শুধু জরায়ুমুখের ক্যান্সারেই নাইজেরিয়ায় প্রতিদিন গড়ে ৩৩ জন নারী আক্রান্ত হন এবং ২২ জনের মৃত্যু হয়। এ রোগের চিকিৎসা নেই তা নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, নাইজেরিয়ার রোগীদের ক্যান্সার চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। একই কথা বিশ্বের উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশের ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ক্যান্সার সারিয়ে তুলতে বিশ্বে বহু চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন হয়েছে। বিশেষ করে ইমিউনোথেরাপির মতো যুগান্তকারী উদ্ভাবনের ফলে সাম্প্রতিক কয়েক দশকে ক্যান্সারে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মাত্র এক প্রজন্ম আগেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে (ইমিউনোথেরাপি) ক্যান্সার প্রতিহত করা সম্ভব এমন ধারণা অনেকের কাছেই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো মনে হতো। কিন্তু বর্তমানে ক্যান্সার গবেষণার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ইমিউনোথেরাপি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিসট্রেশন (এফডিএ) ২৫ ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ৩০টিরও বেশি ইমিউনোথেরাপির অনুমোদন দিয়েছে।
এর ফলাফলই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। একসময় অ্যাডভান্সড মেলানোমা রোগীদের গড়ে মাত্র ১৬ সপ্তাহ বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকত। কিন্তু ইমিউনোথেরাপির কল্যাণে বর্তমানে তাদের প্রতি তিনজনের একজনের ১০ বছর বা তারও বেশি সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একইভাবে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের অনেকের ক্ষেত্রে আগে যেখানে আয়ুষ্কাল মাসে হিসাব করা হতো, এখন তা বছরের হিসাবে পরিমাপ করা হচ্ছে।
কিন্তু নাইজেরিয়ার ক্যান্সার রোগীদের বেশির ভাগেরই ইমিউনোথেরাপি বা এ ধরনের অন্যান্য উদ্ভাবনী চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ কম। এমনকি লাগোস ও আবুজার বড় বড় হাসপাতালেও চিকিৎসকরা প্রায় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যেখানে তারা জানেন কোন চিকিৎসা ক্যান্সার রোগীর জন্য কার্যকর হতে পারে, কিন্তু সেটি ব্যবস্থাপত্রে দেয়ার সুযোগ নেই। ফলে ধনী দেশগুলোর ক্যান্সার রোগীরা যখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দীর্ঘদিন বেঁচে থাকছেন, তখন নাইজেরিয়ার মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশের ক্যান্সার রোগীরা তুলনামূলক স্বল্প সময়ের মধ্যে মারা যাচ্ছেন।
অনেকের ধারণা, ক্যান্সার চিকিৎসার বৈষম্য দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো চিকিৎসা-উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা দুর্বল করে দেয়া এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে খুব কম দামে বা বিনামূল্যে তাদের চিকিৎসা প্রযুক্তি দিতে বাধ্য করা। তাদের যুক্তি, পেটেন্ট ব্যবস্থা এবং উচ্চমূল্য স্বাস্থ্যসেবার পথে অন্যায্য বাধা সৃষ্টি করে। কিন্তু এ যুক্তিতে একটি বাস্তবতার প্রতিফল নেই। আর তা হলো উদ্ভাবনের জন্য কার্যকর প্রণোদনা না থাকলে ইমিউনোথেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন সম্ভব ছিল না।
নতুন ক্যান্সার চিকিৎসা উদ্ভাবনে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় এবং এতে বড় মাত্রার ঝুঁকিও থাকে। সম্ভাবনাময় অধিকাংশ নতুন ওষুধই শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। ফলে যে অল্প কয়েকটি উদ্ভাবন সফল হয়, সেগুলোর মাধ্যমে ব্যর্থ প্রচেষ্টার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। নাইজেরিয়ার মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশের এখনো নিজস্ব উদ্যোগে বড় পরিসরে ক্যান্সার চিকিৎসা উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। তাই তারা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে হওয়া আবিষ্কারের ওপরই নির্ভর করে। দ্রুততর সময়ে প্রাপ্তির নামে যদি আমরা উদ্ভাবনের মেধাস্বত্ব বা উচ্চ ব্যয়ের ব্যবস্থা ভেঙে ফেলি, তাহলে অগ্রগতির গতিও শ্লথ হয়ে যাবে। ফলে ধনী ও দরিদ্র—উভয় দেশের আগাম রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
পেটেন্টের মেয়াদ একসময় শেষ হয়, আর তখনই বাজারে কম দামের জেনেরিক সংস্করণ আসতে শুরু করে। এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়াতে বেশ কয়েকটি ওষুধ কোম্পানি এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বিভিন্ন উদ্যোগও নিয়েছে। এ ব্যবস্থা হয়তো নিখুঁত নয়, তবে অন্তত এটি নতুন নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবন অব্যাহত রাখতে সহায়তা করে।
বাস্তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সঠিকভাবে ক্যান্সার নির্ণয় ও কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় বাধা পেটেন্ট নয়, বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত নেয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো এবং দারিদ্র্য। তাই উদ্ভাবনের প্রণোদনা না কমিয়ে সরকারগুলোর উচিত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, আমদানীকৃত ওষুধের অনুমোদন দ্রুত দেয়া এবং স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো ও সক্ষমতা বাড়ানো। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নত করা। কেননা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রান্তিক পর্যায়ে এর ঘাটতি সবচেয়ে বেশি।
পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের জনগণের জীবনমান উন্নয়নেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বাজারকে আরো উন্মুক্ত করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও গতিশীলতা বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবায় বেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পরিবারের আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
যখন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ মানুষের নাগালের বাইরে থাকে, তখন দ্রুত সমাধানের দাবি ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু এটি এক ধরনের অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিবেচনা। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু সুফল পাওয়া গেলেও আগামী দিনে তা বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। চিকিৎসাবিষয়ক উদ্ভাবনের ভিত্তি যে প্রণোদনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেটিকে দুর্বল করলে উদ্ভাবন কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাবে। কিন্তু ক্যান্সার শনাক্ত হলেই মৃত্যু যেন অবধারিত না হয় সেজন্য উদ্ভাবন কার্যক্রম পুরোদমে এগিয়ে যাওয়াটাই বাঞ্ছনীয়।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২০২৬]
থম্পসন আয়োদেলে: নাইজেরিয়ার লাগোসভিত্তিক জননীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনিশিয়েটিভ ফর পাবলিক পলিসি অ্যানালাইসিসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো