আন্তর্জাতিক নারী দিবস

অর্থনৈতিক সমতা ও প্রযুক্তির সুফল নারীর জন্য অবারিত হোক

পরিশেষে নারী দিবস কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখে গোলাপি শাড়ি পরে র‍্যালি করার দিন নয়, কিংবা পুরুষের সাদা শার্টের সঙ্গে গোলাপি টাই পরে ‘কালার কোড’ মেলানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়।

বসন্তের স্নিগ্ধ এক সকালে এক নতুন বিশ্ববাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। গোটা বিশ্বই আজ অভাবনীয় প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে মুখর। যান্ত্রিক এ যুগে জীবন হয়েছে সহজ। তবু কি আমরা মানবিক সমতা ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে এগোতে পেরেছি? প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশেষ এ দিনটিতে নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়। তাদের সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয় এবং সব মিলিয়ে আগামীর স্বপ্ন বুনতে শুরু করি আমরা। প্রতি বছরের মতো এবারো একটি প্রতিপাদ্য রয়েছে। ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক’ প্রতিপাদ্যে এবারের নারী দিবস উদযাপিত হচ্ছে।

অর্থাৎ একটি জরুরি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে গোটা বিশ্বকে টেকসই পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিপাদ্যটির মূল লক্ষ্য গোটা বিশ্বে বিচারহীনতার সংস্কৃতি রোধ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয়া। এবার প্রচারণামূলক স্লোগান হিসেবে ‘গিভ টু গেইন’ বা ‘ত্যাগেই অর্জন’ ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ সামাজিক পর্যায়ের অগ্রগতি নিশ্চিতকল্পে অন্যকে সহযোগিতা করার মানসিকতা গড়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ একটা ‘উইন উইন’ উৎসাহকে প্রাধান্য দিয়েই এবার আয়োজিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস।

প্রতি বছর নারী দিবসকে ঘিরে একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়। নতুন বছরের জন্য থাকে নতুন লক্ষ্য। কিন্তু অতীতে যে লক্ষ্যগুলো ছিল এবং তা যে ইতিহাসের সূচনা করেছিল তা কি পূর্ণতা পেয়েছে? দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সময়ে নারীরা অধিকার আদায়ে অনেকগুলো দাবি উত্থাপন করেছিলেন।

এরপর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ এক শতক। দুঃখজনক বিষয়, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এ যুগে এসে এখনো আমরা ওই একই প্রসঙ্গগুলো তুলে ধরছি। বিশ্বব্যাপী নারীকে যেসব প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে এবং যেসব সহিংসতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে নারী কতটা অসহায়। এ কথা সত্য, নারী আজ অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। কিন্তু এখনো প্রযুক্তির সুফলের স্বাধীনতা নারীর জন্য অবারিত হয়ে ওঠেনি। গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখন এমন হয়ে উঠেছে যে ডিজিটাল স্বাধীনতা ব্যতীত পরিপূর্ণভাবে সব অধিকার ও মর্যাদা পাওয়া সম্ভব হবে না।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীর অর্থনৈতিক অগ্রগতির বাস্তবতা পর্যালোচনার বহু সুযোগ পাওয়া যায়। এ দিনটিতে জাতিসংঘ তো বটেই বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমনকি সরকার কাঠামো নারী অগ্রগতির বার্ষিক ‘রিপোর্ট কার্ড’ উপস্থাপন করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি এমনকি মানবাধিকারের প্রসঙ্গেও নারীর অবস্থান বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়। এসব পর্যালোচনা নতুন করে নীতিনির্ধারকদের জন্য জাগরণী বার্তা হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারেন, জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে পিছিয়ে রেখে জাতিসংঘের অভীষ্ট টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন সম্ভব নয়।

এক্ষেত্রে একটি ভালো উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) একটি তথ্যমতে, শ্রম খাতে লিঙ্গবৈষম্য কমানো গেলে বিশ্বব্যাপী জিডিপি ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেতে পারে। এ পরিসংখ্যান সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে নারীর ক্ষমতায়ন মানেই একটি সমৃদ্ধ প্রজন্ম এবং মজবুত জাতীয় অর্থনীতি। এ বাস্তবতা গোটা বিশ্বের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যমতে, বৈশ্বিক শ্রমশক্তিতে পুরুষের অংশগ্রহণ যেখানে প্রায় ৭২-৭৫ শতাংশ, সেখানে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ৪৭-৪৮ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার মাত্র ২৪ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের কল্যাণে নারী কর্মসংস্থানের হার (৩৮-৪০ শতাংশ) প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে ভালো হলেও নীতিনির্ধারণী পেশায় নারীর হার এখনো নগণ্য।

ব্যাংক খাতের মতো নিরাপদ কর্মক্ষেত্রেও নারী কর্মীর হার বর্তমানে ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যার মধ্যে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার (সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট) হার মাত্র ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ। বোর্ড অব ডিরেক্টরসে নারীর অংশগ্রহণ আজও নামমাত্র। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৩’ অনুসারে বিশ্বব্যাপী লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে আরো ১৩১ বছর প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের রিপোর্টে তারা জানিয়েছে, নীতিনির্ধারণী উদ্যোগের মাধ্যমে এ সময় ১২৩ বছরে নেমে এসেছে। অর্থাৎ অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আট বছরের গ্যাপ পূরণ হয়েছে মাত্র দুই বছরে। এ পরিবর্তন অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এখনো নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেকটুকু পথ পাড়ি দেয়া বাকি।

সব মিলিয়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এখনো লিঙ্গবৈষম্য প্রকট। গ্লোবাল ফিনডেক্স ডেটাবেজ বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। যদিও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এ দূরত্ব কিছুটা কমিয়েছে, তবুও বাণিজ্যিক বা এসএমই ঋণের ক্ষেত্রে নারীরা আজও প্রান্তিক পর্যায়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, মোট এসএমই ঋণের মাত্র ৫-৭ শতাংশ নারীরা পেয়ে থাকেন। এর প্রধান কারণ ‘জামানত’ বা কো-ল্যাটারালের অভাব।

উত্তরাধিকার আইনে নারীর পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তারা স্থাবর সম্পত্তি ব্যাংকে বন্ধক দিতে পারেন না। ফলে মেধা থাকলেও পুঁজির অভাবে অনেক নারী উদ্যোক্তা অঙ্কুরেই ঝরে পড়েন। তাছাড়া আর্থিক খাত ক্রমান্বয়ে প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াচ্ছে। প্রযুক্তিগত ধারণা কিংবা সাক্ষরতার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়েই পিছিয়ে আছে। কিন্তু আর্থসামাজিক বাস্তবতায় নারীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক ঘাটতি আছে।

নতুন বছরে ‘ডিজিটাল জেন্ডার ডিভাইড’ এক নতুন উদ্বেগের নাম। দেশে স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান প্রায় ২৯ শতাংশ। প্রযুক্তিতে এ পিছিয়ে পড়া নারীদের আগামীর উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান থেকে ছিটকে দিতে পারে। কর্মক্ষেত্রে নারীরা আজও ‘গ্লাস সিলিং’ বা অদৃশ্য বাধার সম্মুখীন। নিয়োগকর্তাদের অনেকের মধ্যেই একধরনের ‘প্রোবেবল বায়াস’ বা সম্ভাব্য পক্ষপাত কাজ করে, যেমন বিয়ের পর নারী চাকরি ছেড়ে দেবেন বা মাতৃত্বকালীন ছুটির কারণে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হবে। সমকাজে সমমজুরির বিষয়টি আজও কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। বেসরকারি খাতে একই পদে কাজ করেও নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে ১৫-২০ শতাংশ কম বেতন পান। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও নারী অদৃশ্য। ডিজিটাল ল্যান্ডস্কেপে নারীর উত্তরণের পথ তাই সুগম নয়।

নারীর এ অচলায়তন ভাঙার জন্য তাই নীতিনির্ধারকদের বিশ্ববাস্তবতায় যেমন গুরুত্ব দিতে হবে তেমনি অভ্যন্তরীণ কাঠামোগুলোকেও যাচাই করতে হবে। এ যাচাইয়ের মাণদণ্ড নির্ধারিত নয়। কিন্তু সুপারিশ আকারে কিছু বিষয় ভাবা যেতে পারে। প্রথমে কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অনুপাত অন্তত ৪০: ৬০ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংক ও করপোরেট সেক্টরে ‘জেন্ডার ব্যালান্স’ নীতিতে গুরুত্ব দিতে হবে।

নারীর অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়েও ভাবতে হবে। স্থাবর সম্পত্তির জামানতের বদলে নারীর ব্যবসার লেনদেন বা ‘সাইকোমেট্রিক ক্রেডিট স্কোরিং’-এর ভিত্তিতে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনরর্থায়ন তহবিল নারীদের জন্য সহজলভ্য করতে হবে। এসব সুবিধা যেন নারীরা ঠিকঠাক পান সেজন্য ডিজিটাল লিটারেসি বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নারীদের জন্য ডিজিটাল লিটারেসি ক্যাম্পেইন করতে হবে।

ফ্রিল্যান্সিং এবং ই-কমার্স খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কর রেয়াত (ট্যাক্স রিবেট) প্রদান করা প্রয়োজন। এছাড়া সব প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত ডে-কেয়ার সেন্টার বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি ‘পিতৃত্বকালীন ছুটি’ (পেটারনিটি লিভ) উৎসাহিত করতে হবে, যাতে সন্তান লালন-পালন কেবল নারীর একার দায়িত্ব না থাকে। পাঠ্যপুস্তক ও গণমাধ্যমে নারীকে কেবল গৃহিণী হিসেবে নয়, বরং সফল অর্থনীতিবিদ বা প্রযুক্তিবিদ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। সমাজকে বুঝতে হবে যে নারীর আয় তার পরিবারের দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান অস্ত্র।

পরিশেষে নারী দিবস কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখে গোলাপি শাড়ি পরে র‍্যালি করার দিন নয়, কিংবা পুরুষের সাদা শার্টের সঙ্গে গোলাপি টাই পরে ‘কালার কোড’ মেলানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অকুণ্ঠ শপথ; জেন্ডার সমতা ও সাম্যের জন্য নিবেদিত হওয়ার অঙ্গীকার। এ শপথ নিতে হবে একটি সমান্তরাল প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে। নারীর উন্নয়ন মানেই মানবতার উন্নয়ন—এ শিক্ষাটি পরিবার ও সমাজ থেকেই আসতে হবে। আমরা যদি নারীদের জন্য সর্বত্র একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে পারি, তবে সমৃদ্ধ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তোলা কেবল সময়ের ব্যাপার। আজকের সংগ্রামই হোক আগামী প্রজন্মের জন্য এক সুন্দর ও সমতার পৃথিবী।

এমএম মাহবুব হাসান: ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক

আরও