গত
৫০ বছরের
পথচলায় উন্নয়নের
নানা মাত্রায়
বাংলাদেশের ভূমিকা
এবং অর্জন
দেশ এবং
সারা বিশ্বে
যথাযথভাবে পরিচিতি
পেয়েছে। তবে
পরিবর্তনের পাশাপাশি
আকাঙ্ক্ষা ও
চ্যালেঞ্জের জগৎ
পাল্টেছে। সে
দৃষ্টিকোণ থেকে
অর্থনীতিতে কিছু
উদ্বেগের জায়গা
ঘনীভূত হয়েছে।
২০২২-এর
মে মাসে
পিপিআরসি-বিআইজিডির
পঞ্চম প্যানেল
জরিপ নতুন
করে ১৮
দশমিক ৫
শতাংশ দারিদ্র্যের
হার বৃদ্ধি
পাওয়ার অনুমান
করেছিল। সরকারের
পরিসংখ্যান সংস্থার
প্রদত্ত সর্বশেষ
তথ্যমতে, দারিদ্র্যের
হার বেড়েছে
এবং বর্তমানে
তা ২৯
দশমিক ৫
শতাংশে এসে
দাঁড়িয়েছে। কভিড-পূর্ববর্তী
সময়ে যা
২০ শতাংশ
ছিল। এ
দারিদ্র্যের সংখ্যা
বেড়ে যাওয়া
এবং মধ্যবিত্ত
শ্রেণীর ক্রমবর্ধমান
অর্থনৈতিক হতাশা
বর্তমানে সংকটের
শীর্ষবিন্দুতে অবস্থান
করছে। এসব
হতাশা তৈরি
হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ
ও দুর্নীতিগ্রস্ত
অর্থনীতি পরিচালনার
রাজনৈতিক অর্থনীতি
থেকে।
বাংলাদেশ আজ
কয়েকটি স্পর্শকাতর
প্রশ্নের সম্মুখীন।
প্রথমত, মাত্রাহীন
দুর্নীতি কি
শুধু নৈতিক
ব্যর্থতা নাকি
তা বর্তমান
সময়ের রাজনৈতিক
অর্থনীতির অবশ্যম্ভাবী
অনুষঙ্গ? দ্বিতীয়ত,
সংস্কারে অনীহা
কি অদক্ষতার
প্রশ্ন না
দুর্নীতিগ্রস্ত স্বার্থকে
আড়ালে রাখার
প্রয়োজনে? তৃতীয়ত,
বাস্তবায়নগত দুর্বলতা
কি সক্ষমতার
অভাব না
মেধার নিরন্তর
অবমূল্যায়নের ফল?
বাংলাদেশের অর্থনীতি
সুষ্ঠু পরিচালনার
ক্ষেত্রে ঘাটতি
সবসময়ই ছিল।
কিন্তু গত
এক দশকে
নীতি প্রণয়নের
রাজনৈতিক অর্থনীতির
একটি মৌলিক
রূপান্তর হয়েছে।
এক্ষেত্রে লৌহ
ত্রিভুজ ধারণায়
উন্নয়নের তিন
ধরনের প্রবণতাকে
সংজ্ঞায়িত করা
এবং এর
পরিণতি বিশ্লেষণের
আশু প্রয়োজন
দেখা দিয়েছে।
লৌহ ত্রিভুজের
প্রথম অংশ
হচ্ছে একমাত্র্রিক
উন্নয়ন দর্শন।
উন্নয়ন ধারণায়
অবকাঠামোই সব—এ
দর্শন সামাজিক
উন্নয়নকে পাশে
ঠেলে দিয়েছে।
শিক্ষার মানের
চেয়ে বিদ্যালয়ের
ভবন বেশি
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
গেছে। স্বাস্থ্যসেবার
মানের চেয়ে
হাসপাতাল ভবন
এখন অধিক
গুরুত্বপূর্ণ। নগর
অবকাঠামো ইন্টিগ্রেটেড
ও বাসযোগ্যতাকে
প্রাধান্য না
দিয়ে বিচ্ছিন্ন
অবকাঠামোর সমাহারে
রূপান্তরিত হয়েছে।
একমাত্রিক উন্নয়ন
দর্শনের ফলগুলো
খুবই পরিচিত।
যেমন সড়ক
নিরাপত্তার শঙ্কাজনক
ঘাটতি এবং
নিরাপদ ভ্রমণের
অনিশ্চয়তা, শিক্ষার
মানের নিম্নগতি,
কাঙ্ক্ষিত ফলাফল
ছাড়াই স্বাস্থ্যসেবা
অত্যধিক ব্যয়বহুল
হয়ে যাওয়া।
লৌহ ত্রিভুজের
দ্বিতীয় অংশ
হচ্ছে অর্থনৈতিক
নীতি প্রণয়নের
ওপর গোষ্ঠীস্বার্থের
প্রবল আধিপত্য।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে
অলিগার্ক বাস্তবতা
তৈরি হয়েছে,
যা উৎপাদনশীলতা
ও প্রতিযোগিতাকে
নিরুৎসাহিত করছে
এবং সম্পদ
পাচারকে উৎসাহিত
করছে। সংকীর্ণ
বেসরকারি স্বার্থ
রক্ষা করতে
গিয়ে যে
ধরনের অনৈতিক
নিয়ম সাজানো
হয় তা
উদ্বেগজনকভাবে আর্থিক
সংস্থান, ব্যাংক
খাত, বিদ্যুৎ,
পরিবহন ব্যবস্থা,
আইসিটি এবং
অবকাঠামো খাতের
মতো সংকটপূর্ণ
এবং লাভজনক
খাতে স্বাভাবিক
বিষয় হয়ে
দাঁড়িয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রের
উদাহরণ উপরের
বিষয়টি পরিষ্কার
করতে পারে।
কুইক রেন্টাল
বিদ্যুৎ প্রকল্প
স্বল্পমেয়াদে লোডশেডিং
এড়ানোর জন্য
গ্রহণ করা
হয়েছিল, কিন্তু
এটি কেন
প্রারম্ভিক সময়সীমার
পরও চলমান
রইল? বিতরণ
অবকাঠামো এবং
প্রাথমিক বিদ্যুৎ
সরবরাহে প্রয়োজনীয়
বিনিয়োগের চাহিদা
ব্যতীত কেন
বিদ্যমান উৎপাদন
সক্ষমতার ক্রমশ
বিস্তার ঘটানো
হলো? কেন
গ্যাস অনুসন্ধান
না করে
সর্বনাশা অতিরিক্ত
নির্ভরতায় ব্যয়বহুল
এলএনজি আমদানির
ব্যবস্থা করা
হয়েছিল? কেন
ভোলা গ্যাস
ফিল্ডে বিদেশী
কোম্পানিকে সুবিধা
দিতে রাষ্ট্রায়ত্ত
সংস্থা বাপেক্সকে
কৌশলগতভাবে নিষ্ক্রিয়
করে ফেলা
হলো?
বাস্তবে পরিকল্পিত
অকার্যকারিতা এবং
দুর্নীতি বিস্তারের
যোগসাজশের বিষয়টি
নগ্নভাবে ফুটে
উঠেছে। এর
কারণ হচ্ছে,
সার্বিক বিষয়টি
অর্থনৈতিক নীতি
দিয়ে পরিচালিত
হয়নি, বরং
গোষ্ঠীস্বার্থ প্রভাবিত
রাজনৈতিক অর্থনীতির
মাধ্যমে নির্দেশিত
হয়েছে।
পরিবহন খাতের
দিকে নজর
দেয়া যাক।
বিআরটিসি বহু
বছর ধরেই
একটি রুগ্ণ
রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি
হয়ে আছে।
অন্যদিকে রুট
পারমিট বরাদ্দ
দেয়ার বিষয়টি
বাস মালিকদের
কব্জাধীন হয়ে
আছে। ফলে
বিআরটিসি কোথাও
তার ওপর
ন্যস্ত দায়িত্ব
নিয়ে দাঁড়াতেই
পারছে না।
বেসরকারি খাতের
স্বার্থ দেখতে
গিয়ে শাসন
ব্যবস্থাকে অবজ্ঞা
করার এ
প্রবণতা কার্যত
অপশাসনের অচলাবস্থাকে
চলমান রাখার
ক্ষেত্রে দায়মুক্তি
দেয়। এক্ষেত্রে
পি কে
হালদারের মামলাটি
এসব জুড়ে
বসা প্রাতিষ্ঠানিক
শাস্তিযোগ্য অব্যবস্থাপনার
প্রতীক হিসেবে
গণ্য হতে
পারে।
জিডিপির অনুপাতে
রফতানি প্রতিযোগিতার
একটি পরিমাপ
হিসেবে কাজ
করে। এ
সূচক ২০১২
থেকে ২০২২
সালের মধ্যে
অর্ধেকের বেশি
অর্থাৎ ২০
শতাংশ থেকে
১০ দশমিক
৬ শতাংশে
এসেছে। এছাড়া
জিডিপি অনুপাতে
বেসরকারি বিনিয়োগের
স্থবিরতা আরেকটি
উদ্বেগের কারণ।
অবকাঠামোমূলক প্রকল্পে
চুক্তিগুলো মূল্যায়নের
সমগ্র প্রক্রিয়ায়
ই-টেন্ডার
স্বচ্ছতা ও
দক্ষতা নিয়ে
আসবে বলে
ভাবা হয়েছিল,
কিন্তু বাস্তবতা
ভিন্ন কথা
বলছে। দুর্নীতিগ্রস্ত,
অদক্ষ এবং
সংঘবদ্ধ কাজের
চর্চা এখানে
প্রতিযোগিতামূলক মূল্য
প্রস্তাব, মূল্যবৃদ্ধি,
পরবর্তী অনুমোদনের
ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি
এবং বিলম্বিত
প্রকল্পের ক্ষেত্রে
অনানুষ্ঠানিক বাধা
হিসেবে কাজ
করে।
লৌহ ত্রিভুজের
তৃতীয় অংশ
হচ্ছে ‘অবিচারের
অর্থনীতি’, যা
শ্রমিক, কৃষক,
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা,
এমনকি বর্তমানে
মধ্যবিত্ত শ্রেণী
যাদের রাজনীতিতে
উচ্চকণ্ঠ নেই
তাদের স্বার্থকে
উপেক্ষা করার
ভিত্তিতে গড়ে
উঠেছে।
গণপরিবহন ব্যবস্থা,
প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর
মূল্য, উপযোগিতার
খরচ, সাশ্রয়ী
গৃহায়ন, মানসম্মত
শিক্ষা এবং
স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ,
উন্মুক্ত পরিবেশে
বসবাসের সুযোগ—এর
সবগুলোই মানসম্মত
জীবনযাপনের ভিত্তি।
কিন্তু সাধারণ
জনগণের রাজনৈতিক
কণ্ঠস্বর অনেকটা
প্রান্তিক হয়ে
যাওয়ায় নীতির
জগতে এ
বিষয়গুলো খাপছাড়া
মনোযোগের ঊর্ধ্বে
উঠতে পারছে
না।
অবিচারের অর্থনীতির
দ্বিতীয় বিষয়টি
হচ্ছে কমপক্ষে
তিনটি ক্ষেত্রে
এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা
অর্জনের বিপরীত
ঝুঁকিপূর্ণ পথে
রয়েছে। এগুলো
হচ্ছে পুষ্টিগত
ঘাটতি (ক্রয়ক্ষমতার
অভাবে পরিবারের
খাবার থেকে
পুষ্টিমানগুলো হারিয়ে
যাচ্ছে), মাধ্যমিক
পর্যায়ে ঝরে
যাওয়ার সংখ্যা
বৃদ্ধি পাওয়া
এবং তরুণ
বিশেষ করে
শিক্ষিত তরুণদের
বেকারত্ব বেড়ে
যাওয়া।
বাংলাদেশ সম্ভবত উন্নয়ন যাত্রার বাঁকবদলের পর্যায়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে সফলতার মুখ দেখা অন্য দেশগুলো মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়েছে, কারণ তারা সতর্ক সংকেতগুলো মানেনি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলোকে মূল্যায়ন করেনি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ কি লৌহ ত্রিভুজকে মূল্যায়ন করতে সক্ষম হবে? যখন অবাধ্য ত্রিভুজ পারস্পরিকভাবে এমন নীতির প্রবণতাকে শক্তিশালী করে তুলছে, যা বাংলাদেশের ব্যাপক স্থিতিশীল উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রে কাঠামোগত বাধায় রূপান্তরিত হয়েছে। এটির অপসারণ শুধু কাগুজে সুপারিশ ও শ্রুতিমধুর কথার মাধ্যমে হবে না। লৌহ ত্রিভুজ সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উপলব্ধি, পন্থা এবং ইচ্ছা—তিন জায়গাতেই বড় ধাক্কা প্রয়োজন।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান