সম্পদের অপেক্ষাকৃত কম বরাদ্দ সত্ত্বেও বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা উভয় ক্ষেত্রেই অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। এর পুরস্কার হিসেবে দেশটিতে ঘটেছে ব্যাপক দারিদ্র্য হ্রাস এবং উন্মোচিত হয়েছে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে সুবর্ণ সুযোগ। তবে ‘সর্বসুখ’ এখনো অধরা থাকছে, তার প্রধান কারণ শিশুমৃত্যুর হার, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি। এছাড়া গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো প্রায় ৪০ শতাংশ যুবক না শিক্ষা, না চাকরি বা প্রশিক্ষণে— এমন চিত্র রূপান্তরের গল্পটি অনেকটা অসম্পূর্ণ রেখেছে বিধায় নীতিনির্ধারক মহলের উদ্বিগ্নতা বেড়েই চলেছে। উদ্বেগের এ ক্ষেত্রগুলো যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ও মনোযোগের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে তা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে না।
এক.
এটা জানা কথা যে ২০৩০ নাগাদ উচ্চ মধ্যম আয়ের মর্যাদায় পৌঁছার জন্য আগামী সাত বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে; তারপর আরো একটি উল্লম্ফন সাপেক্ষে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ১৩ হাজার ডলারের বেশি এবং তখন হয়তো মিলবে উচ্চ আয়ের দেশের মর্যাদা। কিন্তু প্রথাগত পদ্ধতিতে যে সেই ‘সোনার হরিণ’ পাওয়া সম্ভব নয় তা যত তাড়াতাড়ি বোধগম্য হবে ততই মঙ্গল। প্রথম কথা, গবেষকরা বলছেন, কম দক্ষতা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় একটি প্রধান বাধা, যেখানে কম উৎপাদনশীলতা সম্পন্ন একটি স্বল্প দক্ষ কর্মশক্তি এত বড় স্বপ্ন অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে উঠবে। অথচ কে না জানে, দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিশেষ যত্ন এবং উচ্চ বাজেট বরাদ্দের আহ্বান জানিয়ে আসছেন; শুনিয়েছেন সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্যের গল্প, যা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ বিনিয়োগের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। অতএব বাংলাদেশের উচিত ওই দেশগুলো থেকে আমাদের পরিপ্রেক্ষিতে প্রযোজ্য কৌশল/নীতিমালা প্রয়োগ করা। মোট কথা, অনেক হয়েছে; এবার শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্রুত সমাপ্ত করে শ্রমশক্তি তৈরির জন্য সেই মডেলগুলো অনুকরণ করা উচিত বলে বিজ্ঞজনদের ধারণা।
দুই.
তবে তার মানে এই নয় যে, বাংলাদেশের এ-যাবৎকালের সাফল্য একেবারে খাটো বলে লজ্জায় মুখ লুকোতে হয়। বিভিন্ন গবেষণা থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান এ রকম ধারণা দেয় বলে মনে হয় না। যেমন একটি গবেষণা প্রতিবেদন, যা বলছে (টিটু দত্ত গুপ্ত এবং অন্যান্য রচিত) তার নির্যাস হুবহু মোটামুটি এ রকম: স্বাধীনতার পর পরই ১৯৭২ সালে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতে পারত, পাঁচজনের মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পড়তে এবং লিখতে পারতেন এবং ২০ জনের একজন উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন। সময়ের আবর্তনে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার হার দাঁড়ায় ৭০ ভাগ এবং ২০২২ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুরা এক-পঞ্চমাংশের কম ছিল। গত ৫০ কি ৫৩ বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা চার গুণ বেড়েছে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দুই গুণ এবং সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয় অনেকটা ব্যাঙের ছাতার মতো বেড়েছে—বিস্ময়কর ৬ থেকে ১৬৪! বলা হয়ে থাকে যে, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে ও গ্রিসের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষের বাংলাদেশ এখন চার কোটির বেশি শিক্ষার্থীর জন্য দুই লাখ প্রতিষ্ঠান, ১৫ লাখ শিক্ষকের একটি শিক্ষা কল চালায়। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাতে সাফল্যও সুস্পষ্ট এবং আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত। তার কারণ শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, আয়ু বেড়েছে যদিও, সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য দেখায়, কিছু সূচক উল্টোরথে চলছে।
চার.
বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে খুব কম বরাদ্দের পরও (জিডিপির যথাক্রমে ২ ও ১ শতাংশের নিচে) গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে এসব ইতিবাচক প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। ইউনেস্কোর মতে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়ের অংশ বাংলাদেশের তুলনায় দ্বিগুণ। ব্যথিত চিত্তে বলতে হয়, বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ হিসেবে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বাজেট নিম্নগামী এবং তাও এমন একটি সময়কালে যখন মোট উন্নয়ন বাজেটের ২৫ শতাংশ ছিনিয়ে নিচ্ছে পরিবহন অবকাঠামো খাত। গবেষকদের রাখা প্রশ্ন: তার মানে কি বাংলাদেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের চেয়ে বেশি রাস্তার প্রয়োজন? তা হলেও মন্দ ছিল না যদি বরাদ্দ যেত গুণসম্পন্ন, দুর্নীতিমুক্ত এবং বিশেষ কারণে বাড়তি ব্যয় নয় এমন জায়গায়। অথচ দিনের শেষে হিসাবে বেরোয় যে, বাংলাদেশে এক কিলোমিটার রাস্তার খরচ প্রতিবেশ দেশ ভারতের চেয়ে ঢের বেশি।
যা-ই হোক, ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার চারটি শিক্ষা সম্পর্কিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে কিছু কৃতিত্ব প্রদর্শন করতে হবে, যেমন মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সর্বজনীন, মানসম্মত, ন্যায়সংগত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সেই সঙ্গে আরো শিক্ষার সুযোগ তৈরি। জাতীয় কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য, যেমন ২০৩১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদায় উত্তরণ—এগুলো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পাঁচ.
