্রশাসন?

নভেল করোনাভাইরাস সৃষ্ট কভিড-১৯-এর প্রভাবে বিশ্বের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড যখন পর্যুদস্ত, প্রকৃতি তখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত পেয়েছে। কার্বন নিঃসরণ গত কয়েক দশক ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার যে প্রবণতা, ২০২০ সালে তার ব্যত্যয় ঘটেছে অনেকটাই। নেচারের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের

নভেল করোনাভাইরাস সৃষ্ট কভিড-১৯-এর প্রভাবে বিশ্বের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড যখন পর্যুদস্ত, প্রকৃতি তখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত পেয়েছে। কার্বন নিঃসরণ গত কয়েক দশক ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার যে প্রবণতা, ২০২০ সালে তার ব্যত্যয় ঘটেছে অনেকটাই। নেচারের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ৬ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন টনে নেমেছে। তার সিংহভাগই কমেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে (১২ দশমিক ৯ শতাংশ), যদিও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ চীনে হ্রাসের পরিমাণ মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ। বলা নিষ্প্রয়োজন, করোনাভাইরাস চীনের উহান প্রদেশে প্রথম শনাক্ত হলেও কঠোর সতর্কতা এবং সময়মতো কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে চীনে উৎপাদন এবং বিপণন ব্যবস্থা খুব অল্প সময়ের জন্যই বন্ধ ছিল। ফলে চীনে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের পরিমাণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (৭ দশমিক ৭ শতাংশ), ভারত (৮ শতাংশ) এমনকি রাশিয়ার (২ দশমিক ৮ শতাংশ) চেয়েও কম।

তবে বিশেষজ্ঞের মতে, ২০২০ সালের কার্বন হ্রাসের উদাহরণ একটা সাময়িক প্রবাহ মাত্র। নতুন স্বাভাবিক অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর কৌশল গ্রহণের কারণে আক্রান্ত দেশগুলো করোনাকালীন আংশিক হলেও উৎপাদন এবং বিপণনকাজ পুনরায় শুরু করতে সমর্থ হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বা করোনা-পরবর্তী সময়ে যখন উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলো করোনায় সৃষ্ট ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য অধিকতর উৎপাদন করবে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ করোনা-পূর্ববর্তী ধারায় ফিরে যাবে, যা আগামী দিনে প্রাকৃতিক পরিবেশকে অধিকতর হুমকির মুখে ফেলে দেবে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন উল্লেখ করে যে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন গত এক দশকে বার্ষিক গড়ে দশমিক ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কার্বন নিঃসরণের হার যদি আগের স্বাভাবিক ধারায় ফিরে যায়, তবে পৃথিবী নামক গ্রহে মানুষের বাস করা কঠিন হবে। বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কম উচ্চতার দেশগুলো পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। আর বাংলাদেশের মতো ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দেশগুলো আরো বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হবে, যদিও বৈশ্বিক উষ্ণতা সব দেশকেই কম-বেশি প্রভাবিত করবে। যেমন ২০১৫ সালের ডিসেম্বর ছিল গত ১৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণতম মাস, যা বিশ শতকের গড় তাপমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। তাপমাত্রার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে উত্তর মেরুর বরফ দ্রুত গলতে শুরু করেছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে।

তবে বিশ্বনেতৃত্বের পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাইডেন প্রশাসন জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের বিশ্বাস। অনেকেরই এমন ধারণা যে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবেলায় অতীতে যে ইতিবাচক নেতৃত্বের প্রমাণ দিয়েছিল, হাল আমলে সেটা অনেকটাই নিম্নমুখী। যেমন কিয়োটো চুক্তির পর কার্বন নিঃসরণ রোধে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি কার্যকরী দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বলে মনে করা হয়। বর্তমানে প্রায় ২০০টি দেশ স্বাক্ষর করেছে এ চুক্তি। ওবামা প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে এ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করেছিল। স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ছিল যে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ২০০৫ সালের তুলনায় কমপক্ষে ২৮ শতাংশ কমিয়ে আনা। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা (ইপিএ) ২০১৫ সালে ক্লিন পাওয়ার প্লান্ট বা সিপিপি নীতি প্রণয়ন করেন। ট্রাম্প প্রশাসন সিপিপি বাতিল করেছে। তদুপরি ২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রশাসন প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কার্বন নির্গমনের হার না কমে বরং অনেকটাই বেড়ে যায়। যেমন ২০১৮ সালে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যা গত দুই দশকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ২০১০ সালে বৃদ্ধির হার ছিল সর্বোচ্চ।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার অফিসের প্রথম দিনেই প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে প্রত্যাবর্তনের জন্য নির্বাহী আদেশ প্রদান করেন। অধিকন্তু, জলবায়ু পরিবর্তনকে বৈদেশিক এবং জাতীয় সুরক্ষা নীতির একটি প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এমন মনোভাব ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচনপূর্ব অঙ্গীকারকেই শুধু বাস্তবায়নের পথ দেখায়নি (নির্বাচনপূর্ব একটি টুইটে জো বাইডেন লিখেছিলেন ‘ট্রাম্পের কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের মানে হলো শুধু ‘ফাঁকি’ আর আমার কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের মানে হলো ‘কর্মসংস্থান’), বরং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বনেতৃত্বের যে শূন্যস্থান সৃষ্টি হয়েছিল, তা পূরণ করার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বলা বাহুল্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলায় মার্কিন নেতৃত্বের অবসান ঘটে। অনেকেরই ধারণা ছিল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বা জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল হয়তো সেই শূন্যস্থান কিছুটা হলেও পূরণ করবেন কিন্তু জনগণের সেই আশা হালে পানি পায়নি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মোকাবেলাসহ দেশটির অর্থনৈতিক নাজুক অবস্থা মাখোঁকে অনেকটাই কোণঠাসা করে রেখেছে। মেরকেলও সেভাবে এগিয়ে আসেননি।

এখন প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা কেন এত জরুরি? বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে কার্বনের যে মোট মজুদ, তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবদানই সবচেয়ে বেশি। শিল্পবিপ্লবের পর থেকেই দেশটি বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে আজ পর্যন্ত দেশটির কার্বন নির্গমনের মোট পরিমাণ প্রায় ৪০০ বিলিয়ন টন এবং মোট নিঃসরণের এক-চতুর্থাংশ যদিও বর্তমানে কার্বন নিঃসরণের দিক থেকে চীনের পরেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। বর্তমানে বিশ্বের মোট নিঃসরণের ১৫ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের অবদান, আর চীনের অবদান ৩০ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে জলবায়ু পরিবর্তনের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ দেখতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নেতৃত্বেই হতে হবে।

ট্রাম্প আমলে চীনের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্ক যারপরনাই তলানিতে ছিল, সে কথা সবারই জানা। কার্বন নির্গমনের লাগাম টেনে ধরার নীতি অর্থনীতিতে সাময়িক অসুবিধার সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এমন কোনো নীতিতে চীন সায় দেবে না, সেকথা অনুমেয়। আবার মার্কিন কোনো চাপের কাছে চীন নতি স্বীকার করবে না, একথা এরই মধ্যে প্রমাণিত। সুতরাং চীনকে আলোচনার টেবিলে আনতে অবশ্যই জুতসই কূটনৈতিক নীতির দ্বারস্থ হতে হবে। এখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সঙ্গে নিয়ে চীনকে আলোচনার টেবিলে বসাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই চীনের সহযোগিতার প্রত্যাশা করতে পারে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দেশটির কার্বন নীতি পুনর্মূল্যায়ন করে ২০৬০ সালের মধ্যে চীনকে কার্বননিরপেক্ষ দেশে পরিণত করার পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছেন। এখানেই যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের সঙ্গে পরিবেশ ইস্যুতে কাজ করতে হবে, প্রয়োজনে বিদ্যমান বাণিজ্যবিরোধ পাশে রেখেই।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, করোনা-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের নাজুক অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি বাইডেন প্রশাসন কতটুকু সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারবে? প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে কার্বনমুক্ত করা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে মোট কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে নিয়ে আসার প্রত্যয় রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি জমিগুলোয় তেল ও গ্যাস উত্তোলনে বিরতির প্রস্তাবনাসহ জাতীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট কার্বন নিঃসরণের এক-চতুর্থাংশ আসে সরকারি জমিতে জীবাশ্ম জ্বালানি আহরণে। এই নীতি বাস্তবায়ন হলে বার্ষিক ২৮০ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অধিকন্তু জীবাশ্ম জ্বালানিতে চলমান ভর্তুকি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি ভর্তুকির পরিমাণ বার্ষিক প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার ২০ শতাংশ যায় কয়লা শিল্পে এবং ৮০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস ও অপরিশোধিত তেল উত্তোলনে। এর সঙ্গে সরকারি কাজে ব্যবহূত সব পরিবহন বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে বাইডেন প্রশাসনের। তবে প্রেসিডেন্ট বাইডেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে। কারণ এখানেই রয়েছে তার প্রতিশ্রুত কর্মসংস্থান তৈরির চাবিকাঠি। নতুন প্রশাসন আশা করছে যে কংগ্রেসের মাধ্যমে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্যাকেজ পাস হবে, যার ৪০ শতাংশ বিনিয়োগ হবে সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের জন্য।

প্রেসিডেন্ট বাইডেনের অতীত কর্মকাণ্ড অবশ্য কিছুটা আশার সঞ্চার করে। ১৯৮৬ সালে কংগ্রেসে প্রথম জলবায়ু পরিবর্তন আইন প্রবর্তন করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট। তিনি ওবামা প্রশাসনের অর্থনৈতিক উদ্দীপনা প্যাকেজের অধীনে ‘গ্রিন জব’ বা পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থানের কৌশল প্রণয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে কয়লা প্লান্ট ও অটোমোবাইল শিল্পের কার্বন নির্গমন সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য আইনগুলো সমর্থন করেছিলেন। বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে তার অতীত কর্মকাণ্ড অবশ্যই সাধারণের মনে আশার সঞ্চার করবে। তবে সত্যিকারের পরিবর্তন দেখতে হলে আমাদের আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে, যদিও বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রশ্নে অপেক্ষার সময় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।

 

ড. মোহাম্মদ দুলাল মিয়া: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফিন্যান্স ও অর্থনীতি বিভাগ। নিজওয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওমান

আরও