গত বছর জুলাইয়ের শেষ দিকে বাংলাদেশ সরকার যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য প্রস্তাব পাঠায় তখন অনেক জায়গা থেকেই একটা হায় হায় রব ওঠে। ঋণ চাওয়ার সরকারের এ উদ্যোগের কারণে তখন অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন সরকার কি শিগগিরই অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পতিত হচ্ছে? অবশ্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি সে সময় মোটেই অনুকূলে ছিল না। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সংকট, দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি, সরবরাহজনিত ঘাটতি, প্রতিবেশী পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে নিয়ে শঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছিল। অর্থাৎ তা অনেক বিশ্লেষক এক প্রকার ধরেই নিয়েছেন যে বাংলাদেশ ক্রমেই সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে সব আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে বাংলাদেশ স্থিতিশীল রয়েছে এবং অনেক অর্থনৈতিক সূচকে বৈশ্বিক সংকটের আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। গত বছর নভেম্বরে বাংলাদেশ সরকার ও আইএমএফ ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এ বছর জানুয়ারির শেষ দিকে আইএমএফ চাওয়ার চেয়ে বেশি ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার অনুমোদন করেছে। এ ঋণ সাত কিস্তিতে প্রতি ছয় মাস অন্তর মোট ৪২ মাস সময়ে প্রদান করা হবে। এর জন্য সুদের হার হবে মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণের মেয়াদ হবে ২০ বছর এবং এর সঙ্গে ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। বাদবাকি টাকা ১০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। ঋণের জন্য আইএমএফের অবশ্য ধরাবাঁধা নির্দিষ্ট শর্ত নেই তবে তারা সরকারের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা ও কিছু জায়গায় আরো সংস্কার চেয়েছে। সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিক স্বায়ত্তশাসন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো, মুদ্রা বিনিময় ও সুদের হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসাবের পদ্ধতি সংশোধন, জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানো, করনীতির সংস্কার এবং ভ্যাট আইন নবায়ন ও কার্যকর করা, ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে জিডিপি প্রকাশ করা। এছাড়া বৃহত্তর সামাজিক ও উন্নয়নমূলক ব্যয় বৃদ্ধির জন্য আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কার, জলবায়ুসহিষ্ণুতা বৃদ্ধিও আইএমএফের পরামর্শের মধ্যে রয়েছে। আইএমএফ যে সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে তার প্রায় সবই আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় এবং সরকার অনেক আগে থেকেই এ পদক্ষেপগুলো গ্রহণ শুরু করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সংস্কার একটি মন্থর প্রক্রিয়া এবং এতে অনেক পক্ষ জড়িত থাকে। তবে সরকার যে সংস্কারের জন্য আন্তরিক তা দৃশ্যমান। আইএমএফের চলমান সংস্কার প্রস্তাব সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
এমন নয় যে বাংলাদেশ এই প্রথম আইএমএফের কাছে ঋণ চেয়েছে। বাংলাদেশ বিভিন্ন ধাপে ঋণ গ্রহণ করেছে, সর্বশেষ লোন গৃহীত হয় ২০১২ সালে ৯৮৭ মিলিয়ন ডলার। এর পাশাপাশি অন্যান্য বহুপক্ষীয় সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কাছেও বাংলাদেশ ঋণ চেয়েছে। বাংলাদেশ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে আইএমএফের কাছ থেকে বেশি লোন চেয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এখন বাংলাদেশের কেন আরো বৈদেশিক ঋণ প্রয়োজন, বিশেষত বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান থেকে, সেটা খোলাসা করা প্রয়োজন। আমরা বিভিন্ন দেশ থেকেও ঋণ পাই, যেমন চীন, ভারত, রাশিয়া, জাপান। তবে বহুপক্ষীয় সংস্থা থেকে ঋণ নিলে সুবিধা বেশি।
বৈদেশিক ঋণের ইতিহাস বেশ পুরনো। সভ্যতার শুরুতে বিশেষত গ্রিস ও রোমের শাসকরা বিভিন্ন জাতি বা নগররাষ্ট্র থেকে তখন অর্থ ধার করতেন। মধ্যযুগে ইউরোপীয় রাজা ও বণিকরা ইতালির ব্যাংকারদের কাছ থেকে অর্থ ধার করতেন। ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপে যারা ক্ষমতাশালী ছিলেন তারা তাদের সরকার ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা নিতেন তাদের বৈদেশিক মিশন সফল করার জন্য। উনবিংশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের ফলে রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ ও আধুনিকায়নের জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়। যার ফলে ঋণ গ্রহণ ও প্রদানে নতুন যুগের সূচনা হয়। বিংশ শতাব্দীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুনর্গঠন ও উন্নয়নে বৈদেশিক ঋণ বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৮ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার আইনে সই করেন, যা পরবর্তী সময়ে মার্শাল প্ল্যান নামে পরিচিতি লাভ করে। মার্শাল নামটি তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট জর্জ মার্শালের নামানুসারে রাখা হয়, যিনি ১৯৪৭ সালে প্রথম এ প্রস্তাব পেশ করেন। এ মার্শাল প্ল্যানের অধীনে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো তাদের অর্থনীতি পুনর্গঠনে ব্যাপক ঋণ গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো উন্নত দেশ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দেশ থেকে তাদের উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক ঋণ নেয়।
