একটি
সাধারণ গল্প
দিয়ে শুরু
করা যাক।
রাস্তার পাশে
কোনো স্থাপনা
নির্মাণ চলছে।
পথচারীদের মাথার
ওপরে হঠাৎ
কোনো ইটের
কিংবা লোহার
টুকরো যেন
না পড়ে
সেজন্য মাথার
ওপরে কিছু
টিন শেড
ছাউনি ব্যবহার
হচ্ছে। অনেক
বেশি নির্মাণজনিত
শব্দে আশপাশে
বসবাস করা
দুষ্কর হয়ে
উঠছে। নির্মাণ
ব্যবস্থাপনার ত্রুটির
কারণে নির্মাণ
শ্রমিকরা বড়
ধরনের দুর্ঘটনার
শিকার হচ্ছেন
কিংবা সেই
স্থাপনা নির্মাণের
জায়গা থেকে
এত বেশি
পরিমাণ ধুলাবালি
নির্গত হচ্ছে,
যা পরবর্তী
সময়ে বায়ুদূষণের
অন্যতম প্রধান
কারণ হিসেবে
বিবেচিত হচ্ছে।
তাছাড়া রাস্তার
ওপর অযাচিত
ইট-বালি,
রড-সিমেন্টের
বস্তা পথচারী
চলাচল ব্যাহত
করছে। আর
এমন সাধারণ
চিত্র বছরের
পর বছর
ধরে চলছে
তো চলছেই।
যেকোনো স্থাপনা
নির্মাণের সাইটে
গেলে এ
দৃশ্যগুলো যেন
খুব চিরচেনা।
হয়তো সুন্দর
একটি ভবন
তৈরি হচ্ছে
কিন্তু সেই
ভবনটি তৈরির
সময়কালে কত
ধরনের সমস্যা
সৃষ্টি করছে—এ
বিষয়গুলো সম্পর্কে
আমরা সবসময়ই
নীরব থেকে
যাই। হয়তো
মাঝেমধ্যে শ্রমিকদের
কর্মপরিবেশ ও
নিরাপত্তার বিষয়
নিয়ে আমরা
আলোকপাত করি
কিংবা নির্মাণ
শিল্পকে কীভাবে
টেকসই করা
যায় এবং
নির্মাণ শিল্পের
দূষণ থেকে
পরিবেশকে কীভাবে
রক্ষা করা
যায় সেসব
বিষয় নিয়ে
হয়তো অনেক
গবেষণাও করি।
কিন্তু প্রায়োগিক
দিকে আজও
তেমন কোনো
বিশেষ ইতিবাচক
ভূমিকা লক্ষণীয়
নয়। আর
এভাবেই স্থাপত্য
ও নির্মাণ
শিল্পের ধরনটি
আজও সেকেলে।
বিশেষ করে
আমাদের দেশে।
ম্যাককিনসে গ্লোবাল
ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক
একটি প্রতিবেদন
বিশ্বজুড়ে সবার
সামনে একটি
সত্য উপস্থাপন
করেছে স্থাপত্য
ও নির্মাণ
শিল্পের ওপর।
যেখানে দেখানো
হয়েছে স্থাপত্য
নির্মাণ শিল্প
বিশ্বের সবচেয়ে
কম ডিজিটাল
শিল্পের মধ্যে
একটি। তাছাড়া
এটিও প্রতীয়মান
যে দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের পর
থেকে এ
স্থাপত্য নির্মাণ
শিল্পে উৎপাদনশীলতা
খুব একটা
বেশি বৃদ্ধি
পায়নি। যদিও
স্থাপত্য নকশা
প্রণয়ন এবং
অনুশীলনের ক্ষেত্রে
৩০ বছরেরও
বেশি সময়
ধরে ডিজিটাল
সরঞ্জামগুলো ব্যবহার
হয়ে আসছে।
কিন্তু নির্মাণ
শিল্পে এখন
পর্যন্ত এ
সিস্টেম অ্যানালগ
থাকার প্রবণতা
রয়েছে। আর
সে কারণেই
নির্মাণ শিল্পে
কিংবা কনস্ট্রাকশন
সাইটে এখন
পর্যন্ত আধা
দক্ষ ও
অদক্ষ কায়িক
শ্রমের ওপর
নির্ভর করতে
হয়। আর
এর সামগ্রিক
অর্থ হলো,
স্থাপত্য নির্মাণ
শিল্প একত্রীকরণ
করতে হবে
এবং এ
শিল্পকে আরো
ডিজিটাল প্রযুক্তি
ব্যবহারের জন্য
উপযুক্ত করতে
হবে। এতে
একদিকে যেমন
এ শিল্পের
উৎপাদনশীলতা বাড়বে,
নতুন নতুন
কর্মসংস্থান সৃষ্টি
হবে এবং
বিল্ট এনভায়রনমেন্ট
কিংবা মানুষ
দ্বারা তৈরি
পরিবেশকে ডিজিটাল
প্রযুক্তির সঙ্গে
আরো বেশি
সংযোগ স্থাপন
করতে হবে
সামগ্রিক উন্নয়নের
লক্ষ্যে।
স্থাপত্য অনুশীলনে
ডিজিটাল সরঞ্জাম
ও স্বয়ংক্রিয়
প্রযুক্তির এ
সংযুক্তিকরণ বর্তমান
সময়ের আলোকে
আরো বেশি
জরুরি হয়ে
উঠেছে। যার
সঙ্গে মানুষের
গতিশীলতা, সম্পদ,
পারিপার্শ্বিক বৈচিত্র্যসহ
জলবায়ু পরিবর্তনের
প্রভাবগুলো ওতপ্রোতভাবে
জড়িত। এসব
নেতিবাচক প্রভাব
মোকাবেলা করার
জন্য ধারণা
করা হচ্ছে
স্থাপত্য নির্মাণ
শিল্পে ডিজিটালাইজেশন
এখন সময়ের
দাবি। স্থাপত্য
নির্মাণ শিল্প
একদিকে যেমন
এই মানুষসৃষ্ট
পরিবেশে উন্নত
প্রযুক্তিগত নির্মাণ
কৌশলের মাধ্যমে
অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী
করে তুলতে
পারে, ঠিক
সেই সঙ্গে
স্থানীয় সংস্থাগুলোকে
তাদের দক্ষতার
ভিত্তিতে ব্যবহার
করতে পারে।
আর এগুলোকে
সমন্বয়ের অন্যতম
প্রধান মাধ্যম,
যা উৎপাদনকে
ইতিবাচকভাবে সাড়া
দিতে সক্ষম,
সেটি হলো
ডিজিটালাইজেশন।
আমাদের দেশে
প্রকৌশল ও
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
স্থাপত্য ও
নির্মাণবিষয়ক বিভিন্ন
বিভাগের মাধ্যমে
শিক্ষা দেয়।
কিন্তু প্রশ্ন
হচ্ছে, সেই
শিক্ষা পদ্ধতি
কতটা সমসাময়িক?
যেখানে সময়ের
সঙ্গে সঙ্গে
শিক্ষা উপকরণের
ক্ষেত্রেও বাস্তবসম্মত
পরিবর্তন ও
পরিবর্ধন প্রয়োজন।
এমনকি শিক্ষাজীবন
শেষে ছাত্রছাত্রীরা
যখন মাঠ
পর্যায়ে কাজ
করছে তখন
তাদের কাছ
থেকেও চলমান
কোর্স সম্পর্কে
ফিডব্যাক নেয়া
প্রয়োজন। এতে
চলমান শিক্ষা
উপকরণগুলোর সঙ্গে
বাস্তবতার একটি
সংমিশ্রণ সম্ভব।
যার মাধ্যমে
আমরা খুব
সহজেই আমাদের
পূরণীয় বিষয়গুলো
খুঁজে বের
করতে পারব।
আমার জানামতে
এখন পর্যন্ত
আমাদের দেশে
স্থাপত্য নির্মাণ
শিল্পের সঙ্গে
ডিজিটালাইজেশনে প্রযুক্তির
ব্যবহার সম্পর্কিত
শিক্ষার সমসাময়িক
প্রচলন ঠিক
তেমনভাবে হয়নি।
এটি বলার
অপেক্ষা রাখে
না যে
এ ডিজিটাল
উদ্ভাবন শিল্পের
ওপর বিশেষ
করে স্থাপত্য
ও নির্মাণ
শিল্পে একেবারেই
কোনো কাজ
হয়নি বহির্বিশ্বে।
১৯৭৮ সাল
থেকে বিশেষ
করে জাপানের
বিভিন্ন ধরনের
নির্মাণ সংস্থা
এই স্বয়ংক্রিয়
নির্মাণ প্রযুক্তি
বিকাশের সঙ্গে
ওতপ্রোতভাবে জড়িত
ছিল। ধারণা
করা হয়,
যা শুরু
হয়েছিল সেখানকার
শ্রমিক ঘাটতির
অবস্থান থেকে।
এখন পর্যন্ত
দেশটি স্বয়ংক্রিয়
স্থাপত্য নির্মাণ
প্রযুক্তি শিল্পে
অগ্রদূত হিসেবে
রয়ে গেছে।
তাদের এ
কার্যক্রমের বেশির
ভাগ অংশ
জুড়ে রয়েছে
নির্দিষ্ট কাজভেদে
অটোমেশনের ওপরে
স্বয়ংক্রিয় রোবট।
টাইলস থেকে
শুরু করে
সিলিং উৎপাদন
এবং কংক্রিটের
একত্রীকরণ থেকে
শুরু করে
অনেক ধরনের
নির্মাণ শিল্পের
কর্মকাণ্ডের সঙ্গে
এ রোবট
জড়িত। আজ
বিশ্বের বিভিন্ন
নির্মাণ প্রযুক্তি
কোম্পানিগুলো জাপানের
এই উদ্ভাবন
থেকে শিখতে
শুরু করেছে।
কারণ জাপানে
এ ডিজিটালাইজেশন
বিশেষ করে
স্থাপত্য ও
নির্মাণ শিল্পে
আরো বেশি
প্রয়োজনীয় হয়ে
উঠেছে বর্তমানে।
এখানে উদাহরণস্বরূপ
বলা যেতে
পারে আমেরিকার
একটি কোম্পানি
নির্মাণ সাইটের
চারপাশে মাটি
ও অন্যান্য
উপকরণ সরানোর
জন্য স্বয়ংক্রিয়
একটি রোবোটিকস
নির্মাণ বাহন
তৈরি করেছে।
তাছাড়া ইউনিভার্সিটি
কলেজ লন্ডন,
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে শুরু
করে পৃথিবীর
অনেক বড়
বড় বিশ্ববিদ্যালয়
তাদের অটোনোমাস
ম্যানুফ্যাকচারিং ল্যাবের
মাধ্যমে স্থাপত্য
নির্মাণ সাইটের
জন্য ড্রোন
প্রযুক্তি থেকে
শুরু করে
বিভিন্ন পরিবেশগত
প্রযুক্তির—যা
নির্মাণ প্রকৌশলের
সঙ্গে জড়িত—উন্নয়ন
সাধন করছে।
অন্যদিকে নির্মাণ
শিল্পকে আধুনিকায়ন
করতে হবে,
যার জন্য
প্রয়োজন বিশদ
জ্ঞান ও
গবেষণা। যেমন
‘মডুলার
কনস্ট্রাকশন সিস্টেম’,
যা কম্পিউটার
কিংবা আইফোনের
সঙ্গে অ্যাপলের
অনুরূপ। তাছাড়া
বিভিন্নভাবে Plug-In
কনস্ট্রাকশন সিস্টেম
দিন দিন
জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
এ ধরনের
নির্মাণ প্রণালিতে
আবাসন শিল্পের
ওপর নির্ভরশীল
প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো
নির্দিষ্ট একটি
কারখানায় স্থাপনা
নির্মাণের বিভিন্ন
উপাদান ফ্যাব্রিকেশনের
মাধ্যমে তৈরি
করতে পারে।
সেক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে
স্বাস্থ্যবিধি মেনে
চলা সহজ
হবে। স্থাপনা
নির্মাণে যদি
এমন একটি
ফ্যাব্রিকেটেড কিংবা
Plug-In কনস্ট্রাকশন
পদ্ধতি কারখানাভিত্তিকভাবে
গড়ে তোলা
সম্ভব হয়
তাহলে সেটি
একদিকে যেমন
পরিবেশের জন্য
সুফল বয়ে
আনবে, ঠিক
তেমনি নির্মাণ
জটিলতা কমিয়ে
অল্প সময়ের
মধ্যে স্থাপনা
নির্মাণ আরো
সহজতর হবে।
সবচেয়ে বড়
যে বিষয়টি
এ ধরনের
মডুলেশন প্রযুক্তিতে,
সেটা হচ্ছে
উপকরণের পরবর্তী
বাজারমূল্য বজায়
থাকবে এবং
পরবর্তী সময়ে
সেগুলো খুব
সহজে পুনরায়
ব্যবহার করা
সম্ভব হবে।
এমনকি পছন্দানুযায়ী
নকশা পরিবর্তনের
বিষয়টিও থাকবে,
যা ক্রেতাদের
আরো বেশি
আকর্ষণ করবে
এবং অর্থনৈতিকভাবে
উন্নয়নে সহায়তা
করবে নির্মাণ
প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
এটি লক্ষণীয়
যে বর্তমানে
বিশ্বের বিভিন্ন
কোম্পানি কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তা ও
মেশিন লার্নিং
ব্যবহার করে
স্থাপত্য নির্মাণ
শিল্পে বিভিন্ন
ধরনের ওয়েব
অ্যাপ্লিকেশন ও
প্লাটফর্ম ব্যবহার
শুরু করেছে
নির্মাণ শিল্পকে
উন্নত করার
লক্ষ্যে। এখন
আমাদের দেশে
বিষয়টি নিয়ে
বিশদভাবে ভাবার
সুযোগ ও
সময় হয়েছে।
বিশেষ করে
প্রকৌশল ও
প্রযুক্তি শিক্ষা
ব্যবস্থায়। প্রচলিত
নির্মাণ উপকরণের
ব্যবহার ও
নির্মাণ কৌশলের
পরিবর্তন আনা
জরুরি। শুধু
অর্থনৈতিক কারণে
নয়, বরং
পরিবেশগত কারণ
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সেই সঙ্গে
মানসিক-সামাজিক
অনেক বিষয়
এর সঙ্গে
জড়িত। চতুর্থ
শিল্প বিপ্লবে
বাংলাদেশ এগিয়ে
চলছে ডিজিটালাইজেশনের
দিকে সব
ক্ষেত্রে। সেক্ষেত্রে
যদি স্থাপত্য
ও নির্মাণ
শিক্ষায় আর্টিফিশিয়াল
ইন্টেলিজেন্স, এনভায়রনমেন্টাল
ইন্টারেকশন, রোবোটিকস
ও স্মার্ট
প্রযুক্তির সমন্বয়ে
একটি বিশেষ
শিক্ষা বিভাগ
চালু করা
হয় তাহলে
হয়তোবা সেটি
আমাদের টেকসই
নির্মাণ শিল্পে
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন
করতে সক্ষম।
সজল চৌধুরী: শিক্ষক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণারত