অল্প সময়েই ভঙ্গুর দশায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

অদূরদর্শী ও ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা টেকসই অবকাঠামোর অন্তরায়

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। কয়েক দফা সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে অবশেষে ২০১৭ সালে নির্মাণ শেষ হয়েছিল সড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ। কিন্তু চালু হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই অবসান হতে যাচ্ছে এর সক্ষমতা। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে রাটিং দেখা দেয়ার পাশাপাশি মহাসড়কটির ভিত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর মিলছে।

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। কয়েক দফা সময় ব্যয় বাড়িয়ে অবশেষে ২০১৭ সালে নির্মাণ শেষ হয়েছিল সড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ। কিন্তু চালু হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই অবসান হতে যাচ্ছে এর সক্ষমতা। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে রাটিং দেখা দেয়ার পাশাপাশি মহাসড়কটির ভিত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর মিলছে। এটি হতাশাজনক। এতে কাঙ্ক্ষিত সুফলপ্রাপ্তি যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এর সংস্কারে ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। রাষ্ট্রের দিক থেকে এটি বড় ধরনের আর্থিক চাপের বিষয় বৈকি।

সাধারণত ৫০ বা ১০০ বছরের চাহিদা দীর্ঘমেয়াদি সুফল মাথায় রেখে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বৈশ্বিকভাবে এটিই অনুসরিত চর্চা। কিন্তু বাংলাদেশে অনেকটাই এর ভিন্নতা প্রতীয়মান। এখানে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে অদূরদর্শিতা পরিকল্পনাহীনতার ছাপ স্পষ্ট। কোনো প্রকল্পে নকশাতেই ভুল রয়ে যাচ্ছে, আবার কোনোটা বাস্তবায়ন শেষেই ধরা পড়ছে নানা নির্মাণত্রুটি। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়কের ক্ষেত্রেও কিছু ত্রুটি থেকে যাওয়ার বিষয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা অত্যাবশ্যক হলেও সেগুলো উল্লিখিত মহাসড়কের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে আমলে নেয়া হয়নি। এর মধ্যে অন্যতম হলো ট্রাফিক গ্রোথ (যানবাহন চলাচল) সড়ক জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্দেশিকায় মহাসড়কের ট্রাফিক গ্রোথ অন্তত ১০ শতাংশ ধরার নির্দেশনা থাকলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের সময় ডিজাইন ম্যানুয়েলে ট্রাফিক গ্রোথ ধরা হয়েছিল শতাংশ হারে। দুঃখজনকভাবে চালুর পরই চার লেনের মহাসড়কটিতে গাড়ির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশেরও বেশি। ফলে যানবাহনের চাপে এরই মধ্যে ভঙ্গুর দশায় সড়কটি। নকশা প্রণয়নের সময় মহাসড়কটিতে ইকুইভ্যালেন্ট সিঙ্গেল এক্সেল লোড (ইএসএএল) হিসাব করা হয়েছিল ১৩৩ মিলিয়ন। অথচ বর্তমানে তা ১৭৭ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে, যা প্রক্ষেপণের তুলনায় অনেক বেশি। এটি পরিকল্পনায় আগামদর্শিতায় ঘাটতিরই পরিচায়ক। শুধু প্রক্ষেপণ নকশায় ত্রুটি নয়, একইভাবে মহাসড়কটি নির্মাণের বিভিন্ন ধাপেও নিম্নমানের কাজ হওয়ার খবর মিলছে। বিশেষ করে মহাসড়কটির ওয়্যারিং কোর্সের পুরুত্ব ৬০ মিলিমিটারের কম পাওয়া গেছে। মূলত সেখানেই রাটিংয়ের পরিমাণ বেশি দৃশ্যমান। এদিকে আইএমইডির প্রতিবেদনেও আলোচ্য মহাসড়কে কিছু কারিগরি সমস্যার পাশাপাশি কিছু বাস্তব সমস্যা উঠে এসেছে। রাস্তার দুপাশে জনসাধারণের চলাচলের জন্য ফুটপাত নেই। ধীরগতি স্থানীয় গাড়ি চলাচলের বিষয়টি একটি বাস্তবতা হলেও এর জন্য পৃথক কোনো লেনের (সার্ভিস লেন) ব্যবস্থা নেই। রাস্তার উভয় পাশে পানি নিষ্কাশনের নেই কোনো সুব্যবস্থা। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আন্ডারপাসের ব্যবস্থা নেই, নেই পর্যাপ্ত রোড সাইনও। এতে চালকদের অসতর্কতায় চার লেন হওয়ার পরও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। বলা চলে, প্রকৌশল নকশাগত ত্রুটির কারণে মহাসড়কটির স্থায়িত্ব কমার পাশাপাশি দুর্ঘটনা বাড়ছে।

প্রতিটি দেশের বাস্তবতা ভিন্ন হলেও পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন সব পর্যায়ে বিশ্বব্যাপী মহাসড়ক নির্মাণের প্রকৌশলগত কৃেকৗশল একই। বড় কথা, আমাদের সামনে উন্নত দেশসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা সহজেই কাজে লাগানো যেত। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক চর্চাগুলো ঠিকমতো অনুসরিত না হওয়ায় শুরু থেকেই এর উপযোগিতা প্রশ্নের সম্মুখীন। যানবাহনের চাপে অল্প দিনের মধ্যেই সড়কটির আয়ুষ্কাল কমছে। প্রতিটি ধাপে যদি শুরু থেকে প্রকৌশলগত আপসগুলো করা না হতো, তাহলে হয়তো মহাসড়কটি অন্তত আরো কয়েক বছর ভালো অবস্থায় থাকত। জনসাধারণ অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত সেবা পেত। কাজেই পুরো প্রকল্পটির একটি অনুপুঙ্খ পর্যালোচনা জরুরি। আমাদের মতো দেশে নতুন করে কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ নয়। আর্থিক দিক বিবেচনায় সেটি টেকসই সমাধানও নয়। অবস্থায় আপাতত মহাসড়কটি রক্ষণাবেক্ষণে দৃষ্টি দিতে হবে অধিক। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সড়কটির স্থায়িত্বের জন্য দুপাশে সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা এবং যেসব জায়গায় ভেঙে গেছে তা সঠিকভাবে মেরামত করা। সড়কের গুণগত মান ঠিক রেখে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা ধারণক্ষমতার অধিক ভারবাহী যান চলাচল নিষিদ্ধ করা। এছাড়া এজিংগুলো যাতে সরে না যায় তা নিয়মিত তদারক, সংযোগ সড়কগুলো ভালোভাবে পাকা কার্পেটিং করা। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল পূর্ণোদ্যমে চালু হলে সংগত কারণে গাড়ির চাপ আরো বাড়বে। এজন্য মহাসড়কটি আরো প্রশস্ত করার পাশাপাশি সার্ভিস লেন যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এটি ইতিবাচক। সড়ক সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপে মহাসড়কটি আরো টেকসই হবে বলে প্রত্যাশা।

আরও