তবে এর মধ্যে আবার কিছু দেশ কঠিন শর্তের জালে পড়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে ঋণের চক্রে পতিত হয়। গত শতাব্দীর আশি ও নব্বই দশকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের ভার কমানোর জন্য ঋণমুক্তি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। আজ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বৈদেশিক ঋণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন দেশ এখন তাদের উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে আন্তর্জাতিক সংস্থা, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য দেশ থেকে ঋণ গ্রহণ করছে। তা সত্ত্বেও দেশে দেশে এখন নিজেদের সক্ষমতার অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। তাই ঋণ যাতে সহজ শর্তে দেয়া যায় ও পর্যাপ্ত তদারকির ব্যবস্থা থাকে সে ব্যাপারে প্রচেষ্টা চলছে। বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো সাধারণত বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, বাজেট ঘাটতি, লেনদেন ঘাটতি মেটানোর জন্য ঋণ খোঁজে। তাছাড়া কোনো দেশের মুদ্রার বিনিময় ভারসাম্য ও ব্যালান্স অব পেমেন্ট সুরক্ষার জন্যও বৈদেশিক ঋণ লাগে (প্রধানত আইএমএফ থেকে)। এতে অবশ্য ঝুঁকি থাকে তবে সেটা নির্ভর করে সরকারগুলো কতটা ঋণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ তার ওপর।
অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশও অবকাঠামো খাত যেমন সড়ক, ব্রিজ, পাওয়ার প্লান্ট ও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের বড় প্রকল্পগুলোয় বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে আমাদের ‘বৈদেশিক ঋণ’ জিডিপি অনুপাত ছিল ১৭ শতাংশ। আইএমএফের হিসাবে তা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নেয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ১১১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সাহায্য পেয়েছে। অনুদান ও ঋণ দুটোই ধারাবাহিকভাবে পেয়েছে। তবে শুরুতে অনুদানের পরিমাণ বেশি ও ঋণের পরিমাণ খুব কম থাকলেও এখন ঋণ প্রায় ৯৮ শতাংশ। আমাদের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের আশপাশে থাকে। তার মধ্যে ২ শতাংশের অর্থায়ন হয় বৈদেশিক সাহায্য থেকে। এর মধ্যে জুন ২০২২ পর্যন্ত মোট সাহায্যের ৪০ শতাংশ দ্বিপক্ষীয় ও ৬০ শতাংশ বহুপক্ষীয়। বহুপক্ষীয় ঋণের মধ্যে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ সবচেয়ে বেশি যা মোট ঋণের যথাক্রমে ৩২ দশমিক ৩৩ ও ২৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। দ্বিপক্ষীয় লোনের মধ্যে জাপানের সবচেয়ে বেশি প্রায় ১৮ শতাংশ। গত বছর আমরা ১০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা পেয়েছি এবং পাইপলাইনে রয়েছে আরো ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপর। সুখের বিষয় হলো, বাংলাদেশ গত ৫০ বছরে কোনো বছর ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। আইএমএফের হিসাবে আর্টিকেল ফোরের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২২ সালে বাংলাদেশের পাবলিক ঋণ (অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক) জিডিপি হার ৪২ শতাংশ, তার মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ১৭ শতাংশ। ২০১০ সালের বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের জন্য নিরাপদ পাবলিক ঋণ (বৈদেশিক + দেশজ) জিডিপি হারের সীমা হচ্ছে ৭৭ শতাংশ, আর উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এ হার ৬৪ শতাংশ। কাজেই অভ্যন্তরীণ ঋণ বাদ দিলেও আমাদের প্রচুর বৈদেশিক ঋণ নেয়ার সুযোগ আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে গতিতে চলছে তা টেকসই করতে অবকাঠামোগত স্বল্পতা মোকাবেলা, বাজেট ঘাটতি পূরণ ও বন্দর সুবিধা সৃষ্টির জন্য বৈদেশিক ঋণ ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ উভয়ই প্রয়োজন।
আমাদের অনেকের মধ্যে ঋণ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। বিশেষ করে শ্রীলংকা পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষ এখন ঋণকে বোঝা হিসেবে বিবেচনা করছে। বৈদেশিক ঋণ নিয়ে অনেক দেশ উন্নত হয়ে গেছে, আবার অনেক দেশ নিঃস্ব হয়ে গেছে এমন নজির আছে। যেমন নাইজেরিয়া, মিসর বৈদেশিক ঋণ তেমন কাজে লাগাতে পারেনি, হালে শ্রীলংকাও ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টা নির্ভর করে ঋণ কীভাবে কোন কাজে লাগানো হচ্ছে। জাপানে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ জিডিপির ২৬৬ শতাংশের বেশি, দক্ষিণ কোরিয়ায় তা ৪৭ শতাংশ। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকার ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ৮০, ৭৮ ও ১৩১ শতাংশ। পদ্মা সেতু বাদে আমরা যতগুলো মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছি তার সবগুলোই প্রায় বড় অংশ বৈদেশিক ঋণ নিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সে কারণেই গত কয়েক বছর বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। সংকট ছাড়াও সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ঋণ গ্রহণ করে থাকে। যেমন সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাদের বড় অংকের ঋণ-জিডিপি অনুপাত দেখলেই তা বোঝা যায়।
বিদেশী ঋণ তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তা বা রেয়াতি ধরনের। তার কারণ বাজারের বিদ্যমান সুদহার থেকে এ হার অনেক কম। যেমন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) অর্থায়নের ক্ষেত্রে সাধারণ যে সেবা, ইউএস ডলারের ক্ষেত্রে সুদের হার ১ শতাংশের সামান্য বেশি। দ্বিপক্ষীয়ভাবে জাপান থেকে বাংলাদেশ যে ঋণ পায় তা আরো কম হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে জাপান বাংলাদেশকে ২ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের যে সহযোগিতা দিচ্ছে তার সুদের হার মাত্র প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার বাংলাদেশকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৭০০ মিলিয়ন ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে সুদের হার হবে প্রতি বছরে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে দেশের সাধারণ ব্যাংকগুলো থেকে এ ঋণ নিলে খরচ পড়বে গড়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ জুন ২০২২ পর্যন্ত যে বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে তার গড় সুদের হার ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। স্বল্প সুদহার বিদেশ থেকে ঋণ নেয়ার অন্যতম যুক্তি।
বৈদেশিক ঋণ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদের জন্য দেয়া হয়। যেমন বিশ্বব্যাংকের লোনের ক্ষেত্রে মেয়াদ ২৫ থেকে ৪০ বছর মেয়াদি হয়। তাছাড়া এর সঙ্গে গ্রেস পিরিয়ড ৫ থেকে ১০ বছর অন্তর্ভুক্ত থাকে। উল্লিখিত দক্ষিণ কোরিয়ার যে লোনের কথা বলা হলো তার মেয়াদ গ্রেস পিরিয়ডসহ ৪০ বছর। মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে জাপান থেকে যে লোন নেয়া হয়েছে তার মেয়াদ ২০ বছর। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত যে ঋণ নিয়েছে তার গড় মেয়াদ ছিল ২৮ বছর এবং গ্রেস সময়কাল সাড়ে সাত বছর। বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে কিছু শর্ত থাকে এবং বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই তা শর্তাধীন দেশের জন্য মঙ্গলজনক এবং এতে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি জ্ঞান আদান-প্রদানের বিষয় থাকে যার ফলে আমরা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিতি লাভ করতে পারি। আমরা ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সঙ্গে পরিচিত হই। আমাদের দেশে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা বরাবরই বিদেশী বিশেষজ্ঞ এবং কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা পেয়েছি। তাছাড়া ঋণের মাধ্যমে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তার গুণগত মান বজায় থাকার সম্ভাবনা বেশি এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে তদারকি বেশি থাকে বিধায় প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হয়। আমরা ২০৩১ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ডে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশ হতে চাই। সেজন্য এখন অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রচুর বিনিয়োগের প্রয়োজন। তাছাড়া শুধু ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে ১৭ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হবে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-এর লক্ষ্য কাউকে পেছনে ফেলে নয় বাস্তবায়নের জন্যও আমাদের বৈদেশিক ঋণ প্রয়োজন। বিগত সময়ে বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে বাংলাদেশে বড় বড় সংস্কার বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে অবশ্য সরকারগুলোর সদিচ্ছা ছিল। আইএমএফের লোন অনুমোদনের পর অন্যান্য সংস্থাও বাংলাদেশকে আরো ঋণ প্রদানে এগিয়ে আসছে। আইএমএফের ঋণপ্রাপ্তির ফলে আমাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা সম্পর্কে সব দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ঋণদান সংস্থাগুলোর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে বাংলাদেশের প্রতি। এটি এ ঋণপ্রাপ্তির বড় অর্জন মনে করি। এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা ও এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ অতীতে কখনো ঋণ দুর্দশায় পতিত হয়নি এবং অদূরভবিষ্যতেও এর সম্ভাবনা কম। এখনকার এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে দেশে সামগ্রিক বিনিয়োগে অর্থ সঞ্চালন বা প্রবাহ বৃদ্ধি আমাদের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির পূর্বধারায় ফিরিয়ে নিতে সহায়তা করবে। তবে ঋণ ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের জোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখতে হবে।
ড. শামসুল আলম: প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়
একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য