বিশ্লেষণ

পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় আচরণ পরিবর্তনে ‘সামগ্রিক পদ্ধতি’

সরকারি নীতি গ্রহণে অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও অর্থনীতিবিদদের প্রভাব দুনিয়াজোড়া। কিন্তু এ নিয়ে একটি পরিতাপের বিষয় এই যে বিশাল আকারের সঞ্চিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ব্যবহার অনেক সময়েই আংশিক বা অসম্পূর্ণ। আরো পরিতাপের বিষয়, অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলোর কোনো একটিকে বড় করে কাজে লাগানো হয়। আবার ওই তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ জ্ঞান, সতর্কতা ও অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা হয়। উদাহরণ

সরকারি নীতি গ্রহণে অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও অর্থনীতিবিদদের প্রভাব দুনিয়াজোড়া। কিন্তু এ নিয়ে একটি পরিতাপের বিষয় এই যে বিশাল আকারের সঞ্চিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ব্যবহার অনেক সময়েই আংশিক বা অসম্পূর্ণ। আরো পরিতাপের বিষয়, অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলোর কোনো একটিকে বড় করে কাজে লাগানো হয়। আবার ওই তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ জ্ঞান, সতর্কতা ও অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, অর্থনীতির বহুল পরিচিত ও প্রচারিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য বাজার ব্যবস্থা ও ব্যক্তিমালিকানার সুবিধার বিষয়। কিন্তু এ বাজার ব্যবস্থা হতে হবে প্রতিযোগিতামূলক। শুধু তা-ই নয়, অর্থনীতিবিদদের সতর্ক অভিমত: প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায়ও আয় অসাম্য, বাণিজ্য চক্রজনিত অস্থিরতা ও সামাজিক-পরিবেশ লাভ-ক্ষতির অন্তর্নিহিত (এক্সটার্নালিটিজ) বাস্তবতা। এ কারণেই অর্থশাস্ত্রের প্রসার হয়েছে এসব সমস্যার বিশ্লেষণভিত্তিক সমাধানের প্রয়োজনে। যেমন গ্রাম-নগর, অনুন্নত-উন্নত দেশ বা অঞ্চল, মানুষে-মানুষে ও পুরুষ-মহিলাদের মধ্যে আয়ের পার্থক্যের সমাধানে বের হয়েছে উন্নয়ন অর্থনীতি; বাণিজ্য চক্রজনিত অস্থিরতা দূর করে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এসেছে সামষ্টিক অর্থনীতির চর্চা ও প্রয়োগ এবং এক্সটার্নালিটিজ সমস্যা সমাধানে প্রসারিত হয়েছে পরিবেশ অর্থনীতির। এতৎসত্ত্বেও পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রবক্তারা অর্থশাস্ত্র থেকে পাওয়া মুক্তবাজারের কথা নিয়েই শোরগোল করে থাকেন। একই অর্থশাস্ত্রে প্রথম পাঠ্য নীতিগুলো (ফার্স্ট প্রিন্সিপলস) থেকে কিছুটা এগোলেই যেসব তত্ত্ব বা সতর্কতা পাওয়া যায় তা তারা পাশ কাটিয়ে যান বা অনুচ্চারিত রাখেন একচ্ছত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার স্বার্থে। এ কারণেই প্রতিযোগিতা-সমতা-সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উৎপাদন-ভোগ থেকে সৃষ্ট বাহ্যিকতার মতো সমস্যা সমাধানে অর্থশাস্ত্র প্রদত্ত বা নির্দেশিত যথাযথ সরকারি ভূমিকা গ্রহণ থাকে নানাভাবে কণ্টকাকীর্ণ। পুঁজিবাদের শক্তি শুধু সরকার নয়, যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম (টিভি, রেডিও, সোশ্যাল মিডিয়া, খবরের কাগজ) এমনকি রাষ্ট্রের সব অঙ্গকেই তার পক্ষে নিয়ে আসে। এ অবস্থাকে কিছুটা স্তিমিত করতে পারে নির্ভয়ে জনগণের ভোটের মাধ্যমে গণবান্ধব সরকার প্রতিষ্ঠা করে। এ কারণেই অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক এত নিবিড়।

