‘পালাবি কোথায়’, বাংলা সিনেমার একটা বহুল ব্যবহৃত সংলাপ। এই সংলাপটি এখন নগরবাসী তথা বাংলাদেশের মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে খুবই প্রাসঙ্গিক। দিনকে দিনই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে করোনা পরিস্থিতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বেরোনোর ঝুঁকিও বাড়ছে। করোনা থেকে বাঁচতে হলে ঘরবন্দি থাকাটাই এখন একমাত্র পথ। কিন্তু সমস্যাটা ঘরের নিরাপত্তা নিয়ে। ঘরে যে এডিস মশা ওঁৎ পেতে বসে নেই, সে নিশ্চয়তা কোথায়?
আগের বছরের তুলনায় এ বছরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরো বিপজ্জনক মাত্রায় বাড়তে পারে, বলা হচ্ছে এমন আশঙ্কার কথা। গত কয়েকদিনে মিডিয়াতে এই সংক্রান্ত অনেকগুলো রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। ডেঙ্গুর আগ্রাসন বাড়তে শুরু করে এপ্রিল মাস থেকে। অক্টোবর পর্যন্ত মহা দাপটে রাজত্ব করে প্রাণঘাতী ডেঙ্গু। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হলে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার লার্ভার প্রজনন সক্ষমতা নেয় উচ্চ মাত্রা। চলতি এপ্রিল মাসে যেমন তাপমাত্রা বেড়েছে তেমনি বৃষ্টিও হচ্ছে। সবমিলিয়ে বিরাজ করছে এডিস মশার বংশবৃদ্ধির আদর্শ পরিবেশ।
গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এবছরে এখন পর্যন্ত (জানুয়ারি থেকে চলতি এপ্রিল) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ২৮১ জন। শুধু এপ্রিল মাসেই ১৭ তারিখ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮ জন। আমাদের দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ নিয়ে ২০১৯ সালের প্রথম তিন মাসের সঙ্গে এ বছরের (২০২০) প্রথম তিন মাসের একটা তুলনা করা যাক: বাংলাদেশে গত বছর প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৮। আর এ বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এই তিন মাসে হাসাপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ২৬৩। যার অর্থ এই সময়ে গত বছরের চেয়ে এবারে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ/ছয় গুণ বেশি। পত্রিকার রিপোর্ট অনুসারে বিশেষজ্ঞদের বয়ানে, গত বছর প্রথম তিন মাসে এডিস মশার ঘনত্ব ছিল গড়ে পাঁচ/সাড়ে পাঁচ। একই সময়ে এই বছরে ঘনত্ব ১০।
গত বছর ডেঙ্গুর অভিজ্ঞতা আমাদের সবার স্মৃতিতেই টাটকা। ২০১৯ সালে আমাদের দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন লক্ষাধিক মানুষ। মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় তিনশ। গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কতটুকু শিক্ষা নিয়েছি সে প্রশ্নটা এসেই যায়। এবার শীত শেষ হওয়ার আগে থেকেই মশার উপদ্রব বেড়েছে ভয়াবহভাবে। কিন্তু মশা নিধনে সিটি করপোরেশনগুলোর তৎপরতা নেই বললেই চলে। ডেঙ্গু সচেতনতা তৈরিতে তেমন কোনো প্রচরণার উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়।
বিশ্বব্যাপী করোনা হানা দেয়ার সময়ে বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকরা যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে বলে আশ্বস্ত করেছিলেন জনগণকে। কিন্তু করোনা যখন দেশের সীমানার মধ্যে প্রবেশ করল তখন দেখা গেল প্রস্তুতির যে গালভরা বুলি তা শুধুই কথার কথা। করোনার আওয়াজে ডেঙ্গুর পদধ্বনি হয়ত দায়িত্বপ্রাপ্তদের কান অবধি পৌঁছাচ্ছে না। তাতে কিন্তু নীরব ঘাতক এডিসের এগিয়ে চলা থামছে না।
গতবছর ডেঙ্গু রোগীদের বাঁচানোর জন্য প্রাণপাত করেছিলেন ডাক্তাররা। মারা গিয়েছিলেন অনেক চিকিৎসক। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা অন্তত চিকিৎসা পেয়েছিলেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পেরেছিলেন বেশিরভাগ আক্রান্তই। এবারের বাস্তবতা কিন্তু আরো কঠিন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলি, বর্তমানে হাসপাতালে রোগী নিয়ে গেলে প্রথমেই জানতে চাওয়া হচ্ছে, রোগীর জ্বর আছে কি-না। এসময়ে এমনিতেই চিকিৎসা সেবা পাওয়াটা হয়ে উঠেছে ভীষণ দুরহ। আর রোগীর জ্বর আছে শুনলে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে সেটা ভাবলেই শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে। বলাবাহুল্য, করোনার প্রাথমিক সিনড্রোম জ্বর আবার ডেঙ্গুরও তাই। এসময়ে ডেঙ্গু রোগীদের হাসপাতালে সুচিকিৎসা পাওয়াটা কতটা কঠিন হবে, সেটা অনুধাবন করতে প্রয়োজন পড়ে না বিশেষজ্ঞ হওয়ার।
এমনিতেই আমাদের করোনা টেস্টের সামর্থ্য সীমিত। গত কয়েকদিন ধরে আড়াই হাজারের মতো নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। সহজ কথায় ব্যাপকভাবে করোনা আক্রান্ত কি-না এই টেস্ট করাও আমাদের সাধ্যের বাইরে। আর তাই কেউ জ্বর নিয়ে হাসপাতালে গেলে, করোনা সংক্রমণের ভয়টা শুরুতেই কাজ করবে।
করোনা মোকবেলায় আমাদের প্রস্তুতির যে ঘাটতি আছে সেটা আর নতুন করে বলার কিছু নেই। এর সঙ্গে আমাদের অসচেতনায় বাইরের পরিবেশটা হয়ে উঠেছে বিপজ্জনক মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ। জানাজায় লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণ, ত্রাণের জন্য সহায্যার্থীদের ভিড় কিংবা দোকান, বাজার, সুপার শপগুলোতে উপচে পড়া ভিড়- এগুলো নৈমিত্তিক দৃশ্য। বাইরের এই চরম ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্য খিল এঁটে ঘরে বসে থেকেও নিস্তার পাওয়া যাবে সে ভরসা কোথায়? ঘরের মধ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মশককুল। কর্পুর মেশানো গোলাপজল, ধুপ দেয়া, আগরবাতি জ্বালানো সঙ্গে ড্রাগন কয়েল, গুডনাইটের ব্যবহার কোনো কিছুতেই দমানো যাচ্ছে না মশককুলকে। বাঁচতে হলে শুধু খিল এঁটে ঘরে বসে থাকাটাই যথেষ্ট নয়।
গত বছর ডেঙ্গুর মহামারীর সময় একজন মন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছিলেন মশারির মধ্যে থাকতে। ঘরে খিল এঁটে ২৪ ঘণ্টা মশারির মধ্যে থাকাটাই বোধকরি আমাদের একমাত্র বিকল্প! ঘরের বাইরে মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে ভাইরাস। ঘরের ভিতরে দংশনের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে এডিস মশা। এ যেন ‘জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ’ এই প্রবাদের দশা এদেশের মানুষের।