[গতকালের পর]
ইএফডির অন্যতম সুবিধাভোগী হচ্ছেন ক্রেতাসাধারণ: এ মেশিনের
মাধ্যমে যেকোনো
পণ্য বা
সেবা কিনলে
যে চালান
পাওয়া যাবে
তা ওই
পণ্য বা
সেবা ক্রয়ের
আইনি দলিল
হিসেবে গণ্য
হবে। এ চালান পণ্য
বা সেবা
ক্রয় ও ভ্যাট পরিশোধের তথ্যের পাশাপাশি দোকানের
ভ্যাট শনাক্তকরণসহ বারকোড প্রিন্ট করা
থাকবে। এ বারকোডটি থাকার
সুবিধা হলো
ক্রেতা তার
নিজস্ব মোবাইল
অ্যাপস দিয়ে
চালানের সত্যতা
তাত্ক্ষণিক যাচাই
করে নিতে
পারবেন। তিনি
ক্রয়ের সময়
নিশ্চিত হতে
পারবেন, তার
দেয়া ভ্যাট
এনবিআরের সেন্ট্রাল সার্ভারে গৃহীত হয়েছে,
যা মাস
শেষে বিক্রেতা সরকারি কোষাগারে জমা
দেবেন। অন্যদিকে সরকার সময়ে সময়ে
সার্ভারে রক্ষিত
ভ্যাট ইনভয়েস
থেকে দৈবচয়ন
ভিত্তিতে লটারির
মাধ্যমে যে
পুরস্কার ঘোষণা
করছে ক্রেতাসাধারণ তাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। পণ্য
ক্রয়ের সময়
মেশিনে ইনভয়েস
গ্রহণে ক্রেতাসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে এনবিআর
এ ধরনের
প্রণোদনা দেয়ার
ব্যবস্থা রেখেছে।
বর্তমানে প্রতি
মাসের ৫ তারিখে এনবিআরে
লটারি অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রথম
পুরস্কার ১ লাখ টাকাসহ
১০১টি পুরস্কার রয়েছে এতে। নতুন
ভ্যাট আইন
অনুসারে, ক্রেতা
যে মূল্যেই
পণ্য বা
সেবা ক্রয়
করুন না
কেন, সে
মূল্যের মধ্যে
ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত (ভ্যাট ইনক্লুসিভ) রয়েছে
মর্মে ধরে
নেয়া হবে।
এর অর্থ
হচ্ছে ক্রেতা
ইনভয়েস না
নিলে ওই
ভ্যাট রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হবে
না। তবে
ক্রেতাকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ব্যাপক
প্রচারণা থাকবে
নতুন জেনেক্স
ব্যবস্থায়। পত্রিকা,
টিভি, সোশ্যাল
মিডিয়া ও অন্যান্য মাধ্যমে
এ প্রচারণা অনবরত দৃশ্যমান করা
হবে। ক্রেতা
কোনো পণ্য
কিনলে তার
সামনে মেশিনে
ইনভয়েস নেয়ার
বিষয়টি ভেসে
উঠবে এবং
বিক্রেতাকে ইনভয়েস
দেয়ার জন্য
উদ্বুদ্ধ বা
চাপ প্রয়োগ
(প্রয়োজনে কোন
কোন ক্ষেত্রে) করবেন। মেশিনে ইনভয়েস
নিয়ে ক্রেতা
যেমন নাগরিক
দায়িত্ব পালন
করতে পারবেন,
তেমনি মাসিক
লটারির সুযোগ
পাবেন। নতুন
ব্যবস্থাটি মূলত
সচেতন ক্রেতানির্ভর ইনভয়েস ইস্যুর ওপর
দাঁড়িয়ে থাকবে।
এনবিআর কেন এ ইএফডি চাচ্ছে: নতুন ভ্যাট আইনের অন্যতম দিক অনলাইন ব্যবস্থার পরিধি বিস্তৃত করা। এ ইএফডি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় মেশিনে দেয়া যেকোনো তথ্য সঙ্গে সঙ্গে এনবিআরের নেটওয়ার্কে চলে আসবে। আগেই বলা হয়েছে, একজন বিক্রেতা ইচ্ছা করলেও তার বিক্রির তথ্য ইচ্ছামাফিক পরিবর্তন করতে পারবেন না। মাস বা মেয়াদশেষে মোট বিক্রি ও প্রযোজ্য ভ্যাট হিসাব করে তা আদায় করা সহজ হবে। এ ব্যবস্থায় কোনো দোকানের পণ্যের মজুদ ও বিক্রি-সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্যও জানা যাবে। ভ্যাট কর্মকর্তারা অফিসে বসে জানতে পারবেন দোকানে স্থাপিত মেশিনটি সচল আছে কিনা? যদি দেখা যায় কোনো নির্দিষ্ট সময়ে এটি কাজ করছে না এবং বন্ধ থাকছে, তাহলে কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার সিগন্যাল দেবে এবং ভ্যাট কর্মকর্তারা ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আইনানুগ অনুসন্ধান করতে পারবেন। অধিকন্তু বিভিন্ন সময়ে ভ্যাটের হারে পরিবর্তন আসলে তা প্রতিষ্ঠানে না গিয়েও এনবিআরে বসে সিস্টেমে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। এনবিআরের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, ভ্যাটের কলেবর বাড়লেও জনবল না বাড়ায় সীমিত জনবল দিয়ে বিপুল পরিমাণ ভ্যাটের প্রতিষ্ঠানের ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে এবং সঠিকভাবে তদারক সম্ভব হবে। এতে ভ্যাট ব্যবস্থায় সম্পদের সাশ্রয় হবে। তবে বর্তমানের ব্যবস্থায় যে আট হাজার মেশিন বসানো হয়েছে, তাতে দেখা গিয়েছে ইএফডি ভ্যাট আহরণে কার্যকর ব্যবস্থা বলে প্রমাণিত হলেও শত ভাগ সুফলতা মেলেনি। আগেই বলা হয়েছে, স্বতঃস্ফূর্ততার উপাদান থাকলে এর ফল আরো ইতিবাচক হবে। বর্তমানে মেশিনগুলো কায়িকভাবে ভ্যাট অফিসার দ্বারা পাহারা দিয়ে ইনভয়েস ইস্যু করাতে হচ্ছে। এটি যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। স্বতঃস্ফূর্ততা যুক্ত থাকলে এ খাত থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। মাঠপর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা এবং যাচাই-বাছাই করে বিকল্প পন্থায় এবং অত্যন্ত স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জেনেক্স ইনফোসিসকে নির্বাচন করা হয়েছে। রাজস্ব বৃদ্ধির অন্যতম খাত হিসেবে ভ্যাট সংগ্রহের জন্য এটি উত্তম ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এতে শুধু ভ্যাট বাড়বে না, এর মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে যেকোনো পরিসংখ্যানগত তথ্য প্রস্তুত করা যাবে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া আয়কর আহরণের ভিত্তিও তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে যেকোনো আইনি অনুসন্ধান বা তদন্তকাজেও এ তথ্যভাণ্ডার উপযোগী হতে পারে। মূল কথা, ইএফডি ব্যবস্থার নতুন এ সংস্করণ ভ্যাট ব্যবস্থায় আগের তুলনায় স্বচ্ছতা আনবে এবং তা ভ্যাট আহরণের গতি বাড়িয়ে দেবে।
কতিপয় চ্যালেঞ্জ: তবে
বর্তমানে নতুন
ব্যবস্থায় ইএফডি
চালু করতে
সার্বিকভাবে কয়েকটি
চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় আনা হয়েছে। প্রথমত, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ইএফডি
স্থাপনের নতুন
ব্যবস্থাটি অনেক
কর্মকর্তাদের মাঝে
এক ধরনের
বিভ্রান্তির সৃষ্টি
হয়েছে। এ ব্যবস্থাটি কর্মকর্তাদের ব্যর্থতাকে নির্দেশ করছে
কিনা বা
তাদের আইনি
ক্ষমতা চলে
গেল কিনা
তা সামনে
চলে আসছে।
এর সঙ্গে ক্ষোভ
ও হতাশাও
সৃষ্টি হয়েছে।
তবে বিষয়টি
যেভাবে ছড়িয়েছে
তা স্পষ্ট
করা প্রয়োজন। নতুন ব্যবস্থায় জেনেক্স
ইনফোসিস ভ্যাট
কমিশনারেটের এজেন্ট
হিসেবে কাজ
করবে; বিকল্প
হিসেবে নয়।
তারা জাতীয়
রাজস্ব বোর্ডের
নির্দেশনা অনুযায়ী
মেশিন স্থাপন,
মেশিনের কারিগরি
দিক দেখভাল,
মেশিনে লেনদেন
এন্ট্রি নিশ্চিত
করার জন্য
ব্যবস্থা গ্রহণ
এবং এ-সংক্রান্ত দায়িত্ব
পালনের ক্ষেত্রে তথ্য সরবরাহের কাজ
করবেন। জেনেক্স
ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সচেতন
করার জন্য
ব্যাপক প্রচার
ও প্রচারণার ব্যবস্থা করবেন যাতে
সবাই ইএফডিতে
ইনভয়েস ইস্যু
ও গ্রহণ
করার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ হন। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কর্মকর্তাদের সহায়তা নিয়ে জরিপ
করে নতুন
নতুন ভ্যাটযোগ্য প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের
করে মেশিন
স্থাপনেরও ব্যবস্থা নেবে। মোদ্দাকথা, মেশিন
