স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের রাজনীতিকরা যতবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন ততবার ক্ষমতাকে শুধু ভোগই করেছেন। কিন্তু ক্ষমতা যে একটি পবিত্র দায়িত্ব তা অধিকাংশ রাজনীতিক বেমালুম ভুলে বসেছেন। ফলে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর নিজেদের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিতে হয় এবং এ ধরনের ব্যতিক্রমী সরকারকে জনগণ আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় যেন দলীয় সরকার এসে বর্গীদের মতো তাদের সর্বস্ব লুটে নেবে। অথচ আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মাঝে মাঝে বলতে শুনি ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড় এবং দলের চেয়ে দেশ বড়’। কিন্তু দেশের জনগণ দলগুলোর নেতাদের ওই আপ্তবাক্যের বাস্তবায়ন কখনোই দেখেনি। ফলে দেশে এসেছে ‘৭৫, ৯০, ১/১১ ও ২৪শের গণজাগরণ বা বিপ্লব।
২৪-এর ভয়াবহ গণজাগরণে অভূতপূর্ব এক ফ্যাসিস্টকে বিদায় করা ছিল অকল্পনীয় ঘটনা। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে জনগণ এ দ্বিতীয় স্বাধীনতা পেয়েছে। একে তারা হেলায় হারাতে চায় না। কিন্তু এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ দ্রুত নির্বাচন নিবাচন করে অস্থির হয়ে জনগণের বিরাগভাজন হচ্ছেন এবং কেউ কেউ এ সরকারের সংস্কার ক্ষমতায় গেলে উল্টে দেয়ারও হুমকি দিচ্ছেন। তাই মাঝে মাঝে শঙ্কা জাগে ২৪-এর রক্তের স্রোতও কি বৃথা যাবে? কিন্তু কেন জনগণ বারবার রাজনীতিকদের বিশ্বাস করে ক্ষমতায় বসাবে? আমাদের সম্মানিত রাজনীতিকেরা নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করেছেন এবং অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের নেতৃত্বে করা ২৯টি টাস্কফোর্সের সুপারিশের কোনো অংশই বাস্তবায়ন করেননি। তিন জোটের স্বাক্ষরিত রূপরেখাও বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন এবং ক্ষমতায় গিয়ে দুই দল আবার দেশকে দুর্নীতিতে টানা পাঁচ বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে এনেছিলেন ১/১১। এর পরে কায়েম হলো ফ্যাসিজম। সম্মানিত রাজনীতিকরা যদি ওই ২৯টি টাস্কফোর্সের সুপারিশের কিছু অংশও বাস্তবায়ন করতেন এবং তিন জোটের রূপরেখাকে আমলে নিতেন তবে গত ১৭ বছর জেল-জুলুম সহ্য করতে হতো না এবং অন্য একদলকে দেশ ছেড়ে পালাতে হতো না।
আপনারা সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে দিবেন না এবং লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতিও বহাল রাখবেন এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশকৃত জাতীয় সংবিধানিক কমিশন (এনসিসি) গঠনেও আপনারা বিরোধী, কারণ তাতে আপনাদের ইচ্ছামতো নখ-দন্তবিহীন দুদক বানানো যাবে না, বানানো যাবে না অতীতের মতো আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন। বড় দলের রাজনীতিকরা কী কী সংস্কার চান তাও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন থেকে জনগণ জেনে গেছে, সেখানে ৫ আগস্টের আগে দেয় দফাগুলোর বাইরে তেমন কিছুই সংস্কার ওনারা চান না। অর্থাৎ ওনাদের আগের অবস্থান বদলাননি, ৫ আগস্ট যেন কিছুই হয়নি। ওনারা ধরেই নিয়েছেন আর কয়টা মাস, তারপর ক্ষমতার সোপানে আরোহণ করবেন। অথচ কথায় কথায় রাজনীতিবিদের মুখে শুনি-জনগণের কল্যাণ সাধনই নাকি তাদের একমাত্র ব্রত! এখন আবার বলছেন নিজেরা ক্ষমতায় গিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার করবেন। কিন্তু জনগণ তাদের কথায় বিশ্বাস রাখতে পারছে না। অন্যদিকে যারা নির্বাচনের জন্য চাপ দিচ্ছেন তারা অনেকেই ছাত্রদের আন্দোলনের সফলতায় দুদকের মামলাসহ বিভিন্ন মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু প্রকৃতই দুর্নীতিমুক্ত ছিলেন কিনা জনগণ সে ব্যাপারে যথেষ্ট আস্থা রাখে কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
নির্বাচনের পর তারাই তো আবার মন্ত্রী-এমপি হবেন, পূর্বের শাসনের পুনরাবৃত্তি ভিন্ন অন্য কিছু হবে তা তো জনগণ বিশ্বাস করে না। তাই আমাদের শ্রদ্ধেয় রাজনীতিকদের সবিনয় অনুরোধ, জন-মানুষের কল্যাণের দিকে তাকিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে কাজ করতে দিন। ড. ইউনূস সরকার দায়িত্ব না নিলে দেশ-বিদেশের ষড়যন্ত্র সামাল দেয়া রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সরকার কাজ করছে এবং অনেক কিছুটা ট্র্যাকে ফিরেছে। তাই জনগণ দ্রুত নির্বাচনের বিরুদ্ধে। কেন জনগণ আপনাদের শাসন চায় না তা নিয়ে আত্মসমালোচনা করুন।
শুধু এ সরকার বলে নয়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারগুলোও জনগণের কাছে প্রিয় ছিল। কিন্তু ওই সরকারগুলোর দীর্ঘায়ু কামনা করার সুযোগ ছিল না। এটা একটি ভিন্নধর্মী সরকার, অনেকে বলেন বিপ্লবী সরকার এবং হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তে স্নাত এ সরকার। এ সরকারকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার অধিকার ছাত্র-জনতাই দিয়েছে। তাই দ্রুত নির্বাচনের জন্য এ সরকারকে চাপ দেয়ার অধিকার রাজনীতিকদের নেই। আগামী কয়েক বছর এ সরকার সময় পেলে জনকল্যাণে কিছু ভালো কাজের বীজ বপন করে যেতে পারবে বলে অনেকেই মনে করছেন। তদুপরি জনগণের প্রতি এ সরকারের বিশেষ দায়িত্বও রয়েছে। এত রক্তের বিনিময়ে পাওয়া দ্বিতীয় স্বাধীনতা হুট করে আপনাদের ক্ষমতার জন্য বিলীন করে দিতে পারে না। তাই রাজনীতিবিদের প্রতি বিনীত অনুরোধ আরো কিছু দিন ক্ষমতার সুখ ভোগে বিরতি দিন, আত্মোপলব্ধি করে নিজেদের দল এবং আত্মাকে শুদ্ধ করুন। প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করে দেশকে সঠিক ট্র্যাকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে অসহযোগিতা নয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন।
নুরুল আমিন: কলাম লেখক ও শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এ কে অ্যাকসেসরিজ (প্রাইভেট) লিমিটেড