বিশ্ব ক্যান্সার দিবস পালিত

ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক

‘আমি আছি, আমি থাকব, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে’—এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বিশ্ব ক্যান্সার দিবস-২০২০ পালিত হয়েছে বৃহস্পতিবার। বাংলাদেশে এ রোগের বিস্তার এরই মধ্যে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, এশিয়া ও আফ্রিকায় ক্যান্সারে মৃত্যুর হার বৈশ্বিক অনুপাতের চেয়ে বেশি। এ দুই মহাদেশে ফুসফুস

আমি আছি, আমি থাকব, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে’—এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বিশ্ব ক্যান্সার দিবস-২০২০ পালিত হয়েছে বৃহস্পতিবার। বাংলাদেশে রোগের বিস্তার এরই মধ্যে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, এশিয়া আফ্রিকায় ক্যান্সারে মৃত্যুর হার বৈশ্বিক অনুপাতের চেয়ে বেশি। দুই মহাদেশে ফুসফুস ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার অন্ত্রের ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। এজন্য যেমন বায়ু, পানিসহ পরিবেশ দূষণ দায়ী, তেমনি খাদ্যশৃঙ্খলে বিষক্রিয়াকেও বিবেচনায় নিতে হবে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষকদের মধ্যে ক্যান্সারের হার বাড়ছে। এজন্য দায়ী রাসায়নিক সার কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও ক্যান্সারের অন্যতম কারণ বলে এরই মধ্যে চিহ্নিত।

ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো প্রাথমিক প্রতিরোধ, সূচনায় ক্যান্সার নির্ণয়, চিকিৎসা প্রশমন সেবা বা পেলিয়েটিভ চিকিৎসা। কিন্তু দেশে ক্যান্সারের জন্য বরাদ্দের সিংহভাগ ব্যয় হয় অবকাঠামো অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের পেছনে। ক্যান্সার নির্ণয় খাতে বরাদ্দ খুবই কম। রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এক্ষেত্রে সরকারের বরাদ্দ আরো বাড়ানো প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি জরুরি ক্যান্সার হওয়ার আগে প্রতিরোধ করা। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি পাঁচজনের একজন পুরুষ এবং প্রতি ছয়জনের একজন নারী ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। আইএআরসির গবেষণায় বলা হয়েছে, হঠাৎ ধনী হওয়া দেশগুলোর মানুষের জীবনমানের (লাইফস্টাইল) পরিবর্তনের কারণেই তারা বেশি করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। একটা সময় এসব দেশের মানুষ প্রয়োজনীয় ন্যূনতম খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেত। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা এবং দেশগুলোয় অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার কারণে তাদের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে স্ফীত হয়েছে। বেড়েছে মাথাপিছু আয়। ফলে তাদের খাদ্যাভ্যাসে এসেছে পরিবর্তন। হঠাৎ করে হাতে অর্থ আসায় বিলাসী খাবারের ভোগ বেড়েছে এবং একই সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রমের পরিমাণও কমে গেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হওয়ায় এসব দেশে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, বেড়েছে ধূমপান। শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ায় বেড়েছে স্থূলতা। একই সঙ্গে বিলাসিতার প্রতি ঝুঁকে যাওয়ায় মদ পান উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, ক্যান্সারের উচ্চহারে আক্রান্তের সঙ্গে ক্যান্সার নির্ণয় (ডায়াগনসিস), প্রতিরোধ ব্যবস্থা চিকিৎসার দৈন্য রয়েছে। প্রবৃদ্ধি বাড়েনি, এমন দেশগুলোর মানুষেরও নানা কারণে ক্যান্সার হচ্ছে। এরা ক্যান্সার নির্ণয়, প্রতিরোধ ব্যবস্থা চিকিৎসা নিতে পারছে না দারিদ্র্যের কারণে। নারীদের মধ্যে ক্যান্সারের প্রবণতা বেশি। এটি নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের পাশাপাশি নিয়মিত বিরতিতে সুনির্দিষ্ট শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

কৃষি খাতে বরাবরই উৎপাদন বাড়ানো প্রাধান্য পেলেও কৃষকের স্বাস্থ্য উপেক্ষিত থেকেছে। দেশ শিল্পায়নমুখী হলেও আরো অনেক দিন কৃষি আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় মাত্রায় থাকবে। কাজেই কৃষকের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি জরুরি। এখন কৃষকের মধ্যে যে ক্যান্সার বাড়ছে, তা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হওয়া দরকার। শুধু রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে, নাকি অন্য কারণেও দীর্ঘস্থায়ী রোগ বাড়ছে, সেটি নির্ণীত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোন ধরনের ক্যান্সারের প্রকোপ বেশি, সেটি চিহ্নিত করতে হবে। কাজেই জনস্বাস্থ্য গবেষকদের এক্ষেত্রে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। কৃষি ক্ষেত্রে রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক গাইডলাইনের আলোকে সময়োপযোগী বাস্তবসম্মত নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণয়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়নও করতে হবে। জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো কীভাবে কৃষিতে রাসায়নিক উপকরণের চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করছে, সেই অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

জাতিসংঘ ঘোষিত সরকার স্বীকৃত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল নির্যাস অর্থাৎ আর্থিক সক্ষমতা নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের রোগ থেকে সুরক্ষা চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সুস্থ হওয়ার অধিকার রয়েছে। মৌলিক অধিকারবলে বিনা মূল্যে সেবা পাওয়ার অধিকারও মানুষের থাকতে হবে। সব ধরনের সুবিধা না পেলেও সরকারি ক্যান্সার হাসপাতালে কিছু সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। সরকারিভাবে কেবল মহাখালীতে রয়েছে ৩০০ বেডের একটি হাসপাতাল। এর বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। ঢাকার বাইরে আটটি বিভাগে আটটি আঞ্চলিক ক্যান্সার কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এরই মধ্যে ঘোষণা করেছেন। এই কেন্দ্রগুলো হওয়া উচিত সমন্বিত। ক্যান্সার প্রতিরোধ, চিকিৎসা, প্রশমন সেবাসহ সব সুবিধা থাকতে হবে এখানে। একই সঙ্গে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য সার্জারি, কেমোথেরাপি রেডিওথেরাপি সুবিধাও যুক্ত করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী পক্ষগুলোকে ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে নিম্ন নিম্নমধ্যবর্তী দেশগুলোয় অর্থনৈতিক সাহায্য অনেক বাড়াতে হবে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ কার্যক্রমে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তা না হলে ক্যান্সার চিকিৎসার চাপে এসব দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। দেশগুলোয় স্থানীয়ভাবে অতি কার্যকরী ক্যান্সার ওষুধ উৎপাদনে উৎসাহ সুষম বিতরণের প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে, শক্তিশালী প্রতিরোধ কর্মসূচি গ্রহণ বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে। ক্যান্সার সমস্যা উত্তরণে সরকার, নীতিনির্ধারক মহল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে জাতীয় ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল পুনর্গঠন কার্যকর করা জরুরি। জাতীয় ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ কৌশলপত্র প্রণয়ন সময়োপযোগী এবং এর আলোকে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। এছাড়া ক্যান্সারের সঠিক পরিসংখ্যান পেতে জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটে চলমান হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনকে ডাটাবেজ নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী করা দরকার।

আরও