স্থাপন, সংরক্ষণ
ও তা
স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যবহারের যাবতীয়
কাজটি করবে
জেনেক্স ইনফোসিস। স্থানীয় ভ্যাট কর্মকর্তাদের সহযোগী বা এজেন্ট
হিসেবে দায়িত্ব
পালন করবে
প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ
কোনো প্রতিষ্ঠান মেশিনে ইনভয়েস ইস্যু
না করলে
জেনেক্স ইনফোসিস
বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ভ্যাট কর্মকর্তাকে জানাবে এবং ভ্যাট
কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ
করবেন। কর্মকর্তাদের আইনি দায়িত্ব বর্তমানে যেমন রয়েছে, নতুন
ইএফডি ব্যবস্থায়ও তাই থাকবে। এনফোর্সমেন্ট, অডিট ও রাজস্ব
মনিটরিং এবং
বিশেষ করে
ভ্যাট ফাঁকি
হলে তা
উদঘাটন, মামলা
দায়ের ও ন্যায় নির্ণয়নের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনে কোনো মৌলিক
পরিবর্তন আনা
হয়নি। তাই
এ নিয়ে
ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকছে না।
বরং ব্যাপকসংখ্যক ভ্যাটযোগ্য খুচরা প্রতিষ্ঠানকে ইএফডির আওতায় আনা
ভ্যাট কর্মকর্তাদের জন্য স্বস্তি এনে
দেবে; তাদের
দায়িত্ব পালনে
আরো স্বচ্ছতা আসবে। এ খাতে
ভ্যাট আহরণে
নানা ধরনের
হয়রানির অভিযোগ
কমে যাবে।
দ্বিতীয়ত, কারিগরিভাবে মেশিনগুলো স্থানীয়ভাবে উপযোগী করে তৈরি করা হবে কিনা। যে ‘কী-বোর্ড’ ব্যবহার হবে তা প্রান্তিক পর্যায়ের দোকানি বা তার কর্মচারীগণ চালাতে পারবেন কিনা। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট নিরবচ্ছিন্ন না থাকলে কী হবে? প্রথমদিকে দোকানের হাজারো পণ্যের প্রতিটির স্টক নেয়া এবং তার বিপরীতে পণ্য বা সেবার শনাক্তকরণ ও এইচএস কোড ব্যবহার ও তা সমন্বয়ে কিছু জটিলতা হতে পারে। অন্যদিকে কোনো একটি দোকানে বিক্রীত পণ্যের ওপর একই সময়ে বিভিন্ন হারে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক প্রযোজ্য হতে পারে। সিস্টেমে এ বিষয়টি কীভাবে সামাল দেয়া হবে? এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বর্তমানে প্রচলিত ইএফডির অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী দেখা যায়, বিদ্যুৎ না থাকলেও মেশিনের মেমোরিতে লেনদেনের তথ্য ধারণ করা যায়। বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন হলে এসব তথ্য সার্ভারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রেরণ হয়ে যায়। ইনভেন্ট্রি ম্যানেজমেন্টও বর্তমানের অভিজ্ঞতার আলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। ইএফডি মেশিনের ব্যবহার সেলফোনের মতোই সহজ। বর্তমানের মেশিনগুলো যদিও টিপ বাটনের জেনেক্স টাচ স্ক্রিনের মেশিন সরবরাহ করবে। ফলে এ মেশিন আরো ব্যবহার উপযোগী হবে। অন্যদিকে জেনেক্স মেশিন ব্যবহারকারীদের সব ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। তৃতীয়ত, ইএফডি হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর মেশিন। এর ব্যবহার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাও নতুন। যেকোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর মানসিকতা বা অভ্যস্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও ব্যাপক উদ্বুদ্ধকরণ অত্যন্ত জরুরি। সারা দেশে খুচরা দোকানের সংখ্যা ২০ লক্ষাধিক। এত ব্যাপক সংখ্যাকে নতুন ব্যবস্থায় আনতে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও তা এগিয়ে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থত, নতুন চুক্তি অনুযায়ী মোট তিন লাখ ইএফডি স্থাপন করতে হবে আগামী পাঁচ বছরে। তবে ভ্যাট অনলাইনের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা চার লাখ অতিক্রম করেছে মাত্র এবং এদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হচ্ছেন খুচরা বিক্রেতা। এর অর্থ, তিন লাখ মেশিন বসানোর জন্য আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হবে। ব্যবসায়ী সমিতির হিসাব মতে, তাদের সদস্য সংখ্যা ২০ লক্ষাধিক। এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা ভ্যাটনেটের বাইরে। এদের ভ্যাটের আওতায় এনে নতুন ব্যবস্থাটির আওতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পঞ্চমত, কর প্রদানের সংস্কৃতি তৈরির ওপর নির্ভরশীল এ নতুন ব্যবস্থার সাফল্য। ইএফডিতে যেহেতু কর ফাঁকির সুযোগ সীমিত তাই যারা এটি ব্যবহার করবেন এবং মনিটর করবেন তারা কতখানি আন্তরিক হবেন তা নিয়ে আলোচনা হয়। বর্তমান ইএফডির অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে, কোনো কোনো ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রিতে ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট আদায়ে উৎসাহিত হন না। আদায় করলেও তা তারা যথাযথ জমা দেন না। তারা এ নতুন ব্যবস্থাকে কীভাবে গ্রহণ করবেন সেটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে দূরের কোনো প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত মেশিন ব্যবহার না করেও বিক্রেতা তার পণ্যটি নগদে লেনদেন করতে পারেন। মেশিনে এন্ট্রি না দিয়ে বিকল্প পথে তিনি পণ্য বিক্রির সুযোগ খুঁজতে পারেন। একই সঙ্গে, কেউ কেউ বাড়তি সুবিধা হারানোর আশঙ্কায় এ ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহী নাও হতে পারেন। এ চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে জেনেক্স ইনফোসিস ও এনবিআর সামনের দিকে আগাবে। ব্যাপক প্রচারণা এবং একই সঙ্গে পণ্য বা সেবা বা স্থানে (শপিং মল) মেশিন বসালে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই উদ্বুদ্ধ হবেন এবং বাজারেও প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে একে অন্যের পাহারাদার হবেন। কেননা সমজাতীয় পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে কেউ স্থাপিত মেশিনে ইনভয়েস ইস্যু না করলে অন্য ব্যবসায়ীর জন্য তা ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবার ক্রেতা যখন উদ্বুদ্ধ হবেন তখন তিনি চাইবেন তার দেয়া ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা হোক এবং লটারিতে তার পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হোক। এজন্য তিনি মেশিনে ইনভয়েস চেয়ে নেবেন। ষষ্ঠত, আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের নিষ্ঠা ও নৈতিকতা নিয়ে। জেনেক্স ইনফোসিস যদি নিজে অনৈতিকভাবে কোনো ব্যবসায়ী বা সমিতির সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করে তাহলে কী হবে? এতে ভ্যাট আহরণ আরো ঝুঁকির মধ্যে পড়বে কিনা। কেউ কেউ বলছে, এটি ‘প্রাইভেটাইজেশন অব করাপশন’ হয়ে যাবে কিনা। এটির জবাব হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির লাভ নির্ভর করছে মেশিনে ইনভয়েস এন্ট্রির ওপর—যত বেশি মেশিন ব্যবহার হবে তত বেশি তার মুনাফা ঘরে আসবে। ফাঁকি দিলে বরং কোম্পানির (জেনেক্স ইনফোসিস একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি) জন্য ক্ষতি। তবে মাঠ পর্যায়ের বিশেষ করে মেশিন তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠতে পারে। তবে স্বস্তির বিষয়, ভ্যাট কর্মকর্তাদের কাছে এসব অভিযোগ এলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রযোজ্য হতে পারে। অন্যদিকে জেনেক্স ইনফোসিস নিজেই একদল মনিটরিং টিম নিয়োগ করবে যাতে কোনো পর্যায়ে কেউ এ ধরনের অনৈতিক সমঝোতায় লিপ্ত না হন।
বর্ণিত চ্যালেঞ্জগুলাকে মাথায় রেখে এনবিআর নতুন আউটসোর্সিংয়ের ব্যবস্থায় ইএফডি চালু করতে যাচ্ছে। তবে এরই মধ্যে ভ্যাট আইনের আওতায় ৮০০০ মেশিন চালু থাকায়, নতুন ইএফডির যাত্রার পথটি আরো সুগম হয়েছে। এখন বিশ্বাস জন্মেছে, মেশিনসংক্রান্ত যেসব ত্রুটি রয়েছে, তা আমলে নিয়ে যথাযথ ভ্যাট আহরণের উপযোগী করে এসব নতুন ইএফডি স্থাপন করা হবে। কারিগরি দিক দিয়ে এসব মেশিন যতটা ব্যবসায়ী ও রাজস্ববান্ধব করা যায় ততই পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এজন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণে নানামুখী কর্মসূচির আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এতে ভ্যাট কর্মকর্তা ও মনোনীত ব্যবসায়ীরাও অংশ নেবেন। ইএফডি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রম নেয়া হচ্ছে। সব ধরনের শঙ্কা দূর করেই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে। চলতি অর্থবছরেই এ ব্যবস্থার প্রবর্তন দেখা যাবে। ইএফডি অন্য দেশে সাফল্য এনে দিয়েছে। রাজস্ব আহরণে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। কেসি ও ক্যাস্ট্রো (২০১৫) কেনিয়া, তানজানিয়াসহ ১৯টি দেশে জরিপ করে দেখতে পান, ইএফডি চালুর পর ওই সব দেশে ১৪ শতাংশ অতিরিক্ত বিক্রয় রেকর্ডভুক্ত হয়েছে এবং সে অনুপাতে রাজস্বও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়াতে ভ্যাট অন্যতম বিকল্প হওয়ায় নতুন ভ্যাট আহরণে নতুন পদ্ধতিতে এ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির প্রবর্তন একটি বড় অগ্রগতি হবে। এখানে কতিপয় চ্যালেঞ্জ থাকলেও তা গ্রহণযোগ্য ও উপযোগী করে চালু করার জন্য এনবিআরে যথাযথ প্রস্তুতি চলছে। যেহেতু খুচরা পর্যায়ে কোটি কোটি লেনদেনের হিসাব সনাতন পদ্ধতিতে মনিটরিং বাস্তবসম্মত নয়, সেহেতু স্বচ্ছতার স্বার্থেই এবং ভ্যাট আহরণে সময় ও খরচ বাঁচাতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নতুন ইএফডি ব্যবস্থাকে স্বাগত জানানো দরকার। নতুন ভ্যাট আইন অনুসারে প্রযোজ্য হারে ভ্যাট আহরণ ও তা সরকারি কোষাগারে জমা দেখতে চান অনেকে। চূড়ান্তভাবে এতে ভ্যাট ফাঁকির সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় অন্যান্য দেশের মতো রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আদর্শ ভ্যাট ব্যবস্থার ‘চেইন ইফেক্ট’ সৃষ্টি করতে এ ইএফডি কার্যকর অবদান রাখবে। ইএফডির তথ্যাদি অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচক, মাপকাঠি ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার সুযোগ বাড়াবে। এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পদচিহ্নের সূচনা করবে এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির পথ আরো প্রসারিত হবে। (শেষ)
ড. মইনুল খান: সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি)
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)