অর্থনৈতিক স্বার্থই মানব মনের একমাত্র বাস্তবতা নয়: অর্থনৈতিক তত্ত্বে ও নীতি নির্ধারণে মানুষের অর্থনৈতিক সত্তা বা স্বার্থকেই বড় বাস্তবতা বা সত্য হিসেবে চিত্রিত করে যে যুক্তি ও নীতি গ্রহণ করা হয়ে আসছে তা পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করে চলেছে। এর হাজার রকমের বিকৃতি ও নেতিবাচক ফলাফল সত্ত্বেও পুঁজিবাদ দেশে দেশে আরো শক্তিশালী হয়ে চলেছে। অগণতান্ত্রিক দেশে পুঁজিবাদ লুণ্ঠন প্রক্রিয়া শক্তিশালী করে। অর্থনীতিবিদরা পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিরাজমান দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্যে নিয়ে অনেক কাজ করে চলেছেন। কিন্তু যে সমস্যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে জরুরি পানি, বাতাস, ভূমি, আলো, গাছপালা, বনজঙ্গল, খাল-বিল-নদী-নালা-জলাশায়; এক কথায় পরিবেশ—যার দিকে অর্থশাস্ত্র ও অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টি শুধু সাম্প্রতিকই নয়, তা এখনো অপ্রতুল। এখানে উল্লেখ্য, র‍্যাশেল কারসনের ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’, ১৯৬১; গ্যারেট হারডিনের ‘ট্র্যাজেডি অব কমন্স’, ১৯৬৮ এবং ক্লাব অব রোমের/মেডোস ও অন্যান্য-এর ‘লিমিটস অব গ্রোথ’ প্রকাশ হওয়ার পরে চিন্তাশীল মানুষ মাত্রই অর্থনীতির চলতি ধারায় পরিবেশের কী হয়ে চলেছে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ ও কাজ না করে পারার কথা নয়। এরই মধ্যে লিমিটস অব গ্রোথের শতবার্ষিকীও পালিত হয়ে গেল। কিন্তু কোনো দেশ লিমিটস অব গ্রোথের সতর্কতামূলক বার্তা আমলে নিয়ে উৎপাদনে বা পণ্য ভোগে কোনো পরিবর্তন এনেছে এ রকম কোনো খবর নেই। এরই মধ্যে কত না গ্লোবাল সামিটরি হয়ে চলেছে। কত না হাইপ নানা নামে। 

তবুও চেষ্টা আমাদের চালাতেই হবে। এ প্রচেষ্টার একটি যাকে আমি সামগ্রিক (হলিস্টিক) পদ্ধতি হিসেবে দেখি তা নিয়ে এ লেখা। সামগ্রিক (হলিস্টিক) এ অর্থে যে সরকারি নীতি গ্রহণে ভর্তুকি দেয়া বা কর আরোপ করা—এ বহুল ব্যবহৃত নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আর কী করা যায় ও তার ভিত্তি কী তা তুলে ধরা। এখানে উল্লেখ্য, অর্থশাস্ত্র ও অর্থনীতিবিদদের প্রভাবে প্রণোদনা দেয়া না দেয়া—যা বাস্তবায়িত করা হয় ভর্তুকি দিয়ে বা কর আরোপ করে—হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের নীতির একমাত্র প্রধান স্তম্ভ। এ নীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি—মানুষ মাত্রই আর্থিক দিকটা বোঝে। এ যুক্তি অকাট্য হলেও এটা তো অস্বীকার করার নয় যে যেই মানুষকে আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে উৎসাহিত করা যায়, সেই একই মানুষকে পরিবেশ রক্ষায় আইনের মাধ্যমে (ভয়কে কাজে লাগিয়ে) বাধ্যও করা যায়। সবচেয়ে ভালো দিক হলো ওই একই মানুষের মধ্যে রয়েছে নৈতিক ও নীতিবোধও। পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রবক্তারা মানুষের মধ্যে আবিষ্কার করেছে মানুষের আত্মস্বার্থকে বা আর্থিক আচরণকে। অর্থনীতিবিদরা নিশ্চয়ই মানুষের মানবিক গুণাবলি বা মানুষের মধ্যে বিদ্যমান ভয়ের দিকটা বোঝেন। কিন্তু তারা অর্থশাস্ত্রের নিয়মমাফিক মানুষের মনের আর্থিক প্রবণতাকেই বড় করে দেখে অভ্যস্ত। যার ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়ে চলেছে।  শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস যথার্থই বলেন ‘‌মানুষ শুধু টাকা বানানোর মেশিন নয়’।  

