বিশ্ব শহর দিবস পালন

টেকসই নগর পরিকল্পনা ছাড়া একে একে সব শহরই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠবে

২০১৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর পালন করা হয় বিশ্ব শহর দিবস। দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের শহরগুলোয় সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে জোর দেয়া। কেননা পৃথিবীব্যাপী দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে।

২০১৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর পালন করা হয় বিশ্ব শহর দিবস। দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের শহরগুলোয় সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে জোর দেয়া। কেননা পৃথিবীব্যাপী দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে। শহুরে জনসংখ্যার হার ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নগর সমস্যাও। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ বাস করবে শহরগুলোয়। তখন বর্তমানের সংকটগুলো আরো প্রকট হবে। বিশেষ করে শহরগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে। এ প্রভাব মোকাবেলা করতে হলে প্রয়োজন নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া। বিষয়টিকে স্মরণ করিয়ে দিতেই প্রতি বছর আয়োজন করা হয় বিশ্ব শহর দিবস।

দিবসটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ১১-এর সঙ্গেও সম্পৃক্ত। এ লক্ষ্যমাত্রায় অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই শহর গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া হয়েছে বিশেষভাবে। নগর পরিকল্পনায় বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া না হলে শহরগুলো একসময় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এরই মধ্যে বাসযোগ্যতা বিচারে অনেক শহরের নামই ‘অনুপযোগী’ তালিকায় যোগ হয়েছে। তেমন একটি শহর দেশের রাজধানী ঢাকা। শুধু এ শহরের বায়ুদূষণের মাত্রা লক্ষ করলেই বিষয়টির প্রমাণ মেলে।

প্রায় প্রতিদিনই ঢাকার বায়ুমান অস্বাস্থ্যকর থাকে। এখানে বসবাসকারীরা গত নয় বছরে (৩ হাজার ১১৪ দিনের হিসাব) মাত্র ৩১ দিন নির্মল বাতাসে নিশ্বাস নিতে পেরেছেন বলে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) তথ্যে জানা গেছে। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (একিউআইয়ের) তথ্যের ভিত্তিতে ক্যাপস আরো জানিয়েছে, ঢাকায় এ সময়ে ৮৫৩ দিনের বাতাস ছিল অস্বাস্থ্যকর। আর খুব অস্বাস্থ্যকর ও দুর্যোগপূর্ণ বাতাস ছিল যথাক্রমে ৬৩৫ দিন ও ৯৩ দিন। বায়ুমানের এ পরিস্থিতির পেছনে বহু কারণ রয়েছে। কলকারখানা, ইট ভাটার ধোঁয়া থেকে শুরু করে পরিবহনের কালো ধোঁয়া সবচেয়ে বেশি দায়ী। সেই সঙ্গে রয়েছে পানিদূষণ, শব্দদূষণ। এ শহরে কেবল যত্রতত্র বহুতল ভবন ও বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ স্থাপনা নির্মাণের সময় মানা হয়নি বিল্ডিং কোড। নেয়া হয়নি অনুমোদন বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আবার এগুলো নির্মাণের সময় প্রাধান্য দেয়া হয়নি পরিবেশকে। বনভূমি ও জলাধার ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে শহরের তাপমাত্রাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে ঢাকাকে ‘গ্লোবাল হটস্পট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ঘনবসতি ও উচ্চ ভবনে তাপ ধরে রাখা ও সবুজ এলাকা হারানো। ১৯৮৯ থেকে ২০২০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত শুধু ঢাকায় ৪৭ শতাংশ ঘন সবুজ অঞ্চল বিলীন হয়েছে। বিপরীতে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে সড়ক, ভবন ও শিল্পাঞ্চলে কংক্রিটের বিস্তার বেড়েছে। জনসংখ্যার পাশাপাশি যানবাহন বেড়ে যাওয়ায় বাতাস চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে তাপমাত্রা বেড়েছে। এসব কারণে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিদুর্ঘটনা, প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি নিত্যনৈমিত্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ শহরে মেট্রোরেল নির্মাণের দুই বছরের মধ্যে বিয়ারিং প্যাড খসে পড়ে পথচারীর মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে ঢাকা হয়ে উঠেছে অপরিকল্পিত নগরায়ণের অন্যতম উদাহরণ। তবে শুধু যে ঢাকার অবস্থা করুণ, বিষয়টি তা নয়। বাড়তি জনসংখ্যা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে দেশের অন্য বড় শহরগুলোর পরিস্থিতিও একই দিকে যাচ্ছে।

ঢাকা রাজধানী হলেও বাণিজ্যিক নগর হলো চট্টগ্রাম। প্রাকৃতিকভাবে চট্টগ্রাম সমুদ্র, পাহাড়, নদী ও ঢালুভূমির মাঝখানে এ শহরের অবস্থান। অবস্থানগত কারণে এ শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নততর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি। বরং এখানে জলাবদ্ধতার সমস্যা বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, শহরটির জলাবদ্ধতার পেছনে মানবসৃষ্ট কারণ সবচেয়ে বেশি দায়ী, যার হার ৬৩ শতাংশ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিয়মিতভাবে খাল ও নালা পরিষ্কারের অভাব, অপরিকল্পিত বাঁধ, ব্রিজ, কালভার্ট ও সড়ক, পাহাড় কর্তন, পুকুর ও জলাশয় ভরাট, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, চট্টগ্রামের বিভিন্ন খাল ও নালায় সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সরবরাহ লাইন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন ইত্যাদি। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ শহরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও ধরনও পাল্টানোর কারণেও জলাবদ্ধতা আরো প্রকট হয়ে উঠেছে।

ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো কক্সবাজার খুলনা, রাজশাহী শহরগুলোও অপরিকল্পিত নগরায়ণের শিকার। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে কক্সবাজার পর্যটন নগরী হয়ে উঠেছে। আবার সরাসরি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতেও রয়েছে। কিন্তু পর্যটনকে প্রাধান্য দিলেও পরিবেশগত সুরক্ষা উপেক্ষিত থেকে গেছে।

কর্মসংস্থান ও অন্য সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক বেশি থাকায় আশেপাশের গ্রাম ছেড়ে মানুষ খুলনা শহরমুখী হচ্ছে। খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) হিসাবে, এ নগরীতে ভবনের সংখ্যা অন্তত ৭০ হাজার। উপরন্তু প্রতিনিয়ত নির্মাণ হচ্ছে নতুন ভবন। তবে সেক্ষেত্রে নিয়ম মানছেন না ভবন মালিকরা। এতে পরিবেশগত ঝুঁকিতে রয়েছে শহরটি। নকশাবহির্ভূত এসব স্থাপনায় বসবাসকারীরা একদিকে যেমন পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পাচ্ছে না, অন্যদিকে শহরে পয়োনিষ্কাশন কাজে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। ভবনগুলোয় অগ্নিঝুঁকিও বাড়ছে।

রাজশাহীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিবেশগত হুমকি হয়ে উঠছে বায়ুদূষণ। যদিও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে এর সর্বাধিক পরিচিত। অন্যান্য শহরের তুলনায় রাজশাহী অনেকটাই সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বটে, তবে সেটিও যথেষ্ট নয়। শুষ্ক মৌসুমে এখানে বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিশেষ করে যখন দক্ষিণে অবস্থিত পদ্মা নদী থেকে বাতাস প্রবাহিত হয়, তখন চরের বালিকণা শহরে ঢুকতে থাকে। আবার শহরের ভেতরে শিল্প-কারখানা না থাকলেও গাড়ি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বায়ুমানের অবনমন ঘটায়। এছাড়া শহরের বাইরের শিল্প-কারখানার বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে এ শহরের নদীতে গিয়ে মেশে, যা সেচকাজে ব্যবহার হয়। পানিতে মিশ্রিত ক্ষতিকর ভারী পদার্থ মাটি দূষণ ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে রাজশাহীতে পানি সংকটও আগামীতে বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শুষ্ক দিনের সংখ্যা বাড়ছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায়, নদী-নালা শুকিয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এরই মধ্যে অনেক পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।

সর্বোপরি বলা যায়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ যদি অব্যাহত থাকে তাহলে সব শহরই একে একে বাসযোগ্যতা হারাবে। আর টেকসই শহর গড়তে হলে অবশ্যই শহর গড়ে তুলতে হবে সর্বস্তরের জনগণের চাহিদা মাথায় রেখে। সেই সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

আরও