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধর্ষণ, খুনাখুনি, উপাচার্যদের অপকর্ম, শিক্ষক অপরাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে সংবাদ শিরোনাম দখলে ব্যস্ত এবং এগুলো বলে দেয় আমাদের উচ্চ শিক্ষা কোথায় দাঁড়িয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে এটি "স্মার্ট বাংলাদেশ" রূপকল্পকে কতদূর নিয়ে যাবে তাও আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়। এ তথ্যগুলো উত্তর দেয় কেন একটি বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয় কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৪-এ বিশ্বের শীর্ষ ৬৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান পায় না এবং কেন ২০২৩ সালে বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে ১৩৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের ১১২তম স্থান নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের নিচে অবস্থা্ন।
ছয়.
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সামনে কী আছে?
পাকিস্তানের তুলনায় একটু বেশি এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের মানবপুঁজি সূচকের মান দক্ষিণ এশিয়ার গড় এমনকি নেপালের তুলনায় কম। বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ এবং অর্থনীতিবিদরা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ সামাজিক খাতগুলোর উন্নতির জন্য অনেক কিছু করা দরকার। কারণ মানবপুঁজিতে সরকারি বিনিয়োগ যা হওয়া উচিত তার চেয়ে অনেক কম বিনিয়োগ হয়। বলা বাহুল্য, কম সরকারি বিনিয়োগ মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে গড় মানুষের নাগালের বাইরে রাখে। অন্য একটি বেদনাদায়ক পর্যবেক্ষণ এই যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য খুবই বেশি।
এদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (ডব্লিউএইচও) অসংখ্য গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে যে, ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) প্রদানের জন্য সাধারণত সরকারগুলোকে তাদের জিডিপির কমপক্ষে পাঁচ শতাংশ থেকে সাড়ে সাত শতাংশের সমতুল্য ব্যয় করতে হবে। অথচ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ তার অনেক নিচে। আবার কম বরাদ্দে ছোবল হানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অপশাসন ও অপব্যয়। ফলে সেই অল্প বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার হয় না। যেহেতু বর্তমান বাস্তবতা প্রত্যাশা থেকে অনেক দূরে, তাই সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ২০৩২ সালের মধ্যে ইউএইচসি অর্জনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার জন্য স্বাস্থ্য বাজেটে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রয়োজন।
সাত.
দিগন্তে কালো মেঘ। বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৩ প্রতিবেদন বলেছে যে, কিছু প্রধান স্বাস্থ্য সূচকের অবনতি রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আয়ু হ্রাস, নবজাতকের মৃত্যুর হার বৃদ্ধি, বিভিন্ন নতুন রোগের আগমন ইত্যাদি। অথচ এমন এক সময় ছিল যখন বাংলাদেশ নামের দেশটি এ সূচকগুলোয় গর্ব করার মতো কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছিল; এখন এমনকি গর্ভনিরোধক পরিগ্রহণের হার হ্রাস পেয়েছে।
আট.
আফগানিস্তানের পরই দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেখানে পকেটের বাইরে স্বাস্থ্য ব্যয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। গ্লোবাল হেলথ এক্সপেনডিচার ডাটাবেজ দেখায় যে, বাংলাদেশীরা তাদের স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তাদের পকেট থেকে ব্যয় করে, যা ভুটানে ১৯ ও ভারতে ৫০ শতাংশ।
বিআইডিএসের রিসার্চ ফেলো ড. আবদুর রাজ্জাক সরকার বলেছেন, আমাদের কভারেজ ব্যবধান কমাতে এবং ইউএইচসি অর্জনের জন্য জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য স্থিতিশীল এবং কার্যকর নীতির কথা ভাবতে হবে। ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠাতা হো চি মিন যেমন যথাযথভাবে বলেছিলেন,”১০ বছরের উপকারের জন্য আমাদের অবশ্যই গাছ লাগাতে হবে। ১০০ বছরের সুবিধার জন্য আমাদের অবশ্যই জনগণের বিকাশ সাধন করতে হবে।"
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বলেছিলেন, ‘শিক্ষায় বিনিয়োগই শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ’। বাংলাদেশ চাইছে ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত (উচ্চ আয়ের) দেশে পরিগণিত হতে আর তাই এখন থেকে মাত্র ১৭ বছর বেশ কয়েকটি উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা দেশটিকে তাড়া করছে। স্মার্ট বাংলাদেশে স্মার্ট নাগরিকের প্রকৃত মাপকাঠি নিহিত রয়েছে জনগণের মঙ্গল ও শিক্ষার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের মধ্যে।
পাদটীকা:
‘একসময় চীনের জাতীয় আয় আমাদের দেশের জাতীয় আয়ের চেয়ে অনেক কম ছিল, কিন্তু এখন ওরা অনেক ওপরে। এর অন্যতম কারণ ওখানে সব ছাত্রছাত্রী, কি গ্রাম কি শহরে, একটা ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। আমাদের সমস্যাগুলোর বিষয়ে আমাদের আগে জানতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যচর্চা করতে গেলে শুধু টাকা হাতে এল—তাতেই নয়, ব্যবস্থাপনাও দরকার। ব্যবস্থাপনার সংকীর্ণতা আছে।’—অমর্ত্য সেন।
আব্দুল বায়েস: অর্থনীতির অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য