আচরণ পরিবর্তনের সামগ্রিক পদ্ধতি:  আমি নিজেও একজন অর্থনীতির ছাত্র। আচরণগত বিজ্ঞানী বা মনোবিজ্ঞানী না হয়েও মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে অর্থনৈতিক প্রেরণাই মানুষের একমাত্র আচরণগত বৈশিষ্ট্য নয়। মানুষের আচরণ পরিবর্তনের জন্য যে ‘সামগ্রিক পদ্ধতি’ এ লেখার বিষয়বস্তু তার ভিত্তি মানুষের মনের তিনটি উপাদানকেই কাজে লাগানোর জন্য নীতিনির্ধারণ করা। অর্থাৎ ১. ‘অর্থনৈতিক এবং আর্থিক স্বার্থের’ দিক বিবেচনা করে যেমন ভর্তুকি দেয়া বা কর আরোপ করা; ২. তেমনি মানুষের মনের ‘ভয়’কে কাজে লাগানোর জন্য ব্যবহার করা হয় আইনকানুন, যা অমান্য করা হলে থাকে শাস্তির ব্যবস্থা; ৩. মানুষের মনের ‘নৈতিক ও ন্যায্যতা বোধ’কে কাজে লাগানের জন্য যুক্তি ও পরামর্শ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত বা বাঞ্ছিত কার্যাদিতে প্রবৃত্ত করানো। মানুষের মনের এ বোঝা ও উপলব্ধি থেকেই সরকারি নীতি গ্রহণে ব্যবহার প্রয়োজন যথাক্রমে অর্থনৈতিক, নিয়ন্ত্রণমূলক ও নৈতিক পলিসি টুলস (চিত্রে দেখুন)।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে পরিবেশ রক্ষায় একসময় নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাই বেশি ব্যবহার করা হতো। অর্থনৈতিক বা আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে মূলত বিভিন্ন ধরনের চার্জ, যার শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি যা নেতিবাচক বাহ্যিকতার অভ্যন্তরীণকরণ অর্থাৎ কোনো কর্মকাণ্ড বা উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে সামাজিক বা পরিবেশ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনুসারে চার্জ বা লেভি ধার্য করা। পক্ষান্তরে কোনো উৎপাদন ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামাজিক উন্নয়ন বা পরিবেশের উন্নতির সম্ভাবনাকে উৎসাহিত করার জন্য আর্থিক সহায়তা বা ভর্তুকি দেয়ার (যা ইতিবাচক বাহ্যিকতার অভ্যন্তরীণকরণ) বিধান থাকে। মানুষের নৈতিক ও ন্যায্যতা বোধকে কাজে লাগানোর গুরুত্ব ততটা দেখা যায় না। এ বোধকে জাগ্রত করে পরিবেশ রক্ষায় মানুষকে নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণে প্রণোদিত করা যায়।

