বাংলাদেশের শতকরা ৭০-৮০ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষির সঙ্গে খাদ্য জড়িত, আর খাদ্যের সঙ্গে জীবন। এই জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সর্বপ্রথম সনাতন চাষ পদ্ধতি থেকে বের হয়ে প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। প্রেক্ষাপট বলছে দেশে ফসলের মৌসুমে শ্রম ঘাটতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি এবং যন্ত্রে দক্ষ কৃষক গড়ে তোলা ব্যতীত খাদ্য নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক কৃষির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কখনোই সম্ভব নয়। প্রত্যেকটি যন্ত্রেরই স্বতন্ত্র সুবিধা রয়েছে, যার ব্যবহার কৃষকের বর্তমান প্রচলিত সনাতন পদ্ধতির চেয়ে অধিক লাভজনক। তাই কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করে বর্তমান সরকার কৃষিযান্ত্রিকীকরণে বিশেষ গুরত্ব আরোপ করেছে।
প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশে কৃষক তথা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন করার জন্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণ আবশ্যক। এ লক্ষ্যে সরকার ২০০৯-২০১৩ সালে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এবং ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়ে ৩৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে খামার যান্ত্রিকীকরণের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের মাধ্যমে যথাক্রমে ৩৮ হাজার ৩৩৮টি ও ২৫ হাজার বিভিন্ন কৃষি যন্ত্র কৃষকদের সরবরাহ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য সরকার ৩০২০ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প (তৃতীয় ধাপ ২০২০-২০২৪) পাশ করেছে। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞে সরকার প্রায় ৫২০০০ কৃষি যন্ত্র কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করবে যেখানে কৃষকরা হাওর অঞ্চলে ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য অঞ্চলে যন্ত্র ক্রয়ে ৫০-৬০ শতাংশ ভর্তুকি পাবেন। প্রকল্পের আওতায় ধান গম ও ভুট্টার জন্য কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও রিপার বাইন্ডার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, সিডার বা বেড প্লান্টার, পাওয়ার থ্রেসার, মেইজ শেলার, ড্রায়ার, পাওয়ার স্প্রেয়ার, পটেটো ডিগার, ক্যারেট ওয়াশার ও আলুর চিপস তৈরির যন্ত্র কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হবে। এ প্রকল্পে মোট যন্ত্রে ভর্তুকি ব্যয় মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ। বর্তমান সরকারের কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য কৃষক পর্যায়ে ভর্তুকির সুবিধা পৌঁছানো এবং কৃষককে যন্ত্র ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা। তাই যন্ত্র সরবরাহ পরবর্তী যন্ত্রের যথাযথ ব্যবহার ও ভর্তুকি সুবিধা প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত পরিপূর্ণ ভাবে পৌঁছানো নিশ্চিতকরণের ওপরই নির্ভর করবে প্রকল্পের সফলতা।
এই লক্ষ্যে সরকার কর্মকর্তা, গ্রামীণ মেকানিক, যৌথ জমি ব্যবহারকারী কৃষক বা উদ্যোক্তা, যন্ত্র উপযোগী ধানের চারা উৎপাদন কৌশল প্রশিক্ষণ, সমন্বিত খামারে বীজ সহায়তা, এটিআই প্রশিক্ষণ ভবন ও ডরমেটরি নির্মাণ, একটি কৃষি যন্ত্রপাতি টেস্টিং ও প্রশিক্ষণ সেন্টারের সুবিধা সৃষ্টি, একটি টেস্টিং শেড নির্মাণ, কৃষি যন্ত্রপাতি উপকরণ সংরক্ষণাগার নির্মাণ এবং খুচরা যন্ত্রপাতির কাঁচামালের ট্যাক্স হ্রাস ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ভর্তুকি সুবিধা সহ আধুনিক যন্ত্র নির্ভর কৃষি প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত পরিপূর্ণ ভাবে পৌছানো ও টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণ আক্ষরিক অর্থেই অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ এবং এটি নিশ্চিতের জন্য আরো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রেক্ষাপট বলছে দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সল্প জ্ঞানের কারনে প্রান্তিক কৃষকদের উচ্চ মূল্যের ও জ্ঞান ভিত্তিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সামর্থ্য ও আগ্রহ নেই। তারা বেসরকারি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে একর প্রতি হারে এই যন্ত্রপাতি ভাড়া নিবে। সেক্ষেত্রে প্রান্তিক কৃষকদের ভর্তুকির সুবিধা নিশ্চিতকরণে ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহকৃত যন্ত্রের একর প্রতি ভাড়া নির্ধারণ প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত কোনো উপজেলায় উদ্যোক্তা পর্যায়ে উচ্চ মূল্যের কৃষিযন্ত্র ক্রয়কারী না পেলে ওই উপজেলায় যন্ত্র ব্যবহারে আগ্রহী কৃষকদের যন্ত্র ব্যবহারের সুবিধা নিশ্চিতকরণে উপজেলাভিত্তিক মাটির গঠন, প্রকৃতি, ফসল উৎপাদনে কৃষক সংস্কৃতি ও যন্ত্র ব্যবহারে কৃষকের আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে যন্ত্রের চাহিদা নিরূপণ এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।
তৃতীয়ত কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রেতা ভর্তুকি মূল্যে যন্ত্র ক্রয়ের পরে যন্ত্রের দ্বারা প্রতি বছর প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন নিশ্চিতকরণে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী কৃষককে ফসল উৎপাদনে বাধ্য করতে যৌথ জমি ব্যবহারকারী কৃষক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কৃষকের জমি ব্যবহারের বিধিমালা তৈরি প্রয়োজন।
চতুর্থত কিছু মুনফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী ভর্তুকি মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয় করে বর্তমানে বাজার মূল্যে যন্ত্রটি অন্যত্র বিক্রি করে দিতে পারে যা ভর্তুকির উদ্দেশ্য ব্যাহত করবে। প্রতিটি যন্ত্র ক্রেতাকে তার যন্ত্রটি প্রত্যাশিত জীবনকাল অবধি যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তাই দুর্নীতি রোধ, সঠিক যন্ত্র ক্রেতা নির্বাচন, নির্ধারিত ভাড়ায় যন্ত্র সরবরাহ ও যন্ত্রটি প্রত্যাশিত জীবনকাল অবধি ব্যবহার নিশ্চিতকরণে যন্ত্র ক্রেতা আইন তৈরি এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ প্রয়োজন।
পাশাপাশি যেহেতু যন্ত্রগুলো বছরের নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত অন্য সময় অব্যবহৃত অবস্থায় থাকবে তাই যন্ত্র যথাযথ রক্ষনাবেক্ষণ নিশ্চতকরণ, মাঠে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তাৎক্ষণিক কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ, দক্ষ যন্ত্রচালক তৈরিকরণ, যন্ত্র ব্যবহারের উপযোগী করে গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যে কোন যান্ত্রিক সমস্যায় বিক্রয় পরবর্তী সেবা ও খুচরা যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ, কৃষি যন্ত্র আমদানি ও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি মূল্যে পূর্বের সরবরাহকৃত যন্ত্রগুলোর যথাযথ ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি থাকলেও তার সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজন সার্বক্ষণিক তদারকি।
প্রকল্পের ব্যয় করা অর্থের ন্যায্যতা এবং টেকসই যান্ত্রিকীকরণের জন্য এসব আবশ্যক। অন্যথায় প্রকল্পটিতে যন্ত্র ক্রেতা এবং প্রান্তিক কৃষক উভয়েরই বঞ্চিত হওয়ার, মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বাড়ার এবং বিপুল অর্থের অপচয় হওয়ার আশংকা রয়েছে যা পরবর্তী উন্নয়নের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
এটি স্পষ্ট যে, এই প্রকল্পের সফলতার লক্ষ্যে সরকার সকল নীতিমালা ও আইন তৈরি এবং পরিকল্পনা গ্রহন করলেও পর্যাপ্ত প্রকৌশল জনশক্তি নিয়োগ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দপ্তর, সংস্থা ও গবেষণা কার্যক্রমে জড়িত সকল প্রকৌশল জনবলকে কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন দক্ষ জনবলে রূপান্তর এবং একসূত্রে বাঁধা ব্যতীত এর সফল বাস্তবায়ন এবং সার্বক্ষনিক তদারকি কোন ভাবেই সম্ভব নয়।
বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী ও কৃষিবিদ থাকার ফলে অঞ্চল ভেদে কৃষির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহনের পাশাপাশি ফসল, শাকসবজি, ফুল, ফলের অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন জাতের বীজ ও চারা, ভালমানের সার ও কীটনাশক এবং নানাবিধ সমস্যার সমাধান কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় মাঠ পর্যায়ে কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারন কাজের জন্য পর্যাপ্ত প্রকৌশল জনবলের অভাবে এখনো কৃষির প্রকৌশল বিদ্যা কার্যকর ভাবে কৃষকের দোর গোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। যেমন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ক্ষুদ্রসেচ বিভাগের শুধু উন্নত সেচ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্যও পর্যাপ্ত জনবল নেই। অতিসত্বর উপজেলা ভিত্তিক প্রকৌশল জনবল নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি বিএডিসি ক্ষুদ্রসেচ বিভাগকে শুধু সেচ যান্ত্রিকীকরণ ও সেচ ব্যবস্থপনা কার্যক্রমে আবদ্ধ না রেখে বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী কৃষির অন্যান্য অংশ যান্ত্রিকীকরণেও ব্যবহার করা জরুরি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধিনস্ত সকল দপ্তর ও সংস্থায় কর্মরত কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারন কাজে নিয়োজিত প্রকৌশল জনবলকে ঢেলে সাজানো, কৃষি প্রকৌশল বিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম জোরদারকরণ এবং গবেষণা কর্মীদের সঙ্গে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ কর্মীদের সমন্বয় সাধনই হওয়া উচিত টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রথম পদক্ষেপ।
সবশেষে বলা যায় সেচ ব্যবস্থাপনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকে একসূত্রে বেঁধে কৃষি প্রকৌশল অধিদপ্তর গঠন এবং সকল বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ও আইন তৈরির মাধ্যমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে মাঠ পর্যায়ে কাজ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। তাই টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণ তথা কৃষির প্রকৌশল বিদ্যা সম্প্রসারনের লক্ষ্যে সরকারের সু-দৃষ্টি ও দ্রæততম পদক্ষেপ গ্রহণ জরূরী ভিত্তিতে প্রয়োজন। অন্যথায় এই যন্ত্রই হবে ভবিষ্যত যন্ত্রণার কারণ।
আব্দুল্লাহ-আল-মুসাব্বির
সহকারী প্রকৌশলী, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)