ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। এ কারণে তিনি আন্দোলনকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। আমরা জানি, ভাষা আন্দোলনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মেডিকেল কলেজেই সংঘটিত হয়েছিল। ফলে একজন মেডিকেল ছাত্র হিসেবে তার অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে মেডিকেল হোস্টেলের মধ্যে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার সঙ্গে তিনি নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদদের স্মৃতিকে স্মরণ ও অমর করে রাখতে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতের আঁধারে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ১২ নম্বর ব্যারাকের সামনে নির্মিত হয় শহীদ মিনার। এই ১২ নং ব্যারাকের সামনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত গুলিবিদ্ধ হন ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আহমদ রফিক মেডিকেল হোস্টেলের সামনে শহীদ মিনার নির্মাণের রাতের ঘটনারও প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে অনেকেই অংশ নেন, মিছিল বা সভায় যুক্ত থেকেছেন, কিন্তু আহমদ রফিক ছিলেন প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। বদরুদ্দীন উমর, বশীর আল-হেলাল, আবদুল মতিনের পাশাপাশি আহমদ রফিকও ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তার কাজের বিশেষত্ব হলো—পূর্ববর্তী গবেষকদের কিছু সীমাবদ্ধতা বা অস্পষ্টতা তিনি পরিষ্কার করে তুলেছেন।
আহমদ রফিক ভাষা আন্দোলনকে শুধু রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার দৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলনই ছিল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পূর্বাভাস।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভাষা আন্দোলনের ছবিগুলো সংরক্ষণে তার ভূমিকা। সে সময় প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ছবি তোলা সহজ ছিল না। কিন্তু তিনজন—আমানুল হক, রফিকুল ইসলাম ও আহমদ রফিক—এ ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোকে ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন। আজ আমরা যে ভাষা আন্দোলনের ভিজ্যুয়াল ইতিহাস পাই, তাতে তার অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আহমদ রফিকের গবেষণার একটি বিশেষ অবদান হলো, তিনি দেখিয়েছেন ভাষা আন্দোলন শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল না। বরং এটি গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল। তার বইয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বহু জেলা ও অঞ্চলের আন্দোলনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, ভাষা আন্দোলন ছিল সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলন।
আহমদ রফিক আজীবন এ আন্দোলনের চেতনা—অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা ও জাতীয় ঐক্যের আদর্শ—ধরে রেখেছেন। তিনি কখনো আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তার লেখালেখি, কবিতা, রবীন্দ্র ও নজরুল গবেষণাতেও এ চেতনার প্রতিফলন রয়েছে।
গবেষণার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করাও ছিল তার বড় ভূমিকা। বহু তরুণ গবেষককে তিনি উৎসাহ দিয়েছেন, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তার স্মৃতিশক্তি ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তরুণদের কাছে ছিল এক অমূল্য সম্পদ।
ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার গবেষণা, রচিত গ্রন্থ, স্মৃতিচারণা ও আদর্শ ভবিষ্যতের গবেষণার জন্য অমূল্য ভিত্তি হয়ে থাকবে। তিনি কেবল একজন ভাষাসংগ্রামী নন, ছিলেন ইতিহাসচর্চার এক নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য এবং একটি প্রজন্মের শিক্ষক ও অনুপ্রেরণার উৎস।
মামুন সিদ্দিকী : প্রাবন্ধিক-গবেষক; গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা