করোনাকালের শিক্ষা আমাদের উপেক্ষা

করোনাকালের অভিজ্ঞতা সবারই জানা। করোনা জাত-পাত, ধনী-গরীব, বয়স কিংবা লিঙ্গ কোনো কিছুকেই আলাদাভাবে দেখছে না। রাজা-প্রজা ভেদ করছে না। রাজরানি থেকে ভিখারিনী সবাইকেই এক পাল্লায় মাপছে এই অণুজীব। দুর্যোগের সময় সবাই এক কাতারে সামিল হয়। ভেদ - বিভেদ ভুলে মানুষ এক হয়ে ওঠে। সুসময়ে প্রকৃতির এই সহজ শিক্ষাটা আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুলে থাকি। হাল দুনিয়াতে মানুষের অহঙ্কার, স্বেচ্ছাচারিতাকে যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে করোনা। বিশ্ব প্রকৃতিতে অসাম্যের কোন ঠাঁই নাই, বিভেদ - বৈষম্যে সমাধান নাই।

করোনাকালের শিক্ষা কী, এটা অনুধাবনের জন্য খুব বেশিদূর যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। জগৎসংসারকে থমকে দেয়া করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছেন বরেণ্য বিজ্ঞানী সারাহ গিলবার্ট।  প্রাণের ঝুঁকি নিযে এই ভ্যাকসিন নিজের শরীরে নিচ্ছেন এলিসা গ্রানাটো নামের এক মহিয়সী নারী। 

মানুষকে বাঁচানোর এমন মহতী উদ্যোগের বিপরীতে আমরা কী করছি? এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে কেলেঙ্কারি নিয়ে নতুন করে আর কিছু বলার নেই। করোনাক্রান্তিতে সম্মুখসারির যোদ্ধা যারা সেই চিকিৎসকদের জন্য আমরা সরবরাহ করেছি  নিম্নমানের মাস্ক। চিকিৎসকদের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মুনাফা। দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার কী দৈন্যদশা সেটা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। ৮/১০ হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা সেবা না পেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার অনেকগুলো খবর এসেছে মিডিয়াতে। 

আমরা গরীব দেশের মানুষ। বিজ্ঞান চর্চায়, গবেষণায় আমরা অনেক পিছিয়ে। সেই অর্থে বিনিয়োগ নেই। এগুলো সবই সত্যি। কিন্তু এভাবে কী দায় এড়ানো যাবে? প্রশ্নটা শুধু বিজ্ঞান চর্চা কিংবা গবেষণার নয়। মানসিকতা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। করোনা প্রতিষেধক (টিকা) আবিষ্কারের সক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু এলিসা গ্রানাটো মানুষের জন্য নিজের প্রাণকে তুচ্ছ বিবেচনা করার শিক্ষা থেকে কেন আমরা কিছুই শিখতে পারি না।

করোনাকালের অভিজ্ঞতা সবারই জানা। করোনা জাত-পাত, ধনী-গরীব, বয়স কিংবা লিঙ্গ কোনো কিছুকেই আলাদাভাবে দেখছে না। রাজা-প্রজা ভেদ করছে না। রাজরানি থেকে ভিখারিনী সবাইকেই এক পাল্লায় মাপছে এই অণুজীব।  দুর্যোগের সময় সবাই এক কাতারে সামিল হয়। ভেদ - বিভেদ ভুলে মানুষ এক হয়ে ওঠে। সুসময়ে প্রকৃতির এই সহজ শিক্ষাটা আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুলে থাকি। হাল দুনিয়াতে মানুষের অহঙ্কার, স্বেচ্ছাচারিতাকে যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে করোনা। বিশ্ব প্রকৃতিতে অসাম্যের কোন ঠাঁই নাই, বিভেদ - বৈষম্যে সমাধান নাই। 

করোনাকালের এই অসাম্যের শিক্ষা আমরা উপেক্ষা করেই চলেছি। করোনা পরবর্তী বিশ্ব অনেক সুন্দর হবে, বিভেদ - বৈষম্য ভুলে নতুন এক পৃথিবী সৃষ্টি করবে মানুষ, এমন স্বপ্নের কথা বলছেন অনেকেই। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই পুরনো ধ্যান ধারণাতেই আটকে আছি আমরা।  ধরা যাক, রহমতের মাস রমজানের কথাই। প্রতিবছরই রোজার মাসকে ঘিরে রমরমা হয় বাণিজ্য। রাতারাতি জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায় অনেক। করোনাকালেও ব্যতিক্রম হয়নি। বরং মানুষের জিম্মিদশাকে কাাজে লাগাচ্ছেন আমাদের ব্যবসায়ীরা। দুদিনের ব্যবধানে বেগুনের দাম দুই থেকে আড়াইগুণ, শশার দাম তিনগুণ, লেবুর হালি ৬০ / ৭০ টাকা, চাল - তেল - চিনির দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ত্রাণ চুরির সংবাদ থেমে নেই। ব্যাবহৃত মাস্ক ধুয়ে বিক্রি করার একাধিক সংবাদ এসেছে মিডিয়াতে। 

করোনার আগে ও পরে আমাদের জীবন দর্শনে আদৌ কি কোনো পরিবর্তন এসেছে? আগের মতই প্রতিদিনই আসছে খুন - ধর্ষণ - দুর্ণীতির সংবাদ।  একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর সেই পুরনো ‘ব্লেম গেম’ মানসিকতা থেকে আমরা বেরোতে পারছি না। রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের বাগাড়ম্বরের কোনো বিরাম নেই। জীবন - জীবিকার পথ হয়ে পড়েছে ভীষণ কঠিন। ঋণে জর্জরিত দম্পতির আত্মহত্যার খবর এসেছে। 

এই দুঃসময়ে কি প্রেরণা পাওয়ার মতো কিছুই আমাদের নেই: যে আলোয় আমরা একটু পথ দেখতে পারি, ভালো কিছু করতে পারি, সেই বিশ্বাসটা তুলে ধরতে পারি। অনেক খারাপ খবরের ভিড়ে চমকে ওঠার মত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ৮০ বছর বয়সী ভিক্ষুক নাজিমউদ্দীন। ঘর বানানোর জন্য তিল তিল করে জমানো নিজের ১০ হাজার টাকার পুরোটাই তিনি তুলে দিয়েছেন ত্রাণ হিসেবে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য খুব বেশি সামর্থ্যবান হওয়ার যে প্রযোজন হয় না সেই দৃষ্টান্তটাই  রেখেছেন নাজিমউদ্দীন। তবে হতদরিদ্র এই মানুষটি যে দৃষ্টান্ত রাখলেন তা থেকে কি আমরা ভালো কিছু নিতে পাররো? একজন নাজিমউদ্দীনের মহত্ব আমাদের উপরতলাকে সামান্য ঝাঁকিও কি দিতে পারবে?

এরই মাঝে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। করোনা ক্রান্তিতে ভিআইপিদের জন্য বিশেষ হাসপাতাল প্রস্তুত করার ঘোষণা দেয়া হল। যদিও প্রবল বিরোধিতার মুখে ভিআইপি হাসপাতাল প্রকল্প বাদ দেয়া হয়েছে। তবে এখান থেকে মানসিকতা সুস্পষ্ট। আমাদের দেশের সংস্কৃতির অংশ ভিআইপি।  ভিআইপিদের চলাচলের জন্য মাসে কতদিন কতঘণ্টা আমাদের রাস্তায় আটকে থাকতে হয়, সেটা সবারই জানা। আমাদের ভিআইপিদের কাণ্ডজ্ঞান কীভাবে (!) সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে সে উদাহরণও নেহায়েত কম নয়। গত বছর জুলাই মাসে স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনা এখনো অনেকের স্মৃতিতেই টাটকা। ওই সময় মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী এক নম্বর ফেরিঘাটে ভিআইপি যুগ্ম সচিবের অপেক্ষায় ফেরি বন্ধ রাখা হয়েছিল তিন ঘণ্টা। ফেরির জন্য অপেক্ষমাণ হাজারো মানুষের মধ্যে ছিল সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ১১ বছরের ফুটফুটে শিশু তিতাস। তিন ঘণ্টা পর তিতাসকে বহন করা অ্যাম্বুলেন্স ফেরিতে উঠতে পারে। ততক্ষণে সব শেষ। মস্তিস্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়াতে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় তিতাস। ফেরি ছাড়ার জন্য তিতাসের অভিভাবকদের কাকুতি, মিনতিতে কোনো কাজ হয়নি। সবকিছুর উপর ভিআইপি, তার উপর নাই!  

আমরা নিয়ম মানব না, অন্যের ওপর ছড়ি ঘোরাব, বিশেষ সুবিধা পাব, অন্যকে দাবিয়ে রেখে নিজে সুযোগ - সুবিধা ভোগ করব, এই করোনাকালেও এমন মানসিকতা থেকে আমরা বেরোতে পারিনি। আমরা প্রতিনিয়ত লকডাউন ভাঙছি। ইচ্ছামতো জমায়েত করছি। হত্যাকাণ্ড, নারী নির্যাতন, শিশু হত্যা- বন্ধ হয়নি কোনোকিছুই। দুর্যোগের সময় একজন আরেকজনের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, এটাই সাধারণ শিক্ষা। আর আমরা দুর্যোগকে পুঁজি করে মুনাফা করি। প্রতিটি নিত্যপ্রযোজনীয় জিনিসের দাম ঊর্ধ্বমুখি। যতো লকডাউন ততো গুজব আর জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি। 

করোনাকালে যে সাম্যের শিক্ষা তা আমরা উপেক্ষা করে চলেছি বীরদর্পে।

আরও