মানুষের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের যে তিনটি উপাদান ও তার ভিত্তিতে পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রয়োজনের কথা এখানে উল্লেখ করা হলো তার ব্যবহার যে নেই তা নয়। কিন্তু এ প্রয়োগে রয়েছে ‘অসম্পূর্ণতা’। এ অসম্পূর্ণতাকে কাটিয়ে ‘সামগ্রিক পদ্ধতি’ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার তাত্ত্বিক ও অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। তাত্ত্বিক দিকটি সহজ এ অর্থে যে মানুষের ঝোঁক বা প্রবণতা একমাত্র আর্থিক নয়। কাজেই এ একটি মাত্র দিককে কাজে লাগানের জন্য যে নীতিনির্ধারণ করা হয় (যেমন আর্থিক প্রণোদনা) তা শুরুতেই মানুষের আচরণ পরিবর্তনে একটি আংশিক বা অসম্পূর্ণ পন্থা হয়ে গেল। একইভাবে মানুষের ভয় বা ভীতিকে একমাত্র উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য করে নীতিনির্ধারণ করা হয় তাহলেও মানুষের আচরণ পরিবর্তনের কাজটি শুরুতেই হয়ে যায় একটি আংশিক বা অসম্পূর্ণ পন্থা। ঠিক একই ধরনের অসম্পূর্ণতা বিরাজ করবে যদি নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা হয় মানুষের নৈতিকতা বা নীতিবোধকে একমাত্র লক্ষ্য করে, যেমনটা করা হয় সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারের মাধ্যমে। এ আংশিক বা অসম্পূর্ণ পন্থায় না যেয়ে মানুষের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের তিনটি উপাদানকেই এক সঙ্গে কাজে লাগালে আচরণগত পরিবর্তনের ফলাফল হবে সর্বাপেক্ষা অনুকূল বা ফলপ্রসূ। 

এখানে যুক্তির মাধ্যমে যা তুলে ধরা হলো তা পরীক্ষা করার জন্য বিভিন্ন দেশের ও নগরের পরিবেশ রক্ষা বা উন্নয়নের জন্য ওই তিন ধরনের নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলাফল জানার জন্য আমি ও আমার বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রী যেসব গবেষণা করার সুযোগ পেয়েছি তার থেকে স্পষ্ট যে সব ক্ষেত্রে তিন ধরনের পলিসি টুলসই—অর্থনৈতিক, নিয়ন্ত্রণমূলক ও নৈতিক—একই সঙ্গে প্রয়োগ করে কোনো দূষণ কমিয়ে আনার কাজে হাত দেয়া হয়েছে সেই ক্ষেত্রে দূষণ কমিয়ে আনায় সফলতা এসেছে। উদাহরণ হিসেবে ব্যাংককের বায়ুদূষণে ‘লেডেড’ জ্বালানির পরিমাণ হ্রাস বা সম্পূর্ণ দূর করার জন্য কর্তৃপক্ষ যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা উল্লেখ্য। লেডেড জ্বালানির জন্য ব্যাংককের স্কুল ছাত্রছাত্রীদের আইকিউ হ্রাস করছিল বলে চিহ্নিত হওয়ায় তা দূর করার জন্য কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে লেডেড জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করার জন্য যেসব নীতি গ্রহণ করে তা হলো: ১. নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া, যার পরে কোনো যানবাহন আর লেডেড জ্বালানি ব্যবহার করতে না পারা (নিয়ন্ত্রণমূলক বিধি); ২. ‘লেডেড’ জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয়া, যা করা হয় চার্জ ধার্য করে, যার তাত্ত্বিক ভিত্তি নেতিবাচক বাহ্যিকতার অভ্যন্তরীণকরণে, পক্ষান্তরে  ‘আনলেডেড’ জ্বালানির দাম কমিয়ে দেয়া হয় ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে, যা করার তাত্ত্বিক ভিত্তি ইতিবাচক বাহ্যিকতার অভ্যন্তরীণকরণ; ৩. প্রচারমাধ্যমে লেডেড জ্বালানি ব্যবহারে স্কুল ছাত্রছাত্রীদের আইকিউ হ্রাসের  উদ্বেগজনক খবর প্রকাশের মাধ্যমে স্টেকহোল্ডারদের (নাগরিকদেরসহ) সহযোগিতা নিশ্চিত করা। 

এ তিন ধরনের নীতি গ্রহণ ও তা একই সঙ্গে বাস্তবায়নকেই  আমরা ‘সামগ্রিক পদ্ধতি’ হিসেবে চিহ্নিত করি। প্রায় একই সময়ে হ্যানয়ে করা গবেষণায়ও ব্যাংককের মতোই তিন ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে হ্যানয়ের যানবাহনের লেডেড জ্বালানি থেকে আনলেডেড জ্বালানি ব্যবহারে পরিবর্তন করা সম্ভব হয়েছে। এ কাজ দুটি নিয়ে একটি গবেষণাপত্র ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে (আমিন ও অন্যান্য, ২০০৬)। পরবর্তী সময়ে (আমিন, ২০০৮) ইউএনইপির জন্য যানবাহন থেকে নির্গত বায়ুদূষণ হ্রাসের যেসব নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয় তার ফলাফল জানার জন্য বিভিন্ন দেশ-নগরের ৫৪টি কেস স্টাডি করে আমরা যা জানতে পারি তা আরো শক্তিশালী করে, ব দেশ ও নগরে আমাদের চিহ্নিত সামগ্রিক পদ্ধতির ব্যবহার বায়ুদূষণ হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পক্ষান্তরে, ওই কেস স্টাডির যেসব দেশ ও নগরে আর্থিক, নিয়ন্ত্রণমূলক বা সচেতনতা বাড়াতে নেয়া পদক্ষেপ একসঙ্গে একটি প্যাকেজ হিসেবে বা একই সময়ে না নিয়ে কোনো একটি বা দুটি বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে সেসব ক্ষেত্রে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। 

পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ‘ইএমএম’ কাঠামো: মানুষের মনের তিন ধরনের প্রধান প্রবণতাকে কাজে লাগানোর প্রয়াসে আমরা যে তিন ধরনের পলিসি টুলস ও তার যথাযথ ও একসঙ্গে প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের আচরণ পরিবর্তনের এ সামগ্রিক পদ্ধতিকে যথাযথই সামগ্রিক ও একই সঙ্গে প্রয়োগ করার প্রয়োজনে তিন ধরনের পলিসি টুলসকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য যে লেবেলিং করা যায় তা হলো ‘এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট মেজরস’ বা ‘ইএমএম’ কাঠামো। আশা করা যায় এই লেভেলিং হলে তিন ধরনের পলিসি টুলসের কোনো বিশেষ একটি বা দুটিকে ব্যবহারের বা পলিসি টুলসগুলোর আলাদা আলাদা ব্যবহারের প্রবণতার পরিবর্তে প্রতি সেট পলিসি টুলস ব্যবহৃত হবে একসঙ্গে। তা না করে পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়াসে এক সেট পলিসি টুলস একসময়ে চার্জ বা ভর্তুকি, আর এক সময়ে নিয়ন্ত্রণমূলক বিধি, তারও পরে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নানান ধরনের কর্মপন্থা গ্রহণ—এভাবে বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডে খণ্ডে পলিসি টুলস ব্যবহার কখনই সব ধরনের পলিসি টুলস একসঙ্গে ব্যবহারে আচরণ পরিবর্তনে যতটা প্রভাব রাখে বা রাখতে পারে তা হয় না। 

