আলোকপাত

সংকট, সংস্কার ও প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়

সারা বিশ্বের অর্থনীতি এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। কিন্তু বৈশ্বিক সংকট থেকে বাংলাদেশের সংকটের মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে যে সংকট দেখা যাচ্ছে তাকে অনেকেই বাইরের সংকটের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন। আবার অনেকেই বলছেন অভ্যন্তরীণ কারণে সংকটটি সৃষ্টি হয়েছে।

সারা বিশ্বের অর্থনীতি এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। কিন্তু বৈশ্বিক সংকট থেকে বাংলাদেশের সংকটের মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে যে সংকট দেখা যাচ্ছে তাকে অনেকেই বাইরের সংকটের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন। আবার অনেকেই বলছেন অভ্যন্তরীণ কারণে সংকটটি সৃষ্টি হয়েছে। 

অনেকে প্রশ্ন করছেন সংকটের সূত্রপাত কোথায়? এটা ভুল প্রশ্ন। কারণ সংকটের কোনো একক সূত্র নেই, অর্থাৎ সংকটের সূত্র দেশের ভেতর ও বাইরে—উভয় থেকেই এসেছে। মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত সংকট মোকাবেলায় দেশের সক্ষমতা কতটা? আমাদের সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা বা শক্তি থাকলে বড় ধরনের সংকট এলেও তো কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না। কিন্তু যদি সংকট মোকাবেলার শক্তি বা সক্ষমতায় দুর্বলতা থাকে তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণেই সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। সক্ষমতা বাড়ানোর উপায়ও খোঁজা প্রয়োজন। 

এটা পরিষ্কার বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি সম্পর্ক রয়েছে। তবে বহির্বিশ্বের কথা বলে অভ্যন্তরীণ সংকটকে এড়িয়ে গেলে চলবে না। অভ্যন্তরীণ সংকটের বিষয়গুলোও আমাদের ভাবাচ্ছে বেশি। সংকটগুলো হলো—অদক্ষ ব্যয়, ধারাবাহিক অপচয়, দুর্নীতি, সঠিক প্রকল্প নির্বাচনের ব্যর্থতা, বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা, বিনিয়োগের উপযোগিতা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সরকার অনেক অর্থ ব্যয় করে কোনো এক স্থানে হাসপাতাল তৈরি করল। অবকাঠামো নির্মাণ করা হলো কিন্তু এর জনবল, যন্ত্রপাতি দেয়া হলো না, তাহলে সেটি কার্যকর হাসপাতাল হয়ে উঠবে না। এ ধরনের বিনিয়োগের ইকোনমিক রিটার্ন খুবই খারাপ হবে। বিনিয়োগ করতে হবে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায়, বিনিয়োগ করতে হবে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরিতেও। আবার জনবল তৈরিতে বিনিয়োগ করলেই হবে না প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলোও উন্নত করতে হবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকে দুভাবে দেখা যেতে পারে। এক. শক্ত বিনিয়োগ (হার্ড ইনভেস্টমেন্ট) দুই. নরম বিনিয়োগ (সফট ইনভেস্টমেন্ট)। অবকাঠামো নির্মাণ হার্ড বিনিয়োগ আর সফট বিনিয়োগ হলো জনবল তৈরি। এক্ষেত্রে শুধু হার্ড বিনিয়োগ করলে হাসপাতালটি সফলভাবে চলবে না, সফট বিনিয়োগও করতে হবে। আমরা প্রায়ই পত্রপত্রিকায় দেখছি সদ্য নির্মিত সড়ক কয়েক মাসের মধ্যে ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের রাস্তার গড় আয়ু কত? আগে কত কিলোমিটার রাস্তা তৈরিতে কত ব্যয় হতো—এমন প্রশ্ন থাকলেও এখন প্রশ্ন করা হচ্ছে রাস্তা বা সড়ক কতদিন টিকছে? 

সংস্কারের নানা মাত্রা ও দিক রয়েছে। বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় জিডিপি বিনিয়োগ অনুপাত। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ কয়েক বছর ধরে জিডিপির ২১ থেকে ২২ শতাংশের মধ্যে আটকে রয়েছে। সন্দেহ নেই এর অন্যতম কারণ দুর্বল ব্যবসায়িক পরিবেশ। ব্যবসায়িক পরিবেশের মধ্যে অনেক কিছু আছে। প্রাতিষ্ঠানিক যে আইন দরকার ছিল সেটি নেই। এটা এক ধরনের সুষ্ঠু পরিবেশের বিষয়। আরো একটা বিষয় হচ্ছে, ওয়ান স্টপ সার্ভিস বলে কোনো কিছু চালু করা যাচ্ছে না। যতই ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হোক না কেন উদ্যোক্তাদের ১২ বা ১৫টা জায়গায় যেতে হচ্ছে। এসব কারণে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও হচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বিভিন্ন খাতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতি ক্ষেত্রে সক্ষমতা ও দক্ষতার ব্যাপক অভাব লক্ষণীয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি বা সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়—এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড কেমনভাবে চলছে তা আমাদের কারো অজানা নয়। 

সব মিলিয়ে সংস্কারের বিষয়টা এখন আর আমাদের চয়েস বা পছন্দের বিষয় না—যে ইচ্ছা হলো করলাম বা ইচ্ছা না হলে করলাম না। সংস্কারের এখন বহুমাত্রিক গুরুত্ব পেয়েছে। কয়েক বছর আগে থেকেই আমরা সংস্কারের কথা বলে আসছিলাম। কারণ আমরা অভ্যন্তরীণ অনেক বিচ্যুতি দেখছিলাম। যেমন বৈষম্য বেড়ে গেছে, দুর্নীতি বেড়ে গেছে ইত্যাদি। স্বাধীনতা অর্জনের সময় যে সূচকগুলোও গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল অর্থাৎ বৈষম্যহীন সমাজ, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ইত্যাদি সেগুলো এখন বাস্তবে অনুপস্থিত ও নীতি মনোযোগের বাইরেও। উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি এবং সামাজিক পুঁজি যেন বড় ভূমিকা রাখতে পারে তার পরিবেশ তৈরিতে সংস্কারের দাবি ছিল আমাদের। কিন্তু সংস্কার হয়নি। 

স্পষ্টতই সংস্কারের প্রয়োজনটা অভ্যন্তরীণ। বৈষম্য কমাতে যেমন সংস্কার প্রয়োজন তেমনি অর্থনৈতিক গতি বাড়াতেও সংস্কার প্রয়োজন। এখন নতুন যে সংকট তৈরি হয়েছে বিশেষ করে জীবনমান বজায় রাখা এবং তার সূত্র ধরে ডলার সংকটসহ আরো সংকট দেখা দিয়েছে, সেগুলো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে দ্বিগুণ করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোন সংস্কারগুলো আগে করা দরকার। সংস্কারকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ভাগে ভাগ করাই ভালো। স্বল্পমেয়াদি সংস্কার এখনই শুরু করা প্রয়োজন। আর দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কিছুটা চিন্তাভাবনা করে সময় নিয়ে করতে হবে। কিন্তু সরকার সংকট মোকাবেলার জন্য সংস্কারের পথে না হেঁটে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে ব্যস্ত। এটি টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য সহায়ক নয়। সরকার মূলত অর্থনীতির চাকা থামিয়ে দিয়ে সংকট মোকাবেলার চেষ্টা করছিল। ডলার সংকটের কারণে আমদানি পুরোপুরি বন্ধ না করেও যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে অর্থনীতির রসদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে শিল্পের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর্মসংস্থান ও আয়ে তার প্রভাব পড়বে। এতে করে অর্থনীতি আরো স্থবিরতার দিকে এগিয়ে যাবে। এটি একটি দুষ্টচক্র। আমাদের অর্থনীতি চলার স্বাভাবিক রসদগুলো বৈদেশিক ডলারের রিজার্ভের ওপর নির্ভরশীল। 

অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে না গিয়ে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রবৃদ্ধিকে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে এতে সুফল মিললেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে এমন পদক্ষেপ। এলসি পেমেন্টে সময় বাড়ানো হচ্ছে। কিছু পেমেন্ট বিলম্ব করা হচ্ছে। এর ফলে বাড়তি ব্যয় করতে হবে বাংলাদেশকে। কারণ সময় বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সুদও দিতে হবে। পুরো বিষয়টি অর্থনীতির সুশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় গতি আনতে হলে খাতটিকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। এখানে পরিবহন ব্যবস্থাপনায় সংস্কার প্রয়োজন। সরকারও রুট রেশনালাইজেশনের প্রকল্প নিয়েছে কিন্তু তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। কারণ এক শ্রেণীর রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট মালিকপক্ষ তাদের ক্ষুদ্র ও ব্যক্তিস্বার্থে পরিবহন খাতের সংস্কারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এক্ষেত্রে ব্যক্তির স্বার্থে নীতিকে সঠিক পথে যেতে দেয়া হচ্ছে না, সেটার সংস্কার করতে হবে। বলা হয়েছিল ই-টেন্ডার চালু করলে চাঁদাবাজি কমে যাবে। কিন্তু সেটা কি কমেছে? উত্তর হবে না। নতুন পদ্ধতিতে টেন্ডার জমা দিতে বাধা দেয়া হচ্ছে, ই-টেন্ডারের যুগে কেন এসব শুনতে হচ্ছে। 

সংস্কারকে শুধু কারিগরি বিষয় হিসেবে দেখা হলে তা হবে বড় ভুল। সংস্কারের জন্য তিনটি স্তর দেখা দরকার। এক. রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাত্রাটা কেমন, তা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাত্রা যদি অনুপস্থিত থাকে তাহলে ঘুরে-ফিরে সংস্কার এক পা এগোনো এবং দুই পা পেছানোর মতো হয়ে যাবে। দ্বিতীয় বিষয় হলো, সংস্কারের কিছু ট্রেড অফ রয়েছে। সেখানে ভারসাম্য আনতে আমাদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা দিয়ে মনোনিবেশ করতে হবে। বিচক্ষণতা হচ্ছে—কোথায়, কখন এবং প্রথম পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত বা সেখানে কী ধরনের ট্রেড অফ হওয়া উচিত। সংস্কারের তৃতীয় বিষয় হলো কারিগরি। সেখানে কোন নীতি নেয়া হচ্ছে এবং নীতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা ইত্যাদি। 

সর্বশেষ আলোচনা করতে চাই, সংস্কারের ফলাফল কে ভোগ করবে। উত্তর হলো, কী ধরনের সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে এবং কোনগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। ভর্তুকি কমানো সংস্কারের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। একই সঙ্গে ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি ও ভর্তুকি যুক্তিসংগত করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সংস্কারের ক্ষেত্রে এক ধরনের রাজনৈতিক সমর্থন দরকার। যেসব দেশে সংস্কার সফল হয়েছে সেখানে রাজনৈতিক সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভর্তুকি ও ব্যয়সাশ্রয়ী—উভয় পদক্ষেপ দরকার। দুটোতেই সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। ভর্তুকি তুলে নেয়া হলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হবে। জ্বালানির দাম বাড়ানোতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এটি আবার মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে। সরকার ভর্তুকি উঠাতে গিয়ে জনগণকে বাড়তি চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু এ চাপ প্রশমনে কোনো পদক্ষেপই নেয়া হচ্ছে না। মালয়েশিয়ার মতো দেশেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবেলায় নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে জাপানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও কারিগরি দক্ষতা—এ তিনের সমন্বয়। এজেন্ডা হওয়া দরকার কীভাবে ইতিবাচক ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা যায়, যা কিনা প্রবৃদ্ধিকে প্রসারিত করবে। সংস্কারের মূল লক্ষ্য হতে হবে অপচয় কমানো ও জনগণকে মানসম্পন্ন সেবা প্রদান। ভর্তুকি তুলে নেয়ার আঘাত কমাতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে বাড়াতে হবে।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান

আরও