মানুষ, জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, দ্বন্দ্ব, দ্রোহ, অভিব্যক্তি প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম চলচ্চিত্র। বিভিন্ন প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনে বদলে গেছে চলচ্চিত্রের গল্প বলার ধারা। যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে জার্মানিতে গড়ে ওঠে চলচ্চিত্রভিত্তিক আন্দোলন জার্মান এক্সপ্রেশনিজম। জার্মান চলচ্চিত্রকাররা সে সময় তুলে ধরতে চেয়েছেন দেশটির ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থার চিত্র, যুদ্ধ-পরবর্তী শোচনীয় অবস্থা ও জনগণের দৈনন্দিন জীবনের যন্ত্রণা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতালীয় নব্য বাস্তববাদের বৈশিষ্ট্য ছিল দরিদ্র ও কর্মজীবীদের ঘিরে বলা কাহিনী। যার চিত্র ধারণ হতো এ ধরনের মানুষের কর্মস্থলে, আর চরিত্রগুলো অভিনয় করানো হতো অপেশাদার অভিনেতার দিয়ে। বাইসাইকেল থিভস ছবিটি যেমন। কেন এমনটা করা হয়েছিল? কারণ সে সময়ের নির্মাতারা মনে করেছিলেন এটাই গল্প বলার ভঙ্গি। গল্প বলার জন্য লেখক যেমন একের পর এক নির্ভুল দৃশ্য বর্ণনা করেন, তেমনি চলচ্চিত্রকারকেও দৃশ্য বোঝাতে নিখুঁত নির্মাণ করতে হয়। দৃশ্যের প্রয়োজনে সিনেমার চরিত্ররা অবতীর্ণ হয় ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায়। গল্পের তাগিদে কোনো চরিত্র প্রেমিক, তো কোনো চরিত্র ভিলেন। কেউ সত্, সাহসী, কেউ জটিল বিদ্ঘুটে। বাস্তবের সবচেয়ে শোভন-সুন্দর মানুষটি পর্দায় সবচেয়ে ভয়ংকর চেহারা নিয়ে হাজির হন। তেমনি গল্পের প্রয়োজনেই ‘হাওয়া’ ছবির একটি দৃশ্যে আমরা দেখি, অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীকে বা চাঁন মাঝিকে তার পোষা শালিকের মাংস পুড়িয়ে খেতে।
দর্শকের মধ্যে কে না বুঝছে, চঞ্চল চৌধুরী মোটেও ওই শালিকের মাংস খাননি। ওটা স্রেফ দৃশ্য মাত্র। তবে চাঁন মাঝির চরিত্রটি যে কতটা নৃশংস তা বুঝতে ওই দৃশ্যটির প্রয়োজন ছিল বৈকি। কেননা ওই দৃশ্যটি বলে দেয়, চাঁন মাঝির অতীত ভয়াবহতার কথা। তার মাংস খাওয়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে নাজিফা তুষি বা গুলতির বাবাকে হত্যার দৃশ্যটি যেন স্পষ্ট ফুটে ওঠে দর্শকের চোখে।
ছবিতে কোথাও একটিবারের জন্যও শালিক পাখিটিকে হত্যার দৃশ্য দেখানো হয়নি। মনে আছে, মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত আলোচিত ওয়েব সিরিজ ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’র কথা। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর যে কয়জন জীবিত যাত্রী ছিলেন, একটা সময় দেখা যায় তারা তাদের মৃত সহযাত্রীর মাংস খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। হলিউডের ‘রেভেন্যান্ট’ ছবির দুটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ছে। অভিনেতা লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও বন্যপ্রাণীর কাঁচা মাংস খাওয়া কিংবা প্রচণ্ড শীতের হাত থেকে বাঁচতে মৃত ঘোড়ার পেট কেটে তার মধ্যে ঢুকে উষ্ণ হওয়ার চেষ্টা স্রেফ মানুষের বেঁচে থাকার আকুতিকে তুলে ধরে। চলচ্চিত্র এমন এক শিল্প মাধ্যম যা সবসময় মানুষ, সমাজ, প্রকৃতির খুঁটিনাটি সব প্রতিচ্ছবিরই প্রকাশ। গল্পের প্রয়োজনেই কিছু দৃশ্য তাই জরুরি হয়ে পড়ে, যেমন গভীর সমুদ্রে দিক হারানো নৌকায় বসে ক্লান্ত ক্ষুধার্ত চাঁন মাঝি তার ফিরে আসা পোষা পাখিটির মাংস খায়।
পশু, প্রাণী, পাখি হত্যা অপরাধ: বাস্তবে এবং চলচ্চিত্রেও। কিন্তু মেজবাউর রহমান সুমন কী সত্যিকার অর্থে এ ছবিতে এমন কোনো অপরাধ করেছেন বা দর্শককে উসকে দিয়েছেন যে তার বিরুদ্ধে আইনি নোটিস পাঠিয়ে ‘হাওয়া’ ছবির প্রদর্শনী বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে? উত্তরটা সম্ভবত না।
এ প্রসঙ্গে দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব মাইলো অ্যান্ড ওটিস (১৯৮৬) ছবির কথা আসে। প্রায় ২০টি বিড়ালের বাচ্চা মারা পড়ে এ ছবির শুটিংয়ের সময়। অনেকে সোচ্চার হয়েছিলেন। যা ভীষণ যুক্তিসংগত। বেনহুর (১৯৫৯) ছবির শুটিয়ে ১০০ ঘোড়ার মৃত্যু যেমন। পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান: দ্য কার্স অব দ্য ব্ল্যাক পার্ল (২০০৩) ছবি নিয়ে হলিউড রিপোর্টার এক প্রতিবেদনে বলেছিল, সাগরে বিস্ফোরণের দৃশ্যে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও স্কুইড মারা পড়েছে। হবিট: অ্যান আনএক্সপেকটেড জার্নি (২০১২) ছবিতে ২৭টি প্রাণী পানিশূন্যতা, ক্লান্তি ও ডুবে মারা পড়ে। লাইফ অব পাই (২০১২) ছবির দৃশ্য ধারণের সময় সত্যিকারের বাঘটি প্রায় ডুবে মরতে বসেছিল বলে সমালোচনা করেছিলেন অনেকে। অথচ এ ছবিটি বাংলাদেশের হলগুলোয় বহালতবিয়াতে চলেছে। তখন এ ছবি বন্ধের আইনি নোটিস কেউ দেয়নি। প্রশ্নটা এখানেই।
এতদিন পর বাংলা ছবি যখন হলে দর্শক ফেরাতে পারছে তখন যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়া একটি ছবির বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই ধাক্কা লাগে যখন ‘হাওয়া’ ছবির ছাড়পত্র বাতিল ও প্রদর্শন নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে উকিল নোটিস পাঠানো হয়। সে নোটিসে আরো বলা হয়েছে, শালিক পাখি খাঁচায় বন্দি এবং মাংস খাওয়ার দৃশ্য দেখিয়ে বন্যপ্রাণী আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি খুনের মাধ্যমে ভয়ংকর সহিংসতার দৃশ্য দেখানো, নারী চরিত্রকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন এবং অশ্লীল গালাগাল দেখানো হয়েছে।
‘সেন্সরশিপ শুধু আমাদের গল্প বলার ক্ষমতার ওপর আক্রমণ করাই নয়—এটি মানুষ হিসেবে আমাদের নিজস্ব প্রকৃতির বিরুদ্ধে অরোপিত একটি অপরাধও।’ কথাটি বলেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ-আমেরিকান ঔপন্যাসিক সালমান রুশদি।
‘মির্জাপুর’ নামে ভারতীয় একটি ওয়েব সিরিজ আছে, যা ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশেও তুমুল জনপ্রিয় কিংবা আমেরিকান ফ্যান্টাসি ড্রামা সিরিজ ‘গেম অব থ্রোনস’। এখানে হত্যা, সহিংসতা, যুদ্ধের নির্দয় দৃশ্যগুলো গল্পের বিষয়বস্তুর প্রয়োজনেই রয়েছে। এ সিরিজগুলো বাংলাদেশের দর্শকের কাছে জনপ্রিয়, বোধগম্যও। সে পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের দর্শক ‘হাওয়া’ ছবির দৃশ্যগুলো গ্রহণেও সক্ষম, সমঝদার। এটা দেখে তাদের বিগড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাছাড়া শুধু ‘হওয়া’ ছবি কেন, রায়হান রাফির ‘পরাণ’ ছবিতেও তো সহিংসতার দৃশ্য রয়েছে। হাওয়া নিয়ে অভিযোগ করে অন্য ছবি নিয়ে নীরব থাকার মানেও ঠিক বোধগম্য নয়।
নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’, অমিতাভ রেজার ‘আয়নাবাজি’ ছবির পর এ যাবত্ হাতেগোনা কয়েকটি বাংলা ছবি দর্শক আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। এগুলো বাদ দিলে আমাদের দর্শক হলমুখী হয়েছেন বিদেশী ছবির টানে। এমন এক বাস্তবতায় পরাণ ও হাওয়া ছবি দিয়ে বাংলা সিনেমা নতুন দিনে ফিরছে। বিদেশী ছবির দর্শকপ্রিয়তার সঙ্গে টেক্কা দিয়ে দর্শক টানছে ছবি দুটি। নির্মাতা, অভিনেতা, হল মালিকসহ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছেন। মুক্তির অপেক্ষায় আছে আরো কয়েকটি বাংলা ছবি। চলচ্চিত্রবোদ্ধারা ‘হাওয়া’কে বাংলা ছবির বাঁকবদলের সঙ্গেও তুলনা করছেন। এ অবস্থায় ছবিটির বিরুদ্ধে যথাযথ কোনো কারণ ছাড়া এ ধরনের আক্রমণ কেন করা হচ্ছে, তা অনুসন্ধান জরুরি। আরো জরুরি আমাদের চলচ্চিত্রের শিরদাঁড়াটা সোজা রাখার জন্যও।
হাওয়া ছবিটি মূলত বোকাচোখে দেখে বোঝা সম্ভব নয়। জাদু বাস্তবতাকে নির্মাতা যেভাবে দেখিয়েছেন তা প্রশংসার দাবিদার। আমাদের পুরাণে সাপ গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী মাছ হয়ে যাচ্ছে, আবার সাপ হয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে। দর্শকের চোখে দ্বিধা এসে ধাক্কা দেয়—এ নারী মাছ, সাপ, নাকি মানুষ। সমঝদার দর্শক বারবার মুগ্ধ হন এখানে। একটি দৃশ্যে যেমন নাগু জেলে বলে ওঠে এটা তো মাছ কিন্তু অন্যরা সবাই দেখছে জালে জড়িয়ে আছেন এক নারী। কখনো সমুদ্রের নিচে একটা মাছ নৌকাটাকে অনুসরণ করছে। আবার মেয়েটা যখন হারিয়ে যায়, তখন সে জলের নিচে মাছ হয়ে ঘুরছে। আমাদের পুরাণের সঙ্গে জাদু বাস্তবতার এমন দৃশ্যায়ন নির্মাতার মুন্সিয়ানা।
ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে মন খুলে আমাদের নিজেদের গল্প বলার জায়গাগুলো। সমাজে-সংস্কৃতিতে অচেনা আগন্তুক ছায়া। অন্য সংস্কৃতির আড়ালে আমাদের নিজস্ব গল্পগুলো প্রায় হারাতে বসেছে। বিদেশী গল্প, বিদেশী প্রেক্ষাপট-আধুনিকতার সঙ্গে আমাদের নির্মাতা পেরে উঠছেন না, বহুমাত্রিক সংকটের যাতাকলে পৃষ্ঠ হচ্ছেন। রয়েছে অর্থ সংকট, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও দর্শকহীনতা। এমন বাস্তবতায় আমাদের সমুদ্র, আমাদের মানুষ, আমাদের জেলে, আমাদের বেদে সম্প্রদায়, আমাদের পুরাণ, আমাদের প্রেম, আমাদের প্রতিশোধ, আমাদের উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকার গল্পে ভরা ‘হাওয়া’ ছবিটি একটি অনন্য আখ্যান হয়ে ওঠে।
সপ্তাহ দুই আগে সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটি দেখার সময় বয়ষ্ক দর্শকের উপস্থিতি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। যেমন মুগ্ধ করেছে ছবির প্রতিটি গান, চিত্রায়ণ, দৃশ্য ও চরিত্ররা। বাংলাদেশ সংস্কৃতির শেকড় পর্যন্ত ডুব না দিলে এমন মমতায় গল্প বলা যায় না। মেজবাউর রহমান সুমন মেরুদণ্ড শক্ত করেই হাওয়ার গল্পটা বলেছেন। তরুণ এ নির্মাতার সাবলীল নির্মাণভঙ্গিই বলে দেয় সুমনের হাত ধরে হাওয়ার মতো অনেক জাদু বাস্তবতার দৃশ্যবহুল চলচ্চিত্র তৈরি হবে। তাই হাওয়া সিনেমা বন্ধের দাবির যুক্তিটি কতটা সঠিক, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা জরুরি।
লেখক: সাংবাদিক