১৫
মার্চ ছিল
বিশ্ব ভোক্তা
অধিকার দিবস।
১৯৬২ সালের
এই দিনে
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট
কেনেডি কংগ্রেসের
প্রতি এক
বিশেষ বার্তায়
আনুষ্ঠানিকভাবে ভোক্তা
অধিকার নিয়ে
বিশদ আলোচনা
করেন। এ
ধারণা থেকে
অনুপ্রাণিত হয়ে
প্রায় দুই
দশক পর
১৯৮৩ সাল
থেকে ‘ওয়ার্ল্ড
কনজিউমার রাইটস
ডে’ পালন
করা হয়।
দিনটি বিশেষভাবে
মনে করিয়ে
দেয় আমাদের
সবারই এক
সাধারণ পরিচয়—আমরা
ভোক্তা। বিশ্বায়নের
যুগে একজন
ভোক্তার সুবিধা-অসুবিধার
ব্যাপ্তি শুধু
নিজ এলাকা
বা দেশের
ভৌগোলিক সীমানায়
আবদ্ধ নয়;
বরং দুনিয়ার
আনাচেকানাচে ছড়িয়ে
আছে। আমরা
সবাই ভোক্তা
হওয়া সত্ত্বেও
‘ভোক্তা’
হিসেবে রাজনৈতিক
পরিচয় বা
সংগঠন তেমন
প্রবলভাবে গড়ে
ওঠেনি; অথচ
সরকারি-বেসরকারি
সব প্রতিষ্ঠানের
সিদ্ধান্ত ও
কর্মকাণ্ডের ফল
প্রত্যক্ষ ও
পরোক্ষভাবে ভোক্তার
ওপরেই আরোপিত
হয়। সাম্প্রতিককালে
ভোক্তার আচরণ,
খেয়ালখুশি জানতে
এবং নিয়ন্ত্রণ
করতে ‘অ্যালগরিদম’-এর
ব্যাপক ব্যবহার
নতুন অনেক
প্রশ্নের উদ্রেক
করেছে। দুনিয়াজুড়ে
ই-কমার্সের
উত্তরণে প্রশ্নগুলোর
উত্তর জানা
ভোক্তা অধিকারের
একেবারে কেন্দ্রে
চলে এসেছে।
অনেক দেশে
তাই অ্যালগরিদম
আমলে নিয়ে
ভোক্তা অধিকার
নিশ্চিত করতে
গাইডলাইন দেয়া
হচ্ছে।
অ্যালগরিদমের ভিত্তিতে
কনজিউমারদের সঙ্গে
লেনদেন, আদান-প্রদানের
মূলে আছে
ডাটা থেকে
বের করা
কিছু নিয়ম
এবং তার
নিয়মিত ব্যবহার।
এটাকে অটোমেটেড
বা স্বয়ংক্রিয়
সিদ্ধান্ত বলতে
পারেন। এ
রকম অটোমেডেট
সিদ্ধান্তের পদ্ধতি
কিন্তু নতুন
নয়। অটোমেশনে
অনেক পক্ষপাতদুষ্ট
আচরণ প্রাতিষ্ঠানিক
রূপলাভ করতে
পারে। এ
তর্কও জারি
আছে অনেকদিন
ধরে। যেমন
আমেরিকায় ফেয়ার
ক্রেডিট রিপোর্টিং
অ্যাক্ট (১৯৭০)
এবং ইক্যুয়াল
ক্রেডিট অপরচুনিটি
অ্যাক্টে (১৯৭৪)
স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের
অসুবিধা নিয়ে
বেশ আলোচনা
হয়েছে। আমেরিকার
‘ফেয়ার
ট্রেড কমিশন’
এ বিষয়ে
বেশ অগ্রণী
ভূমিকা পালন
করছে। তার
ডিরেক্টের এন্ড্রু
স্মিথ অভিজ্ঞতার
ভিত্তিতে বিভিন্ন
খুঁটিনাটি বিষয়
সহজে তুলে
ধরেছেন। তাছাড়া
অ্যালগরিদম ও
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার
সঙ্গে যে
সামাজিক আচরণের
বিজ্ঞান—কম্পিউটেশনাল
সমাজবিজ্ঞান, তাতেও
এ ধরনের
সমস্যার গবেষণা
হচ্ছে। তার
ভিত্তিতে অ্যালগরিদম
ব্যবহার করে
ভোক্তার তথ্য
ও আচরণ
প্রভাবিত করার
ক্ষেত্রে তিনটি
বিষয় ভাবতে
হবে—ন্যায্যতা,
স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা।
একটা ছোট
উদাহরণের সঙ্গে
আলোচনা করছি।
একটি
উদাহরণ
যেকোনো
অ্যালগরিদমের পেছনে
লুকিয়ে আছে
কিছু ডাটা।
আর ডাটা
মানেই হলো
অতীত। কিন্তু
আমরা আজকের
সিদ্ধান্ত নিই
ভবিষ্যতের আচরণের
অনুমান করে।
সেই অনুমানের
জন্য আমরা
অতীতকে ব্যবহার
করি ভবিষ্যতের
নির্দেশক হিসেবে।
মনে করুন
আপনি কোনো
ব্যাংকের একজন
লোন অফিসার
বা ঋণ
কর্মকর্তা। আগে
আপনার ব্যাংক
লোন দেয়ার
সময় বা
নতুন ব্যাংক
অ্যাকাউন্ট খোলার
সময় ভোক্তাদের
কাছ থেকে
লিঙ্গ, বয়স,
অবস্থান (ভৌগোলিক),
আয় ইত্যাদি
তথ্য সংগ্রহ
করত। এখন
আপনি অতীতের
এ তথ্য
থেকে দেখতে
চান কোন
কোন তথ্য
ব্যাংকের ভালো
ভোক্তাকে নির্দেশ
করে। কম্পিউটারের
বিভিন্ন সফটওয়্যারকে
বললেন ডাটা
থেকে প্যাটার্ন
বের করে
দিতে। সমস্যা
হলো যেসব
আয়, বয়স,
লিঙ্গ বা
এলাকার মানুষ
আগে একেবারেই
কোনো রকম
খদ্দের হিসেবে
ছিল না,
তাদের তথ্যই
তো নেই।
ফলে তাদেরকে
সংযুক্ত করে
প্যাটার্ন বের
করাই তো
সম্ভব না।
এ চিন্তাভাবনা
থেকে আপনি
উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপকদের
বললেন আরো
তথ্য লাগবে;
তাদের বললেন
অন্য ব্যাংক,
কোম্পানি বা
অন্য কোনো
থার্ড পার্টি
থেকে আরো
বিস্তারিত ডাটা
জোগাড় করে
ডাটাকে আরো
সমৃদ্ধ ও
অন্তর্ভুক্তিমূলক করা
যায় কিনা।
ন্যায্যতা
উল্লিখিত
উদাহরণ থেকেই
আমরা ন্যায্যতা,
স্বচ্ছতা ও
দায়বদ্ধতা নিয়ে
আলোচনা করতে
পারি। ন্যায্যতা
নিশ্চিত করতে
গেলে খেয়াল
রাখতে হবে
কোনো সংরক্ষিত
বা ক্ষুদ্র
জাতিগোষ্ঠীর বা
এলাকার মানুষ
যেন ডাটা
এবং তা
থেকে বানানো
নিয়ম দিয়ে
বৈষম্যের শিকার
না হয়।
অ্যালগরিদম বানানোর
সময় তথ্য
ইনপুট করার
সময় সতর্কতার
পাশাপাশি আউটকাম
বা ফলাফল
কী আসে
তাও দেখতে
হবে। যদি
বিশেষভাবে সংরক্ষিত
জাতি-গোষ্ঠী
বা এলাকার
লোকজনের ওপর
তথ্য না
থাকে বা
অসম/অসম্পূর্ণ
তথ্য থাকে,
তবে সিম্যুলেটেড
ডাটা দিয়ে
দেখতে পারেন
অ্যালগরিদম কেমন
আউটপুট দিচ্ছে।
দেখেন আউটপুট
বৈষম্যমূলক কিনা।
যদি সিম্যুলেশন
করতেই হয়,
তবে বিভিন্ন
অনুমান পরিবর্তন
করে দেখতে
হবে ফলাফলে
কোনো তাত্পর্যপূর্ণ
পরিবর্তন আসছে
কিনা। আবার
ভোক্তার কোনো
তথ্য অসম্পূর্ণ
থাকলে অ্যালগরিদম
তৈরির সময়
ভোক্তাকে সম্পূর্ণ
করার সুযোগ
দিতে হবে;
না হলে
ন্যায্যতা নিয়ে
প্রশ্নবোধক চিহ্ন
রয়ে যায়।
স্বচ্ছতা
ভোক্তাকে
সোজাসুজি বলুন
আপনি কেন,
কীভাবে স্বয়ংক্রিয়
টুল এবং
অ্যালগরিদম ব্যবহার
করছেন। এ
টুলকে ট্রেনিং
দেয়ার জন্য
কী ডাটা
ব্যবহার হয়েছে।
এসব বিষয়ে
ছলনা, প্রতারণার
আশ্রয় নেবেন
না। ডাটা
সংগ্রহে কোনো
ব্যক্তি গোপনীয়তা
লঙ্ঘন না
করতে সক্রিয়
থাকুন। কোনো
সংবেদনশীল ডাটা
সংগ্রহ করলে
তা নিয়ে
লুকাছাপা না
করে স্বচ্ছ
থাকুন। থার্ড
পার্টি বা
তৃতীয় পক্ষ
থেকে ডাটা
নিয়ে কাজ
করলে তা
থেকে কোনো
ক্ষতিকর ঘটনা
ঘটার সম্ভাবনা
থাকলে তা
ভোক্তার সঙ্গে
আলোচনা করুন।
ডাটা তৃতীয়
পক্ষের হলেও
তা ব্যবহারের
দায় সম্পূর্ণ
আপনার ও
আপনার প্রতিষ্ঠানের।
দায়বদ্ধতা
অ্যালগরিদম
দিয়ে ভালো
সিদ্ধান্ত নেয়ার
জন্য বাহবা
নিলেও অ্যালগরিদম
যখন ভুল,
একপেশে ও
বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের
দোষে দুষ্ট
হয়, তখন
ব্যবস্থাপকের ‘ইট
ওয়াজন্ট মি’
মনোভাব পরিহার
করতে হবে।
মনে রাখতে
হবে অ্যালগরিদম
ট্রেনিং করার
পেছনে আছে
মানুষ, তারাই
তথ্য দিয়ে,
নিয়ম দিয়ে
অ্যালগরিদমকে সমৃদ্ধ
বা অসমৃদ্ধ
করে। প্রতিষ্ঠানের
মধ্যে কারা
সেই দায়িত্ব
নেবে, কেন
নেবে এবং
কীভাবে নেবে
তা সোজাসুজি,
খোলাখুলিভাবে নিশ্চিত
করতে হবে।
এসব বিষয়
বিস্তারিতভাবে লিখিত
থাকলে অনেক
ঝুঁকি কমে
আসবে। প্রসঙ্গত,
এক্ষেত্রে এন্ড্রু
স্মিথের প্রশ্নগুলো
আমার প্রয়োজনীয়
মনে হয়েছে।
(১) যে
ডাটা থেকে
কানুন বের
করেছেন, তা
আদৌ প্রতিনিধিত্বশীল
কিনা?
(২) ডাটাতে
কিছু পক্ষপাত
থেকে যায়,
তা জানেন
কিনা? আপনি
যখন মডেল
তৈরি করেছেন,
তা ধর্তব্যের
মধ্যে আনছেন
কিনা।
(৩) মডেল
থেকে যে
নিয়ম বের
করছেন তার
প্রিডিকশন (ভবিষ্যদ্বাণী
করার) দক্ষতা
কেমন।
পরিশেষে, অ্যালগরিদম
সিদ্ধান্তে সহায়তা
করলেও তার
ন্যায্যতা ও
স্বচ্ছতা নিশ্চিত
করার দায়িত্ব
ব্যবস্থাপক ও
প্রতিষ্ঠানের। এক্ষেত্রে
সক্রিয় জবাবদিহিতা
নিশ্চিত করতে
না পারলে
আইনি ও
দুর্নামের ঝুঁকি
আছে।
আব্দুল্লাহ শহীদ: পিএইচডি গবেষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, কর্নেল ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র