গত এক মাসের পত্রিকার পাতা ওল্টাতে গিয়ে পাঠকের চক্ষু যেন চড়কগাছ। প্রত্যেক পত্রিকার শিরোনাম দখল করে নিয়েছে ব্যাপক দুর্নীতির নমুনা। প্রাক্তন আইজিপি বেনজীর আহমেদের বে-নজির দুর্নীতি দিয়ে গল্পের শুরু, তারপর ছাগলকাণ্ডের মতিউর রহমান দুর্নীতির আর এক মহা গুরু এবং অতঃপর কদিনের মধ্যে বহু কেচ্ছার স্ফুটন। শুধু কি পুলিশ আর এনবিআর এ খারাপ কাজে লিপ্ত? না, মোটেই না। এর আগে প্রায় নিয়মিত প্রকাশিত হতো কিছু কিছু উপাচার্যের দুর্দমনীয় দুর্নীতির কথা। আমলাদের কথা তো সদ্যপ্রয়াত কবি অসীম সাহা বলে গেছেন, ‘কিছু কিছু আমলা আছে/ তাদের বড়ো গামলা আছে/ তাতেই বহন করেন তারা মাল। তাদের অনেক পাওয়ার আছে/ অনেক কিছু খাওয়ার আছে...’।
এক
অনেক দেশেই ব্যাপক দুর্নীতি প্রসঙ্গে সরকারি মহল গা না করে গা জুড়াতে চায়। যে কথাটা উত্তরের অপেক্ষায় তাদের জিভের ডগায় ডগডগে থাকে তা হলো ‘দুর্নীতি সব দেশেই আছে’। কিন্তু ওসব দেশে কীভাবে, কী মাত্রায় ও দুর্নীতির সাজাই বা কী এতদ প্রশ্নে তারা সচরাচর নীরব থাকেন। আবার বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অন্যতম মোক্ষম উপায় দাঁড়ায় এই বলা যে অমুক তমুক আমলে এর চেয়ে কম দুর্নীতি হয়নি। জানিয়ে রাখা ভালো, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। এ অঞ্চলে নিজের আসল পরিচয় হারিয়ে শাসক সম্প্রদায়ের কেউ ‘মি. টোয়েন্টি পারসেন্ট’, কেউ ‘মি. টেন পারসেন্ট’ ইত্যাদি নামে সমধিক পরিচিত। বেশির ভাগ ঐতিহাসিক মনে করেন, ইংরেজ প্রবর্তিত শাসন ব্যবস্থা দুর্নীতির জন্ম দেয়, যদিও তারা নিজেরা দুর্নীতিপরায়ণ ছিল না। প্রায় দুই হাজার বছর আগে একটা সংকলনের নানান অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাদের রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে রাজা যাদের নিয়োগ দেন তারাই ভণ্ডামি করে অন্যদের সম্পত্তি গ্রাস করে এবং রাজাকে এ ধরনের কর্মকর্তাদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে হবে; রাজার দায়িত্ব হলো যে সব দুষ্ট লোক মামলার বিভিন্ন পক্ষ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে তাদের নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া এবং তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।’
চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের বয়সও, ধরা যাক, প্রায় দুই হাজার বছর হবে। চাণক্য লিখেছেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা দুভাবে বড়লোক হয়ে থাকেন: হয় তারা সরকারকে প্রতারণা করেন, অন্যথায় প্রজাদের অত্যাচার করেন...জিহ্বার ডগায় বিষ বা মধু থাকলে তা না চেটে থাকা যেমন অসম্ভব, তেমনি সরকারের তহবিল লেনদেন করে একটুকুও সরকারের সম্পদ চেখে না দেখা কঠিন ব্যাপার। জলে বিচরণরত মাছ কখন জল পান করে তা জানা যেমন অসম্ভব, তেমনি নির্ণয় সম্ভব নয় কখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা তহবিল তসরুফ করেন।’
দুই
শুধু সরকারি কর্মচারীরাই দুর্নীতি করেন এমন কথা নেই। বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও দুর্নীতির দুর্গন্ধ ভেসে বেড়ায়—প্রতারণা করা, ভেজাল মেশানো, সিন্ডিকেট গড়ে তোলা, শেয়ারবাজারে কারসাজি ইত্যাদির মাধ্যমে দুর্নীতি বিকাশ লাভ করে। বর্তমান বাংলাদেশে এর জলজ্যান্ত উদাহরণ ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এবং এর সহায়ক শক্তি, বালি উত্তোলন, বালিশ কেনা, মুরগি সিন্ডিকেট প্রভৃতি। আবার রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক দুর্নীতির ছাপ আড়ালে-আবডালে থাকে না। ভারতের পশ্চিম বাংলা, এমনকি লোকসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি প্রধান আলোচনার বিষয়, বাংলাদেশে তো বটেই। ভারতের জনৈক রসিক ব্যক্তি নাকি বলেছিলেন, রাজনীতিবিদরা ও ডাকাতরা একই ধরনের কাজ করে থাকেন, তবে উল্টো পরম্পরায়। ডাকাতরা প্রথমে ডাকাতি করে তারপর জেলে যায়; রাজনীতিবিদরা প্রথমে জেলে যান, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ডাকাতি করেন।
তিন
দুর্নীতি উন্নয়নের সহায়ক—এমন তত্ত্ব এককালে সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণায় শেকড় গেড়েছিল। যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হলো এই প্রতিপাদ্য যে ঘুসের টাকায় লাল ফিতার দাপট দূর করে দ্রুত সিদ্ধান্ত হাতে পাওয়া সহজ হয়, ঘুস ছাড়া ফাইল নড়ে না, বাবুও কাবু হয় না। সুতরাং ফেল কড়ি, মাখ তেল। অবশ্য এ প্রতিপাদ্য অসাড় বলে প্রমাণ করেছেন পরবর্তী গবেষকরা। সাম্প্রতিক গবেষণায় দুর্নীতির কয়েক ধরনের কুফল চিহ্নিত করা হয়েছে: সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট, বিকৃত ভোগ, প্রকট সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি এবং নিরুৎসাহিত বৈদেশিক বিনিয়োগ। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বলয়ে, বিশেষত রাজনৈতিক অঙ্গনে, দুর্নীতির বিরূপ প্রভাব নিয়ে বিস্তর আলোচনা আছে এবং মনে করা হয় দুর্নীতির কারণে বছরে আমাদের জিডিপির ২-৩ শতাংশ খোয়া যায়। অর্থাৎ এ পরিমাণ দুর্নীতি না হলে সম্ভবত পদ্মা সেতুর মতো তিন-তিনটি সেতু নির্মাণ করা যেত।
চার
একসময় ভাবা হতো যে বেতন কম বিধায় সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘুস খান। তবে বেতন বৃদ্ধি যে দুর্নীতি রোধে মোক্ষম অস্ত্র নয় তার প্রমাণ স্বয়ং বাংলাদেশ। যেখানে দফায় দফায় বেতন ও দুর্নীতি উভয়ই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তাছাড়া কতদিন আপনি বেতন বাড়াবেন যখন দুর্নীতির কারণে রাজস্ব আহরণ নিম্নমুখী? তার মানে এই নয় যে প্রশাসনে সৎ কর্মচারী নেই, সমাজে ভালো মানুষ নেই। তারা আছেন। তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মতোই তাদের কোণঠাসা অবস্থা, দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীর দাপটে তারা শান্তিতে থাকতে পারেন না। মুদ্রার জগৎ সম্পর্কে যেমন গ্রেসাম বলতেন, খারাপ মুদ্রা ভালো মুদ্রাকে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়, ঠিক তেমন এক অবস্থা প্রশাসনেও। খারাপ কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাপটে সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী উধাও।
দুর্নীতি হ্রাসে প্রথম দরকার দুর্নীতিপরায়ণদের আইন অনুযায়ী সাজা দেয়া। তার মানে আইনের শাসন কায়েম করা। যেমন হংকং, চিলি ও নিউ সাউথ ওয়েলসের অভিজ্ঞতা আমলে নেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, যেমন অভাব নেই আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসার ফোকরের। সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা, মামলাও হচ্ছে কিন্তু সেই মামলার বিরুদ্ধে আপিল করে তারা আপাত স্থিতাবস্থার সুযোগ নিয়ে সুদে-আসলে লাভবান হচ্ছেন। তেমনি ঘটছে ব্যাংকের ঋণ আদায়ের জগতে—প্রলম্বিত শুনানি দুর্নীতির জন্য সোনায় সোহাগা। চায়ের টংয়ে বসেই কোনো সাধারণ নাগরিক চোখ বুজে বলে দিতে পারেন, বেনজীর আহমেদ গংদের বিচার সম্পন্ন হতে প্রায় এক দশক লেগে যাবে, তারপর আপিলের পর আপিল নিয়ে হয়তো যাবে আরো পাঁচ বছর। মানুষ বাঁচে ক বছর? সুতরাং, নো ভীতি, করো দুর্নীতি!
একটা বিখ্যাত উক্তি এ রকম: ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সব সমাজে সফল হয় না। শুধু যেসব দেশে প্রশাসনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সৎ কর্মকর্তা রয়েছেন সেসব দেশে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তি দেয়া সম্ভব। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে দুর্নীতি তাড়ানো সম্ভব নয়। আইন হলো মাকড়সার জালের মতো, যা ছোট পতঙ্গদের আটকাতে পারে, বড় পোকাদের ঠেকাতে পারে না।’
পাঁচ
দুর্নীতি দমনে সরকারের সদিচ্ছা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথমত সরকারকে সব ব্যবসা থেকে হাত গোটাতে হবে। একমাত্র একচেটিয়া ব্যবসা ছাড়া সরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান লাভের মুখ দেখেছে, এমন নজির খুব কম। সরকারি ব্যাংক কিংবা বিমানের ব্যর্থতার কথা কে না জানে। তার পরও বলতে হয়, দুর্নীতি নির্মূলের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে একজন ন্যায়পাল নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতিবিষয়ক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বেঞ্চ বা অন্য কোনো উপায় বের করতেই হবে। দুর্নীতিবাজদের অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল বিচার বিভাগীয় দীর্ঘসূত্রতা। তৃতীয়ত, সার্বিকভাবে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—যথা প্রশাসনিক, রাজস্ব, আমদানি-রফতানি, এমনকি নির্বাচন পদ্ধতির ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার ব্যতীত দুর্নীতি নির্মূল অধরা থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। প্রসঙ্গত, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রসার দুর্নীতি নির্মূলে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সব শেষে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল সহজ হবে বলে মনে হয় না। মোট কথা একমাত্র সুশাসন পারে দুর্নীতিমুক্ত এক বাংলাদেশ উপহার দিতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন থাকতে হবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরতে পরতে। জনগণ যাতে সরকারকে বলতে পারে: হুজুর আমরা আপনার কাছে কোনো উপকার চাই না, শুধু মেহেরবানি করে দুর্নীতিবাজদের সামলান। প্রত্যেক বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে সরকারের নেয়া পদক্ষেপের ফলাফল নিয়ে একটা অনুচ্ছেদ ব্যয় করতে পারলে জনগণ বাধিত হবে। মনে রাখা দরকার, সমস্যা স্বীকার না করলে এর সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ছয়
আসল কথা হলো দুর্নীতি নির্মূলের ক্ষেত্রে সদিচ্ছাই সব নয়, একই সঙ্গে সঠিক পন্থা বাস্তবায়ন এবং তার যথাযথ তদারকি সদিচ্ছার সুফল কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ডেনমার্কের যুবরাজ ছাড়া যেমন হ্যামলেট নাটক সম্ভব নয়, তেমনি অর্থনীতির চলমান অস্থিরতা কাটাতে চাই ব্যয় সংকোচন এবং সে ক্ষেত্রে অর্থ পাচার ও দুর্নীতি গুরুত্বপূর্ণ ছিদ্র বলে আমরা মনে করতে পারি। যত তাড়াতাড়ি এই ছিদ্র বন্ধ করা যায় ততই মঙ্গল। টোটকার সাহায্যে হয়তো শরীরের ফোসকা সারানো সম্ভব, কিন্তু গভীর ক্ষতের জন্য দরকার সার্জারি এবং তা করার সময় এখনই।
আব্দুল বায়েস: সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়