ইএমএম ব্যবহারের জন্য লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা: পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে মানুষের আচরণ পরিবর্তনে সামগ্রিক পদ্ধতি (তিন ধরনের পলিসি টুলস নিয়ে যে ইএমএম কাঠামো) কী এবং কেন তা এতক্ষণ তুলে ধরা হলো। এখন দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন এ কাঠামোর পলিসি টুলসের প্রয়োগের জন্য যা করণীয় সেসব বিষয়ে। প্রথম কাজ কোন ধরনের পরিবেশে সমস্যা হ্রাসে বা সমাধানে পলিসি টুলসগুলোর প্রয়োগ রূপরেখা তৈরি বা  ডিজাইন করা হবে তা ঠিক করা। এ ডিজাইন হতে পারে বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, স্যানিটেশন, ভূমিদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থা বা যানজট সমস্যার মতো ‘পরিবেশ মিডিয়া’ (এনভায়রনমেন্টাল মিডিয়া) লক্ষ্য করে, যার মাধ্যমে পরিবেশদূষণ হয়ে চলেছে। একইভাবে তা হতে পারে জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ, উৎপাদন, ভোগ, প্রযুক্তি, নির্মাণ ও পরিবহন ব্যবস্থার মতো ‘অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড’ লক্ষ্য করে। এর পরে আসে ‘স্থান-সংক্রান্ত’ বিষয় অর্থাৎ পরিবেশ মিডিয়া হোক বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে বিষয়ই হোক না কেন পলিসি টুলস ডিজাইন তো হবে স্থানভিত্তিক, যা হতে পারে বৈশ্বিক বা সর্বদেশীয়, জাতীয় বা রাষ্ট্র, অঞ্চল, শহর-নগর-মহানগর বা গ্রাম-পাড়া-ওয়ার্ড পর্যায়ে। কোথায় ও কোন সমস্যা সমাধানে ইএমএম কাঠামোর পলিসি টুলস প্রয়োগ করা হবে তা নির্দিষ্টকরণ একটি মৌলিক কাজ। পরিবেশসংক্রান্ত অনেক আইনকানুন ও বিধিবিধান বৈশ্বিক ও দেশ বা জাতীয়ভিত্তিক। যদিও ‘‌থিংক গ্লোবালি, অ্যাক্ট লোকালি’র মতো কথা চালু আছে। কাজে তার প্রতিফলন করতে হলে পরিবেশ রক্ষার কাজকে স্থানীয় এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে নিয়ে আসা জরুরি। স্থানীয় ধারণাটিও খুব সহায়ক নয় স্থানিক স্কেলকে নির্দিষ্টকরণে। আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে চলে আসা স্থানীয় সরকারের স্তরগুলোকে—গ্রাম ও ওয়ার্ড (ওয়ার্ডকেও বিভিন্ন পাড়ায় ভাগ করা যায়; পাড়াভিত্তিক স্থানিক স্কেলের অস্তিত্ব আমাদের শহরগুলোতে ছিল, এখনো হয়তো কোনো কোনো শহরে আছে) থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় বা আঞ্চলিক নগর-মহানগর পর্যন্ত। 

প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সামর্থ্য বৃদ্ধি: পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সব স্তর বা পর্যায়ের জন্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা ও তার প্রতিটিকে শক্তিশালী করা। প্রতি স্তরের প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একইভাবে সব কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মকালীন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন নিয়মিত করা।

আলোচিত ইএমএমের একটি প্রয়োগ দেখিয়ে এ লেখার সমাপ্তি করা যায়। ফিল্ড ও ফিল্ডের (২০১৭) পরিবেশ অর্থনীতির আন্ডারগ্র্যাজুয়েট টেক্সবুক ‘এনভায়রনমেন্টাল ইকনোমিকস’ বইটিতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আউটপুট (g) বৃদ্ধির জন্য যে প্রাকৃতিক সম্পদ (M) ব্যবহার করা হয় ও তার থেকে যে রেসিডুয়ালস (R) বা অবশিষ্টাংশ নির্গত হয় তার এক অংশ আসে উৎপাদন চক্র (R) থেকে আর এক অংশ আসে ভোক্তাদের বা ভোগ পণ্য ব্যবহারকারী চক্র থেকে। গ্রন্থাকার দুজন ‘বস্তুগত ভারসাম্য সমীকরণ’— (M=Rdp+Rdc বা উৎপাদন চক্র থেকে আসা রেসিডুয়ালস + ভোক্তাদের বা ভোগ পণ্য ব্যবহারকারী চক্র থেকে থেকে আসা রেসিডুয়ালস)—ভিত্তিতে দেখান যে প্রকৃতির ভারসাম্যের জন্য যা প্রয়োজন তা হলো এক. অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন (g) হ্রাস করা; দুই. উৎপাদন প্রক্রিয়া ও ভোগ্যপণ্য উভয় চক্র থেকে নির্গত রেসিডুয়ালস হ্রাস (Rdp & Rdc) করা ও তিন. উৎপাদন ও ভোক্তা চক্র থেকে পাওয়া রেসিডুয়ালসের (Rrp, Rrc) পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) বৃদ্ধি। এ তিন লক্ষ্যে আলোচিত ইএমএম কাঠামোর ব্যবহার হতে পারে নিম্নরূপ: ক. অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন হ্রাস করার জন্য কর ধার্য (অর্থনৈতিক পলিসি টুলস), পরিমাণ নির্ধারিত করা (নিয়ন্ত্রণমূলক পলিসি টুলস), সহজ-সরল জীবনযাপন উৎসাহিত করা (নৈতিক পলিসি টুলস); খ. রেসিডুয়ালস হ্রাস করার জন্য, বেশি রেসিডুয়ালস উৎপন্ন করে এ রকম প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর ওপর কর ধার্য ও রেসিডুয়ালস হ্রাস করে এ রকম প্রযুক্তিতে ভর্তুকি বা প্রণোদনা প্রদান (অর্থনৈতিক পলিসি টুলস), উৎপাদন প্রক্রিয়ায় রেসিডুয়ালস হ্রাস করে এ রকম প্রযুক্তির প্রদর্শনী ও প্রচার করা (নৈতিক পলিসি টুলস); গ. পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং বৃদ্ধির জন্য উৎপাদনকারীদের রিসাইক্লিং কোটা নির্দিষ্ট করে দেয়া (নিয়ন্ত্রণমূলক পলিসি টুলস), রিসাইক্লিং কোটা অতিক্রম করতে পারলে পুরস্কৃত করা (অর্থনৈতিক পলিসি টুলস), পণ্য উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারীদের এবং ভোক্তাদের ওপর বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ অনুসারে চার্জ লেভি বা ধার্য করা (অর্থনৈতিক পলিসি টুলস), রিসাইক্লিং বৃদ্ধির জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও রাস্তাঘাটে বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় প্রচার ও অনুষ্ঠান করা (নৈতিক পলিসি টুলস)। 

এ লেখায় আনা বিষয়গুলো অজানা নয় কিন্তু রয়েছে অপূর্ণতা। প্রয়োজন নীতিনির্ধারণে হলিস্টিক বা সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ বা পদ্ধতি গ্রহণ। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত পারদর্শিতা দেয় এক এক বিষয়ে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে প্রয়োজন জ্ঞানের একাধিক শাখার সম্মিলন ও প্রয়োগ। সর্বোপরি কল্যাণময় মনোভাব। আত্মস্বার্থের সর্বজনীনতা দেখিয়ে অ্যাডাম স্মিথ বিখ্যাত হয়েছেন আর অর্থশাস্ত্র এ বাস্তবতা কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করে যাচ্ছে। পরিবেশ ধ্বংসের থেকে বাঁচার জন্য এখন কাজে লাগাতে হবে মানুষের কল্যাণময়তার সর্বজনীনতাকে, যাকে আত্মস্বার্থের সর্বজনীনতা থেকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই—সুপ্ত বা অন্তর্নিহিত হতে পারে। টাকা দিয়ে যেমন আত্মস্বার্থকে সচল করা হয়, ভয় দেখিয়ে যেমন নাগরিককে চুপ রাখা যায় তেমনি নীতি বা কর্তব্যবোধকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কল্যাণময়তাকেও সচল করা যায়। পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে মানব মনের তিন বোধকে একসঙ্গে কাজে লাগানোকেই এ লেখায় সামগ্রিক পদ্ধতি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। 

ড. এটিএম নুরুল আমিন: প্রফেসর ইমেরিটাস, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ব্যাংকক

আরও