নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসছে। ভোটের সময় এলেই শহর থেকে গ্রামের চেনা এক চিত্র ভেসে আসে। মাইকের আওয়াজ, মিছিল, স্লোগান আর পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে যায় চারদিক। এটাই আমাদের নির্বাচনী প্রচারণার চিরায়ত দৃশ্য।
তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছে এক বিশেষ উদ্যোগ ‘ভোটের গাড়ি-সুপার ক্যারাভান’। গত ২২ ডিসেম্বর থেকে দেশের রাজপথে যাত্রা শুরু করেছে ভোটের গাড়ি। ১০টি সুসজ্জিত বড় ট্রাক, বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিন এবং প্রচারণাসমৃদ্ধ বহরটি দেশের ৬৪টি জেলা ও ৪৯৫টি উপজেলায় ঘুরে বেড়াবে। এর মূল উদ্দেশ্য জাতীয় নির্বাচন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা হিসেবে প্রস্তাবিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে গণভোটের সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা।
২২ ডিসেম্বরের ভোটের গাড়ির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, তারা মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে নির্বাচন ও গণভোট সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দেবে, ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করবে এবং গণতন্ত্রের বার্তা ছড়িয়ে দেবে। তবে যেকোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মতোই প্রশ্ন রয়ে গেছে এর কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে।
‘ভোটের গাড়ি’ প্রকল্পের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কত টাকা বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে, সেই সঠিক অংকটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা না হলেও তা অনুমেয়। রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয়ে পরিচালিত এ উদ্যোগ কি সত্যিই জনসচেতনতা তৈরি করতে পারছে, নাকি এটি কেবল একটি ব্যয়বহুল রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হচ্ছে? জনমনে এ প্রশ্ন বড় আকারে দেখা দিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ ক্যারাভানগুলো মানুষের মনে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলবে। বিশেষ করে গত দেড় দশকে যারা ভোট দিতে পারেনি, সেই তরুণ প্রজন্মকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা এর অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষায়িত ক্যারাভানগুলোয় বড় পর্দায় ভিডিও প্রদর্শনী, তথ্যচিত্র ও আলোচনার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার কথা বলা হয়েছে। ভোটের গাড়ির এ অভিনব প্রচারণার কথা সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে অনেকেই শুনেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখেছে কয়জন?
আশপাশে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধিকাংশ মানুষই নিজে ভোটের গাড়ির অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করেনি। একই চিত্র পাওয়া যায় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনেও। প্রতিবেদনগুলোর মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সচেতনতা সৃষ্টির এ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে। একটি ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশে মাত্র ১০টি গাড়ি দিয়ে ৩০০টি নির্বাচনী এলাকায় সচেতনতা সৃষ্টি প্রায় অসম্ভব। এছাড়া ভোটের গাড়ির প্রচারণা কার্যক্রম উপজেলা শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে সরকারের নির্বাচনী প্রচারণা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ মোট ভোটারের বড় একটি অংশ উপজেলার বাইরে গ্রামগুলোয় থাকে। অন্যদিকে স্পটগুলোয় ভোটের গাড়িগুলো খুব অল্প সময় অবস্থান করছে। ফলে এর প্রভাব হচ্ছে অনেকটা ‘ক্ষণস্থায়ী প্রদর্শনী’র মতো। মানুষ ভিড় করছে রঙিন পর্দার আকর্ষণে, কিন্তু তারা সেখান থেকে রাষ্ট্র সংস্কার বা ‘জুলাই সনদ’ এর জটিল বিষয়গুলো কতটা বুঝতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।
এ উদ্যোগের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সাধারণ মানুষের কাছে এর কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সূচি বা রুটম্যাপ না থাকা। প্রচারণা মানেই হলো মানুষের কাছে পৌঁছানো, কিন্তু মানুষই যদি না জানে গাড়িটি কখন তার এলাকায় আসবে, তবে সেই প্রচারণার সার্থকতা থাকে না। সাধারণ মানুষ জানে না ভোটের গাড়িটি আজ কোথায়, কখন অবস্থান করছে বা আগামীকাল কোন উপজেলায় কখন যাবে। কোনো ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম আছে কিনা সেটিও সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়।
অনলাইনে খুঁজেও ভোটের গাড়ি-সুপার ক্যারাভানের কোনো ডিজিটাল ট্র্যাকিং বা রুটম্যাপ পাওয়া যায়নি। এমনকি ভোটের গাড়ি কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কবে, কখন যাবে- সে নিয়ে স্থানীয়ভাবে মাইকিংয়েরও কোনো খবর শোনা যায়নি। ফলে গাড়িগুলো যখন হঠাৎ কোনো মোড়ে এসে দাঁড়ায়, তখন অধিকাংশ মানুষই অপ্রস্তুত থাকে। আবার বাজার বা জনবহুল এলাকায় গাড়ি পৌঁছনোর আগেই মানুষ তাদের কাজ শেষ করে চলে যায় অথবা গাড়িটি এমন সময়ে এসেছে যখন মানুষের সমাগম কম। সঠিক প্রচারের অভাবে এ বিপুল আয়োজন অনেক ক্ষেত্রেই ‘দর্শকহীন প্রদর্শনী’তে পরিণত হচ্ছে। এর বাইরে আরেকটি বড় প্রশ্ন, ভোটের গাড়ির প্রচারণার পরিকল্পনায় নারী ভোটাদের জন্য কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে? কারণ বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে হোক শহর কিংবা গ্রাম, কোনো পাবলিক প্লেসের গণজামায়েতে নারীদের অংশগ্রহণ কম চোখে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিবেশে নারীরা অংশগ্রহণ করতেও অস্বস্তি বোধ করেন।
ভোটের গাড়ির আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো প্রচারণার বিষয়বস্তু। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ১ ঘণ্টার অনুষ্ঠানে ভোটের গাড়ি আগামী সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে গণভোটের বিষয়ে বিভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। এছাড়া আবরার ফাহাদ হত্যা, ফেলানী হত্যা, প্রতিবেশী দেশের প্রভাব ও নির্ভরশীলতার মতো ঘটনাগুলো প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে। ভোটের গাড়ির আয়োজনে আরো রাখা হয়েছে শিল্পীদের দেশাত্মবোধক গানের পরিবেশনা। কিন্তু এ ধরনের প্রামাণ্যচিত্র কী গণভোটের বিষয়বস্তুকে বুঝতে সাধারণ জনগণকে সাহায্য করছে?
গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে সংবিধানে কী কী পরিবর্তন হবে- সে বিষয়ে বাছাইকৃত কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন রয়ে যায়, দেশের কোন কোন নীতি, নিয়ম বদলে যাবে তার সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনগণ জানতে পারছে কি? জনমত বাক্স রাখা হয়েছে, যেখানে আগত জনগণ মতামত লিখে জমা দিচ্ছে, কিন্তু সেই মতামতের কোনো ফিডব্যাক দেয়ার বিষয়ে জানা যায়নি। দেখা যায়নি কোনো প্রশ্ন-উত্তর পর্বও। শুধু একতরফা বক্তব্য বা ভিডিও প্রচারণা হলে, প্রচারণাকে অংশগ্রহণমূলক না করতে পারলে ভোটের গাড়ির যে উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে- তা আদৌ সফল হবে কি? জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকারিভাবে সচেতনতার কোনো প্রয়োজন আদতে নেই, রাজনৈতিক দলগুলোই নিজ নিজ স্বার্থে প্রচারণা চালাবে এবং জনগণ জাতীয় ভোটের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু গণভোট বছর বছর হয় না এবং এর প্রভাবও সুদূরপ্রসারি। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গত অক্টোবরে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছে। এ সনদে থাকা সংবিধান–সম্পর্কিত ৪৭টি এবং আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কারের মধ্যে ৩৭টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে হবে গণভোট। কিন্তু প্রস্তাবিত যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে গণভোটের আয়োজন, সেই সংস্কার প্রস্তাবের প্রতিটি প্রস্তাবের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই কি জনগণের কাছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা হচ্ছে?
যে সনদ তৈরি করতে অন্তর্বর্তী সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর এতটা সময় লেগেছে, ভোটের গাড়ির ২/১ ঘণ্টার প্রচারণা কি জনগণকে সেই জটিল, দুর্বোধ্য বিষয় বোঝাতে সক্ষম? প্রচারণার ভাষা যদি সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের সঙ্গে যুক্ত না হয়, প্রশ্ন-উত্তরের সুযোগ না থাকে, তবে তা কেবল একটি যান্ত্রিক প্রচার হিসেবেই গণ্য হয়।
অন্যদিকে গত ২২ জানুয়ারি শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণা। রাজনৈতিক দল ও জোটসহ প্রচারণায় মাঠে নেমেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। এই মুহূর্তে জনগণের আগ্রহের ও অংশগ্রহণের কেন্দ্র দলীয় প্রচারণা। দলীয় নেতাকর্মী ও সাপোর্টাসহ সাধারণ মানুষও অংশগ্রহণ করছে প্রার্থী ও দলের প্রচারণায়। এ অবস্থায় ভোটের গাড়ির কার্যক্রম কতটা সফল হবে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে সেখানেও।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে নারী ভোটার, প্রান্তিক ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করার কর্যকরী পদক্ষেপ ছাড়া এ সীমিতসংখ্যক প্রচার গাড়ি এবং স্বল্পসময়ের প্রচারণা দিয়ে এ উদ্যোগ কি গণভোটের জটিল বিষয়গুলোয় সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে পারবে?
যদিও সরকারের তরফে আরো ১০টি গাড়ি যুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল তবে নতুন গাড়ি যুক্ত হয়েছে কিনা সে বিষয়ে পরবর্তী সময়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, ভোটের গাড়ির বিশেষ এ উদ্যোগ প্রচারণায় পথে পথে ঘুরে বেড়াবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। ‘ভোটের গাড়ি-সুপার ক্যারাভান’কে সফল করতে হলে এটিকে বড় পর্দার তথ্যচিত্র প্রদর্শনী থেকে বেরিয়ে এসে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সংলাপে রূপান্তর করতে হবে। সচেতনতা কেবল প্রচারণায় আসে না, আসে অংশগ্রহণমূলক আলোচনায়। অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, কবে কোথায় প্রচারণা কার্যক্রম চলবে তার আগাম তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং অবশ্যই প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে অংশগ্রহণের দ্বারা জনগণকে বোঝাতে হবে। এর অন্যথা হলে প্রচারণার বিপরীতে এই বর্ণিল ক্যারাভানগুলোর পেছনে অর্থ ব্যয় কোনো সুফল বয়ে আনবে না। সাধারণ মানুষের কাছে কেবল একটি ‘রাস্তার বিনোদন’ বা ‘ব্যয়বহুল আনুষ্ঠানিকতা’ হিসেবেই স্মরণে থাকবে।
শাকিলা জেরিন: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, বণিক বার্তা