প্রস্তাবিত বাজেট

স্বর্ণ নীতিমালা বাস্তবায়নের হাতছানি

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করোনাক্রান্তি উত্তরণে গৃহীত ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ থাকলেও এনবিআরের বেশকিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রস্তাব অনেকের নজর এড়ায়নি। এদের মধ্যে অন্যতম হলো বর্তমান সরকার কর্তৃক আগে প্রণীত স্বর্ণ নীতিমালাকে এগিয়ে নেয়ার জোর সদিচ্ছা। নীতিমালাটি ২০১৮ সালের নভেম্বরে জারি হলেও এই দীর্ঘ সময়েও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এর অন্যতম প্রতিবন্ধকতা ছিল স্বর্ণ আমদানিতে শুল্কহারে অসামঞ্জস্য। বর্তমান বাজেটে সেটি আর থাকছে না।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করোনাক্রান্তি উত্তরণে গৃহীত ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ থাকলেও এনবিআরের বেশকিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রস্তাব অনেকের নজর এড়ায়নি। এদের মধ্যে অন্যতম হলো বর্তমান সরকার কর্তৃক আগে প্রণীত স্বর্ণ নীতিমালাকে এগিয়ে নেয়ার জোর সদিচ্ছা। নীতিমালাটি ২০১৮ সালের নভেম্বরে জারি হলেও এই দীর্ঘ সময়েও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এর অন্যতম প্রতিবন্ধকতা ছিল স্বর্ণ আমদানিতে শুল্কহারে অসামঞ্জস্য। বর্তমান বাজেটে সেটি আর থাকছে না।

বাজেটের এসআরও ১৪৪-এর টেবিল ১ (৭১০৮.১৩০০ এইচএস কোড) অনুসারে আমদানি পর্যায়ে স্বর্ণের ওপর বিদ্যমান করভার থেকে প্রযোজ্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এতদিন এই করভারের কারণে বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি হালে পানি পায়নি। এর মূল কারণ ছিল, ব্যাগেজ রুলের আওতায় ব্যাগেজ সুবিধায় আনীত শুল্ক ও বাণিজ্যিকভাবে আমদানীকৃত স্বর্ণের শুল্ককরের ব্যাপক তারতম্য। ব্যাগেজ সুবিধায় বিমানবন্দর দিয়ে আসা একজন যাত্রী ২৩৬ গ্রাম স্বর্ণের বার এবং ২০০ গ্রাম পর্যন্ত স্বর্ণালংকার (১০০ গ্রাম বিনা শুল্কে, বাকি ১০০ গ্রাম শুল্ক দিয়ে) আমদানি করার সুযোগ পান। এসব স্বর্ণে ওই যাত্রীকে ভরিপ্রতি মাত্র ২ হাজার টাকা শুল্ক দিতে হয়। অন্যদিকে বাণিজ্যিকভাবে অনুমোদিত ডিলাররা স্বর্ণ আমদানি করলে শুল্ককর দিতে হতো ভরিপ্রতি প্রায় ১২ হাজার টাকা। আমদানি পর্যায়ে প্রতি ভরির শুল্ককর হবে নির্ধারিত ২ হাজার টাকা এবং মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ আগাম করসহ মোট ২০ শতাংশ। যেখানে ব্যাগেজে একজন যাত্রী মাত্র ২ হাজার টাকা শুল্ক দিয়ে বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ আনতে পারে, সেখানে বেশি শুল্ক দিয়ে তা স্থানীয় বাজার থেকে কেউ কিনবে না, এটাই স্বাভাবিক।

এই পার্থক্যজনিত করভারের কারণে স্বর্ণ নীতিমালার আওতায় ডিলারদের দ্বারা স্বর্ণ আমদানিতে তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি। এর সমাধানের দুটো প্রধান বিকল্প ছিল। প্রথমত, ব্যাগেজ বিধিমালায় সব ধরনের স্বর্ণবার ও অলংকার নিষিদ্ধ করা, যাতে কম শুল্ক দিয়ে যে কেউ তা বাণিজ্যিকভাবে আনতে পারে এবং স্থানীয় বাজার থেকে ক্রয়কে উৎসাহিত করা। দ্বিতীয় বিকল্পটি ছিল ব্যাগেজের আওতায় আনীত স্বর্ণের শুল্ককর বাণিজ্যিক আমদানিকারকের অনুরূপ ২০ শতাংশে উন্নীত করা, যাতে উভয়ের মধ্যে করভার সমান থাকে। তবে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে এনবিআর বাজেটে তৃতীয় আরেকটি পথ বেছে নিয়েছে—আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ প্রযোজ্য ভ্যাট প্রত্যাহার করা। এতে উভয় পর্যায়ে করভার এখন যৌক্তিকীকরণ করা হয়েছে। নীতিমালা অনুসারে অনুমোদিত ডিলারকে আমদানি পর্যায়ে অন্য ৫ শতাংশ আগাম কর (অগ্রিম ভ্যাট) দিতে হলেও স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য ঘোষণা প্রদান করে কেবল মূল্য সংযোজনের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করলে তাকে নিট ভ্যাট দিতে হবে ২ শতাংশের কম। ওই অগ্রিম ভ্যাটের (আমদানি পর্যায়ে পরিশোধিত ৫%) বাকি অংশ সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিস থেকে তিনি ফেরত পেয়ে যাবেন। এভাবেও তিনি করভার লাঘব করতে পারবেন।

কর কাঠামোয় এ পরিবর্তনের ফলে স্বর্ণ নীতিমালাটির ভবিষ্যৎ আরো উজ্জ্বল হয়েছে, এমনটি বলা যায়। মাননীয় অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন, ‘আশা করা যায়, এতে বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বর্ণালংকার তৈরি ও বিপণন খাতে মূল্য সংযোজন কর আহরণ বৃদ্ধি পাবে।’ এই বক্তব্য অনুসারে, আমদানি পর্যায়ে প্রস্তাবিত মূসক অব্যাহতি স্বর্ণের দেশীয় মূল্য সংযোজন শিল্পের সহায়ক হবে। যেটুকু কর ছাড় দেয়া হয়েছে দেশীয় শিল্পের বিকাশ হলে তার চেয়ে বেশি কর স্থানীয় পর্যায়ে আহরণ হতে পারে। যেমন কাস্টমসের তথ্যমতে, বর্তমানে বৈধ পথে বাণিজ্যিকভাবে স্বর্ণের কোনো আমদানি নেই এবং সরকার এ খাতে কোনো কর রাজস্বও পাচ্ছে না। টিআইবি মতে, দেশের যত স্বর্ণ ব্যবহার হয়, তার একটা অংশ চোরাচালান বা অন্য কোনো অবৈধ উৎস থেকে জোগান হয়ে থাকে। আমদানি পর্যায়ে কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডারে কোনো রেকর্ড না থাকায় স্থানীয় পর্যায়েও যথাযথ লেনদেন করনেটে আসে না এবং সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ থেকে এক ধরনের কালো টাকা বা ‘ডার্টি মানি’ সৃষ্টি হয়ে আসছে। নীতিমালাটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশের স্বর্ণ শিল্প এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসবে। 

স্বর্ণ নীতিমালার ফলে দেশীয় স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে চোরাই স্বর্ণের সংযোগ নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে। কারণ এতে অনুমোদিত ডিলারের মাধ্যমে স্বর্ণ আমদানি ও স্বর্ণকারদের কাছে তা বিক্রয়ের তথ্যাদি সরকারের নজরদারিতে থাকবে। কোথাও কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে এখতিয়ার সম্পন্ন সংস্থা তা যাচাই-বাছাই করে দেখতে পারবে। সরকারের যথাযথ রাজস্ব আহরণের পথ উন্মুক্ত হবে। অন্যদিকে সরকার তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাবে মোট স্বর্ণের স্থিতি ও চাহিদা সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান তৈরি করা এবং এ খাতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দিতে পারবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে পারলে দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রফতানি করার অপার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এজন্য বন্ড সুবিধা প্রদান, শুল্ক রেয়াত এবং প্রত্যর্পণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে নীতিমালায়।  

প্রায় পৌনে দুই বছর আগে যে গতিতে নীতিমালাটি প্রণয়ন করা হয়েছিল, সে গতিটি ধরে রাখা যায়নি। এখনো এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন না হওয়ায় অনেকের মাঝে সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল। জুয়েলারি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা এটির দ্রুত বাস্তবায়ন চান। তাদের স্বার্থেই এর দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ এর ফলে তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা একটা নৈতিক ও আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। তারা মাথা উঁচু করে ব্যবসা করতে পারবেন। প্রায় ২০ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের এ শিল্প আরো বিকশিত হবে। নীতিমালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। একজন ক্রেতা তার কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে যে গহনা কিনছেন, তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে তিনি নিশ্চয়তা পাবেন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিটি স্বর্ণালংকারে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্দিষ্ট হলোগ্রামযুক্ত ও যথাযথ চালান প্রদান করে লেনদেন করার কথা বলা হয়েছে। প্রণীত নীতিমালাটি নিঃসন্দেহে দেশের স্বর্ণ ব্যবসায় অধিকতর বৈধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।

নীতিমালায় স্থান পাওয়া আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা ছিল স্বর্ণকারদের হাতে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ মজুদের নিষ্পত্তি করা নিয়ে। আগেই বলা হয়েছে যে স্বাধীনতার পর স্বর্ণ সরবরাহ নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট ও পৃথক নীতিমালা না থাকায় প্রধানত চোরাচালান বা কোনো অবৈধ উৎস থেকে সংগৃহীত স্বর্ণ দিয়ে তাদের স্বর্ণ ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। বস্তুত আগে স্বর্ণালংকারের মূল উপাদান এই স্বর্ণপিণ্ডের কোনো বৈধ জোগান ছিল না। ফলে বিভিন্ন সময়ে তাদের হাতে মজুদের অধিকাংশ স্বর্ণের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭ সালে চোরাচালানের একটা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রাজধানীর একটি বড় জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি শোরুম থেকে শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযানে প্রায় ১৫ মণ স্বর্ণ আটকের পর স্বর্ণ ব্যবসার এই দুর্বল দিকটি সামনে চলে আসে। ওই ঘটনার পর নীতিনির্ধারকদের চোখ খুলে দেয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন করে স্বর্ণ নীতিমালা প্রণয়নে মনোযোগী হয়। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে টিআইবিও সম্পৃক্ত হয়। 

প্রণীত নীতিমালায় বর্ণিত ভবিষ্যতের আমদানি ও ব্যবহারের পাশাপাশি বর্তমানে ব্যবসায়ীদের হাতে স্বর্ণের বিশাল মজুদ নিষ্পত্তি ছিল একটি জটিল প্রক্রিয়া। কারণ এদের অধিকাংশের সপক্ষে বৈধ আমদানির কাগজ বা প্রমাণাদি নেই। ব্যবসায়ীদের হাতে থাকা আবার এসব স্বর্ণকে অবৈধ ঘোষণা করে জব্দ করাও বাস্তবসম্মত নয়। যুগ যুগ ধরে দেশীয় স্বর্ণ শিল্প এভাবেই গড়ে উঠেছে। এই বিশেষ বিবেচনায় সরকার তাদের হাতে থাকা মজুদ স্বর্ণের বিষয়ে সাধারণ অব্যাহতির (জেনারেল ইনডেমনিটি) নীতি অবলম্বন করে। এনবিআরের একটি প্রজ্ঞাপনের (এসআরও ১৩২, তারিখঃ ২৩ মে ২০১৯) মাধ্যমে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়কর প্রদান করে তাদের মজুদ স্বর্ণের ঘোষণা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। এক মাসব্যাপী (জুন ২০১৯) এই বিশেষ কর মেলায় সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজার স্বর্ণকার অংশ নিয়েছেন এবং তারা প্রায় ২০০ কোটি টাকা আয়কর প্রদান করেন। তারা প্রতি ভরিতে ১ হাজার টাকা দিয়ে এই ঘোষণা দিয়ে তা বৈধ করার সুযোগ পান। এতে প্রায় ১৮ লাখ ভরি বা ২১ টন স্বর্ণ ঘোষিত হয়। এই বিশেষ অব্যাহতির সুযোগ অবশ্য ব্যবসায়ীদের একটা অংশ নেয়নি। তারা এক রকম ঝুঁকির মধ্যেই আছেন এবং ভবিষ্যতে শুল্ক গোয়েন্দা বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

এই নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় মজুদ স্বর্ণের হিসাব এখন এনবিআরের নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে মজুদ স্বর্ণের আয়কর নেয়া হলেও এনবিআরের কাস্টমস ডিউটির বিষয়টি সম্পর্কে অষ্পষ্টতা রয়ে গেছে। আগেই বলা হয়েছে যে ঘোষিত স্বর্ণের একটি বড় মজুদ বিদেশ থেকে অবৈধ পথে আমদানীকৃত। এনবিআরের আয়কর বিভাগ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে অঘোষিত বা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন মার্জনা করলেও এতে প্রযোজ্য শুল্কসংক্রান্তে কোনো ব্যাখ্যা নেই। অন্যদিকে মজুদ স্বর্ণালংকার তৈরি ও বিক্রির সময়ে প্রযোজ্য ভ্যাটও আহরণযোগ্য। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার দ্বার উন্মুুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে এই তিন ধরনের কর (আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট) প্রযোজ্য হতে পারে। অঘোষিত মজুদ স্বর্ণের আয়কর আদায় করে ঘোষণা নিলেও অন্য দুটো করের বিষয়টি কীভাবে সুরাহা হবে তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। ভবিষ্যতে যেকোনো আইনগত জটিলতা এড়ানোর স্বার্থেই এটি করা দরকার। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১৮টি স্বর্ণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে স্বর্ণ আমদানির ডিলার হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পাইপলাইনে আছে। নতুন স্বর্ণ নীতিমালা অনুযায়ী এসব ডিলার বিদেশ থেকে স্বর্ণ আমদানি করতে পারবে। তাদের এজন্য আমদানি পর্যায়ে শুল্ককর দিতে হবে না—বিক্রির সময়ে তা পরিশোধ করতে হবে। তবে তাদের কাস্টমস থেকে বন্ড লাইসেন্স নিতে হবে এবং দ্য কাস্টমস অ্যাক্ট ১৯৬৯-এর বন্ডসংক্রান্ত শর্তাবলি মানতে হবে। এ কাজটি বর্তমানে চলমান রয়েছে। স্থানীয় খুচরা স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা এসব ডিলার থেকে নির্দিষ্ট ছকে হিসাব অনুযায়ী শুল্ককর প্রদান করে তাদের চাহিদা অনুযায়ী স্বর্ণ ক্রয় করতে পারবেন। এই স্বর্ণ আমদানি, ক্রয় ও বিক্রয়ের বিষয়টি কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়। এনবিআরের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাকে এই মনিটরিং করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।

স্বর্ণ নীতিমালা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলেও স্বর্ণ চোরাচালানের ঝুঁকি একেবারেই উবে যাবে, এমনটি নিশ্চিত হওয়া যাবে না। স্বর্ণের ওপর বর্তমানে প্রযোজ্য শুল্ক-করাদি ফাঁকি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ এড়ানো চোরাচালানিদের অন্যতম লাভ ও লোভের কারণ। এছাড়া রয়েছে স্বর্ণের অন্যান্য অপরাধকেন্দ্রিক ব্যবহার। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, চোরাচালানকৃত স্বর্ণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহূত হয় নানা ধরনের অপরাধের অর্থায়নের বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে। সন্ত্রাস, নাশকতা, অবৈধ মাদক, অস্ত্র ও বিস্ফোরক চোরাচালান, নারী ও শিশু পাচার, মানি লন্ডারিংসহ যেকোনো অপরাধের সঙ্গে অবৈধ লেনদেনে জড়িত এই স্বর্ণ।


আমেরিকান বুলিয়ন ডটকমের মতে, বিশ্বে মানব পাচার ও মাদকসহ যত পণ্যের চোরাচালানি হয়, তার মধ্যে স্বর্ণের স্থান পঞ্চম। এর মূল কারণ হলো, স্বর্ণ কাগজের মুদ্রার চেয়ে অধিকতর কম জায়গা দখল করে এবং তা লুকানো ও বহন করা অধিকতর সহজ। কাগজের মুদ্রার মতো স্বর্ণের অবমূল্যায়ন কম হয় এবং তা স্থায়ী সম্পদ হিসেবেও অনেক আকর্ষণীয়। তাছাড়া এটি ‘গ্লোবাল কারেন্সি’ হিসেবেও বিবেচিত এবং সবার কাছে তা গ্রহণযোগ্য। পাশাপাশি আরেকটি ভৌগোলিক বাস্তবতা হচ্ছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে স্বর্ণের ব্যাপক চাহিদা (২০১৯ সালের হিসাবমতে প্রায় ৬৯০ টন) এবং সেখানে স্বর্ণের আমদানি ও ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণও রয়েছে। এ কারণে অতীতে বাংলাদেশকে স্বর্ণ পাচারকারীদের রুট হিসেবে ব্যবহারের তত্পরতা ছিল। চোরাচালানের দায়ে ২০১৩-১৭ মেয়াদে কেবল শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃক আটক স্বর্ণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫২ মণ, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের বিশ্বাস এর একটা বড় অংশ পার্শ্ববর্তী দেশে পাচারের উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল। বিমানবন্দর ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো থেকে উভয় দেশের বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক বিপুল পরিমাণ আটক স্বর্ণের তথ্য ইঙ্গিত করে, নানা অপরাধের সূত্রে স্বর্ণের চোরাচালানের চাপ হয়তো থেকেই যাবে।

স্বর্ণের এই চোরাচালান প্রতিরোধ মানেই হলো দেশের ‘অপ্রচলিত নিরাপত্তা’ সংহত করা, নানা অপরাধের রক্ত সঞ্চালনে বাধা সৃষ্টি করা এবং সর্বোপরি স্বর্ণ শিল্পকে চোরাচালান থেকে পৃথক করে তা নৈতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা। স্বর্ণ নীতিমালা কার্যকরের মাধ্যমে বৈধ স্বর্ণ ব্যবসাকে উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দরসহ দেশের সীমান্ত এলাকায় কঠোর ও সুতীক্ষ্ণ নজরদারি অব্যাহত রাখার অপরিহার্যতা রয়েছে। এজন্য এনবিআর প্রচলিত আইনের বস্তুনিষ্ঠ ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার সব রকম ব্যবস্থা নিয়েছে। শুল্ক ভবন ও শুল্ক গোয়েন্দায় যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে পদায়ন করছে, সংস্থার সদস্যদের সঠিক প্রশিক্ষণ প্রদান, পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে সুষ্ঠু সমন্বয় এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা তৈরি করছে। নীতিমালাটি বাস্তবায়নে এনবিআর অনেকদূর এগিয়ে এসেছে। আশা করা যায়, দ্রুত এর সুফল দৃশ্যমান হবে; স্বর্ণ শিল্পে সুদিন হাতছানি দিচ্ছে।

 

ড. মইনুল খান: কমিশনার অব কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট, ঢাকা পশ্চিম। তিনি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও স্বর্ণ নীতিমালা প্রণয়নে সরাসরি সংযুক্ত ছিলেন

[email protected]

আরও