অভিমত

বিদেশী ভাষা থেকে দেশী ভাষায় রূপান্তর প্রসঙ্গে

মানবকথিত বুলি ভাষা পরিস্থিতিভেদে নানান অভিধা লাভ করে। বিশেষায়িত ভাষাবিজ্ঞানে এসব অভিধার পরিচয় পাওয়া যায়। ইন্দোআর্য ভাষাবিজ্ঞানে যেমন কোনো মানব বুলি সংস্কৃত, প্রাকৃত, পালি, অপভ্রংশ ও প্রাচীন বাংলা ইত্যাদি অভিধা লাভ করে, তেমনিভাবে শিক্ষাশ্রয়ী ভাষাবিজ্ঞানে কোনো মানব বুলি মাতৃভাষা, প্রথম ভাষা, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাষা ইত্যাদি অভিধা লাভ করে। আবার সামাজিক ভাষাবিজ্ঞানে কোনো

মানবকথিত বুলি ভাষা পরিস্থিতিভেদে নানান অভিধা লাভ করে। বিশেষায়িত ভাষাবিজ্ঞানে এসব অভিধার পরিচয় পাওয়া যায়। ইন্দোআর্য ভাষাবিজ্ঞানে যেমন কোনো মানব বুলি সংস্কৃত, প্রাকৃত, পালি, অপভ্রংশ ও প্রাচীন বাংলা ইত্যাদি অভিধা লাভ করে, তেমনিভাবে শিক্ষাশ্রয়ী ভাষাবিজ্ঞানে কোনো মানব বুলি মাতৃভাষা, প্রথম ভাষা, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাষা ইত্যাদি অভিধা লাভ করে। আবার সামাজিক ভাষাবিজ্ঞানে কোনো মানব বুলি দেশী ভাষা ও অন্যটি বিদেশী অভিধা লাভ করতে পারে। তেমনিভাবে রাজনৈতিক ভাষাবিজ্ঞানে একটি মানব বুলি জাতীয় ভাষা, দাপ্তরিক ভাষা, রাষ্ট্রভাষা ইত্যাদি মর্যাদা লাভ করে।    

ভাষা পরিস্থিতিভেদে একেকটি ভাষা তার নিজস্ব মর্যাদা লাভ করে। ঠিক একই কারণে আবার ভাষানীতি পরিবর্তনের ফলে মর্যাদা বদলায়। উদাহরণস্বরূপ একসময় (১২০৩-১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দ) বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা ও দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফার্সি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে (১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে) ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে চালু করায় ফার্সি এখন এ দেশে বিদেশী ভাষা। তেমনিভাবে একসময় ভারতীয় যুক্তরাজ্যের দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফার্সি। কিন্তু বর্তমানে এর দাপ্তরিক ভাষা হলো ইংরেজি ও হিন্দি। কাজেই ভারতীয় যুক্তরাজ্যের ফার্সি ভাষার মর্যাদার পরিবর্তন ঘটেছে। অনুরূপভাবে, বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতিতে যে ইংরেজি ভাষা একসময় ‘বিদেশী ভাষা’ ছিল, সেই ইংরেজি ভাষার মর্যাদা পরিবর্তন হয়ে এখন তা দেশী ভাষা হিসেবে মর্যাদা লাভের ধারায় রয়েছে।

বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতিতে বিদেশী ভাষা

এ পর্যায়ে জানা প্রয়োজন বিদেশী ভাষা বলতে কী বোঝায়। ভিন্ন দেশে কথিত ও ব্যবহূত কোনো ভাষা, যার সে দেশে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রভাষা বা জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি রয়েছে। এ সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতিতে বিদেশী কথিত ভাষার মধ্যে ইংরেজি বিদেশী ভাষা কিনা তা নিয়ে ধন্দ রয়েছে। এ ধন্দটির সমাধান খুঁজতে আমাদের জানতে হবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কাল থেকে শুরু করে প্রণীত আইন, ভাষানীতি ও শিক্ষানীতি সম্পর্কে। আমাদের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে জাতীয় ভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো ভাষানীতি নেই, তাই কোনো বুলির বিদেশী ভাষা হিসেবে সর্বশেষ মর্যাদা নিরূপণের কোনো দলিল আমাদের হাতে নেই। তবে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে প্রণীত ও গৃহীত শিক্ষানীতিগুলোয় ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কিত নির্দেশনাগুলো পর্যালোচনা করলে বিদেশী ভাষার মর্যাদা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে। আলোচনার সুবিধার্থে এখানে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭৩ সালে ৮ জুন প্রণীত ও ১৯৭৪ সালে মে মাসে গৃহীত শিক্ষানীতির ১৪ নম্বর পৃষ্ঠার ৪.৬ অনুচ্ছেদটি পড়লে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

শিক্ষানীতির এ অনুচ্ছেদে যে কয়টি বিদেশী ভাষার উল্লেখ আছে, সেগুলো হলো ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, রুশ, গ্রিক, জাপানি ও চীনা। অর্থাৎ এ শিক্ষানীতি ইংরেজি ভাষাকে অন্যান্য বিদেশী ভাষার সঙ্গে এক কাতারে রেখে বিদেশী ভাষা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই একই অনুচ্ছেদে ইংরেজিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ শিক্ষানীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, পঞ্চম শ্রেণীর আগে কোনো বিদেশী ভাষা শেখার প্রয়োজন নেই বলে বিবৃত করা হয়েছে। কিন্তু দেশের শিক্ষানীতিতে পরিমার্জন ও বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে কেবল ইংরেজি ভাষাকে অধিকতর মর্যাদা দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় তা প্রচলনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ শিক্ষানীতিতে বিদেশী ভাষার পক্ষে একমাত্র ব্যতিক্রমী ধারা হলো এই যে, কর্মোদ্দেশ্যে বিদেশ গমনেচ্ছুদের সুবিধার্থে কারিগরি বিদ্যালয়গুলোয় বিদেশী ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। 

এরই মধ্যে বিশ্বায়ন শুরু হয়েছে। এ বিশ্বায়নের প্রভাবে বিদেশী ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ প্রয়োজন অনুসারে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রস্তুত না হলেও বিকল্প অনেক বিদেশী ও দেশী প্রতিষ্ঠানে বিদেশী ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ইংরেজি ভাষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা এবং এ ভাষাকে অন্য সব বিদেশী ভাষার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে প্রকৃত বিদেশী ভাষাগুলো বিদেশী ভাষা হিসেবে প্রায়োগিকতা হারিয়ে চলেছে।

ইংরেজি ভাষাকে বিদেশী ভাষা অভিধা আরোপণ সমস্যা

ইংরেজি বিদেশী ভাষা হয়েও অন্যান্য বিদেশী ভাষার চেয়ে ভিন্নতর। কারণ পর্যায়ক্রমিকভাবে বিভিন্ন কালপর্বে শিক্ষানীতিতে পরিবর্তনের ফলে ইংরেজি ভাষার প্রায়োগিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর ফলে বিদেশী ভাষা হিসেবে এর মর্যাদার পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর এ পর্যন্ত জাতীয় শিক্ষানীতি বা জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ছয়বার। কালক্রমে এ ছয় ধাপে ইংরেজি ভাষার মর্যাদা বারবার পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ২০ বছর পর ১৯৯১ সালে জাতীয় কারিকুলাম কমিটি কর্তৃক প্রণীত শিক্ষানীতিতে প্রথমবারের মতো প্রথম শ্রেণী থেকে ইংরেজি ভাষাকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে চালু করার বিধান দেয়া হয় এবং ২০০০ ও ২০১০ খ্রিস্টাব্দে গৃহীত শিক্ষানীতিতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় চালুর অনুমোদন দেয়া হয়।

২০০০ সালে গৃহীত শিক্ষানীতির ৩ নং পৃষ্ঠায় শিক্ষার্থীদের জন্য একই সঙ্গে মাতৃভাষায় শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিধান দেয়া হয়। শিক্ষানীতির এ পৃষ্ঠায় মাতৃভাষা ও ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার বিধানটি যেভাবে বিবৃত করা হয়েছে, তা আমাদের কাছে ধন্দ হিসেবে উপস্থিত হয়। কেননা মাতৃভাষার মাধ্যমে একই শিক্ষা দেয়ার বিধান দেয়া হলে সেখানে ইংরেজি ভাষা মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ থাকে না।

ইংরেজি ভাষার দেশীয়করণ

এভাবে শিক্ষানীতিতে বারবার পরিবর্তনের ফলে ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থায় যে পরিবর্তনগুলো সূচিত হয় তা নিম্নরূপ: ১. দ্বিভাষিক সাক্ষরতাবিশিষ্ট জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন। ২. প্রথম শ্রেণী থেকে ত্রয়োদশ শ্রেণী পর্যন্ত সাক্ষরতা ইংরেজি কোর্সের প্রবর্তন। ৩. কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, জিইডি ইত্যাদি বিদেশী কারিকুলামে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন। ৪. শিক্ষার সব স্তরে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন।

এসব পরিবর্তনের ছাপ দেশের গণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই দৃষ্ট হচ্ছে। অর্থাৎ দেশে এখন জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ শিক্ষা ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষকরা হলেন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক অভিজাত বর্গ। এমনকি যারা জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্বে আছেন, তারাও মূলত দেশে বিকল্প ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট রয়েছেন।

দেশে এখন বাংলা ও ইংরেজি এ দুটি শিক্ষা ব্যবস্থা সমান্তরালভাবে চালু রয়েছে। এ দুই মাধ্যমের শিক্ষা থেকে মানুষের কাছে এখন উত্তমটি বেছে নেয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু মানুষের এ বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি নির্ধারিত হয় জাতীয়তাবাদী আদর্শ ও আর্থিক সামর্থ্য নামের নিয়ামক দ্বারা। কিন্তু অর্থনীতির কাছে জাতীয়তাবাদ সবসময় পিছু হটে। সবাই এখন ছুটছে ইংরেজি শিক্ষার পেছনে। কাজেই এখন বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার মধ্যে মানুষ ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাকেই বেছে নিতে চায়; এ উদ্দেশ্য থেকে বিরত থাকে শুধু তখন, যখন আর্থিক সামর্থ্য থাকে না। কাজেই ইংরেজি শিক্ষা বেছে নেয়ার ব্যাপারটি এখন আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সব শেষে বলা যায়, ইংরেজি ভাষা তার বিদেশী ভাষার মর্যাদা হারিয়ে এবং দেশীয় ভাষার মর্যাদা লাভের প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং এর ফলে এ শিক্ষা অর্থনৈতিক সামর্থ্যভিত্তিক বিভেদের দেয়াল টানতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। 

 

ড. এবিএম রেজাউল করিম ফকির: অধ্যাপক ও পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও