বিশ্লেষণ

বিভিন্ন দেশে চীনা সহায়তার ভূরাজনীতি

বিভিন্ন দেশে দ্বিপক্ষীয় সহায়তা বাবদ ২০০০ সাল থেকে চীন মোট ৮৪৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। সে হিসাবে প্রতি বছর ৩৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। চীনের এ খরচের পরিমাণ বিশ্বের বৃহত্তম বৈদেশিক অর্থায়নকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সমান। যদিও দুটি দেশের বৈদেশিক সাহায্যের সংজ্ঞা ভিন্ন, কিন্তু গত দুই দশকে ১৬৫টি দেশে দ্বিপক্ষীয় সহায়তার ১৩

বিভিন্ন দেশে দ্বিপক্ষীয় সহায়তা বাবদ ২০০০ সাল থেকে চীন মোট ৮৪৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। সে হিসাবে প্রতি বছর ৩৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। চীনের এ খরচের পরিমাণ বিশ্বের বৃহত্তম বৈদেশিক অর্থায়নকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সমান। যদিও দুটি দেশের বৈদেশিক সাহায্যের সংজ্ঞা ভিন্ন, কিন্তু গত দুই দশকে ১৬৫টি দেশে দ্বিপক্ষীয় সহায়তার ১৩ হাজার ৪২৭টি প্রকল্পে যুক্ত থাকার কারণে চীনকে এক্ষেত্রে নতুন বৈশ্বিক নতুন উন্নয়ন অংশীদার বলা যায়। তদুপরি সমসাময়িক এক গবেষণা দেশটির বৈদেশিক উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কে পর্যবেক্ষকদের নেতিবাচক ধারণা চ্যালেঞ্জ করছে।

বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করার চেয়ে চীন মূলত ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে বেশি মনোযোগী বলে সমালোচকরা অভিযোগ করেন। পাশাপাশি সাহায্য গ্রহণকারী দেশগুলোর কী কী ক্ষতি হতে পারে তাও চিহ্নিত করেন। সব ধরনের বৈদেশিক সহায়তার ক্ষেত্রে এ সমালোচনা করা হয়। কিন্তু প্রথম দর্শনে চীনের এ ধরন সন্দেহবাদীদের কাছেও নিরাশাজনক মনে হয়।

প্রথমত, চীনের তিন শতাধিক সরকারি এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান দেশটির তেরো শতাধিক প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। সহযোগিতা প্রকল্পের সঙ্গে বেসরকারি খাতের সামান্য সংযোগ লক্ষ করে একে রাজনৈতিক ফায়দার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সন্দেহের পক্ষে যুক্তি পাওয়া যায়। আবার অন্যান্য দেশের মতো চীন তার সাহায্যের বিনিময়ে গ্রহীতা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এবং রাজনীতির ওপর শর্তারোপ করে না। এখান থেকে সন্দেহ আরো বাড়ে যে চীনের সহযোগিতা ভুল পথে যাবে এবং বৈদেশিক সহযোগিতার উদ্দেশ্য—দরিদ্র দেশগুলোয় টেকসই উন্নয়ন—ব্যাহত হবে।

বৈদেশিক সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে চীনের পদ্ধতিটিও অস্বাভাবিক। চীন সাধারণত বাজারের প্রচলিত সুদের তুলনায় উচ্চহারের ভর্তুকিতে বৃহৎ অবকাঠামো তৈরির উদ্দেশ্যে ঋণরূপে উন্নয়ন-অর্থায়ন করে। চুক্তি অনুসারে সাধারণত শর্ত দেয়া হয়, সাহায্যগ্রহীতা দেশটি অর্থের একটি বড় অংশ কোনো চীনা প্রতিষ্ঠানে খরচ করবে, যারা প্রকল্প সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, শ্রমিক সরবরাহ করবে।

বিস্ময়ের কিছু নেই যে ঋণগ্রহীতা দেশগুলো চীনের প্রতি তাদের ক্রমবর্ধমান ঋণ সম্পর্কে চিন্তিত হবে। এর মধ্যে সমালোচকরা বিতর্ক তোলেন যে চীনের এ সাহায্যের সুবিধাগুলো এখানে স্পষ্ট হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনা শ্রমিকদের নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে গ্রহীতা রাষ্ট্রের সক্ষমতা কমার পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিকদের মজুরি নিম্নমুখী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বর্তমান গবেষণায় দেখা যায়, যদিও এসব উদ্বেগের ক্ষেত্রে কিছু সত্যতা রয়েছে কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, চীনা বৈদেশিক সাহায্যের কিছু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কিন্তু তা মূলত বৈদেশিক প্রভাব অর্জনের চেয়ে অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিরসনে সহায়তা করে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা দমনে কীভাবে চীনা সরকারের তরফ থেকে বড় অংকের বৈদেশিক সহায়তা প্রকল্প আরম্ভ হয়। উদাহরণস্বরূপ, চীনা শ্রমিকরা যখন আন্দোলন করেন, কেন্দ্রীয় সরকার তখন সে অঞ্চলের বড় কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈদেশিক সাহায্য চুক্তি করে। এ কোম্পানিগুলো তখন অতিরিক্ত কর্মী গ্রহণ করে গ্রহীতা রাষ্ট্রে সড়ক, বন্দর, সেলফোন টাওয়ার তৈরির কাজে বেশকিছু বছরের জন্য শ্রমিক ও দ্রব্য পাঠাতে থাকে।

রাজনৈতিক দিক থেকে তাই এ সাহায্য প্রকল্প চীনের জন্য লাভজনক। সাহায্যের এ অর্থ দেশের বেকারত্ব কমাতে সাহায্য করে। এতে সামাজিক সংকট কমে এবং অন্যদিকে গ্রহীতা দেশটিও অর্থায়নের জন্য কৃতজ্ঞ থাকে। আমেরিকার খাদ্য সহায়তাও একই নীতিতে কাজ করে: ভালো উৎপাদনের বছরগুলোয় আমেরিকান সরকার গম কিনে নেয় যেন কৃষকদের জন্য একটি নিরাপদ মূল্য নিশ্চিত করা যায়। পরবর্তী সময়ে সাহায্য হিসেবে উদ্বৃত্ত ফসল দুস্থ দেশে সহায়তা হিসেবে পাঠানো হয়। 

তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক গবেষণা থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, চীনা সাহায্যের কারণে ঋণগ্রহীতা দেশের জিডিপি, খানাপ্রতি ভোগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। তাহলে প্রচলিত ধারণার বিপরীতে বলা যায়, চীনা সহযোগিতার সুফল সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কিছুটা চুইয়ে পড়ছে।

সত্যি বলতে কি, এ তথ্যগুলো মানতে অনেকের কষ্ট হলেও আসলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ এমনকি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও বলেন, দুস্থ দেশগুলোর অর্থনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণই উন্নতির চাবিকাঠি। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যেসব দেশের এ ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন, তারাই সবচেয়ে অকার্যকর প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করে। নিজেদের অবকাঠামো তৈরি করতে না পারা এসব দেশের উন্নতি করতে না পারার প্রাথমিক কারণ। এসব ক্ষেত্রে চীনা সাহায্য একটি সুন্দর সমাধান দিতে পারে। নিজেদের কর্মী ও নির্মাণ সামগ্রী-উপকরণ নিয়ে আসা এবং স্থানীয় জোগানের ওপর নির্ভর না করার কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকতে পারে। এছাড়া গ্রহীতা রাষ্ট্র তার নাগরিকদের উন্নতিতে আগ্রহী না হলেও চীনা সাহায্য থেকে তাদের বিপুল সুবিধা হতে পারে। একটি খনিকে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে নির্মিত রাস্তা আশেপাশে বসবাসকারী মানুষের যাতায়াত সুবিধা দিতে পারে। এতে সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্র তৈরি হয়। সরকারি উদ্দেশ্যে নির্মিত টেলিকম টাওয়ার কৃষকদের জন্য তথ্যের সুবিধা ও বাজারে প্রবেশ সহজ করতে পারে। সড়ক কিংবা রেলওয়েসংলগ্ন পাওয়ার লাইন আলোক ব্যবস্থা সৃষ্টি করে, যার সাহায্যে শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হওয়া সম্ভব।

গবেষকরা এ বিষয়ে আরো গভীর মনোযোগ দিলে চীনা বৈদেশিক সহায়তার ত্রুটিগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কিন্তু চীনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলো সর্বাংশে খারাপ নয়। এটা সত্য যে এ ধরনের সাহায্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কখনো কখনো সহায়তা করে কিন্তু গ্রহীতা দেশের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি নিশ্চিত। যা-ই হোক না কেন, কোনো দাতা দেশই কেবল পরোপকার করতে বৃহৎ বিনিয়োগ করবে না।

গবেষকদের পাওয়া তথ্য অনুসারে বলা যায়, চীনা সাহায্য মূলত উন্নয়ন সহযোগিতার দুর্লভতম উদাহরণ, যেখানে গ্রহীতা দেশকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে উপযুক্ত সুবিধা প্রদান করে। বৈদেশিক সাহায্যের কার্যকারিতা বাড়াতে ইচ্ছুক দেশের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তাদের জন্য লাভজনক হতে পারে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

ন্যান্সি কিয়ান: নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কেলগ স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের ম্যানেজারিয়াল ইকোনমিকস ও ডিসিশন সায়েন্সেসের অধ্যাপক। চায়না ইকোনমিকস ল্যাব এবং নর্থ ওয়েস্টার্নের চায়না ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক

ভাষান্তর: মাহমুদুর রহমান

আরও